আকাশকলম ৫।।
আমাদের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের কোন ছবি ছিল
না। আমার দাদু, ঠাকুমা কেউ রবীন্দ্রনাথকে পছন্দ করতেন না। বাবার ‘বদ অভ্যাস’
হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের গান শোনার। রবিবার দুপুর বেলা ছাদে গিয়ে চুপি চুপি রেডিও
চালিয়ে রবীন্দ্রসংগীত শুনত। শব্দ জোরে হলে ধরা পড়ার ভয় ছিল। তাই বাড়িতে
রবীন্দ্রনাথের ছবি ছিলনা কোন। কিন্তু, গান ছিল। আমার বাবা গিটার বাজাত। হাওয়াইন
গিটার। অনেক শনিবার বা রবিবার দুপুরে বা অনেক আধোঘুমের রাত্তিরে শুনেছি
টি-টেবিলটার ওপর গিটার রেখে বাবা একমনে বাজাচ্ছে, তুমি সন্ধ্যাদীপের শিখা...।
আর মায়ের ওই বিশাল বড় হারমোনিয়ামটা। এগারো
ঘাটের চেঞ্জার। চম্পককাকু আসত মাকে গান শেখাতে। আমি তখন খুব ছোট। খুব ছেঁড়া ছেঁড়া
দৃশ্যপট মাথার মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। কানের মধ্যে দিয়ে মনের মধ্যে বসে থেকেছে রাগ আহির
ভৈরোঁ, ইমন কল্যান, দরবারি কানাড়া। প্রতি সন্ধ্যায় রান্নাঘরের ক্লান্তি মুছে মা
যখন হারমোনিয়াম নিয়ে বসত, এক অদ্ভুত আনন্দ দেখতাম তার চোখে, মুখে। পরম স্নেহে
হারমোনিয়ামের গায়ে হাত বোলানো। মধ্য সপ্তক, তার সপ্তকে ঘোরা ফেরা করতে করতে মনে
হত, সারা ঘরে খুব সুন্দর গন্ধ বেরোচ্ছে, ধুপ জ্বলছে, কেউ পুজো করছে। কোন এক
আরব্যরজনীতে বাবা গল্প বলেছিল, মালকোষ রাগ নাকি জিনদের খুব প্রিয়। গাইলে তারা সারি
দিয়ে বসে মন দিয়ে শোনে, আর যে গাইছে তাকে প্রভু বলে মানে। এর পর থেকে যখনই ‘মন
তরপত হরি দরশন...’ করে গান ধরত মা, অনেকবার পিছনে ফিরে দেখেছি।
পুজোর আগে বা বৈশাখ মাসে আমাদের ক্যাসেট
কেনা হত। তাসের দেশ, ক্ষীরের পুতুল, দেবব্রত, হেমন্ত, কণিকা এমন কত কি। বাবার একটা
পুরোনো টেপ রেকর্ডার ছিল। দুপুর বেলা স্নান করার পর, মা সেখানে চালিয়ে দিত
বুদ্ধু-ভুতুম বা লালকমল-নীলকমল। আমি খাটের ওপর চুপ করে বসে পাড়ি দিতাম খেজুর পাতার
ডোঙায় করে রাজকণ্যের খোঁজে।
তারপর আস্তে আস্তে বড় হয়েছি। রূপকথার
গানগুলো পালটে গেছে। সেই জায়গাগুলো নিয়ে নিয়েছে, রবীন্দ্রনাথ। পরীক্ষায় ভালো
রেজাল্ট করলে মাসি টাকা দিত। নিজের পছন্দ মত কিছু কেনার জন্য। এরকমই এক পরীক্ষার
পর পঞ্চাশ টাকা দিয়ে কিনেছিলাম বিঠোফেনের ফিফ্থ আর সিক্সথ সিম্ফনি। এক নতুন জগতের
স্পর্শ। সত্যজিতের ছবিতে যে জগতের হাল্কা অনুভব ছিল, তাকে এমন নিবিড় ভাবে পেয়ে
নিজেকে হারিয়ে ফেললাম। কত রাত বসে থেকেছি, এক আকাশ তারা আর মুন লাইট সোনাটা।
রবীন্দ্রনাথ শেষের কবিতায় যাকে বলেছেন, চন্দ্রালোক গীতিকা। কলেজে উঠে সব্যসাচীর
সাথে পরিচয় হল। ওর হাত ধরে ডুব মারলাম পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীতের এই অনিন্দ্য
সাগরে। মোজার্ট, বাখ, চাইকোভ্স্কি, হ্যান্ডেল, ভিভালডি, মাহ্লারের সাথে শুধু
ভেসে চললাম।
এর মধ্যে আরো গভীর ভাবে ধরা পড়েছেন
রবীন্দ্রনাথ। গানের সুর ছেড়ে, কথার দিকে মন ঝুঁকেছে। কথা গুলোকে বার বার পড়ে আনন্দ
পাই। মনেহয় ওগুলো গায়ে মাখি। একটা মানুষ কি করে এমন অনুভব করতে পারেন। ভেবে আকুল
হই। এর মধ্যে পায়ে পায়ে এসে পড়েছে প্রেসিডেন্সি কলেজের বারান্দা দিয়ে লিওনার্ড
কোহেন, হ্যারি বেলাফন্টে, ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা, পিঙ্ক ফ্লয়েড, জন ডেনভার, এলভিস
প্রিসলি, বিট্ল্স্এর দল। আমি ভেসে চলি এদের সাথে।
সেদিন অনেক রাতে বৃষ্টি নামল। জেগে ছিলাম।
এটা ওটা কাজে। জানলার বাইরে দিয়ে ঝম্ঝম্ শব্দটা কানে আসতেই অনেক দূরে মন চলে
গেল। অনেকদিন আগের কোন আষাঢ় মাসের সন্ধ্যাবেলা। বাইরে ঝরে পড়ছে বৃষ্টি। মা
হারমোনিয়ামে বসে। আমি অপার বিস্ময়ে ভেবে চলেছি ওই যন্ত্রটার রহস্য। কিকরে ওর ভিতর
থেকে আওয়াজ বের হয়। মা মেঘ রাগে একটা আলাপ ধরেছিল। মধ্য, তার সপ্তকের গন্ডি পার
হয়ে ঘরের মধ্যে এক ঝাঁক মেঘ ঢুকে পড়ল। আমি, মা, আমাদের ওই হারমোনিয়াম, সব যেন
কোথায় হারিয়ে যেতে লাগল। এলোপাথারি জলের ছাঁট চোখে, মুখে। অনেক দূরের মেঘ পার হয়ে
মায়ের গলা পাচ্ছি, কড়ি মা, শুদ্ধ নি। স্বর ঝরে পড়ছে। চারিদিকে গান। মিউজিক।
রবীন্দ্রনাথ, বিঠোফেন, প্রাচ্য, পাশ্চাত্য, রক, লোকগীতি দিয়ে যা বাঁধা যায়না, যার
বর্ণপ্রভেদ করা যায়না। বিশাল অতলান্তিকের ঢেউরাশির উপর শুধু ভেসে চলা যায়, সপ্তক
থেকে সপ্তকে।
No comments:
Post a Comment