Tuesday, October 23, 2012
Sunday, October 14, 2012
Post 14: Akashkolom 6
আজ মহালয়া। রোজকার মত ভোরবেলা ওঠা বা মহালয়া শোনার কোন ব্যাঘাত ঘটালাম না। পার্থক্য এই যে রেডিওর বদলে ল্যাপটপ। পারিপার্শ্বিকের সাথে বদলাতে হয় সবকিছু। তাই বদলাই নিজেকে। একটু একটু করে পালটে যাই রোজকারের তাড়নায়।
আমাদের বাড়িতে দাদানের, মানে আমার দাদুর একটা পুরোন বড় রেডিও ছিল। কাঠের, বেশ বড় সড়। তাতে রবিবারের গল্পদাদুর আসর, বা অনুরোধের আসর খুব কম শুনেছি আমি। কারণ, আমার দাদানের সিনেমার প্রতি যতটা আকর্ষণ ছিল, গান বা মিউজিকের প্রতি ততটা নয়। বা বলা ভালো আমি দেখিনি। তাই রেডিওতে রোববারের দুপুরের নাটক বাজতে শুনেছি অনেকদিন ভাতঘুম ঘোরে। কখন শম্ভু মিত্র, কখনো রুদ্রপ্রসাদের গলা দাপিয়ে বেড়াত আমাদের বাড়ির আনাচ-কানাচ।
মহালয়ার ভোরগুলো এ থেকে একটু আলাদা হত। পুজোর গন্ধ নিয়ে আসা এই মহালয়া। দাদানের রেডিওটা বেজে উঠত চারটের একটু আগেই। নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ধরতে হত কোলকাতা ক। মা এসে মাথায় হাত বুলিয়ে, গালে হামি দিয়ে ডাকত। মহালয়া শুনব। আগের রাতে বার বার মনে করিয়ে শুয়েছি। যাতে মা ডেকে দেয়। চোখ রগড়ে উঠে বসি। পাশের ঘরে তখন বেজে উঠেছে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের দৈব স্বর। গোটা বাড়িটা এই কাক না ডাকা ভোরে জেগে উঠেছে। বাবা কাকা সোফায় বসে। মা আমাকে মুখ ধুইয়ে চলে গেছে চায়ের ব্যাবস্থা করতে। দাদান, দিদিভাই রেডিওর সামনে। মনের মধ্যে খবর হয়ে গেল পুজো আসছে। বাইরে হাল্কা শিউলির গন্ধ, ঘুটঘুটে অন্ধকার থেকে ভেসে আসে 'বাজল তোমার আলোর বেণূ', পাড়ার আরো অন্য বাড়িতে রেডিও চলছে। গোটা পাড়াটার মধ্যে প্রাণ জেগে উঠেছে। পাশের বাড়ির টুলটুলি পিসি মাকে হাঁক দিয়ে জিজ্ঞেস করে, বৌদি, শুনছ তো? মা বলে, হ্যাঁ রে। কি শুনছ, কেউ বলে না, কেউ বলে দেয় না। সবাই শুনছে। আমি শুনছি, বাবা শুনছে, কাকা শুনছে, মা চা করতে করতে শুনছে। প্রতিবার শুনে শুনে গানগুলোর সব শব্দ মনে থেকে যাওয়া সত্ত্বেও সবাই সমান উৎকর্ণ। কখন শোনা যাবে হেমন্তর ঐশ্বরিক কন্ঠে, শুভ্র শঙ্খরবে বা দ্বিজেনের জাগো জাগো দুর্গা বলে কল্যানীকে আবাহন। ধরিত্রির সব দুষ্টের দমন করার জন্য। দেবীপক্ষের শুরু হয়ে যায়। আকাশে বাতাসে, দিকে দিগন্তরে সকল লোকে। কালো আকাশের বুক চিরে আলো দেখা যায়। পুব আকাশের কোলে লালচে ছাপ পড়ে। সূর্য ওঠার দেরি আছে। এটা তার আগের আলো। সে যে আসছে সেটা ঘরে ঘরে জানান দেওয়ার আলো। বাড়ির সামনে বাবার করা ছোট্ট বাগানের ঘাসগুলো ভিজে থাকে শিশির জলে। শিশির ভেজা ঘাস, মাটি মিশিয়ে একটা অদ্ভুত গন্ধ উঠত। সেটাও এইদিন পাওয়া যেত। বেলা বাড়লে রোদের সাথে সেসব কোথায় পালিয়ে যায়, অন্যদিন দেখিনি কখনো।
এরকম হারিয়ে ফেলা মহালয়াগুলো আর ফিরে আসেনা। কেন আসেনা? আমরা বড় হয়ে গেছি বলে? এই মাটিমাখা সম্পর্কগুলো, এই আকাশের গন্ধ মাখা দৈব ভোর গুলো চলে যাবে আমাদের কাছ থেকে? বড় হওয়াটা কি দোষের? ছোটবেলায় মাকে হারানো, অনেক দুঃখ চাপা আমার মাকে অনেক মহালয়ার আগের রাতে একা একা কাঁদতে দেখেছি। অথবা চোখের জলে ভেসে যেতে দেখেছি বাজল তোমার আলোর বেণুর সাথে। না জানি তারও ছোটবেলার কোন হারানো স্মৃতি, তার মায়ের কোলের মধ্যে শুয়ে শুয়ে মহালয়া শোনার কথা মনে পড়ে যায় হয়ত। আমারও এই মহালয়ার দিন কেমন যেন মায়ের জন্য খুব মন খারাপ করে। এই লেখাটা লিখতে লিখতেও গলার কাছটায় দলা পাকিয়ে উঠছে। আবার একটা কান্না মাখা ভোর কেটে গেল আমার মায়ের। বাড়ির রেডিওটা খারাপ হয়ে গেছে বেশ কয়েকদিন। তাই হয়ত এ বছর বাজছে না। এপাশ ওপাশ থেকে ভেসে আসা টুকরো মহালয়া নিয়েই হয়ত মায়ের এবছরের মহালয়া। আমাদের ফ্ল্যাটের একফালি বারান্দায় বসে পুব আকাশের আস্তে আস্তে ম্লান হয়ে আসা শুকতারাটার দিকে তাকিয়ে মা হয়ত হারিয়ে যাচ্ছে সেই ছোটবেলার দিনগুলোর মধ্যে। আর চোখ থেকে, অবিরত নেমে আসছে একটা নীরব গভীর জলের রেখা। আমরা সবাই শুনতে থাকি।এক পবিত্র মন্ত্রের মত, যা পুরোন হয়না, কি শুনছি কেউ প্রশ্ন করেনা। মা দুর্গার আবাহন করে, ডেকে আনে মনের মধ্যে স্মৃতির ভীড়। কিছুটা গভীর চোখের জল মাখা কোন হারানো কথা মিশে মিলে যায় ঝরে পড়ে থাকা শিশির ভেজা শিউলিগুলোর গন্ধের সাথে। শাঁখ বাজতে থাকে, উলু বাজে, আকাশের লাল ফিকে হয়ে আসে। দিন গুনতে থাকি আমরা সবাই, কবে বাড়ি ফিরব মায়ের কাছে, কবে মা আসবে আমাদের কাছে।
আমাদের বাড়িতে দাদানের, মানে আমার দাদুর একটা পুরোন বড় রেডিও ছিল। কাঠের, বেশ বড় সড়। তাতে রবিবারের গল্পদাদুর আসর, বা অনুরোধের আসর খুব কম শুনেছি আমি। কারণ, আমার দাদানের সিনেমার প্রতি যতটা আকর্ষণ ছিল, গান বা মিউজিকের প্রতি ততটা নয়। বা বলা ভালো আমি দেখিনি। তাই রেডিওতে রোববারের দুপুরের নাটক বাজতে শুনেছি অনেকদিন ভাতঘুম ঘোরে। কখন শম্ভু মিত্র, কখনো রুদ্রপ্রসাদের গলা দাপিয়ে বেড়াত আমাদের বাড়ির আনাচ-কানাচ।
মহালয়ার ভোরগুলো এ থেকে একটু আলাদা হত। পুজোর গন্ধ নিয়ে আসা এই মহালয়া। দাদানের রেডিওটা বেজে উঠত চারটের একটু আগেই। নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ধরতে হত কোলকাতা ক। মা এসে মাথায় হাত বুলিয়ে, গালে হামি দিয়ে ডাকত। মহালয়া শুনব। আগের রাতে বার বার মনে করিয়ে শুয়েছি। যাতে মা ডেকে দেয়। চোখ রগড়ে উঠে বসি। পাশের ঘরে তখন বেজে উঠেছে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের দৈব স্বর। গোটা বাড়িটা এই কাক না ডাকা ভোরে জেগে উঠেছে। বাবা কাকা সোফায় বসে। মা আমাকে মুখ ধুইয়ে চলে গেছে চায়ের ব্যাবস্থা করতে। দাদান, দিদিভাই রেডিওর সামনে। মনের মধ্যে খবর হয়ে গেল পুজো আসছে। বাইরে হাল্কা শিউলির গন্ধ, ঘুটঘুটে অন্ধকার থেকে ভেসে আসে 'বাজল তোমার আলোর বেণূ', পাড়ার আরো অন্য বাড়িতে রেডিও চলছে। গোটা পাড়াটার মধ্যে প্রাণ জেগে উঠেছে। পাশের বাড়ির টুলটুলি পিসি মাকে হাঁক দিয়ে জিজ্ঞেস করে, বৌদি, শুনছ তো? মা বলে, হ্যাঁ রে। কি শুনছ, কেউ বলে না, কেউ বলে দেয় না। সবাই শুনছে। আমি শুনছি, বাবা শুনছে, কাকা শুনছে, মা চা করতে করতে শুনছে। প্রতিবার শুনে শুনে গানগুলোর সব শব্দ মনে থেকে যাওয়া সত্ত্বেও সবাই সমান উৎকর্ণ। কখন শোনা যাবে হেমন্তর ঐশ্বরিক কন্ঠে, শুভ্র শঙ্খরবে বা দ্বিজেনের জাগো জাগো দুর্গা বলে কল্যানীকে আবাহন। ধরিত্রির সব দুষ্টের দমন করার জন্য। দেবীপক্ষের শুরু হয়ে যায়। আকাশে বাতাসে, দিকে দিগন্তরে সকল লোকে। কালো আকাশের বুক চিরে আলো দেখা যায়। পুব আকাশের কোলে লালচে ছাপ পড়ে। সূর্য ওঠার দেরি আছে। এটা তার আগের আলো। সে যে আসছে সেটা ঘরে ঘরে জানান দেওয়ার আলো। বাড়ির সামনে বাবার করা ছোট্ট বাগানের ঘাসগুলো ভিজে থাকে শিশির জলে। শিশির ভেজা ঘাস, মাটি মিশিয়ে একটা অদ্ভুত গন্ধ উঠত। সেটাও এইদিন পাওয়া যেত। বেলা বাড়লে রোদের সাথে সেসব কোথায় পালিয়ে যায়, অন্যদিন দেখিনি কখনো।
এরকম হারিয়ে ফেলা মহালয়াগুলো আর ফিরে আসেনা। কেন আসেনা? আমরা বড় হয়ে গেছি বলে? এই মাটিমাখা সম্পর্কগুলো, এই আকাশের গন্ধ মাখা দৈব ভোর গুলো চলে যাবে আমাদের কাছ থেকে? বড় হওয়াটা কি দোষের? ছোটবেলায় মাকে হারানো, অনেক দুঃখ চাপা আমার মাকে অনেক মহালয়ার আগের রাতে একা একা কাঁদতে দেখেছি। অথবা চোখের জলে ভেসে যেতে দেখেছি বাজল তোমার আলোর বেণুর সাথে। না জানি তারও ছোটবেলার কোন হারানো স্মৃতি, তার মায়ের কোলের মধ্যে শুয়ে শুয়ে মহালয়া শোনার কথা মনে পড়ে যায় হয়ত। আমারও এই মহালয়ার দিন কেমন যেন মায়ের জন্য খুব মন খারাপ করে। এই লেখাটা লিখতে লিখতেও গলার কাছটায় দলা পাকিয়ে উঠছে। আবার একটা কান্না মাখা ভোর কেটে গেল আমার মায়ের। বাড়ির রেডিওটা খারাপ হয়ে গেছে বেশ কয়েকদিন। তাই হয়ত এ বছর বাজছে না। এপাশ ওপাশ থেকে ভেসে আসা টুকরো মহালয়া নিয়েই হয়ত মায়ের এবছরের মহালয়া। আমাদের ফ্ল্যাটের একফালি বারান্দায় বসে পুব আকাশের আস্তে আস্তে ম্লান হয়ে আসা শুকতারাটার দিকে তাকিয়ে মা হয়ত হারিয়ে যাচ্ছে সেই ছোটবেলার দিনগুলোর মধ্যে। আর চোখ থেকে, অবিরত নেমে আসছে একটা নীরব গভীর জলের রেখা। আমরা সবাই শুনতে থাকি।এক পবিত্র মন্ত্রের মত, যা পুরোন হয়না, কি শুনছি কেউ প্রশ্ন করেনা। মা দুর্গার আবাহন করে, ডেকে আনে মনের মধ্যে স্মৃতির ভীড়। কিছুটা গভীর চোখের জল মাখা কোন হারানো কথা মিশে মিলে যায় ঝরে পড়ে থাকা শিশির ভেজা শিউলিগুলোর গন্ধের সাথে। শাঁখ বাজতে থাকে, উলু বাজে, আকাশের লাল ফিকে হয়ে আসে। দিন গুনতে থাকি আমরা সবাই, কবে বাড়ি ফিরব মায়ের কাছে, কবে মা আসবে আমাদের কাছে।
Tuesday, October 2, 2012
Post 13: My Presidency
প্রেসিডেন্সি কলেজের বারান্দাগুলো আমার কাছে
ছোটবেলায় হামাগুড়ি দেওয়ার উঠোনের মত আপন। অনেকদিন থেকেই ভাবি কলেজ নিয়ে কিছু একটা
লিখি। কি লিখি কি লিখি করে লেখা আর হয়ে ওঠে না। আসলে কলেজটার সাথে এত কিছু জড়িয়ে
আছে যে, একপাতা আকাশ কলমের মধ্যে তাকে ধরানো খুব মুশকিল। সেই প্রথমদিনের বৃষ্টি
ভেজা বন্ধুত্বগুলো এত দিনের এত পথচলা পার হয়ে এত নিজের, এত আপন, বুকের মধ্যের
জিনিস হয়ে গেছে, যে সেগুলোর কথা বলা মানে আমার অর্ধেক আত্মজীবনী। তাদের নিয়েই আমার
জীবনের পথচলা, জীবনের বাঁকে বাঁকে বার বার তাদেরকে নতুন করে পাব বলে হারানো বারে
বারে। সেই সাত পাঁচ চিন্তা করতে করতে হঠাতই ল্যাপটপ খুলে বসলাম কিছু লিখি বলে। কিন্তু
সব কথা বলা যায়না, সব কথা ভাগ করে নেওয়া যায়না সবার সাথে। কত খারাপ লাগা, ভালো
লাগায় সামিল হয়েছে জীবন এই তিন বছরে। কত ওঠা পড়ার সাথী এই কলেজ। তাই সবটুকুকে মনের
মধ্যে রেখে কিছু ভালোলাগা লিখে রাখার ইচ্ছে হল। সার্বিক রোমন্থন না হোক, কলেজের
অলি গলি দিয়ে হেঁটে তো আসা হবে।
সেদিন জুলাই মাসের সকাল বেলা। আকাশ ঘনঘোর
কৃষ্ণবর্ণ। সকালের বারাসাত লোকালটা ঠিক করা ছিল ধরব। সাথী হবে বারাসাতের আরো
কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবী। প্রথমদিন কলেজ যাওয়া। সদ্য স্কুল পার হয়ে এক অন্যরকম জীবন।
যেখানে কেউ বকবেনা ব্যাজ নেই বলে, প্রেয়ারের লাইনে দাঁড়িয়ে চুপিচুপি পাশের জনের পা
মাড়িয়ে দেওয়ার মত দুষ্টুমিও হবেনা সঙ্গী। তাই মনের মধ্যে এক অচেনা জীবনে পা রাখার
নিদারূণ আকুতি। কিন্তু এমন দিনে কি যাওয়া যায়, এমন ঘন ঘোর বরিষায়? বাবা বলল,
কলেজস্ট্রীটে এক হাঁটু জল জমে কিন্তু। আমি বললাম, ডিঙিয়ে যাব। কিন্তু প্রথমদিন
কলেজ মিস্ করার মত বোকা আমায় পাওনি। তাই বাবার হাত ছেড়ে প্রথমবারের জন্য চেপে
বসলাম ট্রেনে।
সেদিন জল জমেনি কলেজস্ট্রীটে। আমার এতবছরের
কলেজ জীবনের ওই প্রথম এবং শেষ বারের মত প্রবল বৃষ্টির পরেও জলশুণ্য দেখেছি
কলেজস্ট্রীট। মেন গেট থেকে পোর্টিকো পার হয়ে হেঁটে চলা ডিরোজিও হলের দিকে। ওখানেই
হবে ওরিয়েন্টেশন। প্রিন্সিপালের বক্তৃতা। সব ডিপার্টমেন্টের ফার্স্ট ইয়ার জমা হবে
ওখানে, তারপর যার যার ডিপার্টমেন্টের দিকে। অতঃপর গিয়ে পড়া এক ঝাঁক অচেনা মুখের
মাঝে। যাদের সাথে কাটাতে হবে সামনের তিন বছর। একটা হাসি মুখ, উস্কোখুস্কো চুল,
পিঠে স্কুলের ব্যাগ এগিয়ে এসে বলল, তুমি কি ফিজিক্স? অল্প হেসে হ্যাঁ বলি। নাম?
কোলাহল। প্রথম বন্ধু। ফিরতি প্রশ্নে বলি, কোলাহল যেখানে হয়, সৈকত।
ওরিয়েন্টেশন শেষ হয়। পথ ধরা ডিপার্টমেন্টের।
প্রথম এসেই যে মেয়েটাকে নজর করেছিলাম, তার গলায় ঝোলানো মোবাইল। টাটা ডোকোমোর সেই বিশাল
বড় হ্যান্ডসেট। চোখে চশমা। দেখলে বুদ্ধিমতী মনে হয়। বেশ ভালোলাগা মেশানো কৌতুহল
তৈরী হয়। ডিপার্টমেন্টের পথে মিলে যেতেই জেনে নিই নাম। সেমন্তী। সঙ্গে আর একজন,
মনোনীতা। ছোট খাটো চেহারা, মুখে সবসময় একটা আলতো হাসি। বন্ধুত্বের জন্য সময়
লাগেনা।
পথ চলতে থাকি একসাথে। ভালোলাগা, খারাপ লাগা
গুলো মিলে মিশে যায়। কলেজের বারান্দার রোদ-ছায়ায় চলে আড্ডা, গল্প, সেমন্তীর বেসুরো
গান। কলেজটার বিশাল বারান্দাটার একটা মন ভালো করা জাদু আছে। অথবা মেন বিল্ডিং-এর
পোর্টিকো। রোজ ক্লাস শুরুর আগে টুক করে সেরে নেওয়া নির্ভেজাল আড্ডাগুলো। বেকার
ল্যাবরেটরির কোরিডোর, পিএলটির ইতিহাস মাখা এক বিশালত্ত্ব, শীতকালের ক্লাশ ছুটে রোদ
মাখা মাঠে বসে রবীন্দ্রচর্চা, এই সবকিছুর মধ্যে দিয়ে দারুণ ভাবে ধমনীর মধ্যে তরঙ্গ
তোলে প্রেসিডেন্সি।
সব্যসাচীর কাছে প্রথম শুনি মোজার্ট। তার আগে
অবধি আমার অভিজ্ঞতা বলতে বেঠোফেনের ফিফ্থ আর সিক্সথ সিম্ফনি। সব্যসাচী আমায় একদিন
পিএলটি টুতে বসে শিস্ দিয়ে মোজার্ট শোনালো। হর্ন কনসার্তো। ভালো লাগা শুরু হল।
বাখ, বেঠোফেন, মোজার্ট, ভিভালডি, মাহ্লার, চাইকভ্স্কি। তারপর থেকে এখনো অবধি এমন
অনেকদিন গেছে, সাংঘাতিক মন খারাপের মাঝে দিশা দিয়েছে ভিভাল্ডির স্প্রিং-এর
আলেগ্রো।
কোলাহলের সাথে আমার এক নিবিড় বন্ধুত্বের ভিতরে
এক অন্যরকম পৃথিবী সবসময় ছিল। সেই পৃথিবীতে আমরা কখনও বেড়াতাম সাথে নিয়ে
মৃৎ-প্রদীপ, আকাশ থেকে নেমে আসা গৌড়মল্লার সাথী হত যখনতখন। সত্যি কথা বলতে আমার
সাহিত্যচর্চার গভীরতা বেড়েছে কোলাহলের জন্য। ওর কাছ থেকে অনেক অকাজের দুপুরে বসে
শরদিন্দুর বিদ্রোহী বা স্বখাত-সলিল শুনতে শুনতে মনের মধ্যে দাগ টেনে গেছে অনেক
উল্কার আলো। আজও অনেক না-ভালো লাগা রাতে আনমনে চলে যাই হাজার বছর পার হয়ে
তুঙ্গভদ্রার তীরে।
কলেজে একদিন মনোনীতাকে বলেছিলাম, যে তুই আমার
সবচেয়ে ভালো বন্ধু, কারণ তুই টিনটিন পড়িস। কোলাহল অভিমান ভরে বলেছিল, টিনটিনটাই সব
হল? এই সামান্য মান অভিমানের দোলদোলানি কোলাহল আর মনোনীতার মধ্যে যতটা ছিল, আমার
সাথে এদের কারোর সেটা ছিল না, বা থাকলেও আমি টের পাইনি কখনও। সেমন্তী ছাড়া।
সেমন্তীর সাথে আমার একটা চিরন্তন খুনসুটির সম্পর্ক আজও বিদ্যমান। তার ফাঁকে ফাঁকে
নানারকম মান অভিমানের পালা চলেছে।
ওই যে বলেছিলাম না, আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু
ছিল মনোনীতা। ওটা তখন মনে হয়েছিল টিনটিনই তার মূল কারণ, কিন্তু পরিণতির সাথে আরো
অনেক গভীর ভাবে খুঁজে পেয়েছি আমাদের বিশুদ্ধ বন্ধুত্বের সংজ্ঞা। ওর কথা লেখার জন্য
আমার এই রাতটা যথেষ্ট নয়। আমার কলেজ এবং কলেজোত্তর জীবনের অনেক পাথেয় আহরণ করি ওর
কাছ থেকে। আমার সব খারাপ থাকা সন্ধ্যেগুলোর একান্ত সাথী, আর ভালো থাকা ভোরগুলোর
প্রথম ফোনকল।
প্রেসিডেন্সি আমায় তিন বছরে অনেক দিয়েছে,
যেটা আমায় তার পরে বা আগে কেউ দেয়নি। আমার আনমনা বিকেলের অনেক মণি মুক্ত, আমার
পথবাতির হলদে আলোর সন্ধ্যে বেলা। ঝুপঝুপে বৃষ্টির দিনে বেকারের সিঁড়ি আমাদের জীবন
থেকে চলে গেছে আজ কয়েকটা বছর হয়ে গেছে। তবু বার বার ফিরে আসে মনের মধ্যে। আজ যখন
প্রতিটা দিনকে সন্ধ্যের দিকে টেনে টেনে নিয়ে যেতে যেতে আলোছায়া ভরা পথ গুলোর দিকে
পা বাড়াই, মন গিয়ে ঠেকে বার বার ওই বাড়িটার আনাচে কানাচে। শুধু একটা ইঁট কাঠে ভরা
দেড়-দুশো বছরের পুরোনো ইমারত নয় প্রেসিডেন্সি, নয় রোজকার খবরের শিরোনামে চলতে থাকা
উন্নয়নের হিসেবে বাঁধা উৎকর্ষের কেন্দ্র, আমার প্রতিটা জীবনকণার ছুটে চলার শুরু ওর
ওই বারান্দা দিয়ে। চৌখুপির রোদ-ছায়ায় ভরা আমার অনেক হারানো, আমার অনেক কাছের
অনেকগুলো সকাল নিয়ে জেগে থাকে প্রেসিডেন্সি, আমার বুকের অনেক গভীর কোন অতলান্তিকে।
Post 12: The Spring
যদিও এ ঘোর শরতে বসন্তের গান গাওয়া নিতান্ত
বাতুলতা, তাও কেন জানিনা বসন্তের কথা মনে পড়ল। আসলে কালকেই এক বন্ধুর সাথে মশকরা
করছিলাম। বেচারি পায়ের চোটে অর্ধেক শয্যাশায়ী। কিসব কঠিন নাম বলল, সেই সব হাড়ে
নাকি সমস্যা। ভালো বুঝলাম না। কেবল আহা-উহু করে বললাম, লেগেছে বিষম চোট, কি জানি
কি হয়? সে বেরসিক। বলে এতো শরত কাল, বসন্তের কথা কেন বলিস? গানটার শুরুর কথা মনে
করিয়ে দিলাম। ‘চোটের কথাই যদি বললেন, তাহলে দুকলি শোনাই। যদিও এ শরতকাল, তবু মনের
মধ্যে ফাগুন মাস’। এই কথা বলে আমিও তাই মুখবন্ধ করলাম আপনাদের। সোজা ভাষায় কৈফিয়ত
দিলাম।
কালকের ওই বাসন্তিক আলোচনার পর, চেন্নাইয়ের
(যেখানে সারা বছর গ্রীষ্মের অটোক্র্যাসি চলে) রোদে পুড়ে সারাদিনের কাজকর্মের পর
আবার মনের মাঝে একটু বসন্ত জাগালো ফেস্বুকের পোস্ট। কেউ একজন ভিভাল্ডির ফোর সিজ্নের
কথা লিখেছে। বারবার শোনা জুলিয়া ফিশারের ভায়োলিনের কথা মনে পড়ল। ইউ টিউবে জুলিয়ার
স্প্রিং শুনে যে কতবার তার প্রেমে পড়েছি, তার তো ইয়ত্তা নেই। অল্প বয়েসী মেয়ে।
চারটি তারে ছড় ঘসে চারিদিকে বসন্তের আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে। উঠছে, নামছে, ঢেউ
খেলছে, সুরের ওপর সুর জাগছে। সুর জাগছে নদীর জলে, গাছের পাতায়, এমনকি পাতার গায়ে
লেগে থাকা কাঁচপোকাটাও সুরের তালে রঙীন হয়ে উঠছে। কি অদ্ভুত এই সুর, তাই না? কিছু
তারের কাঁপনে জেগে ওঠা এক মায়া। ভাসিয়ে নিয়ে চলে সব কিছু। এক বিশাল অতলান্তিকের
উপর দুলতে থাকা শুভ্রফেন ঢেউএর মত। আগুন জ্বলে বসন্তের। বাসন্তী ভুবনমোহিনী।
বসন্তের সুর জাগে নভোতলে, সরোবরে, নদী, গিরি, গুহা, পারাবারে। কি এই বসন্ত? কিভাবে
জাগে এই সুর? আকাশ থেকে নেমে আসা বৃষ্টির মত সুর ঝরে পরে, মুখের পরে, বুকের পরে।
এক মনে জাল বুনে চলা মাকড়সাটাও চঞ্চল হয়ে ওঠে। বসন্ত এসেছে। ফুলের বুকে জেগে ওঠে
মধু। অলি বার বার ফিরে আসে। আকাশের ছেঁড়া মেঘের দল ভেসে চলে সেই সুরের দোলনায়।
সেদিন একলা ঘরে ল্যাপটপকে সঙ্গী করে ডুব
মেরেছিলাম বসন্তকে আরো একটু গায়ে মাখব বলে। কানে এলো রাগ বাহার। রসিদ খানের
দেবদত্ত গলায় কোথাও বেজে চলেছে, ‘মাতোয়ারি কোয়েলিয়া ডার ডার...’। চোখে ভেসে এল
কয়েকটা ছেঁড়া পাতার মত দৃশ্যপট। এক মাঠ সবুজ ঘাসে পা ডুবিয়ে ভেসে চলা আমার কথা।
আকাশের বুকে আঁচড় কেটে উড়ে চলা চিল। বারবার ঘুরে ঘুরে ফিরে আসে মুখরার মত। গাছে
গাছে কোকিলের ডাক, এক ঝাঁক রঙীন প্রজাপতির উড়ে চলা এদিক সেদিক। যেন কতগুলো উড়ন্ত
ফুলদল। কোকিলের ডাক, প্রজাপতির ডানা, ঘাসের পাতায় ঘাসফড়িং-এর ব্যস্ততা, সব মিলিয়ে
কম্পোজ হয়ে চলেছে এক অনন্ত সুরের জাল। সবেতে আছে এক তরঙ্গ, আছে সুর। কিছু নিতান্ত
ম্যাটার ওয়েভ মাধ্যম থেকে মাধ্যমে বয়ে চলে তৈরী করে চলে এই অদ্ভুত জাদুরাশি। নিজের
মনের সাথে শুধু মিলিয়ে নেওয়ার অপেক্ষা। এই মিলনের জন্যেই আমাদের চির প্রতীক্ষা।
বিশ্ব জগতের কেন্দ্রে জেগে ওঠা এই সুরের তালে নিজের হৃদয় ছন্দকে অনুরণিত করার এক
অনন্ত অপেক্ষা।
Subscribe to:
Comments (Atom)