যদিও এ ঘোর শরতে বসন্তের গান গাওয়া নিতান্ত
বাতুলতা, তাও কেন জানিনা বসন্তের কথা মনে পড়ল। আসলে কালকেই এক বন্ধুর সাথে মশকরা
করছিলাম। বেচারি পায়ের চোটে অর্ধেক শয্যাশায়ী। কিসব কঠিন নাম বলল, সেই সব হাড়ে
নাকি সমস্যা। ভালো বুঝলাম না। কেবল আহা-উহু করে বললাম, লেগেছে বিষম চোট, কি জানি
কি হয়? সে বেরসিক। বলে এতো শরত কাল, বসন্তের কথা কেন বলিস? গানটার শুরুর কথা মনে
করিয়ে দিলাম। ‘চোটের কথাই যদি বললেন, তাহলে দুকলি শোনাই। যদিও এ শরতকাল, তবু মনের
মধ্যে ফাগুন মাস’। এই কথা বলে আমিও তাই মুখবন্ধ করলাম আপনাদের। সোজা ভাষায় কৈফিয়ত
দিলাম।
কালকের ওই বাসন্তিক আলোচনার পর, চেন্নাইয়ের
(যেখানে সারা বছর গ্রীষ্মের অটোক্র্যাসি চলে) রোদে পুড়ে সারাদিনের কাজকর্মের পর
আবার মনের মাঝে একটু বসন্ত জাগালো ফেস্বুকের পোস্ট। কেউ একজন ভিভাল্ডির ফোর সিজ্নের
কথা লিখেছে। বারবার শোনা জুলিয়া ফিশারের ভায়োলিনের কথা মনে পড়ল। ইউ টিউবে জুলিয়ার
স্প্রিং শুনে যে কতবার তার প্রেমে পড়েছি, তার তো ইয়ত্তা নেই। অল্প বয়েসী মেয়ে।
চারটি তারে ছড় ঘসে চারিদিকে বসন্তের আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে। উঠছে, নামছে, ঢেউ
খেলছে, সুরের ওপর সুর জাগছে। সুর জাগছে নদীর জলে, গাছের পাতায়, এমনকি পাতার গায়ে
লেগে থাকা কাঁচপোকাটাও সুরের তালে রঙীন হয়ে উঠছে। কি অদ্ভুত এই সুর, তাই না? কিছু
তারের কাঁপনে জেগে ওঠা এক মায়া। ভাসিয়ে নিয়ে চলে সব কিছু। এক বিশাল অতলান্তিকের
উপর দুলতে থাকা শুভ্রফেন ঢেউএর মত। আগুন জ্বলে বসন্তের। বাসন্তী ভুবনমোহিনী।
বসন্তের সুর জাগে নভোতলে, সরোবরে, নদী, গিরি, গুহা, পারাবারে। কি এই বসন্ত? কিভাবে
জাগে এই সুর? আকাশ থেকে নেমে আসা বৃষ্টির মত সুর ঝরে পরে, মুখের পরে, বুকের পরে।
এক মনে জাল বুনে চলা মাকড়সাটাও চঞ্চল হয়ে ওঠে। বসন্ত এসেছে। ফুলের বুকে জেগে ওঠে
মধু। অলি বার বার ফিরে আসে। আকাশের ছেঁড়া মেঘের দল ভেসে চলে সেই সুরের দোলনায়।
সেদিন একলা ঘরে ল্যাপটপকে সঙ্গী করে ডুব
মেরেছিলাম বসন্তকে আরো একটু গায়ে মাখব বলে। কানে এলো রাগ বাহার। রসিদ খানের
দেবদত্ত গলায় কোথাও বেজে চলেছে, ‘মাতোয়ারি কোয়েলিয়া ডার ডার...’। চোখে ভেসে এল
কয়েকটা ছেঁড়া পাতার মত দৃশ্যপট। এক মাঠ সবুজ ঘাসে পা ডুবিয়ে ভেসে চলা আমার কথা।
আকাশের বুকে আঁচড় কেটে উড়ে চলা চিল। বারবার ঘুরে ঘুরে ফিরে আসে মুখরার মত। গাছে
গাছে কোকিলের ডাক, এক ঝাঁক রঙীন প্রজাপতির উড়ে চলা এদিক সেদিক। যেন কতগুলো উড়ন্ত
ফুলদল। কোকিলের ডাক, প্রজাপতির ডানা, ঘাসের পাতায় ঘাসফড়িং-এর ব্যস্ততা, সব মিলিয়ে
কম্পোজ হয়ে চলেছে এক অনন্ত সুরের জাল। সবেতে আছে এক তরঙ্গ, আছে সুর। কিছু নিতান্ত
ম্যাটার ওয়েভ মাধ্যম থেকে মাধ্যমে বয়ে চলে তৈরী করে চলে এই অদ্ভুত জাদুরাশি। নিজের
মনের সাথে শুধু মিলিয়ে নেওয়ার অপেক্ষা। এই মিলনের জন্যেই আমাদের চির প্রতীক্ষা।
বিশ্ব জগতের কেন্দ্রে জেগে ওঠা এই সুরের তালে নিজের হৃদয় ছন্দকে অনুরণিত করার এক
অনন্ত অপেক্ষা।
No comments:
Post a Comment