কিছু মানুষ থাকেন যাঁরা গল্প বলতে পারেন খুব সুন্দর। সেরকম একজন আমার ঠাকুরদাদা, যাঁকে আমি দাদান বলেই ডাকি। আমার ছোটবেলায়, যখন অক্ষর পরিচয় ঘটেনি, দাদানের মুখের গল্পই ছিল সাহিত্যের সাথে আমার প্রথম পরিচয়। আমার দিব্যি মনে পড়ে ইস্কুলে ভর্তি হওয়ার পর মিস্রা বেশ চমকে গিয়েছিল আমার মহাভারত বা রামায়ণের প্রায় সব ঘটনাবলী কন্ঠস্থ দেখে। এর সমস্তটাই দাদানের মুখের গল্প শুনে।
মানুষ যখন নির্মিত হয়, তার সাথে মহিষাসুরমর্দিনীর এক মিল থাকে। তিলোত্তমা কে যেমন ব্রহ্মা, বিষ্ণু আর মহেশ্বর নিজের নিজের তেজ পুঞ্জিভুত করে সৃষ্টি করেছিলেন এবং সমস্ত দেবতারা নিজেদের অস্ত্র দিয়ে সজ্জিত করেছিলেন তাঁকে, মানুষের নির্মাণটাও ঠিক সেই ভাবেই হয়। আশ-পাশে ঘিরে থাকা আত্মীয় বা অনাত্মীয় মানুষদের থেকে প্রেরণা বা বোধ সঞ্চয় করে তার জীবনবোধ গড়ে ওঠে। আমিও তার কোনও ব্যতিক্রম নই। আমার বাবা যদি আমার বিজ্ঞান বোধের জন্য দায়ী হয়, আমার দাদান ছিল আমার সাথে বিশ্ব সাহিত্য এবং চলচ্চিত্রের সাথে যোগসূত্র। ছোট্টবেলার আনন্দমেলা পড়ে শোনানো থেকে শুরু করে 'দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন'এর গল্প। বড় হয়ে ছবিটা দেখেও সেই উপভোগ্যতাটা পাইনি যেটা ছিল দাদানের গল্পে। তাঁর অফুরন্ত গল্পের স্টক। আমার হাই স্কুল পার হয়ে যাওয়া অবধি একটা গল্প দ্বিতীয়বারের জন্য রিপিট হয়নি কখনো।
দাদান টাকী রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্র। ইস্কুলের গল্প শুনেছি ছোটবেলার থেকে। প্রতি গরমের ছুটির আগে নাকি মঞ্চ বেঁধে নাটক হত। দাদান তাতে পার্ট করত। তখন আমি সদ্য ক্লাশ ওয়ান। দাদানের মুখেই শোনা বৃত্রাসুরের গল্প নিয়ে আমার খাতার পিছনে লিখে ফেললাম একটা 'নাটক'। গরমের ছুটির আগের দিন ক্লাশের বন্ধুরা মিলে করেও ফেললাম। হাততালি কুড়োলাম বেশ। তারপর থেকে যতদিন ওই স্কুলে ছিলাম, কোনওবার রামু নামের এক ভুলো চাকরের গল্প, কোনোবার রবীন্দ্রনাথের গেছোবাবা অথবা সুকুমারের অবাক জলপান - নাটক বাদ পড়েনি একবারও।
বড় হওয়ার পর যখন নানারকম সুবিধা-অসুবিধার কারণে বাবা-মা আলাদা হয়ে চলে আসি অন্য বাড়িতে, প্রতি শনিবার হলেই দাদানের কাছে যাওয়াটা মিস্ হতনা - শুধুমাত্র গল্প শোনার জন্য। গল্প শুনতে শুনতেই শুনেছিলাম, তার রবীন্দ্রনাথের শেষযাত্রায় যোগ দেওয়ার কথা, শুনেছিলাম তার সত্যজিতকে দেখা - কোনও এক কনসার্ট হলের বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গান শুনতে। গল্প শুনেই জেনেছিলাম, হিচককের বার্ডস্, সাউন্ড অফ মিউজিক অথবা চার্লি চ্যাপলিনের গল্প।
কাল রাতে অফিস থেকে ফেরার পর যখন হঠাত ফোনে শুনলাম মানুষটা হঠাত নেই - অজস্র স্মৃতির ভীড়ে হারিয়ে ফেলেছিলাম নিজেকে। অনেকরাতের কোন বিমান না থাকায় তাঁকে শেষবারের মত বিদায় জানাতে পারলাম না। এখনো কোলকাতায় ফিরলে ক্ষীণ হয়ে আসা কন্ঠস্বরেও আমায় কাছে বসিয়ে একের পর এক গল্প বলে যেতেন - হয়ত সেগুলো আমার বহুবার শোনা বা পড়া - তবুও চুপ করে শুনে যেতাম - গল্প বলাটা যে একটা আর্ট সেটা শিখিনি, কিন্তু বুঝেছি দাদানের কাছ থেকে। ভালো থেকো দাদান।
মানুষ যখন নির্মিত হয়, তার সাথে মহিষাসুরমর্দিনীর এক মিল থাকে। তিলোত্তমা কে যেমন ব্রহ্মা, বিষ্ণু আর মহেশ্বর নিজের নিজের তেজ পুঞ্জিভুত করে সৃষ্টি করেছিলেন এবং সমস্ত দেবতারা নিজেদের অস্ত্র দিয়ে সজ্জিত করেছিলেন তাঁকে, মানুষের নির্মাণটাও ঠিক সেই ভাবেই হয়। আশ-পাশে ঘিরে থাকা আত্মীয় বা অনাত্মীয় মানুষদের থেকে প্রেরণা বা বোধ সঞ্চয় করে তার জীবনবোধ গড়ে ওঠে। আমিও তার কোনও ব্যতিক্রম নই। আমার বাবা যদি আমার বিজ্ঞান বোধের জন্য দায়ী হয়, আমার দাদান ছিল আমার সাথে বিশ্ব সাহিত্য এবং চলচ্চিত্রের সাথে যোগসূত্র। ছোট্টবেলার আনন্দমেলা পড়ে শোনানো থেকে শুরু করে 'দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন'এর গল্প। বড় হয়ে ছবিটা দেখেও সেই উপভোগ্যতাটা পাইনি যেটা ছিল দাদানের গল্পে। তাঁর অফুরন্ত গল্পের স্টক। আমার হাই স্কুল পার হয়ে যাওয়া অবধি একটা গল্প দ্বিতীয়বারের জন্য রিপিট হয়নি কখনো।
দাদান টাকী রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্র। ইস্কুলের গল্প শুনেছি ছোটবেলার থেকে। প্রতি গরমের ছুটির আগে নাকি মঞ্চ বেঁধে নাটক হত। দাদান তাতে পার্ট করত। তখন আমি সদ্য ক্লাশ ওয়ান। দাদানের মুখেই শোনা বৃত্রাসুরের গল্প নিয়ে আমার খাতার পিছনে লিখে ফেললাম একটা 'নাটক'। গরমের ছুটির আগের দিন ক্লাশের বন্ধুরা মিলে করেও ফেললাম। হাততালি কুড়োলাম বেশ। তারপর থেকে যতদিন ওই স্কুলে ছিলাম, কোনওবার রামু নামের এক ভুলো চাকরের গল্প, কোনোবার রবীন্দ্রনাথের গেছোবাবা অথবা সুকুমারের অবাক জলপান - নাটক বাদ পড়েনি একবারও।
বড় হওয়ার পর যখন নানারকম সুবিধা-অসুবিধার কারণে বাবা-মা আলাদা হয়ে চলে আসি অন্য বাড়িতে, প্রতি শনিবার হলেই দাদানের কাছে যাওয়াটা মিস্ হতনা - শুধুমাত্র গল্প শোনার জন্য। গল্প শুনতে শুনতেই শুনেছিলাম, তার রবীন্দ্রনাথের শেষযাত্রায় যোগ দেওয়ার কথা, শুনেছিলাম তার সত্যজিতকে দেখা - কোনও এক কনসার্ট হলের বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গান শুনতে। গল্প শুনেই জেনেছিলাম, হিচককের বার্ডস্, সাউন্ড অফ মিউজিক অথবা চার্লি চ্যাপলিনের গল্প।
কাল রাতে অফিস থেকে ফেরার পর যখন হঠাত ফোনে শুনলাম মানুষটা হঠাত নেই - অজস্র স্মৃতির ভীড়ে হারিয়ে ফেলেছিলাম নিজেকে। অনেকরাতের কোন বিমান না থাকায় তাঁকে শেষবারের মত বিদায় জানাতে পারলাম না। এখনো কোলকাতায় ফিরলে ক্ষীণ হয়ে আসা কন্ঠস্বরেও আমায় কাছে বসিয়ে একের পর এক গল্প বলে যেতেন - হয়ত সেগুলো আমার বহুবার শোনা বা পড়া - তবুও চুপ করে শুনে যেতাম - গল্প বলাটা যে একটা আর্ট সেটা শিখিনি, কিন্তু বুঝেছি দাদানের কাছ থেকে। ভালো থেকো দাদান।