Tuesday, September 18, 2012

Post 11: নয় নয় এ মধুর খেলা



বন্ধুদের আড্ডায় আমি প্রায়ই এই প্রশ্ন শুনতে পাই যে জীবনে কটা প্রেম করেছিস? একটু হেসে উত্তর দিই, অসংখ্য। হাসির মানেটা সবার কাছে নানাভাবে পৌঁছায়। কেউ ভাবে সলজ্জ, কেউ ভাবে নির্লজ্জকিন্তু আসল ব্যাপারটা কেউ বোঝে না। আমার হাসি পায় এটা ভেবে যে, ‘প্রেম’ কিভাবে করে? এটা কি সকালের প্রাতঃকৃত্যের মত কিছু? নাকি বাজারের দরদাম করার মত? প্রশ্নটার উত্তরটা জানার জন্য মনটা কয়েকদিন ধরেই ঘুরঘুর করছে এর ওর দরজায়। ‘কেউ বলে ফাল্গুন, কেউ বলে পলাশের মাস...’। কেউ বা বলে অভ্যাস। প্রেম নিয়ে সবার কি মত, তাই ভেবে ঠিক করলাম কিছু একটা লিখি। সার্থক গদ্য নাহোক্‌, একটা স্ট্যাটিস্টিকাল রিপোর্ট তো হবে!
নবনীতা দেবসেনের একটা লেখা পড়েছিলাম প্রেম নিয়ে। উনি দশ কথার পর এক কথায় বলে দিলেন, এ শুধু মেঘের খেলা। কি গোলমেলে কথা বলুন দেখি। মেঘের খেলা কি একরকম হয়? কতরকম মেঘ, তার কতরকম খেলা। এর মানে কি বুঝবেন? তাই নবনীতাকে হাতে রেখে আর একটু আঁটঘাঁট বেঁধে বেরলাম প্রেম খুঁজতে। বন্ধু বান্ধবী, দাদা, কাকা, পিশে, মেশো – যাকে পাই জিগ্যেস করি (মানে যাদের জিগ্যেস করতে লজ্জা লাগেনা আর কি!), ওগো বলতে পার, প্রেম করা মানে কি? উত্তরের তালিকা দেখলে চিত্রগুপ্ত তার ফর্দ বের করতে লজ্জা পাবেন। মেশোর দল বললেন, প্রেম করা আবার কি? দেখিস না, তোদের বয়সী ছেলে মেয়ে গুলো পার্কে বসে ছাতার তলায় যা করে, তাই হল প্রেম করা। না দেখে থাকলে ইলিয়ট পার্ক ঘুরে আয়। কোনো বন্ধু বলল, ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড ইয়ার। কে জানে! আবার কোনো বন্ধুনি তো এমনতর প্রশ্ন শুনে ভাবল আমি বুঝি তার প্রেমেই পড়ে গেলাম! কি কান্ড! মেসেজের উত্তর দেয়না আর! এক বান্ধবী বলল, তার ছয় বছরের প্রেম জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে যে, প্রেম করা একটা অভ্যাস। রোজকার কাজকর্মের সাথে যার মিলে যাওয়া। যার ওঠা পড়া গুলো সময়ের সাথে থাকে, কিন্তু অ্যাটিনুয়েটেড হয়ে যায়, তবে মিলায় না কখনও। আর একজন বলল, অতশত বুঝিনা, ভালবাসি, ব্যাস। বিয়ে করব। ছানা পোনা মানুষ করব। সুখে থাকব। প্রেম কাকে বলে বুঝলেও যা, না বুঝলেও তাই। বরং বুঝলেই সমস্যা। খালি দ্বন্দ্ব আসবে। বান্ধবীর প্রেমিক জবাব দিল, জাস্ট ওয়েস্টেজ অফ টাইম। করেছ কি মরেছ। বন্ধুর প্রেমিকাটির মতে, এ হল, খুব ভাল একটা অভ্যাস। সকালের দাঁত মাজার মত আর কি! ভাইএর কথায়, কাঁঠালের আঠা, লাগাস না, ছাড়াতে পারবিনা।  
তাহলে প্রেম করা কি? এত উত্তরের ঝাঁকে মাথা পুরো ডেডলক হতে চলল। তবু প্রেম মেলে না। উত্তরের জন্যে গুরুদেবের রচনাবলী নামালাম তাক থেকে। সেখানে দেখি তিনি আর এক অভিযোগ করে বসে আছেন, এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম, প্রেম মেলেনা। আবার পাওয়ার আকুলতা নিয়ে বসে আছে, কি জানি সে আসবে কবে তার জন্য জাগতে হবে, এমনি তার আকুলতা। তাহলে? এই মিলনের আকাঙ্ক্ষা, এটাই প্রেম? নাকি ওই সুখ, যার জন্য সবাই প্রেমের যাচনা করে, সেটাই প্রেম? সব গুলিয়ে দিলেন তো গুরুদেব!
এপাশ ওপাশ তাকাতে মনে পড়ে গেল স্কুলের দিনগুলোর কথা। ক্লাশ নাইন। নতুন নতুন কোচিং –এ পড়তে যাওয়ার কথা। এক ঝাঁক নতুন মেয়ে। প্রাইমারি স্কুলে মেয়েরা পড়ত একসাথে। কিন্তু তখনও মেয়েদের নারীত্ব নামক অমোঘ জিনিসটি সম্পর্কে সচেতন হইনি। ক্লাশের বন্ধুদের সাথে নানারকম তাত্ত্বিক আলোচনা চলত। কিন্তু তাদেরকে একসাথে পেয়ে সবকিছু গুলিয়ে গেল। বন্ধু বান্ধবদের কাছ থেকে শচিনের বাউন্ডারি মারার মত ধপাধপ প্রেমে পড়ার গল্প শুনতে লাগলাম অফ্‌-পিরিয়ডে। উফ্‌, সে কি লোমহর্ষক কাহিনী সব! সে কি রহস্যময়তা! বিশেষ কোন মেয়ে আজ তাকিয়ে হেসেছে! ব্যাস্‌, স্বপ্ন দেখা শুরু। কেউ একজন আমার কাছে নোটস্‌ চেয়েছে! পরের দিন স্কুলের হেডলাইন!
স্কুলে থাকার সময় প্রেমের এই সরল রূপটা দিব্যি ছিল। বড় হয়েই বিপত্তি! ওই যে সুকুমার রায় বলেছেন না, বড় হলেই মানুষ গুলো সব হোঁতকা হয়ে যায়, সহজ জিনিসেরও মানে খুঁজতে চায় সবসময়। আমার হয়েছে সেই দশা। প্রেম করার আবার মানে কি হে! আর থাকলেও বা, জানার দরকার কি? জানলে কি চতুর্বর্গ লাভ হবে? মসফেটে কি দু অ্যাম্পিয়ার কারেন্ট বেশি যাবে, নাকি ভারতের জিডিপি বাড়বে? কিছুই না, তাহলে!
সেইটাই তো মুশকিল, কি করে বোঝাই? মনের মধ্যে প্রেম জেগেছে, তাও আবার মানে নিয়ে। কয়েকদিন আগে, একটা বই পড়ছিলাম। পাওলো কোয়েলহোর লেখা। সেখানেও এক অপূর্ব প্রেমের কথা শোনালেন তিনি। এক জাপানি মহিলার বেঁচে থাকা কিছু প্রেম বুকে নিয়ে। যার প্রেম, তিনি এক মহান লেখক, তিনি তাকে ছেড়ে গেছেন বহু বছর। তার কাছে সেই স্মৃতি আর ওই টুকরো প্রেম ছাড়া আর কিছু নেই। কি অদ্ভুত ভালোবাসা।
কিম-কি-দুকের কিছু ছবির কথা মনে আসে। দ্য টাইম। এক প্রেমিকার হঠাৎ মনে হয় যে তার প্রেমিক তার সাথে থেকে বোর হয়ে গেছে। সেই একই দেহ, সেই একই মুখ। রোজ রোজ দেখে দেখে প্রেমিকের একঘেয়েমি এসে গেছে, তাই হয়ত তাকে তার আর ভালো লাগছেনা। এ হেন মানসিকতায় সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে যে সব পালটে ফেলবে। প্লাস্টিক সার্জারি করে ফেললও পালটে। অপারেশনের ক্ষত শুকানোর জন্য গা ঢাকা দেয়। প্রেমিকটি কিছুই জানতে পারেনা। মেয়েটিকে পাগলের মত খুঁজে চলে। অতঃপর ঘটনা পরম্পরায় ছেলেটি জানতে পারে মেয়েটির এই কাজের কথা। খুব রাগ হয় তার। সেও ঠিক করে পালটে যাবে। প্লাস্টিক সার্জারি করে নিজেকে পালটেও ফেলে। এবার শুরু হয় দুজনের দুজনকে খুঁজে চলা। মন আছে সেই পুরানো, খুঁজে চলেছে তার সেই খুব চেনা, সবচেয়ে প্রিয় কাছের মানুষটিকে। কিন্তু তাদের চেহারা পালটে গেছে। হয়ত হয়ে গেছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর আর সুন্দরী। কিন্তু তারা কেউ কাউকে চিনতে পারছে না। পৃথিবীর পথে অসংখ্য মানুষের ভীড়ে খুঁজে চলে তারা একে অন্যকে। খুঁজতে থাকে তাদের প্রেমকে
এমনই এক গায়ে কাঁটা লাগানো প্রেম কাহিনি। কি এক মধুর খেলা এই প্রেম। এমনই যে সেই মাধুর্য অতিক্রম করে বেড়িয়ে পড়ে এই বেদনার্ত গল্পকথা। তাহলে প্রেম আর দেহ মিলে গেলেই কি এই যত বিপত্তি? কিন্তু দেহ ছাড়া প্রেম, সে কি করে হয়? সেত ওই কিছু দার্শনিক বইয়ের বিষয় ছাড়া কিছু নয়, প্লেটনিক লাভ- কামগন্ধ নাহি তায়।
আরো অনেকগুলি ছবির কথা মনে আসছেমৃণাল সেনের ‘অন্তরীন’-এর সেই ‘বন্দিনী’র সাথে লেখকের এক অদ্ভুত একে অপরকে না দেখা প্রেম,  পেড্রো আলমাদোভারের ‘টক টু হার’-এ ওই জড়বৎ নারীর সাথে পরিচারকের প্রেম। সমস্ত ক্ষতিকে হার মানিয়ে ভালোবাসার জয়গান। ‘অনুরণন’ ছবিতেও সেই এক সম্পর্কের কথা, যার কোন নাম হয় না। এমন হাজার এক প্রেমের নমুনা ঝেঁপে আসছে চারিদিক দিয়ে। তাহলে ‘প্রেম করা’টা আসলে কি? নাহ্‌। এ বড় কঠিন বিষয়।
মনে গেল পড়ে কোন এক আলো-আঁধারির সন্ধ্যাবেলা। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোতে দাঁড়িয়ে থাকা। বুকের ভিতর দুরুদুরু। সময় কখন আসবে? পাশ দিয়ে চলে যায় দু একটা রিক্সা, হর্ণ বাজিয়ে। দুই-একটা সাইকেলের আওয়াজ। ওই যে কাদের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না? তবে কি ওর টিউশন শেষ হল? নাহ, ওটা তো টিভির শব্দ। মাকে বলে এসেছি রিফিল কিনতে যাব। রিফিল কিনতে এতক্ষণ! নাহ্‌, এটা বড্ড বাড়াবাড়ি হচ্ছে। আজকেই কেন এত দেরী করছে? মাথার ওপর মশার ঝাঁক, বন্‌বন্‌ করছে। হাতের তালুতে ঘামে ভিজে যাওয়া একটুকরো কাগজ। আমার সব বজ্র-বিদ্যুৎ গুলো জমিয়ে রেখেছি ওর মধ্যে। রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর, চুপি চুপি লিখে ফেলা এই চিঠি আমার দৈনন্দিন চালচিত্রের থেকে বাঁচানো সময়টুকু দিয়ে। টিউশন শেষ হয়। ও আসে, ও চলে যায়। থেকে যায়, আমি, আমার হলুদ ল্যাম্পপোস্ট আর ঘামে ভেজা তালু।
এটাও তো প্রেম ছিল। কখন সে আসবে, তার একবার দেখা পাওয়ার অন্তহীন প্রতীক্ষা। সে প্রতীক্ষা কি কারো শেষ হয়? খ্যাপা খুঁজে খুঁজে ফিরতে থাকে প্রেমের পরশ পাথর। এক ঘাট থেকে অন্য ঘাটে ভেসে চলে নৌকা। কোন একজন মহান মানুষ বলেছিলেন, বিবাহেই নাকি প্রেমের সমাপ্তি। সত্যি কি তাই? তাহলে আমাদের বাবা-মা’রা দিব্যি হেসে খেলে রয়েছেন। তাতে কি প্রেম নেই? নাকি নিছকই অভ্যাস! স্বয়ং কন্দর্পই জানেন, বা হয়ত তিনিও জানেন না। মানুষের মনের তল পাওয়া কঠিন, যদিও তলিয়ে দেখলে এই জটিল সমাজের তুলনায় মানুষের মন অনেক সরল। সেখানে কোন নিয়ম থাকেনা, থাকেনা সমাজের বিধি নিষেধ চক্ষুলজ্জা। শুধু কিছু মোটা দাগের লোভ, কামনা, ভয়। তাই সমস্ত বাধা নিষেধ টপকে তার অগম্য কিছু নেই। তল পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাই অগত্যা হাল ছাড়তেই হয়। শরণ নিই রবীন্দ্রনাথের, ‘নয় নয় এ মধুর খেলা’। প্রেম করাই ভালো। মানে খুঁজে কাজ কি?

Post 10: Akashkolom 5



আকাশকলম ৫।।
আমাদের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের কোন ছবি ছিল না। আমার দাদু, ঠাকুমা কেউ রবীন্দ্রনাথকে পছন্দ করতেন না। বাবার ‘বদ অভ্যাস’ হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের গান শোনার। রবিবার দুপুর বেলা ছাদে গিয়ে চুপি চুপি রেডিও চালিয়ে রবীন্দ্রসংগীত শুনত। শব্দ জোরে হলে ধরা পড়ার ভয় ছিল। তাই বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের ছবি ছিলনা কোন। কিন্তু, গান ছিল। আমার বাবা গিটার বাজাত। হাওয়াইন গিটার। অনেক শনিবার বা রবিবার দুপুরে বা অনেক আধোঘুমের রাত্তিরে শুনেছি টি-টেবিলটার ওপর গিটার রেখে বাবা একমনে বাজাচ্ছে, তুমি সন্ধ্যাদীপের শিখা...।
আর মায়ের ওই বিশাল বড় হারমোনিয়ামটা। এগারো ঘাটের চেঞ্জার। চম্পককাকু আসত মাকে গান শেখাতে। আমি তখন খুব ছোট। খুব ছেঁড়া ছেঁড়া দৃশ্যপট মাথার মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। কানের মধ্যে দিয়ে মনের মধ্যে বসে থেকেছে রাগ আহির ভৈরোঁ, ইমন কল্যান, দরবারি কানাড়া। প্রতি সন্ধ্যায় রান্নাঘরের ক্লান্তি মুছে মা যখন হারমোনিয়াম নিয়ে বসত, এক অদ্ভুত আনন্দ দেখতাম তার চোখে, মুখে। পরম স্নেহে হারমোনিয়ামের গায়ে হাত বোলানো। মধ্য সপ্তক, তার সপ্তকে ঘোরা ফেরা করতে করতে মনে হত, সারা ঘরে খুব সুন্দর গন্ধ বেরোচ্ছে, ধুপ জ্বলছে, কেউ পুজো করছে। কোন এক আরব্যরজনীতে বাবা গল্প বলেছিল, মালকোষ রাগ নাকি জিনদের খুব প্রিয়। গাইলে তারা সারি দিয়ে বসে মন দিয়ে শোনে, আর যে গাইছে তাকে প্রভু বলে মানে। এর পর থেকে যখনই ‘মন তরপত হরি দরশন...’ করে গান ধরত মা, অনেকবার পিছনে ফিরে দেখেছি।
পুজোর আগে বা বৈশাখ মাসে আমাদের ক্যাসেট কেনা হত। তাসের দেশ, ক্ষীরের পুতুল, দেবব্রত, হেমন্ত, কণিকা এমন কত কি। বাবার একটা পুরোনো টেপ রেকর্ডার ছিল। দুপুর বেলা স্নান করার পর, মা সেখানে চালিয়ে দিত বুদ্ধু-ভুতুম বা লালকমল-নীলকমল। আমি খাটের ওপর চুপ করে বসে পাড়ি দিতাম খেজুর পাতার ডোঙায় করে রাজকণ্যের খোঁজে।
তারপর আস্তে আস্তে বড় হয়েছি। রূপকথার গানগুলো পালটে গেছে। সেই জায়গাগুলো নিয়ে নিয়েছে, রবীন্দ্রনাথ। পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করলে মাসি টাকা দিত। নিজের পছন্দ মত কিছু কেনার জন্য। এরকমই এক পরীক্ষার পর পঞ্চাশ টাকা দিয়ে কিনেছিলাম বিঠোফেনের ফিফ্‌থ আর সিক্সথ সিম্ফনি। এক নতুন জগতের স্পর্শ। সত্যজিতের ছবিতে যে জগতের হাল্কা অনুভব ছিল, তাকে এমন নিবিড় ভাবে পেয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেললাম। কত রাত বসে থেকেছি, এক আকাশ তারা আর মুন লাইট সোনাটা। রবীন্দ্রনাথ শেষের কবিতায় যাকে বলেছেন, চন্দ্রালোক গীতিকা। কলেজে উঠে সব্যসাচীর সাথে পরিচয় হল। ওর হাত ধরে ডুব মারলাম পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীতের এই অনিন্দ্য সাগরে। মোজার্ট, বাখ, চাইকোভ্‌স্কি, হ্যান্ডেল, ভিভালডি, মাহ্‌লারের সাথে শুধু ভেসে চললাম।
এর মধ্যে আরো গভীর ভাবে ধরা পড়েছেন রবীন্দ্রনাথ। গানের সুর ছেড়ে, কথার দিকে মন ঝুঁকেছে। কথা গুলোকে বার বার পড়ে আনন্দ পাই। মনেহয় ওগুলো গায়ে মাখি। একটা মানুষ কি করে এমন অনুভব করতে পারেন। ভেবে আকুল হই। এর মধ্যে পায়ে পায়ে এসে পড়েছে প্রেসিডেন্সি কলেজের বারান্দা দিয়ে লিওনার্ড কোহেন, হ্যারি বেলাফন্টে, ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা, পিঙ্ক ফ্লয়েড, জন ডেনভার, এলভিস প্রিসলি, বিট্‌ল্‌স্‌এর দল। আমি ভেসে চলি এদের সাথে।
সেদিন অনেক রাতে বৃষ্টি নামল। জেগে ছিলাম। এটা ওটা কাজে। জানলার বাইরে দিয়ে ঝম্‌ঝম্‌ শব্দটা কানে আসতেই অনেক দূরে মন চলে গেল। অনেকদিন আগের কোন আষাঢ় মাসের সন্ধ্যাবেলা। বাইরে ঝরে পড়ছে বৃষ্টি। মা হারমোনিয়ামে বসে। আমি অপার বিস্ময়ে ভেবে চলেছি ওই যন্ত্রটার রহস্য। কিকরে ওর ভিতর থেকে আওয়াজ বের হয়। মা মেঘ রাগে একটা আলাপ ধরেছিল। মধ্য, তার সপ্তকের গন্ডি পার হয়ে ঘরের মধ্যে এক ঝাঁক মেঘ ঢুকে পড়ল। আমি, মা, আমাদের ওই হারমোনিয়াম, সব যেন কোথায় হারিয়ে যেতে লাগল। এলোপাথারি জলের ছাঁট চোখে, মুখে। অনেক দূরের মেঘ পার হয়ে মায়ের গলা পাচ্ছি, কড়ি মা, শুদ্ধ নি। স্বর ঝরে পড়ছে। চারিদিকে গান। মিউজিক। রবীন্দ্রনাথ, বিঠোফেন, প্রাচ্য, পাশ্চাত্য, রক, লোকগীতি দিয়ে যা বাঁধা যায়না, যার বর্ণপ্রভেদ করা যায়না। বিশাল অতলান্তিকের ঢেউরাশির উপর শুধু ভেসে চলা যায়, সপ্তক থেকে সপ্তকে।