আমাদের বাড়িতে সরস্বতী পুজো হয়নি কোনদিন। আমাদের নাকি নিয়ম ছিল না পুজো করার। তার
উপর বেশ কমিউনিস্ট আবহাওয়া আমার বাবার মধ্যে থাকায়, পুজো করা নিয়ে কেউ মাথাই ঘামায়নি
কোনদিন। সে যাই থাকুক, পুজো কখনো মিস্ করিনি। পুজো মানে আমার কাছে ঠিক ধ্যান, অঞ্জলি
এসব ছিল না। বরং ছিল খিচুড়ি, প্রসাদ খাওয়া, বন্ধুদের সাথে খেলা – যেটা একটু বড় হয়ে
পালটে গিয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডাতে পরিণত হয়েছিল। সত্যি বলতে অঞ্জলি দিতে আমার একটু
বাধত। মা বলত ঠাকুরের কাছে বিদ্যে, বুদ্ধি চাইতে হয়। আমার আপত্তি ছিল এই জায়গাতেই।
চাইব কেন? তার যদি ‘অন্তর্যামী’ হিসাবেই অধিষ্ঠান থাকে, তবে কিসের সে ঠাকুর যে চেয়ে
চেয়ে সব নিতে হবে? আর যদি তা না হয়, তাহলে অমন বিদ্যের দরকার নেই।
আমার হাতেখড়ি হয়েছিল বহরমপুরে বড়মামার বাড়িতে এমনই এক সরস্বতী পুজোর দিনে। বয়স
তখন আড়াই। তবু কিছু জিনিস আবছা মনে আছে। মনে আছে, বড়দার সাথে সাইকেলে চড়ে দোকান থেকে
স্লেট আর দুটো পেন্সিল কিনে এনেছিলাম। পেন্সিল মানে স্লেট পেন্সিল, কিন্তু একটা পেন্সিল
ছিল কাঠ-পেন্সিলের মত দেখতে। পরে ইস্কুলে ভর্তি হয়ে দিদিমনি কে এরকম একটা পেন্সিল দেখিয়ে
তাক্ লাগিয়ে দেব ভেবে আমার খুব মজা লেগেছিল। আর মনে আছে পিতলের সরস্বতীর কথা।
এক ঝলক ওই হলদেটে অবয়বটা এখনও চোখে ভাসে। সেবারের পর ইস্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম।
বাবার সাথে হাত ধরে ইস্কুলের পুজোতে গিয়ে ফল খাওয়া, পরদিন দধিকর্মা খাওয়া –
বন্ধুদের সাথে খেলা, মনে আছে কিছু কিছু। আর সরস্বতী পুজো হলেই দুপুর বেলা রোদে পিঠ
দিয়ে লাল লাল কুলে বিটনুন মাখিয়ে আমাতে-মায়েতে খাওয়া। উফ্, ভাবলেই মনটা কোথায়
ফিরে যায়, সেই স্বপ্নের ছোটবেলাতে।
বড় হয়ে যাওয়ার পর, মানে যখন ক্লাস ইলেভেন, টুয়েল্ভ – বা ফার্স্ট ইয়ার, সরস্বতী
পুজোর সংজ্ঞা পালটে গেল। এই স্কুল, ওই স্কুলে ঘোরা, কোন নির্দিষ্ট একজনের সাথে কখন
দেখা হবে সেই প্রতীক্ষা করা। তখনও মোবাইল ফোন পৃথিবীটাকে আক্ষরিক অর্থেই হাতের
মুঠোয় এনে দেয়নি। স্কুলের গেটের পাশে অপেক্ষায় থাকা, কখন সে তার বন্ধুদের নিয়ে
হেঁটে যাবে, হয়তবা হাসবে, বলবে শুধু ‘কি রে’। ব্যাস্, সেদিনের সব পাওয়া হয়ে গেল।
তখন বাকি সব মিথ্যে হয়ে শুধু ঐ টুকু নিয়ে ভেসে চলা যাবে পরের সরস্বতী পুজো অবধি।
তখন কলেজের সেকেন্ড ইয়ার। পকেটে সদ্য এসেছে মোবাইল ফোন। পাঞ্জাবীর পকেটে রেখে
বেরিয়েছিলাম ঠাকুর দেখতে। বন্ধুরা বলল সিনেমা দেখবি? কি সিনেমা মনে নেই। পাড়ার
হল-এ। টিকিট গেটে দেখিয়ে ঢুকতেই পকেটে টান, মোবাই হাপিস। সেদিন আমার সাংঘাতিক দুঃখ
হয়েছিল। অবশ্য তারপর কেমন করে পুলিশে ডায়েরী করে, সেটা শিখতে পেরেছিলাম।
সরস্বতী পুজো আসে, যায়। তার সাথে প্রতিবার আমিও হয়ে যাই একটু একটু করে বড়।
কলেজ ছেড়ে আই আই টি – কোলকাতা থেকে প্রায় ঊনিশশো কিলোমিটার দূরে বসে পুজোর আনন্দ।
এক ঝাঁক বাঙালির সাথে মিশে যাওয়া। সেটাও পার হয়ে যায়। আজ সকালে চারপাশে কোথাও যখন
পুজোর শব্দ নেই, মন খারাপ লাগল খুব। কোনদিন দিতে না চাওয়া অঞ্জলিটা খুব ইচ্ছে করল
দিতে। মনেহল, মায়ের পায়ে কেঁদে পড়ি – মা গো, তুমি যদি বিদ্যে দিতে পারো, বুদ্ধি
দিতে পারো, আর আমায় একবারের জন্য, একদিনের জন্য, ফেরাতে পারোনা, ওই ছোটবেলার শিশির
ভেজা শুক্লা পঞ্চমীর ভোরবেলায়?