ক্লাস নাইনে বা টেনে বাংলাতে টেক্সট ছিল - সধবার একাদশী। আমি বাংলা পড়তাম - ঠিক পড়তাম না, বরং বলা যায় বাংলায় আমার যেটুকু নিজস্বতা সেটুকুকে সযত্নে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সাহায্য নিতাম আমার দিদির কাছে। আমার মাসতুতো দিদি। সে যদিও যাদবপুরের রসায়নের ছাত্রী তখন, তবু আমাদের দুজনের বাংলা সাহিত্য নিয়ে ভালোবাসাটা একই রকম হওয়ায় রোববার সকালের নিয়ম করে বাংলা চর্চাটা বেশ মজাদার হত। সেই সধবার একাদশী নিয়ে একটা ব্যাখ্যা লিখেছিলাম আমি। ও সেটাকে ঠিক ঠাক করে দেয়। সেখানে একটা লাইন জুড়ে দিয়েছিল এরকম - "ধৃ ধাতু থেকে নিষ্পন্ন 'ধর্ম' কথাটার অর্থ হল যা মানুষকে ধারণ করে... "। এই লাইনটা পরে পরীক্ষাতেও লিখেছি। আজও মনে আছে - কেন জানিনা।
এই তো আজ সকালেই কোথাও একটা কথা হচ্ছিল - আমাদের এই পেটুক রেস্টুর্যান্টে নাকি কাল "শিরনি" হয়েছিল। তার ছবিও দেখলাম ফেসবুকে। আমার যদি যাওয়া হয়নি। তো কথায় কথায় কেউ বলল 'শিন্নী'। মনে খটকা জাগল। আমি যতদূর জানি শব্দটা "শিরনি"। বর্ণাগম ঘটে "শিন্নী" হয়ে গেছে লোকমুখে। দ্বিধাভঞ্জনের জন্য 'চলন্তিকা' খুললাম। কথাটা "শিরনি" সন্দেহ নেই। সঠিক জানতাম। কিন্তু যা জানতাম না - তাহলো এর উৎপত্তি। রাজশেখর বসু বলছেন - এর উৎপত্তি ফার্সি শব্দ 'শিরিনি' থেকে - যা কিনা পীরের প্রসাদ। তারমানে একটি ফার্সি খাবার যা মুসলিম শাসক বা বণিকদের হাত ধরে এ দেশে আসে এবং শেষ মেশ হিন্দু দেবতা সত্যনারায়ণের প্রসাদে পরিণত হয়!
মনে বেশ উৎসাহ জাগল। একত্ব বই পত্র এবং ইন্টারনেট ঘেঁটে কিছু তথ্য পেলুম।
সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ যখন বাংলার মসনদে বসলেন তিনি সত্যপীরের উপাসনা চালু করেন। অর্থাৎ ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সময়টা ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ। উমর শেখ মির্জার ছেলে জাকির-উদ্দিন মুহাম্মদ তখন সতেরো বছরের কিশোর। উজবেকিস্তানে বাপের সাম্রাজ্যে বসে। দিল্লীর দিকে আসার প্ল্যান প্রোগ্রাম শুরুই হয়নি। দিল্লীতে লোদি বংশের সিকান্দার লোদি তখন সুলতান। আলাউদ্দিন হুসেন শাহের সাথে অম্লমধুর সম্পর্ক। শান্তির চুক্তির দোহাই দিয়ে কেউ কাউকে বেশী ঘাঁটান না। আর বাংলায় তখন এক নতুন প্রেমের জোয়ার আসব আসব করছে। চৈতন্য মহাপ্রভু তখন কিশোর। রূপ গোস্বামী, সনাতন গোস্বামীরা তখনও হুসেন শাহের রাজকার্যে নিযুক্ত।
এই সময় বাংলায় সত্যপীরের উপাসনা প্রবর্তন হয়। হুসেন শাহ ঘরে ঘরে গিয়ে সত্যপীরের উপাসনা করতে বলেছিলেন কিনা সে গ্যারান্টি দিতে পারবোনা, তবে হ্যাঁ, সময়কাল অনুযায়ী এই সেই সময়। তো যা হোক, সত্যপীরের যে উপাসনা শুরু হয়, সেখানে মুসলিম ধর্ম অনুযায়ী স্বাভাবিক ভাবেই কোন দেবতা বা মূর্তি ছিল না। উপাসনা করা হত একটি খালি তক্তপোষের সামনে বসে। আবদুল করিম সাহেব বলছেন, “... এটি মুসলমানদের পীরানি ধারণার স্থানীয় প্রকাশ। ধর্মান্তরিত হওয়ার পর স্থানীয় জনগণের পীরানি ধারণার সঙ্গে তাদের পূর্বতন দেবতাদের অলৌকিক ক্ষমতার সংমিশ্রণ ঘটে। এই পরিবর্তন ধারার চরম পরিণতিতে দেখা দেয় পীর পূজা। পীরগণ অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী বলে তখন লোকজন বিশ্বাস করতে শুরু করে।”
এই সত্যপীরের পূজাতে খুব স্বাভাবিক ভাবেই হিন্দু পুজোর রীতি (মনসা পূজো) যেরকম মিশেছিল, কিছু সময় পরে হিন্দু ঘরে এর দেখাদেখি যখন সত্যনারায়ণ পূজো শুরু হয়, খুব স্বাভাবিক ভাবেই সেখানে মিশ খেয়ে যায় এই সত্যপীরের পুজোর নিয়ম কানুন (এমনকি নামটাও?)। আর ঠিক তখনি সত্যনারায়ণের প্রসাদের তালিকায় ঢুকে পড়ে আদ্যন্ত ফার্সি খাবার এই ‘শিরিনি'।
কি অদ্ভুত ভাবুন তো! ওদিকে চৈতন্যদেব বৈষ্ণব ধর্মর প্রেমের জোয়ারে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছেন শত সহস্র মানুষকে, ওদিকে মহাযান বৌদ্ধ ধর্ম প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে এই ভারতীয় ভূখণ্ডের থেকে, তিব্বত থেকে নেমে আসছে বজ্রযান। ওইদিকে ইউরোপের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি সদ্য এঁকে উঠেছেন মোনালিসা বা মাইকেল এঞ্জেলো তখনো মই এ চড়ে সিস্টিন চ্যাপেলের ছাদে রং করছেন। আর মার্টিন লুথার পোপের বিরুদ্ধে তথা সমগ্র ক্যাথলিক চার্চের বিরুদ্ধে হেঁকে বসেছেন এক যুক্তিপূর্ণ জেহাদ। আর ঠিক এই সময় কিনা এই বাংলাদেশে মুসলিমদের থেকে হিন্দুদের কাছে প্রবাহিত হয়ে চলেছে এক পূজা পদ্ধতি, তার উপকরণ, মায় প্রসাদ অব্ধি। একেই তো বলে ইউনিটি ইন ডাইভার্সিটি।
সত্যি বলতে এত কিছু ভেবে মনটা খারাপ হয়ে যায় এই কারণেই যে এই দেশ তথা এই পৃথিবীতেই যখন মানুষ তথাকথিত সভ্যতর হয়েছে, এই ‘এজ অফ কমিউনিকেশন’ এ দাঁড়িয়ে কিনা আমাদের রোজকার রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে খবরের কাগজ, টিভি চ্যানেল জুড়ে হত্যালীলার খবর শোনা। এবং তার নব্বই ভাগ ধর্ম সংক্রান্ত সংঘাত। দিদির লিখে দেওয়া সেই লাইনটা তাই হয়ত উল্টো অর্থ নিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে আসে বারবার।
গোটা সপ্তাহ জুড়ে রক্তের জলরঙে মানুষের কান্না আঁকা ক্যানভাসের ছবি দেখতে দেখতে ক্লান্ত মন নিয়ে আবার একটা নতুন সপ্তাহ শুরু হল। আশা করি, একটুও যেন রক্ত না ঝরে।
"মানুষ বড় কাঁদছে ,তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও
মানুষই ফাঁদ পাতছে ,তুমি পাখির মত পাশে দাঁড়াও
মানুষ বড় একলা ,তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও ।
তোমাকে সেই সকাল থেকে তোমার মত মনে পড়ছে
সন্ধে হলে মনে পড়ছে ,রাতের বেলা মনে পড়ছে
মানুষ বড় একলা ,তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও ।
এসে দাঁড়াও, ভেসে দাঁড়াও এবং ভালোবেসে দাঁড়াও
মানুষ বড় কাঁদছে ,তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও
মানুষ বড় একলা ,তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও !”