Thursday, May 30, 2013

Post 19: Ebong Rituporno

তখন ক্লাশ থ্রি কিংবা ফোর। বাড়িতে জমা হয়ে থাকা পুরোন সব পত্র-পত্রিকার মধ্যে থেকে টেনে বের করা কোন এক আনন্দমেলার পাতায় পড়েছিলাম ‘হীরের আংটি।' শীর্ষেন্দুর গল্প পড়তে শেখা ওই সময় থেকেই। গল্পের এক অদ্ভুতুড়ে মেজাজ না-পাকা কিশোর মনকে টেনে নিয়ে ফেলত ওই সব আজগুবি চরিতের মধ্যে। শীর্ষেন্দুর সেই অদ্ভুতুড়ে মেজাজের একটু বাইরে ছিল ‘হীরের আংটি।' এক ধনী পরিবারে হঠাৎ তৈরী হওয়া এক ক্রাইসিসকে ঘিরে এক গল্প। সেবার গরমের ছুটিতে টিভিতে এক দুপুরে দেখলাম সেই গল্পটাই ছবি হয়ে এসেছে। ছুটি-ছুটিতে ‘হীরের আংটি’ দেখাবে। সত্যি বলতে গল্প পড়ে যতটা মজা পেয়েছিলাম, সেই মজাটা ছবি দেখে পেলাম না। ছবির সাথে গল্পের অমিল অনেকটাই। পরিচালকের নাম দেখলাম, ঋতুপর্ণ ঘোষ, নতুন। একদিন মা আর বাবা আমায় বাড়িতে রেখে ‘বড়দের ছবি’ দেখে এল। ছবির নাম ‘ঊনিশে এপ্রিল।' এরকম তারিখ দিয়ে নাম, কি অদ্ভুত লাগল। মা বলল এত ভালো ছবি নাকি অনেকদিন পর হল বাংলায়। কি জানি, হবেও বা! তারপর আসতে আসতে বড় হওয়ার সাথে সাথে খবরের কাগজ, টিভির সাথে কানে আসতে থাকে কত টুকরো খবর। সদ্য টিন এজার তকমা পাওয়া একটু একটু করে বড় হয়ে ওঠা মন কৌতূহল জাগায় ‘দহন’ ঘিরে। কি এমন দৃশ্য আছে! সে কথা অনেক বড় হয়ে ওঠে অব্ধিও কৌতূহল হিসাবেই থেকে গেছিল মনের ভিতর। 
এর মধ্যে যখন ক্লাশ এইটে পড়ি বাড়িতে কেব্‌ল্‌ লাইন নেওয়া হল। হঠাতই এক বিকেলে এক নতুন চ্যানেলের (আকাশ বাংলা) উদবোধনী ছবি হিসাবে দেখানো হল ‘উৎসব।' অপরিণত মনে এটা বড়দের ছবি – এই বোধটা প্রবল হয়ে উঠল। কিন্তু একটা ভালোলাগা তৈরী হল ছবি ঘিরে। 
প্রেসিডেন্সি কলেজে ঢোকার পর খুব স্বাভাবিক ভাবেই চলচ্চিত্র নিয়ে আগ্রহটা বিস্তৃত হল। অনেক দেশ-বিদেশের ছবি হাতে এল। রাতের বেলা হেডফোন কানে দিয়ে দেখে ফেললাম ‘অটাম সোনাটা।' বন্ধু বলল এটাই নাকি ‘ঊনিশে এপ্রিলের’ প্রেরণা। পাড়ার সিডির দোকানে বন্ধুর মেম্বারশিপ কার্ডে নিয়ে এলাম ‘ঊনিশে এপ্রিল’, ‘রেইন কোট।' সিনেমা দেখা শিখতে শুরু করেছি ততদিনে। সাংঘাতিক ভালো লাগল ‘ঊনিশে এপ্রিল’এর ডায়লগ, বারবার ঘুরে ফিরে শুনলাম শুভা মুদ্‌গলের গলায় ‘রেইন্‌কোট’এর টাইটেল সং। কি অসাধারণ সব লিরিক্স! এমন ব্রজবুলি ভাষায় লিখেছেন এই ভদ্রলোক! কি আশ্চর্য প্রতিভা তাঁর! এর অনেকদিন পরে আই আই টিতে এক রাতের আড্ডায় আমার কাছে পরিস্কার হয়েছে ‘ঊনিশে এপ্রিল’এর নামকরণের কারণ। ভদ্রলোকের রবীন্দ্রজ্ঞান ততদিনে আমার শ্রদ্ধার উদ্রেক করেছে। কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুর তারিখ ঊনিশে এপ্রিল ছিল, এটা জানার পর থেকে সেই শ্রদ্ধার পরিমান আরো অনেকখানি বেড়ে গেল। 
কলেজে ফেরতা এক বৃষ্টির বিকেলে ‘পূরবী’ হলে দেখলাম চলছে সদ্য রিলিজ হওয়া ‘দোসর।' একলা টিকিট কেটে ঢুকে পড়লাম। প্রসেনজিতের অভিনয় দেখে মুগ্ধ হলাম। সাদা-কালোতে ফোটোগ্রাফি, সংলাপ সব মুগ্ধ করে দিল সদ্য বড়দের সিনেমা দেখার অনুমতি পাওয়া মনকে। পাড়ার সিডির দোকান থেকে সিডি ভাড়া করে দেখে ফেললাম ‘বাড়িওয়ালি’, ‘শুভ মহরত’, ‘অন্তরমহল।' শুধু মুগ্ধ হয়ে শুনেছি সংলাপ, রবীন্দ্রসংগীতের আশ্চর্য ব্যবহার। দিনের পর দিন গুন্‌গুনিয়েছি ‘চোখের বালি’র অসাধারণ মিউজিক। 
বি এস সি পাশ করার পর প্রথম বার ডেটে যাব সদ্য প্রেমিকার সাথে। অনেক ভাবনার পর গন্তব্য ঠিক হল নন্দন। চলছে ‘খেলা।' ঋতুপর্ণ ঘোষের। তাঁর অন্যান্য ছবির তুলনায় অনেক দুর্বল হলেও আমার জীবনের একটা মোড়ে দাঁড়িয়ে ছিল ‘খেলা’, এক সাথে হাতে হাতে হাত ছুঁইয়ে দিয়েছিল। 
এরপর অনেকছবি বারবার দেখেছি। ফিরে দেখেছি ‘হীরের আংটি।' মোহিত হয়ে গেছি ডায়ালগ শুনে, মিউজিক শুনে। ছোটবেলার নির্বোধ না-ভালোলাগাটাকে করুণা করেছি মনে মনে। 
এইসব ভালোলাগা গুলো জীবনের সাথে জড়িয়ে গিয়ে ঋতুপর্ণকে আমার জীবনের একটা অংশ করে দিয়েছিল নিজের অজান্তে। প্রেসিডেন্সির বারান্দায় প্রথমবার সামনা-সামনি দেখে কোন কথা বলার সাহস না দেখিয়ে চুপচাপ বাড়িয়ে দিয়েছিলাম অটোগ্রাফ খাতা। আমার সিনেমা প্রীতির অংশ হিসাবে একবার পরিচালক হওয়ার ভূত ঘাড়ে নিয়ে দেখা করেছিলাম ‘অনিন্দ্য’দার সাথে। প্রতিদিন কাগজের অফিসে কথার ফাঁকে আমায় জিজ্ঞেস করেছিল, “পড়াশোনাটা আগে শেষ করে নেবে, তারপর এদিকে আসবে, নাকি, এখনই করতে চাও? তাহলে ঋতুদার সাথে অবসার্ভিং ডিরেক্টরের কাজ করতে পারো। আমি কথা বলে দেখতে পারি।“ সেদিন এক অনিশ্চয়তায় দুলে পড়াশোনাটাকেই বেছে নিয়ে বলেছিলাম, “ঠিক আছে, আগে মাস্টার্স কমপ্লিট করি, তারপর।“ জীবনের একএকটা ইচ্ছে থাকে - আকাশকুসুম। খুব ইচ্ছে ছিল ঋতুপর্ণ ঘোষের সেটে থাকব, চুপচাপ দেখব কিভাবে ভদ্রলোক এমন সব অসাধারণ সৃষ্টি করেন, কিভাবে লেখেন এমন সব সংলাপ! সে আর এ জীবনে হলনা। সকালের মুখ ভার করা আকাশের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে এমন কত কথা মনে এল। মানুষের সাথে আত্মার সম্বন্ধ না থাকলেও যে প্রাণের সম্বন্ধ গড়ে তোলা যায়, টের পাচ্ছিলাম। আমার মত এক নিতান্ত সাধারণ সিনেমাপ্রেমী যুবকের কাছে তাঁর ছবি যে কতভাবে আসতে পারে, ভালোবাসাতে পারে, জন্ম দিতে পারে নতুন বোধের তা অবর্ণনীয়। অনেক চ্যাট শোতে তাঁর মুখের রবীন্দ্রকথা শুনে মনে মনে টুকে রেখেছি, তাঁর ছবির আবহসংগীত গুনগুন করেছি, অনুপ্রেরণা পেয়েছি নতুন ভাবে রবীন্দ্রনাথ পড়ার। এই সব শেখা অপূর্ণ থেকে গেল। এক আকাশ কালো মেঘ সাথে দিয়ে কালপারের অজানায় সাঁতরালেন তিনি। আমাদের ভাঙা নৌকা আধ ডোবা হয়ে থেকে গেল ঘাটের কোণে। এক বুক ব্যাথা আর অপরিপূর্ণ হৃদয়ে বিদায় ঋতুপর্ণ।

Friday, May 10, 2013

Post 18: উটকামন্ডে হত্যাকান্ড




অনেকবার কায়দা করেও যখন সুমন্ত্র বাবু কিছুতেই জানতে পারলেন না, দীপ্তদা এক্সাটলি কিসে চাকরি করে, তখন বাধ্য হয়ে হাল ছেড়ে দিলেন। দীপ্তদাও ঠোঁটের কোণে একচিলতে বিজয়ীর হাসি নিয়ে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আমায় বলল, “পটলা, ঊটির আসল নাম জানিস তো?”
এটা দীপ্তদার খুব বাজে অভ্যাস। আমায় রাস্তা ঘাটে যেখানে সেখানে লোকজনের সামনে ‘পটলা’ বলে ডাকা। ‘পটলা’ মোটেই আমার নাম নয়, কোন কালে ছিল না। আমার দিব্যি একটা ভালো নাম আছে, বৈশ্যম্পায়ন চৌধুরি। আর ডাকনাম ‘অ্যাস্টেরিক্স’। সেটা থেকে ‘পটলা’টা কিভাবে ডিরাইভড্‌ হতে পারে তা দীপ্তদা ছাড়া কেউ জানেনা।
আমি প্যাঁচার মত মুখ করে বললাম, ‘কি একটা উদগাপুত্তলাম, না কি যেন, উইকিপিডিয়াতে দেখেছিলাম। মনে নেই।‘
এর অবধারিত ফল হিসাবে প্রাপ্য গাঁট্টাটা অনেক কায়দা করেও এড়াতে পারলাম না। দীপ্তদা বলল, উদগাপুত্তলাম নয় রে, গাধা, উদগামন্ডলম্‌ বা উটকামন্ড উটকামন্ড নামটা অবশ্য সাহেবদের দেওয়া
আবার ‘গাধা’ বলল! আর নেওয়া যাচ্ছে না। এবার আশু বিদ্রোহ করা দরকার। আর আমার এরকম হেনস্থা দেখে সুমন্ত্র বাবু সামনের সিটে বসে কুমীরের মত দাঁত বার করে হাসছেন। দেখে গা-পিত্তি জ্বলে গেল। হোটেলে পৌঁছে দীপ্ত দাকে ভালো করে ঝাড় দেব। কিভাবে দেব সেটাই প্ল্যান করার জন্য জানলা দিয়ে ওয়ান ফোর্থ মুন্ডু বের করে মন দিয়ে ভাবতে লাগলাম।
দীপ্তদার ভালো নাম দীপ্তমান রায়চৌধুরি। ও মোটেই আমার নিজের দাদা নয়। কস্মিনকালে ছিলো না, থাকতে পারেনা। এরকম একটা নির্দয় পাষানের মত দাদা আমার মোটেই চাইনা। খালি কথায় কথায় প্রশ্ন করে, আর না পারলে গাঁট্টা মারে। এক একটা গাঁট্টার কি জোর! যেন আকাশ থেকে শিলাবৃষ্টি হচ্ছে! ও আমার পিসতুতো দাদা। আমার চেয়ে প্রায় বারো বছরের বড়। কলেজ-টলেজ পাশ করে গেছে অনেক কাল আগে, আমি যখন ফাইভে পড়ি। তারপর সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোতে চাকরি পেয়েছিল। এই ছয় বছরে প্রোমোশন-টোমোশন পেয়ে খুব কিছু একটা হয়ে গেছে। কি হয়েছে কাউকে বলেনা। এটা নাকি ওদের মন্ত্রগুপ্তি। যত্ত ঢপবাজি। অফিস থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে কিনা, কে জানে। তাই হয়ত বলেনা কাউকে। এই যেমন একটু আগে টয়ট্রেনে সুমন্ত্র বাবুকে তো কিসে চাকরি করে, সেটাই বলল না। খালি বলল, ‘সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের একটা চাকরি করি’। সুমন্ত্র বাবু তো জানার জন্য প্রায় কৌন বনেগা ক্রোড়পতি খেলতে শুরু করে দিয়েছিলেন। তাও ভাঙতে পারলেন না। হুঁ হুঁ বাবা, এত সহজ, এ হল আমার দাদা! এর পেট থেকে কথা বের করা আর সুপুরির জুস বানানো একই ব্যাপার!
ওহ্‌, ভুলে গেছি বলতে। আমরা উটি যাচ্ছি। শীতে স্কুলের পরীক্ষা হয়ে গিয়ে বেশ একটা ছুটি পেলাম। কি করব কি করব ভাবছিলাম। হঠাৎ দীপ্তদা একদিন এসে হাজির। বাবাকে, মাকে প্রণাম-ট্রণাম করে একেবারে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ল। হাতে আবার এক বাক্স গোলাপের পাপড়ি দেওয়া সন্দেশ। ব্যাপারটা ঠিক সুবিধের ঠেকল না। এত পটাচ্ছে মানেই কিছু একটা গূঢ় অভিসন্ধি আছে। যা ভেবেছি, ঠিক তাই। কথায় কথায় বাবাকে বলল, যে ও নাকি একটা ছোট্ট কাজে চেন্নাই যাচ্ছে। কাজটা এক ঘন্টার। তারপর কয়েকদিন ছুটি আছে। তাই ভাবছে উটি ঘুরে আসবে। আমাকে সাথে নিয়ে যেতে চায়। একা একা কি আর বেড়াতে ভালো লাগে! শুনে খুব খারাপ লাগল না প্রস্তাবটা। যদিও কথায় কথায় ওর জ্ঞান দেওয়া আর না পারলে গাঁট্টা মারার কথাটা ভেবে ব্রহ্মতালুর ওপরটা সুড়সুড় করে চুলকাতে লাগল, কিন্তু তারপর ভেবে দেখলাম বেশ ছুটি কাটানোও হবে আর নতুন একটা জায়গা দেখাও হবে। উটিতে তো কত সিনেমার শুটিং-টুটিং হয় শুনেছি। এরকম একটা জায়গা ঘুরে আসা হবে বেশতাই মনে মনে ওকে ক্ষমা-ঘেন্না করে দিয়ে রাজিই হয়ে গেলাম।
পরশুদিনই চেন্নাইতে ওর কাজটা হয়ে গেছে। তারপর মেরিনা বিচ এটা ওটা দেখে সময় কাটিয়ে কাল রাতে আমরা ঊটির ট্রেনে চেপে বসেছি। চেন্নাই থেকে ডাইরেক্ট কোন ট্রেন  নেই। চেন্নাই থেকে মেট্টূপালায়াম বলে একটা জায়গা অব্ধি ট্রেনে আসতে হয়। তারপর টয়ট্রেনে করে উটি। কোন ছোটবেলায় দার্জিলিং গেছিলাম, সেখানে টয়ট্রেন চড়েছিলাম কিনা মনেও নেই। বাবা বলে চড়েছিলাম, তাই বিশ্বাস করে নিইতাই এখানে টয়ট্রেন চড়তে হবে ভেবে খুব এক্সাইটেড হয়েছিলাম। আজ সকালে মেট্টূপালায়ামে নেমেই এই সুমন্ত্রবাবুদের সাথে আলাপ। সুমন্ত্র সেন। কোলকাতার একটা ট্রাভেল এজেন্সি চালান। সেরকম বড় কিছু নয়। পাশাপাশি পৈতৃক ব্যাবসা আছে। সেটাই প্রধান জীবিকা। বেড়াতে ভালো লাগে, তাই একটা ছোট ট্রাভেল এজেন্সি খুলেছেনবেড়ানোও হবে, আর দুপয়সা কামানোও যাবে সেই সুযোগে। এবার উটি চলেছেন সাত জনের একটা দল নিয়ে। বাঙালি দেখে নিজেই এসে আমাদের সাথে আলাপ করলেন।
মেট্টুপালায়ামে আমাদের টয়ট্রেনের জন্য ঘন্টা দুয়েক অপেক্ষা করতে হল। আসলে এই চেন্নাইএর ট্রেনটা নাকি অন্যান্য দিন একটু লেট করে। কিন্তু এদিন নির্ধারিত সময়ের বেশ কিছুক্ষন আগেই ঢুকিয়ে দিয়েছে। তাই স্টেশনে বসে ব্রেকফাস্টের সাথে আলাপ পরিচয়ও চলল সবার সাথে। সুমন্ত্রবাবু ছাড়া বাকিদের মধ্যে একজন বয়স্ক মানুষ রয়েছেন। বয়ষ্ক বলতে ‘বৃদ্ধ’ নন, এই বছর ষাটেক বয়েস হবে। শুনলাম উনি নাকি ক্রিকেটার ছিলেন। নাম হিরণ্ময় চ্যাটার্জি। ক্রিকেটার শুনে বেশ উৎসাহ পেয়েছিলাম প্রথমে। তারপর শুনলাম বাংলার হয়ে রঞ্জি খেলেছেন কয়েক বছর। ইন্ডিয়া খেলেননি শুনে আর খুব একটা ইন্টারেস্ট পেলাম না। মন দিয়ে ইডলি আর বড়ার সৎকার করতে লাগলাম। হিরণ্ময় বাবু ওনার ছেলেকে নিয়ে এসেছেন। ছেলের বয়েস বছর তিরিশেক। মৃণ্ময় চ্যাটার্জি। তিনিও কিছুদিন ব্যাট-বল নিয়ে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পাড়ার মাঠের বেশি ওঠা হয়নি। এখন একটা কোম্পানির সেলসে আছেন। সঙ্গে আরো একজন আছে। ইনি মৃণ্ময়বাবুর বন্ধু। সোমক রায়। কি করেন জানিনা। বাকি পাঁচজনের মধ্যে এক দম্পতি। দেখেই মনে হচ্ছে নব বিবাহিত। সবসময় কেমন যেন একসাথে লেগে লেগে রয়েছে। বয়েস ওই তিরিশের বেশি হবেনাঅর্ক দেব আর মিসেস অপর্ণা দেব। আমি ইলেভেনে পড়ি শুনে মিসেস দেব এসে আমার গাল টিপে বললেন, “ও মা। তুমি এত বড় নাকি! আমি তো ভাবলাম সেভেন এইটে পড়। দেখলে তো মনেই হয়না।“ ন্যাকা! শুনে খুব রাগ হল। বাকি দুজনের মধ্যে শুভ্রাংশু সোমের একটা রেস্তোরাঁ আছে। ঢাকুরিয়ার কাছে। আর আলাপন দে একটি সংবাদপত্রের অফিসে কাজ করেন। ভাব দেখে মনে হয়, আমাদের মত নিতান্ত অর্বাচীনদের মধ্যে এসে পড়ে খুব বিড়ম্বনায় পড়েছেন। চোখে একটা নামী ব্রান্ডের সানগ্লাস। যদিও দীপ্ত দা পরে বলেছিল ওটা নাকি ধর্মতলা থেকে কেনা। দাম দুশো তিপ্পান্ন টাকা, সেটা একটা ডাঁটির ভিতরে মার্কার দিয়ে নাকি লেখা আছে। লেখাটা মুছে এলেও, একেবারে ওঠেনি। দীপ্তদা এরকম অনেক কিছু ‘অবসার্ভ’ করে। গুল মারে কিনা জানিনা। তবে একেবারে অবিশ্বাস করতে পারিনা। যাই হোক, এই ভদ্রলোককে আমার একেবারেই পছন্দ হয়নি।
দীপ্তদা দেখলাম হিরণ্ময় বাবুর সাথে বেশ আলাপ জমিয়েছে। দীপ্তদা নিজে কোনদিন ক্রিকেট খেলেছে কিনা আমি জানিনা, তবে খেলা দেখতে ভালোবাসে। ইডেনে খেলা থাকলে নিয়মিত যায়। আমাকেও বেশ কয়েকবার নিয়ে গেছে। তাই দুজনে মিলে বেশ ক্রিকেটের হিস্ট্রি নিয়ে সরগরম হয়ে উঠেছে দেখলাম। আর পাঁচজন বুড়ো লোকের মত, ‘আমাদের সময়ে সব কিছু ভালো ছিল’ শুরু করেছেন ভদ্রলোক। টিটোয়েন্টি এসে ক্রিকেটের সর্বনাশ করছে, বলে প্রায় কপাল চাপড়াতে লাগলেন।   
 উটিতে পৌঁছে সুমন্ত্রবাবু যেই শুনলেন যে আমাদের হোটেল বুক করা নেই, আমরা হোটেল খুঁজতে বেরবো, আমাদের আর ছাড়লেন না। বললেন, ওনাদের সাথে যেতে। উনি নাকি এই নিয়ে প্রায় পাঁচ বার উটি এলেন। আর এলে এই হোটেলেই ওঠেন। তাই গেলে সব ব্যাবস্থা হয়ে যাবে। মোবাইল থেকে ফোন করে কনফার্মও করে দিলেন রুম খালি আছে। দীপ্তদাও দেখলাম আর হোটেল খুঁজতে হবেনা বলে খুশিই হল। হোটেলটা লেকের পাড়ে। উটি শহরটা বেশ সুন্দর। ছিমছাম হিল স্টেশন। মধ্যিখানে একটা লেক আছে। ওটা নাকি আর্টিফিশিয়াল লেক। একটা বড় ন্যাচারাল লেক শহরের বাইরে আছে। আমরা পরদিন সেখানে যাব ঠিক করলাম। স্টেশন থেকে তিনটে অটো ভাড়া করা হল। হোটেল লেক ভিউ উটি। হোটেলে অফ সিজ্‌ন বলে তেমন লোক নেই। আমরা ছাড়া আর একজন বিদেশী। চায়ের টেবিলে ওঁর অ্যাকসেন্ট শুনে দীপ্তদা ফিস্‌ফিস্‌ করে বলল, “জার্মান”
আমাদের ঘরটা লেকের দিকে পাইনি। তবে হোটেলটা খুব সুন্দর। লেকের দিকের একটা সিঙ্গল রুমে হিরণ্ময় বাবু। পাশের ডবল রুমে ওনার ছেলে আর তাঁর বন্ধু। মিসেস দেব, আমরা যখন থেকে দেখছি, তখন থেকে ঘ্যান ঘ্যান করে চলেছেন তাঁর লেকভিউ ঘর চাই বলে। সুমন্ত্র বাবু অনেকবার আশ্বাস দেওয়ার পরও এই হোটেলে ঘর পাওয়ার আগে অবধি সেটা চলেছে। লেক ভিউ ঘর পেয়ে খুশিতে দুজনে ঘরে ঢুকে সেই দরজা দিয়েছেন, চা খেতেও নামলেন না। সুমন্ত্র বাবু নিচে একটা সিঙ্গল রুম নিয়েছেন। বাকি তিনজনের মধ্যে সাংবাদিক মশাই কারো সাথে রুম শেয়ার করা পছন্দ করেন না বলে তাঁকে একটা সিঙ্গল রুম দেওয়া হয়েছে। অগত্যা শুভ্রাংশু বাবুরও তাই
দীপ্তদা ঘরে ঢুকে জুতো-মোজা খুলতে খুলতে বলল, “বুঝলি, পটলা, এই ভদ্রলোকের নাম কোথায় শুনেছি বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছিনা। হিরণ্ময় চ্যাটার্জি। একবার ইন্টারনেটে দেখতে হবে।“
আবার ‘পটলা’ শুনে ভুলে যাওয়া রাগটা আবার ফিরে এল। “তুমি ওরকম লোকজনের সামনে পটলা পটলা করবেনা বলে দিচ্ছি কিন্তু। আমার কি একটা ইয়ে নেই?”
দীপ্ত দা বেশ অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকায়, তারপর খুব জোরে হাসতে থাকে। তাই দেখে আরো রাগ হয়ে গেল। “হাসছ কেন?”
“সত্যি রে, ভুলেই গেছিলাম। তোর তো ক্লাস ইলেভেন। তোর তো একটা ইয়ে আছে।“ হাসতে হাসতেই বলে দীপ্তদা, “সরি বাবা, পটলানন্দ”। শুনে আমারও খুব হাসি পেয়ে গেল। খুব এক চোট হাসার পর বললাম, “যাক্‌ গে, অ্যাপোলজি অ্যাক্সেপ্টেড। এবার বল কি বলছিলে?”
“হুম্‌। বলছিলাম যে, এই ভদ্রলোকের নামটা কোথাও শুনেছি শুনেছি বলে মনে হচ্ছে। এমন কিছু বড় ক্রিকেটার ছিলেন না যে কোন রেকর্ড বইতে দেখতে পাব। সেটাই ভাবছি,” ব্যাগ থেকে ওর নতুন কেনা আই-প্যাড টা বের করতে করতে বলল। “যা, তুই স্নান করে আয়। গরম জলে করিস। নাহলে ঠান্ডা লেগে যাবে।“ বলে বিছানায় উঠে হেলান দিয়ে আই-প্যাডটা অন করে।
ঠান্ডা গরম জল মিশিয়ে স্নান করে বেশ আরাম হল। জার্নির পর এরকম একটা হট বাথ নিলে বেশ ফ্রেশ লাগে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখি দীপ্ত দা জামা-প্যান্ট পালটে রেডি। “একি, তুমি স্নান করবে না? কোথায় যাচ্ছ?” বলি আমি।
“নাহ্‌। এসে করব। নতুন জায়গা। চল একটা রাউন্ড মেরে আসি। শিগগির রেডি হয়ে নে।“ জুতোর ফিতে বাঁধতে বাঁধতে বলে। কাঁধে ওর ক্যামেরার ব্যাগ নিয়ে নিয়েছে। আমি জানি ওর মধ্যে ওর সেই দেড় ফুট লম্বা লেন্স ওয়ালা ক্যামেরাটা আছে।
হোটেল থেকে বেরিয়ে একটা অটো নিলাম এখানকার অটো গুলো কোলকাতার মত নয়। বরং কোলকাতার ট্যাক্সির মত ব্যবহার হয় এখানে। তবে মিটার-ফিটারের কোন বালাই নেই। যা হোক কিছু চায়, একটু দরাদরি করে যা দাঁড়াবে দিতে হবে। অটোতে উঠে মার্কেটের দিকে চললাম। হোটেলের থেকে একটু এগিয়ে দেখি সোমকবাবু রাস্তার পাশে স্থানীয় একজনের সাথে কথা বলছেন। আমাদের লক্ষ্য করলেন না। দীপ্তদাও দেখেছে। কিছু বলল না।
এখানের চকোলেট যে খুব বিখ্যাত জানতাম না। অটোতে আসতে আসতে দীপ্তদা বলল। মার্কেটে এসে দেখলাম গাদা গাদা সারি দিয়ে সব চকোলেটের দোকান। আমরা পছন্দ করে একটা বড় সড় দোকানে ঢুকলাম। হরেক রকম চকোলেট সব সাজানো রয়েছে। আমার তো দেখে বেজায় লোভ লাগল। পছন্দ মত ছ-সাত রকম চকোলেট মিশিয়ে কেনা হল এক প্যাকেট। দোকান থেকে বেরোতে যাব, এমন সময় দেখি দেব দম্পতি হাজির।
“কি চকোলেট কিনতে?” দীপ্তদা প্রশ্ন করে।
“হ্যাঁ, জানেনই তো মেয়েরা কেমন চকোলেট পাগল হয়। হেঁ হেঁ। এখানে এসেই শুনেছে যে এখানকার চকোলেট খুব বিখ্যাত। ব্যস্‌, আমায় টেনে আনল। আপনারা কিনলেন?” মিঃ দেব বললেন। ততক্ষণে মিসেস দেব চকোলেটএর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছেন।
“হ্যাঁ। আমার এই ভাইটিও চকোলেটের ভক্ত।“ ইশস্‌, নিজে যেন খায়না
“ঠিক আছে, যাই দেখি। সাংবাদিক মশাইও তো এলেন আমাদের সাথে। আশেপাশে আছেন কোথাও। চলি।“ বলে স্ত্রীর ডাকে সাড়া দিয়ে ঢুকে যান দোকানে। আমি আর দীপ্তদা বেরিয়ে আসি। পাশের একটা সিগারেটের দোকান থেকে আলাপন বাবু বেরিয়ে আসেন।
“এখানের লোকেদের সাথে কমুনিকেট করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বুঝলেন?” সিগারেট ধরিয়ে বলেন আলাপন বাবু।
“হ্যাঁ, সেতো দক্ষিণের সব রাজ্যেই প্রায়।“ দীপ্ত দা বলে।
“না মশাই। ব্যাঙ্গালোর বা হায়দ্রাবাদ যান। এতো সমস্যা হবেনা। তামিলনাড়ুতে সমস্যাটা বেশি। আমি লক্ষ্য করেছি।“
“হ্যাঁ, তা হবে হয়তো।“
“কি, চকোলেট কেনা হল? কি যেন নাম তোমার?” আমার দিকে ফিরে বলেন ভদ্রলোক। আমার মোটেই উত্তর দিতে ইচ্ছে করছিল না। তাও বললাম, “হ্যাঁ। বৈশ্যম্পায়ন। ডাক নাম, অ্যাস্টেরিক্স।“
‘অ্যাস্টেরিক্স, দ্য গল্‌! বাহ্‌, বেশ নাম তো।“ তারপর দাদার দিকে ফিরে বলল, “চলুন এক কাপ চা খাই।“
সামনের একটা ছোট ক্যাফেতে ঢুকে বসলাম। আমার জন্য একটা অরেঞ্জ লাইম, আর ওদের জন্য নীলগিরি টি। আলাপন বাবু চায়ে চিনি খাননা। বললেন, উনি নাকি ডায়েবেটিক।
“আপনি কি করেন?” ভদ্রলোক সরাসরি প্রশ্ন করে দীপ্তদাকে।
চায়ে একটা সুগার কিউব ফেলে নাড়তে নাড়তে দীপ্ত দা বলে, “সরকারি চাকরি।“
“অহ্‌। আর রাজ্যের যা অবস্থা! মাইনে পত্র কদিন পর আর দেবেনা বোধহয়। বলবে...” ভদ্রলোকের কথার মাঝখানে আটকে দিয়ে দীপ্ত দা বলে, “না, আমারটা সেন্ট্রাল।“
“যাক্‌তাহলে অবশ্য চিন্তা নেই। তা কিসে আছেন?” আবার সেই শুরু হল। আমি তাড়াতাড়ি দীপ্ত দাকে বাঁচানোর জন্য, মনে পড়ে গেছে এই ভাবে বললাম, “তুমি বিকেলে বলছিলে, ওই ভদ্রলোকের সম্পর্কে, কিছু পেলে ইন্টারনেটে?”
“নাহ্‌। সেরকম কিছু পাইনি।“ দীপ্তদা আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে একটা প্রশংসাসূচক হাসি দেয়।
“কার সম্পর্কে বলুন তো?” আলাপনের কৌতূহল।
“ওই হিরণ্ময় বাবু। অ্যাস্টেরিক্সকে বলছিলাম, যে ওনার নামটা আগে কোথাও শুনেছি বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু মনে করতে পারছিনা।“ যাক্‌, এবার তাও ‘পটলা’ বলেনি।
“ওহ্‌।“ বলে আলাপন বাবু একটু চুপ করে গেলেন। তারপর আবার বললেন, “রমন লাম্বার নাম শুনেছেন তো?”
“হ্যাঁ। সে তো ক্রিকেটার ছিল।“ আমি বলে উঠি।
“ঠিক বলেছ। কিভাবে মারা গেছিলেন, জান?” আমার দিকে ফিরে বললেন।
রমন লাম্বা কিভাবে মারা গেছিল, তা আমার মনে পড়ল না। বললাম, “নাহ্‌, তা তো মনে পড়ছেনা”।
“শর্ট লেগে ফিল্ডিং করার সময় মাথায় বল লেগে মারা যান। এই বার মনে পড়েছে।“ দীপ্ত দা বলে।
“ শীর্ষেন্দু বাগচী। মোহনবাগানের প্লেয়ার ছিলেন। ঠিক ওই একই ভাবে মারা যান ময়দানে। সেভেন্টিটু-থ্রি হবে। মনে নেই এক্সাক্টলি। শর্ট লেগে ফিল্ডিং করছিলেন। ব্যাটস্‌ম্যান ছিলেন এই হিরণ্ময় চ্যাটার্জি। তখন হেলমেটের অত বালাই ছিল না ক্লাব ক্রিকেটে। লাগার সাথে সাথে স্পট ডেড। তখন কাগজে এই নিয়ে বেশ হইচই হয়েছিল।“ আলাপন বাবু চায়ে চুমুক দেন, দিয়ে “আঃ” করে তৃপ্তির আওয়াজ করেন। এরকম বেশ একটা সুন্দর বিকেলে এরকম বিচ্ছিরি ভাবে মৃত্যুর কথা শুনে মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। একটানে জুস্‌টা শেষ করে দিয়ে টেবিল-ক্লথের কোণা খুঁটতে লাগলাম। দীপ্তদা শুধু একটা “হুম্‌” বলে চুপ করে গেছে।
“বাহ্‌। আপনি বেশ খবর রাখেন তো।“ দীপ্তদা বলল।
সাংবাদিকদের কাজই তো তাই। তা, আপনারা এখানে কতদিন আছেন?” আলাপন বাবুই আবার প্রশ্ন করেন।
“চার দিন। আপনারাও তো বোধহয় চারদিন। সুমন্ত্র বাবু বলছিলেন।“ দীপ্ত দা এক চুমুকে বাকি চা টুকু শেষ করে দেয়।
“হ্যাঁ। কাল তো আমরা পাইকারার দিকটা যাব। আপনারাও ঝুলে পড়ুন না আমাদের সাথে।“
“ভাবছিলাম। আপনারা কিসে যাবেন?”
“সুমন্ত্রবাবু তো বললেন বড় টেন সিটার গাড়ি করছেন। আমরা তো আটজন আপনারা দুজন দিব্যি এঁটে যাবেন।“
“হ্যাঁ, তা ঠিক। দেখি সুমন্ত্র বাবুর সাথে কথা বলে।“ চায়ের দাম মিটিয়ে উঠে পড়ি আমরা। আলাপন বাবু লোকটাকে প্রথমে দেখে যতটা খারাপ লাগছিল, এখন আর ততটা লাগছেনা। সন্ধ্যে হয়ে আসার সাথে বেশ ঠান্ডা লাগছে। উইন্ডচিটারের চেনটা গলা অবধি টেনে নিলাম। দীপ্তদা আবার একটা মাফলার জড়িয়েছে। আলাপন বাবু মার্কেট টা ঘুরে দেখবেন বলে ওদিকে চলে গেলেন। দীপ্তদা বলল হেঁটেই ফিরবে। ও বেশ কিছু ছবি তুলেছে। মার্কেটের, রাস্তার। আমি, মার্কেট রাস্তা এসবের ছবি তুলে কি হবে জিজ্ঞেস করাতে বলল, যে জায়গায় গেছি, তার একটা রিগোরাস ফটোগ্রাফিক ডকুমেন্টেশন রাখা দরকার। পরে দেখতে ভালো লাগে।
আসার পথে দীপ্তদার সাথে গানের লড়াই খেললাম। ও এক কালে বেশ কয়েক বছর রবীন্দ্রসংগীত শিখত। গলাটা খারাপ হয়ে গেলেও মিউজিকের সেন্সটা খুব ভালো আছে। বাবাও বলে। আর অনেকরকম মিউজিক শোনে। ও শিস্‌ দিয়ে কি একটা সুর করছিল। আমাদের বাড়িতে মায়ের কেনা হিমাংশু দত্তের একটা সিডি ছিল। সেটা কয়েকবার শুনেছি। ওর শিস্‌ শুনে তাই চেনা লাগাতে বললাম, “এটা সেই গানটা না, ‘তোমারি পথ পানে চাহি’?” ও শিস্‌ থামিয়ে বলল, “নাহ্‌। এটা মোৎজার্টের হর্ন কন্সার্টো। হিমাংশু দত্ত এটা থেকেই ইন্সপায়ার্ড হয়ে ওই গানটার সুর দেন। এরকম অনেক এক্সাম্পেল আছে।“ আমি মোৎজার্ট-টোৎজার্ট শুনে যাকে বলে ‘হাইলি এক্সাইটেড’ হয়ে ওকে বললাম, “চলো, গানের লড়াই খেলি”।
ফিরে এসে দেখলাম সুমন্ত্রবাবু ‘ক্যাম্প ফায়ার’ বসিয়েছেন। ‘ফায়ার’ টুকু নেই এই যা। সবাই বেশ দোতলার লবিতে জড় হয়েছেন। আমাদেরও ডাকলেন যোগ দেওয়ার জন্য। সবার সাথে ইন্টার‍্যাকশনের পাশাপাশি গান-কবিতা। যে যা পারে আর কি। একে একে দেব দম্পতি আর আলাপনবাবুও এসে গেলেন। মিসেস দেব ভালো গান করেন দেখলাম। একবার বলাতেই স্বতস্ফুর্ত হয়ে শুনিয়ে দিলেন,”ক্ষণে ক্ষণে মনে মনে শুনি অতল জলের আহ্বান।“ মাঝে একটু কথা ভুলে গেছিলেন। দীপ্তদা ধরিয়ে দিল। শুভ্রাংশুবাবু এককালে নাটক করতেন পাড়ায়। ‘ডাকঘর’এ পিশোমশাই-এর কয়েক লাইন ডায়ালগ শুনিয়ে দিলেন।
হিরণ্ময় বাবু একটা খুব ইন্টারেস্টিং জিনিস দেখালেন। একটা উইকেটের বেল। খাওয়ার শেষে খুব নাটকীয় ভাবে টেবিলের ওপর রাখলেন জিনিসটা। রেখে বললেন, “এটার একটা বিশেষত্ব আছে। কেউ আন্দাজ করতে পারেন?”
দীপ্তদা বলল, “গায়ে তো দেখছি ডন ব্র্যাডম্যানের অটোগ্রাফ করা।“
“এক্সাক্টলি। এটা এমসিজি তে ঊনিশশো আটত্রিশের ব্র্যাডম্যানের দুশো সত্তর করা ইনিংসের বেল। এটা আমার বাবার কালেকশন। ব্র্যাডম্যান নিজে হাতে বাবাকে অটোগ্রাফ করে দিয়েছিলেন।“
“আপনি এরকম একটা দামী জিনিস এভাবে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এ তো নিলামে চড়ালে কত যে দাম উঠবে তার ঠিক নেই।“ দীপ্তদা বেলটা সাবধানে হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে দেখতে বলল। এইসব শুনে তো আমার পুরো গায়ের সব রোম খাড়া হয়ে উঠেছে। আমিও দীপ্তদার হাত থেকে জিনিসটা নিলাম ধরে দেখার জন্য।
“হ্যাঁ, সেতো জানি। তাই বলিনা কাউকে। আপনাদের বললাম। আসলে এটা আমার কাছে খুব পয়া। মানে এ ব্যাপারে আমি একটু পুরোনপন্থী। আমার কাছে তাই এটা সবসময় থাকে। এমনকি খেলার সময়ও কিটস্‌ ব্যাগে থাকতো।“

রাতে খাওয়ার টেবিলে সবার সাথে দেখা হল। শুভ্রাংশু বাবু খাবার নিয়ে খুব খুঁত খুঁত করছিলেন। ওঁর রেস্তোঁরাতে নাকি এর চেয়ে অনেক ভালো খাবার হয়। চিকেনের মধ্যে এত কারি পাতা কেন দেয় ইত্যাদি নানারকম বিষয় নিয়ে খুব বিরক্তি প্রকাশ করছিলেন। টেবিলে বসে পাশে বসা দীপ্তদাকে ফিস্‌ফিস্‌ করে বললেন, “মশাই, এখানে যদি একটা বাঙালি রেস্টুরেন্ট খোলা যায় না, দারুন চলবে।“
দীপ্তদা ততোধিক ফিস্‌ফিসিয়ে বল, “হবে ভালোই। তবে কারি পাতা দিয়ে আলু পোস্ত রান্না করাটা জানতে হবে। আপনি ভাবছেন নাকি যে খুলবেন?”
“ভাবছি। তবে একটা ঠিকঠাক বিসনেস প্ল্যান বানাতে হবে। এখানে জমির দাম কিরকম হবে বলুন তো?”
“সেটা তো বলতে পারবনা। তবে হোটেলের ম্যানাজারকে জিজ্ঞেস করতে পারেন।“
“হ্যাঁ। সেতো পারি। কিন্তু এরা আবার হিন্দি বোঝেনা। আমার আবার ইংরাজিটা যাকে বলে আর কি একটু... হেঁ হেঁ মানে বুঝতেই পারছেন। বাদুড়বাগান বয়েজ থেকে পাশ করেছি তো। ইংরাজিতে তেতাল্লিশের বেশি পাইনি কখনো।“
“ঠিক আছে, আমি না হয় জেনে দেব।“ দীপ্তদা আশ্বস্ত করে ভদ্রলোককে।

রাতে নরম বিছানায় মোটা কম্বলের তলায় ঢুকে মনে হল যেন স্বর্গের নন্দন কানন-টানন এরকম কোথায় শুয়ে আছি। দীপ্তদা দেখলাম আই প্যাড নিয়ে বসে কিসব খুটখাট করছে আর কানে হেডফোন দিয়ে গান শুনছে। সকালে নটায় বেরোতে হবে। সুমন্ত্রবাবুর সাথে কথা বলেছে দীপ্তদা। আমরা একসাথেই পাইকারা যাচ্ছি।
রাতে ঘুমিয়ে বেশ একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। দেখলাম আমাদের বাড়ির পাশের মাঠে ক্রিকেট খেলা হচ্ছে। হিরণ্ময় বাবু বল করছেন আর আলাপন বাবু ব্যাট। কিন্তু বলের বদলে একটা ইয়া বড় কয়েতবেল। তার গায়ে আবার ব্র্যাডম্যানের সই করা। আমার পাশে দাঁড়িয়ে শুভ্রাংশু বাবু বলছেন, “আচ্ছা, ভাই, এই বেলের শরবতএর একটা দোকান দিলে হয়না? তেতাল্লিশ টাকা এক গ্লাস। কিন্তু বাদুড়বাগানে জমি দরকার। আমি তো ইংরাজি জানিনা।“ এমন সময় হিরণ্ময় বাবু একটা ছক্কা হাঁকড়েছেন। আর আমি দেখলাম বেলটা আমার মাথা লক্ষ্য করে সোজা উড়ে আসছে।  দেখে ভয়ে ঘুম ভেঙ্গে গেল। সকাল হয়ে গেছে। দীপ্তদা বাথরুম থেকে বেরোচ্ছে। আমাকে দেখে বলল, “যাহ্‌, রেডি হয়ে নে। আটটা বাজে। নটায় গাড়ি আসবে।“
রেডি হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে ব্রেকফাস্ট টেবিলে গিয়ে দেখি দেব দম্পতি বারান্দায় দাঁড়িয়ে একে অন্যের ফোটো শুট করছেন। দীপ্তদাকে দেখে মিঃ দেব বললেন, “এই যে, ফোটোগ্রাফার মশাই। আপনার ওই ক্যামেরায় আমাদের দুজনের একটা ফোটো তুলে দেবেন? আমায় পরে মেইল করে দেবেন।“
“উইথ প্লেজার,” বলে দীপ্তদা ওদের ছবি তুলে দিতে গেল। আমি মনের সুখে ওমলেট টোস্ট উদরসাৎ করতে লাগলাম। খানিক্ষন পরে দীপ্তদা এসে বসল। বুঝলাম এক ছবিতে দেব-দেবী খুশি হন নি। বেশ কয়েকটা তুলে তবে ছাড়া পেয়েছে।
বলা হয়নি এর মধ্যে সোমক রায়ের সাথে একবারই কথা হয়েছে। ভদ্রলোক ভয়ানক রকম গম্ভীর। শুধু নিজের বন্ধু ছাড়া আর কারো সাথে কথা বলেন বলে মনেহয় না। মৃণ্ময়বাবুও তাই। আমাদের সাথে, মানে দীপ্তদার সাথে, কেমন আছেন, সন্ধ্যা হলে ঠান্ডা পরে এইরকম দু একটা কথা হয়েছে শুধু
গাড়িতে উঠে আমরা পাইকারার দিকে চলতে লাগলাম। রাস্তার দুপাশে বিশাল বড় গল্‌ফ কোর্স। সব আর্মির এলাকা। এখানে বেশ বড় একটা আর্মির ট্রেনিং ক্যাম্প আছে। গাড়িটা একটা পাইন বনের ধারে এসে দাঁড়ালো। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে একটা বিস্তৃত পাইন বন নেমে গেছে। ড্রাইভার সান্তানাম আমাদের বলল, ওই বনের ভিতর দিয়ে নেমে গেলে একটা বিশাল লেক দেখতে পাওয়া যাবে। এত সকাল আর অফ সিজ্‌ন বলে কিনা জানিনা, আমরা ছাড়া আর কোন টুরিস্ট চোখে পড়ল না। দীপ্তদা ইতিমধ্যে গল্‌ফ কোর্সের পাশে দাঁড়িয়ে সবার একটা গ্রুপ ফোটো তুলেছে। দেব-দম্পতি তো ছবি তোলার জন্য সবসময় উৎসাহী। বাকিরাও বেশ Say Cheese  বলে পোজ দিয়েছে। শুধু শুভ্রাংশু বাবু একটু অলস। গাড়ি থেকে নামতেই চান না। তারপর অনেক বলার পর নামানো হল।
পাইন বনের ভিতর দিয়ে নিচে নামতে গিয়ে দুটো ঘটনা ঘটল। শুভ্রাংশু বাবু পাইনের ফুল পারার জন্য লাফিয়ে গাছের ডাল ধরতে গিয়ে হাতের কব্জির কাছটা ছড়লেন আর হিরণ্ময় বাবু একবার পড়ে গেলেন। সবাই মিলে ধরে তোলা হল। লাগেনি সেরকম। বললেন কিছুতে পা আটকে পড়ে গেছেন।  গাছের শিকর-বাকর ছড়ানো চারিদিকে।
নিচে নেমে যে এত সুন্দর দৃশ্য দেখব কল্পনাও করতে পারিনি। দীপ্তদা তো ক্যামেরা নিয়ে পাগল হয়ে গেল পুরো। এবার দেব দম্পতির দাবি অনুযায়ী আবার সবার গ্রুপ ফোটো তোলা হল লেকের ধারে দাঁড়িয়ে। গ্রুপ ফোটো তুলে সবাইকে খুশি করে, দীপ্তদা ক্যামেরা নিয়ে লেকের ধার ধরে খানিকটা এগিয়ে গেল। মিসেস দেব নানা রকম পোজ দিতে লেগেছেন, আর মিঃ দেব ওনার পয়েন্ট অ্যান্ড শুটে খুব ফোটো তুলছেন। বুঝলাম এগুলো ফেসবুকের প্রোফাইল পিকচার হবে।
জলের মধ্যে কত পাখি। সব মাইগ্রেটরি বার্ডস। দারুন লাগছে। দীপ্তদা নিশ্চয়ই ওইদিকে গিয়ে অনেক ছবি তুলছে। সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে এদিক ওদিক। আলাপন বাবু দেখলাম জংগলের মধ্যে থেকে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বেরিয়ে এলেন। এরকম সুন্দর পরিবেশে কারোর সিগারেট খেতে ইচ্ছে করে!
একটু পরে, সুমন্ত্রবাবু সবাইকে ফিরতে বললেন। কারণ এখনো অনেক জায়গা যাওয়ার আছে। এখানে এত দেরী করলে হবেনা। সেসব জায়গা নাকি আরো সুন্দর। দীপ্তদাকে আশেপাশে দেখলাম নানিশ্চয়ই ফিরে আসবে ভেবে আমি বাকি দের সাথে উঠতে লাগলাম গাড়ির দিকে। গাড়িতে এসে সবাই পৌঁছে যাওয়ার পরেও ও এসে পৌঁছালনা। সুমন্ত্রবাবু বললেন, “ফোটো তুলতে কোথায় মগ্ন হয়ে গেছেন দেখ গিয়ে। ওনার মোবাইলের নাম্বার জান? তাহলে ফোন করি।“ দীপ্তদার নাম্বারটা মনেই থাকে। বললাম। কিন্তু অনেকবার রিং হওয়ার পরেও যখন তুললনা, তখন আমার ভয় করতে লাগল। সুমন্ত্র বাবু বললেন, “চল তো খুঁজে দেখি“ বাকিদের গাড়িতে বসতে বলে আমরা দুজন ওর নাম ধরে ডাকতে ডাকতে জংগলের মধ্যে দিয়ে নেমে গেলাম খানিকটা। আমি দেখেছিলাম, দীপ্ত দাকে লেকের ধার ধরে খানিকটা এগিয়ে যেতে। তাই সুমন্ত্রবাবু কে নিয়ে ওই দিকে গেলাম। কোন সাড়াশব্দ নেই। হঠাৎ জংগলের মধ্যে একটা পা বেড়িয়ে থাকতে সেদিকে দৌড়ে গিয়ে দেখি দীপ্তদা হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে। পাশে খোলা ক্যামেরার ব্যাগ। যদিও ক্যামেরাটার কিছু হয়নি। আমরা তাড়াতাড়ি ধরে তুলতেই ‘আঃ উঃ’ করে নিজেই উঠে বসল।
“কি কান্ড! কি করে হল এরকম?” সুমন্ত্রবাবু বললেন।
“জানিনা। দিব্যি ফোটো তুলছিলাম, হঠাৎ মাথার পিছনে পাথরের বাড়ি। ব্যাস। অন্ধকার সব। চোর-ছ্যাঁচোড়ের কাজ হবে,“ ক্যামেরাটাকে সযত্নে পরীক্ষা করতে করতে বলল।
“যেতে পারবে?” আমি জিজ্ঞেস করি।
এক ঝটকায় উঠে পড়ে বলে, “হ্যাঁ রে। লেগেছে তো মাথায়। পায়ে তো কিছু হয়নি।“ তারপর সুমন্ত্রবাবুর দিকে ফিরে বললেন, “একটা রিকোয়েস্ট। এই ঘটনার কথা যেন আর কাউকে বলবেন না। বলবেন ক্যামেরা নিয়ে এত মগ্ন ছিলাম, তাই ফেরার কথা খেয়াল ছিলনা। প্লিজ, কোন প্রশ্ন করবেন না। যথাসময় সব জানতে পারবেন।“
সুমন্ত্রবাবু বোকার মত ঘাড় নাড়েন।
গাড়িতে ফেরার পর ওই উত্তর-ই দেওয়া হল। ড্রাইভার একটু বিরক্তি দেখিয়ে বলল, এর চেয়ে আরো অনেক ভালো জায়গা সামনে আছে।
পাইকারা ফল্‌স্‌টা সত্যি ছবির মত। এত সুন্দর জায়গা তা লিখে বোঝানোর মত সাধ্যি নেই আমার। এবার আর দীপ্তদা কে একা ছাড়িনি। সাথে সাথে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে অনেকটা নীচে নেমে গেলাম দুজনে। দারুন সব পাখি আছে। আর দীপ্তদা বার্ড ফোটোগ্রাফি করতে খুব ভালোবাসে। আমি বললাম, “তোমার ক্যামেরা ঠিক আছে তো?”
ভিউ-ফাইন্ডারে চোখ দিয়ে একতা উড়ন্ত পাখিকে ট্র্যাক করতে করতে বলল, “ক্যামেরা তো ঠিক আছে। কিন্তু বুঝতে পারছিনা একটা জিনিস। চোর ক্যামেরা না নিয়ে ভিতর থেকে মেমরি কার্ড খুলে নিয়ে গেল কেন?”
“মানে?”
“মানে, ক্যামেরা ঠিক আছে। কিন্তু মেমরি কার্ড নেই। স্টেপনি মেমরি কার্ড দিয়ে চালাচ্ছি। ব্যাপারটা ভাবাচ্ছে রে পটলা।“ এরকম ব্যাপার শুনে আমিও এত তাজ্জব বনে গেছি যে, ‘পটলা’ শুনে রাগ হলনা।
“তাহলে সকাল থেকে যে ছবি গুলো তুললে?”
“সব গেছে।“ ব্যাস্‌। আর কিছু না বলে স্পিকটি নট হয়ে ছবি তুলতে লাগল। আমি দু-একবার কথা বলতে গিয়ে ধমক খেলাম। বলল, “চুপ্‌, এত কথা বললে পাখি উড়ে যাবে।“
ফেরার সময় দীপ্তদার ভ্রূ দুটো দেখলাম সাংঘাতিক রকম কুঁচকে রয়েছে। আর কিছু বলার বা জিজ্ঞেস করার সাহস হল না। গাড়ি থেকে বাকি সবাই মার্কেটের কাছে নেমে গেল। কিছু কেনাকাটি করে পরে হোটেলে ফিরবে। শুধু আমরা দুজন, সুমন্ত্র বাবু আর হিরণ্ময় বাবু হোটেলে ফিরলাম।
ঘরে ফিরে সব ছবিগুলো আই-প্যাডে ট্রান্সফার করল দীপ্তদা। সত্যি অসাধারন ছবি তোলে। কিন্তু সকালের ফোটো গুলো হারিয়ে গেল বলে মনটা খারাপ লাগছিল। যাই হোক, গরম জলে স্নান করে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। দীপ্তদাও স্নান করতে ঢুকবে এমন সময় দরজায় নক শুনে দরজা খুলে দেখি সুমন্ত্র বাবু।
“কি সমস্যায় পড়েছি বলুন তো!” সুমন্ত্রবাবু বললেন।
“আসুন। কেন কি হল?” দীপ্তদা বলে।
“প্রথমত, হিরণ্ময় বাবু পাইন বনে পড়ে গিয়ে রুমের চাবি হারিয়ে ফেলেছেন। রুমে ওই দামী জিনিসটা আছে বলে রুমের কি রিসেপশনে না দিয়ে সঙ্গে নিয়েই গেছিলেন। কোথায় পড়ে গেছে পকেট থেকে। দ্বিতীয়ত, শুভ্রাংশু বাবু এখুনি ফিরেছেন। ফিরেই ফোন এসেছে যে ওনার নাকি মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আইসিইউ তে রয়েছেন। তাই কাল সকালেই ফিরে যাবেন। এবার বাকি টাকা ফেরত চাইছেন। এরকম হয়, বলুন? সব বুকিং করা।“
“হুম্‌। তা সেটা তো একটা সমস্যা। আপনি নাহয় একটা কাজ করুন। ওনাকে বলুন, উনি ফিরে যান। আপনি তো পালিয়ে যাচ্ছেনা না। কোলকাতায় আপনার অফিসে আসতে বলুন, তখন না হয়...” দীপ্তদা চট্‌জলদি সাজেশন্‌ দেয়।
“ধুর্‌, সে চেষ্টা কি করিনি ভাবছেন? কিছুই শুনছেননা। আচ্ছা, দেখি কি করা যায়। আপনার শরীর ঠিক আছে তো?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ আমি ফিট।“ দীপ্তদা হেসে বলে।
“গুড। চলি তাহলে। নটায় খেতে নামুন।“
“ঠিক আছে।“
“ও ভালো কথা”, ভদ্রলোক যেতে গিয়েও ঘুরে দাঁড়িয়ে বলেন,”আর একজন বাঙালি এসেছেন হোটেলে। একটু আগে হোটেলের বুকিং রেজিস্টারে দেখলাম। আমাদের দুদিন বুকিং ছিল। সেটা এক্সটেন্ড করাতে গেছিলাম। তখন দেখলাম। দিবাকর রায়। অ্যারাইভড্‌ ফ্রম মুম্বাই। চলি।“ ভদ্রলোক নিজের ঘরের দিকে চলে যান। সত্যি, এই একার হাতে সব সামলানো খুব ঝক্কির জিনিস। দীপ্তদাও তাই বলল।
রাতে নটার সময় খেতে নেমে দেখি কেউই প্রায় আসেনি। সুমন্ত্রবাবু বললেন সবাই নাকি এত টায়ার্ড, তাই যে যার রুমে খাবার আনিয়ে নিয়েছেন। আমরা তিনজনে খাওয়া শুরু করলামএমন সময় এক ভদ্রলোক এসে কোণার টেবিলে বসলেন। মুখে একগাল চাপ দাড়ি, চোখে বেশ পুরু ফ্রেমের চশমা, আর বাঁ গালের ওপর বেশ বড়সড় একটা আঁচিলবসে বেশ চোস্ত কায়দার ইংরাজিতে খাবার অর্ডার করলেন। বুঝলাম ইনিই হলেন দিবাকর রায়। কারণ হোটেলে আর কোন বোর্ডার নেই। দীপ্তদা ফিস্‌ফিস্‌ করে বলল, “কোলকাত্তাইয়া বাঙ্গালির মুখে এত ভালো অ্যাকসেন্ট শোনা যায়না। মনে হচ্ছে মুম্বইএই বর্ন এন্ড ব্রট আপ।“
এদিন রাতে বেশ ঘুম হল। সুমন্ত্রবাবু শেষ অব্ধি কোলকাতার চেনা এজেন্টকে দিয়ে শুভ্রাংশু বাবুর ফ্লাইটের টিকিট কাটিয়ে দিয়ে রক্ষা পেয়েছেন। দুপুরে কোয়েমবাটোর থেকে ফ্লাইট। তাই ভোর না হতেই ভদ্রলোক চেক আউট করবেন। রাতে এসে গুডবাই জানিয়ে গেলেন। দীপ্তদা বলল, “খেতে এলেন না যে?”
“আর মশাই এরকম একটা খবর শোনার পর আর মনের অবস্থা ভালো নেই। তারওপর সব রিপ্যাক করার ছিল। তাই ঘরেই আনিয়ে নিলাম। চলি। আর আপনি ওই জমির দামটা জিজ্ঞেস করতে ভুলবেননা। কোলকাতায় গিয়ে দেখা হবে নিশ্চয়ই।“
“আশা করি।“ দীপ্তদা বলে।
সকালে আবার ওরকম বিটকেল একটা স্বপ্ন দেখে ঘুম-টুম ভেঙ্গে গেল। আজ আমাদের কুন্নুরের দিকে যাওয়ার কথা। একসাথেই যাওয়া হবে সবাই মিলে। শুভ্রাংশু বাবু বেরিয়ে গেছেন অনেক ভোরে। তাই আমরা এখন ন’জন। কুন্নুরের দিকটাও বেশ সুন্দর। একটা চা বাগান দেখা হল। মা-বাবার জন্য দীপ্তদা এক প্যাকেট চা কিনে দিল। নিজেও নিল একটা। তারপর ডলফিন নোজ, সুইসাইড পয়েন্ট এইসব ঘুরতে বেশ লাগল। কাল লেক দেখেছিলাম। আজ দেখলাম মালভুমি পাহাড়। বেশ অন্যরকম ফিলিংস। দীপ্তদা প্রচুর ছবি তুলল। আজ ছোট একটা লেন্স লাগিয়েছে দেখলাম। দেড় ফুটিয়া লেন্সটা ব্যাগে নিশ্চয়ই। দুপুরে দোকান পাওয়া যাবে বলে আজ আর খাবার প্যাক করা হয়নি। একটা ছোট্ট দোকানে বেশ গরম গরম ভাত, সম্বর, পাঁপড়ভাজা, বাঁধাকপি খেতে খারাপ লাগলনা। একটু টক টক, কিন্তু বেশ সুস্বাদু।
বিকেলে ফেরার পথে শহরের ভিতরে একটা ছোট বোটানিকাল গার্ডেন আছে। সেখানে যাওয়া হল। বেশ ভালো লাগল আমার। অর্কিড হাউসের অর্কিডের ছবি তুলল দীপ্তদা ওই দেড়-ফুটিয়া দিয়ে। ক্যামেরার ডিসপ্লেতে দেখেই ব্যোমকে গেলাম পুরো। বাকিরা গাড়ি করে ফিরে গেল হোটেলে। আমরা দুজন মার্কেটের কাছে নেমে গেলাম। দীপ্তদার নাকি সেভিং ক্রিম ফুরিয়ে গেছে।
ফেরার সময় আবার হাঁটা ধরলাম আমরা। অন্ধকার হয়ে এসেছে। আসতে আসতে শহরের আলোগুলো সব জ্বলে উঠছে। বেশ দেখতে লাগে। হোটেলে এসে সারাদিন জার্নির ক্লান্তিতে কোনরকমে খেয়ে নিয়ে বিছানায় পড়েই তলিয়ে গেলাম ঘুমে।
সকালে স্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙলোনা। ভাঙলো দীপ্তদার ঝাঁকানি তে।
“কি হল?” ধড়মড় করে উঠে বসে বলি।
“খুন। হিরণ্ময় বাবু খুন হয়েছেন নিজের ঘরে।“
এর ঠিক রিঅ্যাকশন কি দেওয়া উচিত বুঝতে পারলাম না। বোকার মত মুখ হাঁ করে চেয়ে রইলাম। দীপ্তদা বলল, “বোকার মত না তাকিয়ে থেকে শিগগির গিয়ে মুখ ধুয়ে নে। পুলিশ আসছে।“ জীবনে কখন এরকম অবস্থায় পড়িনি। একেবারে খুন! স্কুলের বন্ধুদের গিয়ে বললে সবার একেবারে রোম খাড়া হয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে এসে দেখি সবাই ভীড় করেছেন রুমের আশেপাশে। দীপ্তদা আমায় ভিতরে যেতে বারণ করল। সুমন্ত্রবাবু তো মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। মৃন্ময়বাবু পুলিশে ফোন করেছেন।
মিসেস দেব তো মিঃ দেবের জামা খামচে ধরে ফ্যাকাশে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছেন। মিঃ দেবকে খালি বলছেন,”তুমি একদম ওদিকে যাবেনা বলে দিচ্ছি।“
পুলিশ এসে ভিতরে ঢুকে সব দেখতে শুরু করল। ইন্সপেক্টর মিঃ স্বামীনাথন এসে সুমন্ত্রবাবুকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে লাগলেন। সকালে বেড টী দিতে এসে বেয়ারা দেখে যে দরজা খুলছেন না হিরণ্ময় বাবু। ভেবেছে ঘুমাচ্ছে। পরে আবার আসে। কিন্তু অনেক ধাক্কাধাক্কির পরও যখন খোলেননি দরজা, তখন মৃণ্ময় বাবু আর সোমকবাবুকে খবর দেয়। ঘর লকড্‌ ছিলো না। খোলার পর দেখা যায় এই অবস্থা। বিছানার ওপর পড়ে আছেন। সে এক রক্তারক্তি ব্যাপার। কেউ ভারী কিছু দিয়ে মাথায় মেরেছে। মার্ডার ওয়েপন কোথাও নেই। জানলা টপকে জোরে ছুঁড়ে দিলেই হল। একেবারে লেকের জলে। মৃণ্ময়বাবু তখুনি পুলিশকে ফোন করেন। পুলিশের ডাক্তার বললেন রাত দুটো থেকে তিনটের মধ্যে হয়েছে ঘটনাটা। হোটেলের দরজা রাত এগারোটার পর বন্ধ হয়ে যায়। সুতরাং বাইরের থেকে এসে যে কেউ খুন করবে, সেটাও সম্ভব নয়। খুনি ভিতরের কেউ।
মিঃ স্বামীনাথন সবাইকে জেরা করবেন বললেন। সুমন্ত্রবাবু ওনাদের দলের সবাইএর নাম বললেন। মিঃ স্বামীনাথন তারপর দীপ্তদার কাছে এসে বলেন, “আপনি কে?”
দীপ্তদা ওকে বললেন যে আমরা বেড়াতে এসেছি আলাদা। এখানে এসে ওনাদের সাথে দেখা হয়ে গেছে। তারপর হঠাৎ কি মনে করে বলে বসল, “কিছু মনে করবেন না, আমি এই ব্যাপারটা তদন্ত করতে চাই। আপনি আপনার কাজ চালান। এদিকে আমি নিজে একটু উৎসাহী। তদন্তের ব্যাপারে।“
এরকম একটা প্রস্তাব শুনে স্বামীনাথন প্রথমে অবাক হয়ে গেলেন। তারপর বললেন, “আপনাকে দিয়েই তো তাহলে জেরা শুরু করতে হয় দেখছি। প্রাইভেট গোয়েন্দা নাকি? শার্লক হোমস্‌? থানায় তুলে নিয়ে গেলে সব শখ মিতে যাবে, বুঝেছেন?”
দীপ্তদা ততক্ষণে পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে ফেলেছে। ওর পকেটে আই-কার্ডও থাকে দেখে আমি থ হয়ে গেলাম। এরকম তো সিনেমায় দেখি। স্বামীনাথন দীপ্তদার আই-কার্ড দেখে আবার অবাক হয়ে মুখের দিকে তাকালেন। তারপর হাতের লাঠিটা বগলে নিয়ে খটাস্‌ করে একটা স্যালুট ঠুকে বললেন,”সরি, স্যর। মানে, বুঝতে পারিনি।” ওনার মুখটা দেখে আমার খুব হাসি পেয়ে গেল। বাকিদেরও তথৈবচ অবস্থা। সুমন্ত্র বাবু তো এসে মাথা-টাথা চুলকে বললেন, “কে দাদা আপনি?”
দীপ্তদা মুচকি হেসে বলল, “সরকারি চাকুরে।“পরের মুহুর্তেই গম্ভীর ভাবে স্বামীনাথনকে বলল, “আপনি যা যা জেরা করার করে নিন। তারপর আমি করব। ততক্ষণ ঘরটা একবার দেখব। চিন্তা নেই কোন জিনিস ডিসপ্লেস করবনা।“
দীপ্তদা অনেকক্ষণ ধরে হামাগুড়ি দিয়ে, হাঁটু গেড়ে, মেঝেতে শুয়ে পড়ে ঘরটা দেখল। তারপর হিরণ্ময় বাবুর জিনিসপত্র দেখতে দেখতে হঠাৎ মৃণ্ময় বাবুকে প্রশ্ন করলেন, “সেই ব্র্যাডম্যানের বেলটা কোথায় থাকত?”
মৃণ্ময়বাবু বললেন, “আমি তো ঠিক জানিনা। তবে, যতদূর জানি ওই হ্যান্ডব্যাগের মধ্যেই।“ দীপ্তদা হ্যান্ডব্যাগটা নিয়ে সেটার চেন খোলার আগে ভালো করে উপরটা পরীক্ষা করে হঠাৎ কিছু একটা ছোট্ট জিনিস লেগে থাকতে দেখে, নিয়ে তাড়াতাড়ি পকেটে পুরলো। আমি এত দূর থেকে বুঝলাম না ওটা কি। তারপর ভিতরের সব জিনিস ঘরের এক কোণে সব ঢেলে ফেলে বলল, “সব আছে। কিন্তু বেল নেই।“
ঘরের সব জিনিস খুঁজেও বেল পাওয়া গেলনা। ইতিমধ্যে পুলিশের জেরা শেষ। যতক্ষণ তদন্ত চলছে, কাউকে হোটেল ছেড়ে বেরোতে দেওয়া হবেনা। দিবাকরবাবু একটু আগে পাইকারা যাওয়ার জন্য বেরোচ্ছিলেন। ওনাকেও আটকে দেওয়া হয়েছে। সবাইকে যে যার ঘরে থাকতে বলে মিঃ স্বামীনাথন দীপ্তদাকে ‘প্লিজ্‌ প্রোসিড’ বলে চলে ঘরটা লক করে দুজন পুলিশ পোস্ট করে গেলেন। যাওয়ার আগে দীপ্তদার ফোন নাম্বার নিয়ে গেলেন, আর চায়ের নেমন্তন্ন করে গেলেন।
দীপ্তদা আমাকে বলল, “যা তো ঘরে গিয়ে আমার আই-প্যাডটা আর নোটবুকটা নিয়ে আয়। তুই আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট।“ আগে এরকম বললে খুব রাগ করতাম হয়তো, কিন্তু একজন ইন্সপেক্টর এত খাতির করল দেখে বেশ গর্ব হচ্ছিল। তাই বেশ থ্রিল নিয়ে দীপ্তদার আদেশ পালন করতে ছুটলাম। এসে দেখলাম দীপ্তদা ম্যানেজারকে বলে একটা খালি ঘর খুলিয়ে তার মধ্যে একটা চেয়ার নিয়ে বসেছে। সুমন্ত্রবাবুকে বলল,”আপনার সাথে কথা বলে প্রথমে ছেড়ে দিই।“ সুমন্ত্রবাবু “নিশ্চয়ই” বলে সামনের চেয়ারটায় ধপ্‌ করে বসে পড়লেন। আমি গিয়ে দরজাটা আটকে দিলাম।
  দীপ্তদা নোটবুকটা সুমন্ত্রবাবুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “আপনার পুরো নাম, ঠিকানা আর কি করেন লিখে দিন তো।“ সুমন্ত্রবাবু লিখে খাতা-পেন ফেরত দেন। দীপ্তদা চোখ বোলাতে বোলাতে জিজ্ঞেস করেন, “আপনার ব্যবসা কিসের?”
“ওই ইলেকট্রনিক্স গুডসের। সাপ্লাই দিই বিভিন্ন দোকানে।“
“কেমন চলে?”
“ভালোই। ওই এলাকায় মনোপলি বলতে পারেন”।
এলাকা বলতে?
“আমার বাড়ির এলাকা। শ্যামবাজার। ওখানেই আমার অফিস-কাম-দোকান।“
“আচ্ছা, হিরণ্ময় বাবুর সাথে কিভাবে পরিচয়?”
“আর পাঁচজন কাস্টোমারের সাথে যেভাবে হয়। আমি অ্যাড দিয়েছিলাম কাগজে। উনি দেখে প্রথমে ফোনে যোগাযোগ করেন, পরে এসে টাকা জমা দিয়ে যান।“
“আর বাকিরা? একই রকম ভাবে?”
“বাকিরা বলতে হিরণ্ময় বাবু ওনার, ওনার ছেলে আর তার সোমক বাবুর টাকা জমা দিয়ে যান। আলাপনবাবুর কাগজেই আমার অ্যাড বেরোয়। আমি যখন অ্যাড জমা করতে গেছিলাম। তখনই উনি ধরেন আমাকে।“
“এক মিনিট। উনি তো সাংবাদিক। আপনি নিশ্চয়ই কোন সাংবাদিকের কাছে বিজ্ঞাপন জমা দেননি।“
“উনি তো সাংবাদিক নন। উনি কাগজের অফিসে চাকরি করেন। অ্যাড সেকশনে।“
“স্ট্রেঞ্জ। তারপর বলুন।“
“বাকিদের মধ্যে, সবাই ওই অ্যাড দেখে ফোন, তারপর এসে টাকা জমা দিয়ে যাওয়া।“
“ওকে। ঠিক আছে, আপনি এবার আসতে পারেন। আপনি প্লিজ, মৃণ্ময় বাবুকে পাঠিয়ে দিন” দীপ্তদা বলে।
“নিশ্চয়ই” বলে সুমন্ত্রবাবু চলে যান।
মৃণ্ময়বাবুকে দৃশ্যতই খুব ধ্বস্ত লাগছে। স্বাভাবিক। ভদ্রলোককে দেখে আমার খুব খারাপ লাগল। ওনাকে দিয়েও দীপ্তদা নাম ইত্যাদি লিখিয়ে নিল। তারপর বলল,
“দেখুন, আমি খুব দুঃখিত। আপনাকে এভাবে জেরা করতে হচ্ছে।“
“না না, ঠিক আছে, বলুন
“আপনি লিখেছেন যে ম্যাকিনটোশ এন্ড সন্স-এর সেলসে আছেন। কোম্পানি কিরকম চলে?”
“পুরোনো কোম্পানি। খুব ভালো নয়। তাই অন্য কোথাও জব খুঁজছিলাম।“
“আচ্ছা। আপনার মা...”
“মা মারা গেছেন। দু’বছর হল। আমি আর বাবা থাকি বাড়িতে, সরি, থাকতাম।“
“ওহ্‌। সোমকবাবু আপনার কিরকম বন্ধু?”
“ও আগে আমার কোম্পানিতেই ছিল। তখনই বন্ধুত্ব। পরে কিছু প্রবলেম হওয়ায় ও কোম্পানি ছেড়ে দেয়। দিয়ে অন্য কোম্পানিতে যোগ দেয়।“
“আপনার পড়াশোনা?”
“আমি বিকম পাশ করি। ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি থেকে।“
“আপনার সাথে আপনার বাবার সম্পর্ক কেমন ছিল?”
“ভালো। মা মারা যাওয়ার পর আমিই বাবার একমাত্র সম্বল ছিলাম।“
“আপনি জানেন, আপনার বাবার খেলোয়াড় জীবনে একটা খুব দুঃখজনক ঘটনা আছে?”
“হ্যাঁ। শীর্ষেন্দু বাগচী। বাংলার টিমে ঢোকার জন্য বাবার কম্পিটিটর ছিলেন। কিন্তু তার আগেই...”
“সেটা নিয়ে আপনার বাবার মনে কোনরকম আফশোস ছিল?”
“আফশোস ছিল কিনা জানিনা, কিন্তু অনেকবার বলতেন। যদিও এও বলতেন যে অ্যাক্সিডেন্ট ইজ অ্যাক্সিডেন্ট। তাতে তো কারো হাত নেই।“ 
“আচ্ছা। ঠিক আছে। আপনি আসুন। সোমক বাবুকে ডেকে দিন, প্লিজ।“
সোমকবাবুকে দেখে যথারীতি কিছু বোঝার উপায় নেই যে কিছু ঘটে গেছে। একটা নির্লিপ্ত মুখ নিয়ে এসে চেয়ারে বসেন। দীপ্তদা প্রশ্ন শুরু করার আগেই ভদ্রলোক বলেন, “আমি নিশ্চয়ই আপনার সব কথার জবাব দিতে বাধ্য নই। পুলিশকে আমি যা বলার বলেছি।“
“আপনি এই মুহুর্তে নিশ্চয়ই বাধ্য ননকিন্তু পরবর্তী ক্ষেত্রে হতেও পারেন।“
“পরবর্তী ক্ষেত্রে মানে? আপনি কি বলতে চান, আমি খুন করেছি?”
“কেউ সন্দেহের ঊর্ধে নয়। আপনি যদি আমার কয়েকটা সহজ প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সাহায্য করেন, তাহলে তদন্তের সুবিধা হবে।“
“বলুন”
“আপনি লিখেছেন যে আপনি এখন সি জি এস এফ নামের একটি কোম্পানিতে আছেন। এখানে আপনার কাজ কি?”
“আমি একজন আর্কিটেক্ট।“
“ওহ্‌। কোথা থেকে পাশ করেছেন?”
“যাদবপুর। নাইন্টিটু।“
“আপনি ম্যাকিন্টোশ ছাড়লেন কেন?”
“মৃণ্ময় বলেছে?” একটু থেমে বললেন,”ওখানে একটা ব্যাপারে আমায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়। বদনাম থেকে বাঁচার জন্য আমি কোম্পানি ছাড়ি।“
“কি ব্যাপার?”
“সেটা আমি বলতে বাধ্য নই”
“বেশ, আমার শেষ প্রশ্ন, হিরণ্ময় বাবুর সাথে আপনার কতটা ইন্টার‍্যাকশন ছিল?”
“ছেলের বন্ধু হিসাবে যতটা হয়। কয়েকবার ওদের বাড়ি গেছি। বেশিরভাগ সময়ই ক্রিকেটের গল্প। ব্যাস্‌। এটুকুই”।
“ঠিক আছে, আপনি আসুন। আলাপন বাবুকে পাঠিয়ে দিন” দীপ্তদার বাড়ানো হাতে হ্যান্ডশেক করে সোমক বাবু বেড়িয়ে যান।
সোমক বাবু বেরিয়ে যেতে দীপ্তদা আমায় বলল, আস্টেরিক্স, দুটো কফি বলতো। তোর আর আমার। বক্‌বক্‌ করে গলা শুকিয়ে যাচ্ছে
আমি দৌড়ে গিয়ে কফি বলে ঘরে ফিরে দেখি আলাপন বাবু এসে বসেছেন। দীপ্তদা বলছে, “হিরণ্ময় বাবুর সম্পর্কে খবর তো রাখেন, কোন ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল?”
“নাহ্‌। বলেছি তো সাংবাদিক হলে সবরকম খবর রাখতে হয়।“
“কিন্তু আপনি তো সাংবাদিক নন, আলাপন বাবু। আপনি অ্যাডভার্টাইজমেন্ট সেকশনে কাজ করেন। তাই নয় কি?” দীপ্তদা সরাসরি বলে।
আলাপনবাবু একটু হকচকিয়ে গিয়ে বললেন,”হ্যাঁ, মানে খবরের কাগজে তো। তাই আর কি।“
দীপ্তদা হেসে বলে,” খবরের কাগজের অফিসের সবাই তো সাংবাদিক হয়না আলাপনবাবু।“
আলাপন বাবু মাথা নিচু করে বসে থাকে। দীপ্তদা বলে,”আপনি তো চায়ে চিনি খাননা। ডায়েবেটিক। তাহলে রাতে নিশ্চয়ই অনেকবার ওঠেন। সেদিন রাতে কিছু শোনেননি? আপনার ঘর তো হিরণ্ময় বাবুর ঠিক মুখোমুখি।“
“নাহ্‌। কোন শব্দ শুনিনি।“
“বেশ। আপনি এবার আসতে পারেন।“
ইনি হ্যান্ডশেক করে যাওয়ার পর দীপ্তদা মুখ বেঁকিয়ে আমায় বলল,“সদ্য নখ কেটেছে রে। হ্যান্ডশেক করতে গিয়ে হাত ছড়ে গেল।“
এরপর দেব দম্পতি এসে প্রায় ঝড় বইয়ে দিলেন। মিসেস দেব তো কেঁদেকেটে একসা। বিয়ের পর এই ওদের এতদূর ঘুরতে আসা। শাশুড়ি কি বলেছেন, বড় ননদের মেয়ে কেন উটি আসতে বারণ করেছিল, সে এখন ইউকে তে আছে। সব কথা শুনিয়ে দিলেন। তারপর দীপ্তদা যেতে বললে নিজেদের কপাল আর সুমন্ত্রবাবুর দোষ দিতে দিতে আমাদের পরিত্রাণ দিয়ে ঘর ছাড়লেন।
দিবাকর বাবু ঘরের মধ্যেও টুপি, মাফলার পরে থাকেন দেখলাম। আগেও দুবার টুপি, মাফলার পরাই দেখেছি। বললেন ঠান্ডার ধাত। খুললেই ঠান্ডা লেগে যাবে। দীপ্তদার নোটবুক ফিল-আপ করে দেওয়ার পর বললেন,”আমাকে কেন আপনারা জেরা করছেন, বলুন তো? আমি আপনাদের চিনিই না। এলাম বেড়াতে। সারাদিনের বেড়ানোটা মাটি করলেন”। দৃশ্যতই খুব বিরক্ত ভদ্রলোক।
দীপ্তদা খুব শান্তভাবে বলল,”দেখুন, একটা মিস্‌হ্যাপ হয়েছে, আমাদের হাতে তো কিছু নেই। সুতরাং, মনে করুন এই হোটেলে থাকার ‘অপরাধ’ হিসাবে এই একটু দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। আপনাকে কিছু তেমন জিজ্ঞাস্য নেই আমার। শুধু ছোট ছোট দুটি প্রশ্ন করে ছেড়ে দেব।“
“বেশ বলুন”
“আপনার বাড়ি মুম্বইতে বললেন তো?”
“হ্যাঁ।“
“এখানে পরশু এসেছেন। কিসে এলেন?”
“ফ্লাইটে চেন্নাই। দেন বাই কার।“
“ওকে। গুড। আপনি পেশা লিখেছেন টিচার। কি পড়ান?”
“বায়োলজি।“
“ওকে। ফিরছেন কবে?”
“আমার পরশু দুপুরের ফ্লাইট আছে। তাই কাল রাতেই বেরোনোর কথা এখান থেকে। কিন্তু এ যা হল। কিছু তো বুঝতেই পারছিনা।“
“চিন্তা করবেন না। আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কেস টা সল্‌ভ করার চেষ্টা করছি। কারণ ফেরার তাড়া আমারও আছে কি না।“
“দেখুন হলেই ভালো।“
“ঠিক আছে। আপনি আসুন। আবার দরকার হলে একটু বিরক্ত করব।“ বলে দীপ্তদা হাত বাড়িয়ে দেয় হ্যান্ড শেক করার জন্য। ভদ্রলোক হ্যান্ডশেক করে চলে গেলেন। দীপ্তদার দেখলাম ভুরুটা সাংঘাতিক রকম কুঁচকে গেছে। আমি নোটবুকটা তুলে উলটে পালটে দেখতে থাকলাম।
ঘরে এসেও দীপ্তদা চুপ করে বসে রইল। আর আই প্যাড আর ওই নোটবুকটা খুলে কিসব দেখতে লাগল। আমি যা গোয়েন্দা গল্প-টল্প পড়েছি, তা থেকে জানি যে এই সময় বিরক্ত করতে নেই গোয়েন্দাদের। তাই চুপচাপ বসে সাথে নিয়ে আসা গোরস্থানে সাবধান পড়তে লাগলাম। একটু পরে দীপ্তদা বলল,”চল, লাঞ্চ করে আসি।“ খিদেও পাচ্ছিল বেশ। লাঞ্চের জন্য নীচে নেমে দীপ্তদা দেখলাম ডাইনিং হলের দিকে না গিয়ে সুমন্ত্রবাবুর দরজায় নক্‌ করল। ভদ্রলোক বেরোতেই বলল,”আপনি কাল শুভ্রাংশুবাবুর ফেরার টিকেট যার কাছ থেকে করে দিয়েছিলেন, তার ফোন নাম্বারটা দেবেন? আমারও একটা টিকেট করতে হবে।“
দীপ্তদা আবার কোথায় যাবে? আমি খুব অবাক হয়ে ভাবতে লাগলাম। সুমন্ত্রবাবু ‘নিশ্চয়ই’ বলে মোবাইল থেকে নাম্বারটা দীপ্তদাকে দেন। দীপ্তদা নিজের মোবাইলে টুকে নিয়ে বলল,”খেতে যাবেন না?”
“একটু পরে। আপনারা সেরে নিন।“
“ঠিক আছে।“
আমি খেতে বসে জিজ্ঞেস করলাম,”এজেন্টের ফোন নাম্বার নিয়ে কি করবে? কোথায় যাবে? আমাদের টিকেট তো করাই আছে।“
“উত্তর মেরু” বলে আবার চুপ করে গেল।
খাওয়ার পর ঘরে ঢোকার মুখে দীপ্তদা আমায় বলল,”শোন পটলা, লেকের ধার থেকে একবার চক্কর মেরে আয়। আমি এখন ভাবব। তুই থাকলেই খালি বক্‌বক্‌ করবি।“
“কিন্তু হোটেলের বাইরে বেরোনো তো বারণ!” আমি বললাম।
“তোর জন্য নয়।“ বলে ঘরে ঢুকে দরজা দিয়ে দিল। খুব রাগ হল। ধুর, নিজে একটা আই-কার্ড আছে বলে খুব হিরোগিরি দেখাচ্ছে। আমারো একদিন হবে। তখন আমিও ওকে বের করে দেব রুম থেকে। এরকম একটা জোরদার শপথ গ্রহণ করে নিচে নেমে বাইরে বেরিয়ে এলাম। দেখলাম, সত্যি পুলিশ দুজন আমায় কিছু বলল না। দীপ্তদা বলে রেখেছে মনে হয়। যাই হোক, আমি সাত পাঁচ না ভেবে লেকের পাড়ের দিকে এগোলাম। লেকে বোটিং হয়। তবে তার টিকেট কাউন্টার বা ঢোকার গেট, সেগুলো অন্যদিকে। এখানটা তাই বেশ ফাঁকা। নিরিবিলি। আমি লেকের ধারে গিয়ে বসে ভাবতে লাগলাম কেসটা নিয়ে। কে খুন করতে পারে। আমার আলাপনবাবুকেই সন্দেহ হল। লোকটা কেমন একটা। খালি হামবড়াই ভাব। আর নিজের সম্পর্কে মিথ্যে কথা বলেন। তাই ওনাকেই কালপ্রিট ধরে নিয়ে কেসটা সাজাতে লাগলাম। কিন্তু খামোখা একট মানুষকে খুন কেন করতে যাবেন, এটা ঠিক ভেবে পেলাম না। অগত্যা হাল ছেড়ে দিলাম যার কাজ সেই করুক। ছোটবেলায় বাড়ির পাশে একটা পুকর ছিল। সেটায় ব্যাংবাজি করতাম। পরে পুকুরটা বুজিয়ে একটা মল হয়ে গেছে। এত বড় লেক দেখে সেই ব্যাংবাজি করার ইচ্ছেটা প্রবল হয়ে উঠল। কিন্তু এখানে সব পাথর। ফেললেই টপাং করে ডুবে যাবে। চ্যাপ্টা ঢিল জাতীয় কিছু পাওয়া যায় কিনা খুঁজি। এই ভেবে পড়ে থাকা একটা গাছের পাতা সরাতেই যে জিনিসটা দেখলাম, সেটা দেখে কয়েক সেকেন্ড কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে, তারপর হোটেলের দিকে দৌড়লাম দীপ্তদাকে খবর দিতে। একটা বড়সড় পাথর। তার গায়ে প্রায় শুকিয়ে আসা ভর্তি রক্তের দাগ।
দীপ্তদা মিঃ স্বামীনাথনকে ফোন করতে উনি একজন পুলিশ পাঠিয়ে ওই পাথরটা নিয়ে গেলেন। দীপ্তদা ফিঙ্গার প্রিন্ট টেস্ট করতে বলল। স্বামীনাথন বিকেলের মধ্যে করে জানাচ্ছেন বললেন। আর বিকেলে চায়ের নেমন্তন্নের ব্যাপারটা রিমাইন্ডার দিলেন।
দীপ্তদাকে জিজ্ঞেস করলাম,”কি গো, কতদূর এগোলে?”
উত্তরে বলল,”অনেকদূর। প্রায় চেন্নাই অব্ধি। আর একটু গেলেই পৌঁছে যাব।“
এরকম হেঁয়ালি করার কি আছে বুঝিনা। আমি কি খুনি যে আমায় কিছু বলবেনা! দাদা, না, শত্রু ভগবান জানে।
সন্ধ্যেবেলা মিঃ স্বামীনাথনের কোয়ার্টারে চায়ের সাথে টা-ও বেশ ভালো জমল। উনি এখানে একাই থাকেন। ফ্যামিলি থাকে চেন্নাইতে। “কেসটা নিয়ে কি ভাবছেন?”  স্বামীনাথন জিজ্ঞেস করলেন।
“অনেকটাই ভেবেছি। একটা খটকা শুধু লেগে আছে। আশা করি, কাল সকালের মধ্যে সলভ্‌ করে ফেলব। শুধু আপনার একটা হেল্প চাই।“
“নিশ্চয়ই। বলুন কিভাবে সাহায্য করতে পারি?”
“এখন নয়। আর একটু ভাবি। রাতে জানাচ্ছি।“
হোটেলে ফিরতে ফিরতে প্রায় আটটা বাজল। সন্ধ্যে বেলা যথেষ্ট খাওয়া হয়েছে। তাই আর ডিনার করলাম না। সিধে ঘরে গেলাম। মা ফোন করেছিল একটু আগে। এসব কিছু বলিনি। বললে আর দেখতে হবেনা। বাবাকে পাগল করে দেবে চিন্তায় চিন্তায়। তাই যা বলার ফিরে গিয়েই বলব।
দীপ্তদা আবার আই-প্যাড খুলে বসে কিসব দেখছে। ফোন করল কয়েকটা। নীচু গলায় জানলার ধারে গিয়ে কথা বলল। কিছুই শুনতে পেলাম না। আমি হাল ছেড়ে দিয়ে ‘পেরিগাল রিপিটার’এ মন দিলাম।
কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানিনা। শুধু এটুকু মনে আছে, দীপ্তদা খাটে বসে স্বামীনাথনকে ফোন করে বলছে, যে সকাল থেকে গেট খুলে দেওয়া হবে। কিন্তু কেউ উটির বাইরে যেতে পারবেনা। আর পুলিশ আউট পোস্টগুলোতে সবার ছবি সার্কুলেট করে দেওয়া হবে, যাতে কেউ বেরোতে গেলে ধরা পড়ে
স্বপ্ন দেখলাম, আমি একটা ঘরের মধ্যে শুয়ে আছি। মাথার পিছনে একটা বড় আলো। সামনে দীপ্তদা হাতে শ্লেট-পেন্সিল নিয়ে পায়চারি করছে, আর বলছে,”সবই তো হল কিন্তু সাত-দুকুনে কত হয় সেইটেই মনে পড়ছেনা।” আমি বলতে গেলাম ‘চোদ্দ’। কিন্তু মুখ দিয়ে কথা বেরোলো না। দেখি মুখ বাঁধা। এমন সময় দেখি আলাপনবাবু একটা বেল নিএ আমার দিকে এগিয়ে আসছেন। তার গায়ে ব্র্যাডম্যানের সই করা। ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। চিৎকার করে দীপ্তদাকে ডাকব, তাও পারছিনা। ভয়ের চোটে ঘুম ভেঙ্গে গেল। দেখি সকাল হয়ে গেছে। কিন্তু দীপ্তদা নেই ঘরে। ঘড়িতে দেখলাম পৌনে নটা। উঠে দেখলাম বাথরুমের দরজাও খোলা। তার মানে দীপ্তদা বাইরে কোথাও গেছে। বলে গেল না? বেজার মুখ করে দাঁতা মাজার জন্য ব্রাশটা নিতে যাব, দেখি একটা কাগজ রাখা পেস্টের পাশে। দীপ্তদা লিখেছে,”চট্‌পট্‌ রেডি হয়ে নে। ঠিক সাড়ে নটায় ব্রেকফাস্ট করে রেডি থাকবি। রুম লক করে নিচেই ওয়েট করিস। আমি ফিরে আসব।“
ব্রেকফাস্ট করে বাইরে বেরোতেই সুমন্ত্রবাবুর সাথে দেখা। আমাকে দেখেই বললেন,”এই যে, তোমার দাদা কোথায়?”
“সেতো জানিনা। বেরিয়ে গেছে অনেক সকালে। কেন?” আমি বলি।
“আমায় তো ভোরবেলা দরজা নক্‌ করে বলে গেলেন যে সবাইকে যেন নটার সময় ঠিক জানিয়ে দিই যে কেস্‌ সলভড্‌। সবাই বাইরে বেরোতে পারেন। কিন্তু উটির বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশে ধরবে। সবার ছবি নাকি দেওয়া আছে পুলিশ আউটপোস্টে। এখন দিবাকর বাবু তো দেখলাম পাইকারা যাওয়ার জন্য বেরোচ্ছেন। ভাবলাম তোমার দাদাকে ইনফর্ম করা দরকার।“
“ওহ্‌। ফোন করে দেখতে পারেন।“
“থাক। আসলেই বলব। দিবাকর বাবু তো আমাদের কেউ নন। ওনাকে আটকে রেখেই বা কি লাভ।“
“হ্যাঁ, সেই।“ বলে আমি সামনের লাউঞ্জে গিয়ে বসি। সামনে টিভি চলছে। কোন স্থানীয় চ্যানেল। ভাষাটা শুনে এক বর্ণও বুঝছিনা। বেশ মজা লাগছে।
এমন সময় একটা পুলিশের জিপ এসে দাঁড়াতেই দীপ্তদা নামল। “কি রে, রেডি?” আমায় দেখে বলল।
আমি বললাম,”হ্যাঁ। সুমন্ত্রবাবু তোমায় খুঁজছিলেন।“
“কেন রে?”
“সেরকম কিছু নয়। দিবাকর বাবু পাইকারা যাওয়ার জন্য বেরিয়েছেন, সেটা ইনফর্ম করার জন্য।“
“সর্বনাশ। এত তাড়াতাড়ি!” বলেই দৌড়ে রিসেপশনে গিয়ে কিসব জিজ্ঞেস করে। এর মধ্যে সুমন্ত্রবাবুও এসে পড়েছেন। দীপ্তদা ওনাকে দেখেই বলে, “যদি ক্ল্যাইম্যাক্সে হাজির থাকতে চান। ইমেডিয়েটলি আমার সাথে চলুন।“ বলেই আমার হাত ধরে টান দেয়।
সুমন্ত্রবাবুও আমাদের পিছন পিছন পুলিশের গাড়িতে ওঠে। স্বামীনাথন ছাড়া একজন কনেস্টবল আছেন গাড়িতে। দীপ্তদা সামনে বসে জিজ্ঞেস করে,”এখান থেকে কুন্নুরের দিকে নেমে যাওয়ার রাস্তা কি একটাই?”
স্বামীনাথন বলেন,”হ্যাঁ। পাহাড়ের গা দিয়ে রাস্তাটা একটাই। তবে সেই রাস্তায় পৌঁছানোর জন্য কয়েকটা রাস্তা আছে।“
“তাহলে শর্টেস্ট রাস্তাটা ধরুন। ব্লু স্যান্ট্রো। নাইন ওয়ান থ্রি নাইনদিবাকরবাবুর গাড়ি। ধরতেই হবে।“
“কিন্তু উনি তো বললেন পাইকারা গেছেন।“ সুমন্ত্রবাবু বলেন।
“না। আমার ইন্টুইশন বলছে, উনি চেন্নাই যাচ্ছেন। ঘর চেক করলে শিওর হওয়া যেত। কিন্তু এখন সময় নেই।“
গাড়ি ততক্ষণে তীব্রগতিতে ছুটেছে কুন্নুরের রাস্তার দিকে। আমি আর সুমন্ত্রবাবু কিছু না বুঝতে পেরে বোকার মত বসে আছি। সুমন্ত্রবাবু আবার বলেন,”কিন্তু মশাই চেকপোস্টে ধরা পরবে তো। আপনি এত ব্যস্ত কেন হচ্ছেন?”
দীপ্তদা খুব বিরক্ত হয়ে বলল,”আপনাকে আনাই দেখি ভুল হয়েছে। বসে শুধু দেখুন। কোন কথা বলবেন না।“ ধমক খেয়ে সুমন্ত্রবাবু চুপ করে যান। আমি একটু কাঁধ শ্রাগ করে বুঝিয়ে দিই যে আমিও সেই তিমিরে।
কুন্নুরের রাস্তায় পড়ার মুখেই একটা পুলিশ পোষ্ট আছে। সেখানে স্বামীনাথন জিজ্ঞেস করলেন যে কোন ব্লু স্যান্ট্রো গেছে কিনা। তারা বলল, “হ্যাঁ”। শুনে দীপ্তদা একটু মুচকি হাসল। নিজের ইন্টুইশন ঠিকঠাক সেটা প্রমাণ হওয়ার জন্য। ড্রাইভার পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ী ছোটালো। পাহাড়ের গা দিয়ে জিগ্‌জ্যাগ্‌ রাস্তা। খালি হেয়ারপিন বেন্ডস। তার মধ্যে দিয়েই বেশ জোরে আমাদের গাড়ি ছুটেছে। এক পাশে গভীর খাদ। পড়ে গেলে আর দেখতে হবেনা। সব কিছু বাঁচিয়ে গাড়ী ছুটছে। এভাবে মিনিট দশেক চলার পর নিচের রাস্তায় একটা ব্লু স্যান্ট্রো দেখা গেল। দীপ্তদা ড্রাইভারকে বলল,”ওই যে। ধরতে হবে।“
চেজ্‌ করে আমরা পাঁচ মিনিটের মধ্যে স্যান্ট্রোর ঠিক পিছনে চলে এলাম। নাম্বার প্লেট দেখা যাচ্ছে। সেই গাড়িই। কিন্তু আমার মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছে, পুলিশ আটকালো না কেন, উটি ছাড়ার আগে?
স্যান্ট্রোর পিছন পিছন কিছুটা চলার পর একটা চওড়া জায়গা পেয়ে ড্রাইভার অসামান্য দক্ষতায় ওভারটেক করে আড়াআড়ি রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে পড়ল। দীপ্তদা আর স্বামীনাথন লাফ দিয়ে নেমে গেছে। দীপ্তদা স্যান্ট্রোর জানলার কাছে গিয়ে বলল, “নেমে আসুন। আপনার খেল খতম।“
দরজা খুলে যিনি নেমে এলেন, তাঁকে দেখে আমার আর সুমন্ত্রবাবুর, দুজনেরই স্পেল-বাউন্ড অবস্থা যাকে বলে, সেই দশা। শুভ্রাংশু সোম দাঁড়িয়ে আছেন।

ঠিক বারোটার সময় সবাইকে নিচের ডাইনিং হলে জমা হতে বলা হয়েছিল। দীপ্তদা রহস্য কিভাবে সলভ্‌ করল সেটা বলবে। বেশ এক্সাইটেড হয়ে গেছি। শুভ্রাংশু সোমকেও হাতকড়া পরিয়ে একটা চেয়ারে বসানো হয়েছে। পিছনে দুজন পুলিশ গার্ড দিচ্ছে।
সবাই এসে গেলে দীপ্তদা নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলতে শুরু করল। সবার বোঝার জন্য সবটা ইংরাজিতেই বলল। আমি বাংলা করে লিখছি।
“আমি শুরু করব আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগের একটা ঘটনা দিয়ে। ময়দানে সিলেকশন চলছে বাংলার দলের জন্য। খেলা চলছে কালিঘাট স্পোর্টিং আর মোহনবাগানের মধ্যে। কালিঘাটের হয়ে ব্যাট করছেন হিরণ্ময় চ্যাটার্জি। এবং মোহনবাগানের ক্যাপ্টেন শীর্ষেন্দু বাগচী শর্টে ফিল্ডিং করছেন। এই দুজনের মধ্যেই বাংলার দলে ঢোকার জন্য রেষারেষি। এমন সময় একটা বল সুইপ করে মারতে গিয়ে সেটা লাগে শীর্ষেন্দু বাবুর মাথার পিছনে। এবং সেখানে তিনি সাথে সাথে মারা যান। এর ফলে হিনণ্ময়বাবু সরাসরি বাংলার দলে জায়গা করে নেন। একজন প্রতিভাবান ক্রিকেটারের মৃত্যুতে ক্রিকেট জগৎ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হল, সেটা নিয়ে খুব জল্পনা চললেও যেটা নিয়ে কোন কথা হয়না, সেটা হল মৃতের পরিবার। শীর্ষেন্দু বাগচীর একমাত্র ছেলে সেদিন মাঠে উপস্থিত ছিলেন। এবং চোখের সামনে বাবার মৃত্যু এবং তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর হাসতে হাসতে সিলেক্টেড হয়ে মাঠ ছাড়া দেখে তার মনের অবস্থাটা যেরকম হয় সেটা খুবই সাংঘাতিক। বাবার ‘হত্যাকারী’ হিসাবে তার মনের মধ্যে হিরণ্ময় চ্যাটার্জীর নাম স্থায়ী হয়ে যায়। সেই ছেলের নাম অর্ধেন্দু বাগচী, ওরফে শুভ্রাংশু সোম, ওরফে দিবাকর দে। সোম টা তো আপনার মামাবাড়ির পদবী, তাই না অর্ধেন্দু বাবু?”
শুভ্রাংশু বাবু মাথা নাড়েন। সুমন্ত্রবাবু বলেন,”কিন্তু দিবাকরবাবু সেজে উনি কিভাবে আগের দিন রাতে এলেন? তখনো তো শুভ্রাংশু বাবু যাননি!”
“ধৈর্যং রহু।“ দীপ্তদা বলে, “অর্ধেন্দুবাবু মামাবাড়িতে মানুষ হন। পড়াশোনাতে সম্ভবতঃ মেধাবি ছিলেন তাই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর্কিটেকচার নিয়ে পাশ করেন নাইন্টি টুতে অর্থাৎ ঠিক যে বছর সোমক বাবুও পাশ করেন। সোমক বাবু আমায় তাঁর কোয়ালিফিকেশন বলতে গিয়ে বলেন যে উনি ওই বছর যাদবপুর থেকে পাশ করেন। আমি আমাদের স্পেশাল ব্রাঞ্চের থ্রুতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নাইন্টিটুর স্টুডেন্ট লিস্ট পাই। সেখানে চোখ বোলাতে গিয়ে সোমক বাবু ছাড়াও অর্ধেন্দু বাগচীর নাম পাই। বাগচী পদবী হওয়ায় শুধুমাত্র নিছক সন্দেহের বশে আমি আরো খোঁজ নিতে বলি। কিছুক্ষণের মধ্যেই খবর পাই যে ইনি শীর্ষেন্দু বাগচীর ছেলে।“ দীপ্তদা একটু থামে। তারপর আবার বলতে শুরু করে,”সোমকবাবু ম্যাকিনটোশ ছেড়ে সি জি এস এফে যোগ দেওয়ার পর দেখেন যে অর্ধেন্দু বাগচী ওই একই কোম্পানিতে কাজ করছেন। সম্ভবতঃ, বেশ কয়েক বছর পর দুজনের দেখা হয়। সোমক বাবু, আমি যদি কিছু ভুল বলি, নিশ্চয়ই শুধরে দেবেন। কারণ এগুলো আমার অনুসন্ধানের ওপর নির্ভর করে করা অনুমান।“ সোমক বাবু ঘাড় নেড়ে সম্মতি দেন। দীপ্তদা বলতে থাকে,”মৃণ্ময়বাবুর সাথে সখ্যতা এবং একসাথে এই বেড়াতে আসার কথা সোমকবাবুই নিশ্চয়ই অর্ধেন্দু বাবুকে বলেন। অর্ধেন্দু বাবু তখনই এই প্রতিশোধ নেওয়ার প্ল্যান করেন। নিজের নাম বদল করে রেজিস্ট্রেশন করান সুমন্ত্রবাবুর কাছে। প্ল্যান করেন যে মাঝপথে হঠাৎ করে ফিরে আসার কথা বলবেন। কিন্তু ফিরে না এসে ছদ্মবেশে অন্যনামে এসে ওই হোটেলেই থাকবেন এবং হিরণ্ময়বাবুকে হত্যা করে প্রতিশোধ নেবেন। তারপর বাইরের লোক হিসাবে উনি চুপচাপ কেটে পরবেন। কেউ সন্দেহ-ও করবেনা। এমনকি শুভ্রাংশু সোমের কোন অস্তিত্বই থাকবেনা আর। আবার তিনি অর্ধেন্দু বাগচী হয়ে ফিরে যাবেন। সোমকবাবুকে হয়তো তিনি সবটা বলেননি, বা বন্ধুর জন্য তিনি সব চেপে রেখেছিলেন। সেটা পুলিশ জানার চেষ্টা করবে। অর্ধেন্দু বাবুর প্ল্যানে কোন আসুবিধে ছিলনা, যদিনা আমি এসে আপনাদের সাথে ভীড়ে যেতাম। আমার ফোটোগ্রাফির হবি থাকায় সেদিন শুভ্রাংশু বাবুর কয়েকটি ছবি গ্রুপ ফোটোর মধ্যে থেকে যায়। উনি মনে মনে ভাবেন যে ছবি থেকে গেলে সেটা ধরে তাঁকে খুঁজে বের করার জন্য একটা ইম্পর্ট্যান্ট ক্লু থেকে যাবে। তাই পাইন বনের মধ্যে আমায় অতর্কিতে পাথর ছুঁড়ে আহত করে ক্যামেরার থেকে মেমরি কার্ড টা সরিয়ে ফেলেন উনি। ওই একই দিনে হিরণ্ময়বাবু যখন পড়ে যান, আমার বিশ্বাস ওনার পকেট থেকে ঘরের চাবিটিও উনিই সরান এবং তার সাহায্যেই রাতের বেলা রুম খুলে খুন করেন। এখন প্রশ্ন হল, আমার সন্দেহ কিভাবে হল যে দিবাকর বাবু এবং শুভ্রাংশু বাবু আসলে একই লোক? অতীতে হয়তো নাটকে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা থাকায় ছদ্মবেশ অসাধারণ নিয়েছিলেন, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। আমরা সবাই বোকা হয়ে যেতাম যদি না দুটো ছোট্ট ভুল থাকত। শুভ্রাংশু বাবুর নাকের দুপাশে দুটো দাগ দেখে আমার মনে হয়েছিল যে উনি চশমা পরেন। কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবার দরকার পড়েনি। তাই সেটা মনে রাখিনি। পরে দুজঙ্কে মেলানোর কাজে সেটা যদিও হেল্প করেছে। দ্বিতীয়ত, উনি দিবাকর রূপে টুপি পরে বা মাফলার জড়িয়ে মাথার হাল্কা টাক বা গলার কাছের আঁচিল সব ঢেকে ফেলেছিলেন। কিন্তু এগুলো তাঁর আগের প্ল্যান্মাফিক ছিল। যেটা প্ল্যানে ছিল না, সেটা হল সেদিন পাইন ফুল পাড়তে গিয়ে কবজির কাছটা ছড়ে যাওয়া। তাই সেটা ঢাকার কথা তাঁর মনে ছিলনা। আমার সাথে কথা বলার পর উনি যখন করমর্দন করেন, সেই দাগটা আমার চোখে পড়ে এবং আমার সন্দেহ শুরু হয়। তারপর, মুম্বই থেকে আসা ওইদিনের সব ফ্লাইটের প্যাসেঞ্জার লিস্টে কোথাও দিবাকর দে’র নাম না পেয়ে আমি শিওর হয়ে যাই। এবং, সুমন্ত্রবাবুর এজেন্টের সাথে কথা বলে শুভ্রাংশুবাবুর ফ্লাইটের ইনফর্মেশন পাই। সেখানেও খোঁজ নিয়ে জানি যে ওই নামের টিকিট ছিল, কিন্তু কোন প্যাসেঞ্জার বোর্ডিং করেননি। কিন্তু এখানে প্রশ্ন হল, দিবাকর বাবু যেদিন এলেন, তারপর দিন সকালে শুভ্রাংশু বাবু হোটেল ছাড়লেন। এটা কি করে সম্ভব। তাই না সুমন্ত্রবাবু?”
সুমন্ত্রবাবু বোকার মত মাথা নেড়ে “হ্যাঁ” বললেন।
দীপ্তদা একটু হেসে বলল,”খুব সহজ। আপনি সেদিন খাওয়ার টেবিলে বা লাউঞ্জে কখনো দুজনকে একসাথে দেখেছেন? না। সুতরাং বুঝতেই পারছেন। দিবাকর যে সম্পুর্ণ বাইরের লোক এবং স্বতন্ত্র, সেটা দেখানোর জন্য অর্ধেন্দুবাবু একটা সাঙ্ঘাতিক মাস্টার প্ল্যান বানান। আর পরেরদিন রাতে যখন সবাই জানে যে শুভ্রাংশুবাবু কোলকাতায়, তখন সেই চুরি করা চাবি দিয়ে হিরণ্ময়বাবুর ঘর খুলে এই অপকর্মটি করলেন উনি। মার্ডার ওয়েপন পাওয়া গেছে। তার গায়ের ফিঙ্গার প্রিন্ট চেক করলেই প্রমাণ হয়ে যাবে সব। আর আজ সকালে আমি যখন বলে যাই যে কেউ যেন উটি ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করে, তাহলে পুলিশে ধরবে, তখন অর্ধেন্দু বাবু সেটাকে সুযোগ হিসাবে নেন। হোটেলে পাইকারা যাবেন বলে গাড়ি বুক করিয়ে গাড়িকে কিছু বেশি পয়সা দিয়ে বলেন মেট্টুপালায়াম অবধি ছেড়ে দিয়ে আসতে। উনি গাড়িতে উঠে মেক-আপ ছেড়ে শুভ্রাংশু সোম-এ ফিরে যান। কারণ পুলিশের কাছে দিবাকর দে’র ছবি আছে, শুভ্রাংশু সোমের নেই। আপনার কিছু বলার আছে, অর্ধেন্দু বাবু?”  
অর্ধেন্দুবাবুকে দেখে মনে হচ্ছে পুরো ভেঙ্গে পড়েছেন। আসতে আসতে বললেন,”আমি যা করেছি, তার জন্য আমি শাস্তি পাব, আমি জানি। কিন্তু আমি অনুতপ্ত নই। সেদিন মাঠে দাঁড়িয়ে চোখের সামনে আমি আমার আইডল, আমার বাবাকে মারা যেতে দেখেছি। আর তারপর ওই লোকটাকে হাসতে হাসতে বলতে শুনেছি, কেমন দিলাম, একেবারে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সিলেক্টেড। তারপর আমি ঠিক করি যে এর প্রতিশোধ আমি নেবই। কারণ, ও ইচ্ছে করে আমার বাবাকে খুন করেছিল।“ একটু থেমে বলেন,”কিন্তু আমি ওই ব্র্যাডম্যানের বেল চুরি করিনি।“ 
দীপ্তদা বলে,”অবশ্যই নয়, অর্ধেন্দুবাবু। আপনার প্রতিশোধ স্পৃহা থাকতে পারে, কিন্তু আপনি চোর নন। সে রাত্রে চুরি করেন অন্য একজন। যিনি মিথ্যেবাদী এবং চোর। নিজে সংবাদপত্রের অফিসের ক্লার্ক হয়ে নিজেকে সাংবাদিক হিসাবে দাবী করেন, আলাপন বাবু।“ সবাই আলাপন বাবুর দিকে তাকায়। উনি কি একটা বলতে গিয়েও চুপ করে যান। দীপ্তদা বলে,”রাত্রে ডায়াবেটিসের জন্য বারবার ওঠা ওনার অভ্যাস। উনি সেদিন রাতেও ওই সময় ওঠেন এবং শব্দ পেয়ে আই-পিসে চোখ লাগিয়ে ঠিক উল্টোদিকের রুমে ঘটনাটা দেখেন। এবং এও দেখেন যে অর্ধেন্দু বাবু বেরিয়ে আসেন, কিন্তু দরজা লক করেন না। কৌতুহল নিয়ে আলাপনবাবু হিরণ্ময়বাবুর ঘরে ঢোকেন এবং তাঁকে মৃত অবস্থায় দেখেন। কিন্তু উনি এত বড় শয়তান যে এই সময়ও নিজে দু-পয়সা পাওয়ার মতলবে হিরণ্ময়বাবুর হ্যান্ডব্যাগ থেকে ‘বেল’টা বের করে নেন। আমি এটা সেদিনই জেরার সময় ধরে ফেলি যখন ব্যাগটা দেখার সময় এক কুচো কাটা নখ পাই। এবং ঠিক তারপরেই প্রশ্ন করার পর সবার সাথে হ্যান্ডশেক করে সবার নখ পরীক্ষা করি। হিরণ্ময়বাবুরও নখ পরীক্ষা করেছিলাম, তাঁর বডি দেখার সময়। দেখি একমাত্র আলাপনবাবুর নখ সদ্য কাটা, এবং সেটা আগেরদিন রাত্রেই। মিঃ স্বামীনাথনকে রিকোয়েস্ট করব আলাপন বাবুর জিনিসপত্র দেখতে। ‘বেল’টা নিশ্চয়ই পেয়ে যাবেন।“
দীপ্তদার মিটিং-এর পর স্বামীনাথন ‘বেল’টা উদ্ধার করে দুজনকে নিয়ে থানায় চলে গেলেন। আমার দারুণ এক্সাইটেড লাগছিল। দীপ্তদা সত্যি জিনিয়াস। শুধু সুমন্ত্রবাবুর মন খারাপ। “ধুর্‌ মশাই এতদিন ধরে ঘুরছি। কত লোককে নিয়ে এলাম। এমন ঘটনা কোথাও ঘটেনি।“ দীপ্তদা বলল,”একে বলে সঙ্গ দোষ। সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, আর গোয়েন্দাসঙ্গে হাজতবাস। যেটা অর্ধেন্দুবাবু আর আলাপন বাবুর হল আর কি!” সুমন্ত্রবাবু বেশ একটা ‘হেঁ হেঁ তা যা বলেছেন’ মার্কা হাসি দিয়ে বললেন,”বেশ একটা গোয়েন্দা সঙ্গ হল। কোলকাতায় ফিরে ছাড়ছিনা আপনাকে। যোগাযোগ রাখবেন কিন্তু।“ “নিশ্চয়ই” বলে দীপ্তদা আমার দিকে ফিরে বলল, “পটলা, রেডি হয়ে নে। বিকেলের বাসে বেরোবো। কাল ট্রেন তো!” তাই তো! ভুলেই গেছিলাম। ‘পটলা’ বলল বলে একটুও রাগ হলনা। বরং স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের কাছে কিভাবে বলব পুরোটা সেটা ভাবতে ভাবতে রেডি হয়ে নেওয়ার জন্য ঘরের দিকে দৌড়াই।