দিনটা ছিল কোন এক শুক্রবার। তার আগের এক
শনিবারের রাতে এক দমকে বলে ফেলা কথা গুলো নিয়ে ভেবেছি অনেক। অনেক দিনের জমে থাকা
বাষ্পের স্রোতের মত কথার ঝাঁক যখন মনের মধ্যে থেকে বের হয়ে যায়, তখন ফাঁকা মনের
মধ্যেটা জুড়ে শুধু থাকে খানিক ভাবনা আর চিন্তার খেলা। ঠিক ভুল বা শঙ্কা নিঃশঙ্কার
দোলাচলে থাকা মনের তখন বড়ই করুণ দশা। এরকম এক জুলাই সন্ধ্যার এস এম এসের
প্রত্যুত্তরে পাওয়া দেখা করার আশ্বাস।
বেশ কিছুদিন আগে, সেমিনারে শেষ দেখা মুখ।
দুরন্ত বনগাঁ লোকালের রোজকার ভীড় ঠেলে প্রতিদিনের চেনা রাস্তায়ও নিজেকে হারিয়ে
ফেলি। চিনতে পারব তো? এই চেনা অচেনার দ্বন্দ্বে ভরা নতুন ফুটে ওঠা এক রাশ ভালোলাগা
কেবল সাথি হয়ে থাকে।পথঘাটের ভীড় ঠেলে প্রেসিডেন্সির ক্যান্টিনের কোণে বসেও তাই
নতুন দেখা পাওয়ার এক পরম আশ্বাসে ঘড়ির শ্লথতা এক অদ্ভুত বুক ঢিপঢিপানির জন্ম দিয়ে
যায় প্রতি সেকেন্ডে। বারবার মোবাইলের স্ক্রীনের দিকে তাকানো। কখন আসবে? ‘সে আসিবে
আমার মন বলে সারা বেলা...’।
সবকটা প্রতীক্ষার মুহূর্তকে জড় করে আকার
দেওয়ার আগেই মোবাইলএর শব্দে চটক ভাঙে। উঠে গুটিগুটি এগোই গেটের দিকে। মনেমনে একরাশ
কল্পনা। বেশ কয়েক সপ্তাহ আগে দেখা মুখের সাথে মিলিয়ে নেওয়ার শেষ মুহূর্তের
প্রস্তুতি। মণীষাকে দেখতে পাই। গেটের পাশে একরাশ লাল রঙা প্রথম দেখার আড়ষ্টতাকে
সাথী করে দাঁড়িয়ে। ক্ষণিকের ইতস্ততায় পথচলা শুরু। হাঁটতে হাঁটতে পার হয়ে যাওয়া
দুপুর ভরে থাকা কলেজ স্ট্রীটের ব্যস্ততা। ঠং ঠং করে গায়ের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া
ট্রাম। আচমকা এসে পড়া টানা রিক্সার ভয়ে হাতে হাত লেগে যায়। একরাশ গরম হাওয়ায় ভেসে
আসা ধুলো মাখা, ধোঁয়া মাখা কোলকাতার গন্ধে ভরে যায় চোখ মুখ। সব পার হয়ে সেন্ট্রাল
আভেনিউ হয়ে চলতে থাকি কোলকাতার বুকের দিকে। আমার একার কোলকাতা কখন যেন হয়ে ওঠে
আমাদের দুজনের। আমার একলা দাঁড়িয়ে থাকা নিয়ন বাতির আলোয় পার্ক স্ট্রীট রেলিঙের
গায়ে দুজনের আঁকাবাঁকা দীর্ঘ ছায়াছবি। আমাদের চলার পথের আশে পাশে তখন সবাই পথচারি।
নিশ্চুপ পরী মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভিক্টোরিয়াকে সাক্ষী রেখে তখন আমরা দাঁড়িয়ে
আছি। আমাদের কোলকাতার রাজপথে। যেন দুই পথের হঠাৎ মিলনে তৈরী হয়ে যাওয়া এক নিয়ন
আলোর শহীদ মিনার।
সেদিন কথা ছিল সিনেমা দেখার। ঋতুপর্ণ ঘোষের
সেদিন-ই রিলিজ হওয়া ছবি ‘খেলা’। নন্দনে চলছে। ঠিক হয়েছিল কলেজে দেখা করে ওখানেই
যাব। কোলাহলও আসবে বলেছিল তমালিকে নিয়ে। কোলাহলের মুম্বাই যাওয়ার আগে বাড়ি লুকিয়ে
শেষ ভিক্টোরিয়া। তাই আমরা ঠিক করেছিলাম প্রেমের সব পথ মিলে যাক আমাদের নন্দনে।
কোলাহল বলে রেখেছিল ওরা ভিক্টোরিয়া যাওয়ার পথে টিকিট কেটে রাখবে। রেখেওছিল। আমাদের
গিয়ে পড়ার ফাঁকে ওরা নিজেদের মত কিছুটা সময় কাটিয়ে নেবে ভিক্টোরিয়ার লনে। আমাদেরও
মেট্রতে যেতে যেতে সলজ্জ আলাপচারিতা শুরু। শুরু নিজেদের কথা। ফেলে আসা দিনের থেকে
তুলে দেওয়া সব মণি মুক্ত।
‘খেলা’ আমার দেখা ঋতুপর্ণর সবচেয়ে ‘খাজা’
সিনেমা। এত দুর্বল স্ক্রিপ্ট, ভাবা যায়না। যাই হোক, ‘খেলা’র সাথে শুরু হল প্রাণের
খেলা। তখন একটা টিউশনি করতাম। মাসের শেষে তিনশ টাকা। তার থেকে বাঁচিয়ে রাখা একশ দশ
টাকা নিয়ে বেরিয়েছিলাম। নন্দনের মধ্যিখানের দুটো সিটের জন্য কিছু আর বাকিটা
আইস্ক্রীম।
আমার ক্যামেরা সারাতে দেওয়া ছিল বেন্টিঙ্ক
স্ট্রীটের ক্যাননের শোরুমে। পড়ন্ত বিকেলের রোদ ঝরা এসপ্ল্যানেডের রাস্তা দিয়ে
হাঁটতে হাঁটতে আমরা খুঁজছিলাম আইসক্রিমওয়ালার গাড়ি। এক ছোট্ট লাল গাড়ির আইসক্রিম।
ওর পছন্দের চকোলেট। আলতো হাতে চামচে করে আমার মুখে জোর করে গুঁজে দেওয়া। চলতে থাকা
পথকে সাথী রেখে কখন যেন হাত ছুঁইয়ে গেছে হাত। হাতের মধ্যে হাতের ধুকপুকানি খুঁজতে
শুরু করেছে হৃদয়ের খোঁজ। বিশাল বড় সিইএসসি বিল্ডিঙের ছায়ায় লুকিয়ে পড়া সূর্যের শেষ
গোধুলিটুকু পিছলে যাচ্ছিল আমাদের শরীর দিয়ে। রাতের অন্ধকারে ঢাকতে থাকা কোলকাতার
শেষ আলোগুলোকে সঙ্গী করে ফেরার পথ ধরতে হয়। এক বুক পূর্ণতা নিয়ে স্টেটস্ম্যান
বিল্ডিঙের গা ছুঁয়ে আমাদের ঘরে ফেরার শুরু হয়, ঠিক যেখানে আমাদের শহরের সূর্যদয়।