ঘড়ির কাঁটা ১১টার ঘর পেরোনোর পর থেকেই সুজান উঠি উঠি করছে। খ্রিস্টমাসের দিন বলে বাড়িতে রাত হচ্ছে বলে কিছু বলবে না, কিন্তু তাও বেশী দেরী করাটা ঠিক নয়। পার্টি হয়তো এদের সারা রাত চলবে। কিছু বিশ্বাস নেই। তাই আর ইতস্তত না করে জোহানকে ডেকে বলেই ফেলল,”এই জোহান, রাত অনেক হল। বাড়ি যাই রে।“
সুজান বা জোহান জন্মসূত্রে ব্রিটিশ হলেও এত বছর এদেশে থাকার পর পাক্কা বাঙালী বনে
গেছে। এমনকি বেশীরভাগ সময় নিজেদের মধ্যেও বাংলাতেই কথা বলে। হিমালয়ের পায়ের কাছে, ডুয়ার্সের একটা ধার
ঘেঁসে এই ম্যাকমোহনপুরের বৈশিষ্ট্যই এটা। এখানের আদি বাসিন্দাদের
সাথে সেই ব্রিটিশ আমল থেকে কয়েকঘর ব্রিটিশ বাস করেন। তাদের রাজত্ব এ দেশ থেকে চলে গেলেও, তারা বন্ধু হয়েই থেকে গেছেন কয়েক পুরুষ ধরে। এমনকি এই ম্যাকমোহনপুরের নামও সুজানদের এক পূর্বপুরুষের নামে। ভাতে মাছে বাঙালী হলেও নিজেদের উৎসবএর কোন ফাঁক পড়ে না। যেমন এই খ্রিস্টমাস। জোহান ম্যাকলরেনদের বাড়িতে সবার নিমন্ত্রণ ছিল রাতের
পার্টিতে। আর পাঁচজন বাঙালী মেয়ের মত সুজানকেও বাবা বেশী রাত অবধি বাইরে
থাকতে দেননা। কিন্তু খ্রিস্টমাসের জন্য একটা দিন ছাড় পাওয়াই যায়। জোহান সুজানের কলেজের বন্ধু। কলেজের সব বন্ধুরা
মিলেই হই-হুল্লোড় চলছিল। কিন্তু সুজান্এর মনটা এই পার্টির মধ্যে ছিলনা। তাই অনেকক্ষণ ধরে উস্খুশ করলেও বলতে পারছিলনা। এগারোটা বাজতে বলেই ফেলল বাড়ি যাওয়ার কথা।
“এখুনি চলে যাবি? বোস না। সবাই তো আছে। অনামিকারাও তো রয়েছে। একসাথে ফিরিস।“ জোহান বলে।
-“না রে। যাই। কিছু কাজ-ও আছে। পড়াশোনা।“
-“উফ্। আজকের দিনেও মাগিং। প্লিজ…”
-“হে হে। না কলেজের পড়া নয়। এমনি এটা ওটা। সত্যি বলছি রে…”
-“বাট যাবি কিকরে? একা একা এত রাতে এতটা রাস্তা…”
-“কিচ্ছু হবেনা। ঠিক চলে যাব।”
-“না না। পাঁচ মিনিট বোস। আমি এগিয়ে দিয়ে আসব।”
-“কোন দরকার নেই জোহান। আমি কচি খুকি নই। স্যাম আঙ্কেলের বাড়ির সামনের শর্টকার্টটা নিয়ে নেব।” মাথার লম্বা সোনালি চুলটা গোছা করে, গায়ে জ্যাকেটটা চড়িয়ে বলে সুজান।
-“একটু দাঁড়া না।”
_”না, বলেছি, না। আমি ঠিক চলে যাব।” সুজানকে কলেজে আড়ালে ‘আয়রণ লেডি’ বলে ডাকে বন্ধুরা। একবার যেটা ভাববে, সেটা থেকে নড়চড় খুব কম হয়।
সুজানের ‘না’ শুনে জোহান আর কিছু বললনা। প্রত্যুষ আর সাম্যও শুনছিল। সুজান সবাইকে বাই
করে বেরোতেই সাম্য বলল,”চল্। আয়রণ লেডিকে ভয় দেখাই।” কলেজে সাম্যর দুষ্টু বুদ্ধির কথা সবাই জানে। ওর মাথায় সব দুষ্টু বুদ্ধির বাসা। সেগুলো ক্ষতিকর হয়না, শুধুই মজা। তাই সবাই ঘিরে ধরে
বলল, “কি করবি রে?”
-“কিছুনা। শুধু ওর পিছু নেব। একটু দূর থেকে। যাতে ও বুঝতে পারে কেউ পিছু নিয়েছে, কিন্তু চিনতে না পারে। তারপর আয়রনের কি দশা হয় দেখা যাক্।”
-“এহ্। শুধু শুধু ভয় দেখাবি?” জোহান মৃদু আপত্তি জানায়।
-“আরে, ভয় পাক্ বা না পাক্, ওর এসকর্ট তো হবে। সেটা তো ভেবে দেখ একবার।”
-“সেটা ঠিক।” ভালো দিকটা ভেবে জোহান মেনে নেয়।
সাম্য আর প্রত্যুষ একটা হুডওয়ালা জ্যাকেট পরে বেরিয়ে পড়ে। কিছুটা পা চালিয়ে আসার পর সুজানকে দেখতে পায়। অন্ধকার রাস্তায় চিনতে পারার কোন সম্ভাবনা নেই জেনেও মোটামুটি ষাট মিটার তফাতে
হাঁটতে থাকে দুজনে। কিছুটা চলার পর সুজান পিছনে ফিরে তাকায় একবার। তারপর জোরে পা চালায়। সাম্যরাও জোরে পা চালায়। বুঝতে পারে যে, ভয় পেয়েছে। সুজান ওদের কাটানোর জন্য অনেক অলি গলি দিয়ে অকারণে ঘুরতে থাকে। সুজান ভয় পাচ্ছে এটা দেখে, সাম্য আরো মজা পায়। প্রত্যুষ অবশ্য একবার বলেছিল যে, “মেয়েটাকে শুধু শুধু আর ভয় পাইয়ে লাভ নেই। চল গিয়ে বলে দি।“
-“বাজে বকিস না তো। তোকে আনাই ভুল হয়েছে।” এক ধমকে চুপ করিয়ে দেয় সাম্য।
হঠাৎ একটা বাইকের আওয়াজ পাওয়া
যায়। এইসময় পুলিশে টহল দিতে বেরোয়, এটা খেয়াল ছিলনা। দুজনে মিলে একটা
বাড়ির আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। নাহলে সুজান যদি কিছু বলে, তাহলে এই মজার নামে প্রচুর ঝামেলা পোহাতে হবে। নাহ্, বাইকটা থামে নি। তারমানে সুজান কিছু বলেনি।
-“কিন্তু, এত রাতে একটা মেয়ে একা রাস্তায় দেখে, কিছু বলল না?” সাম্য বলল।
আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে রাস্তা ফাঁকা দেখে দুজনে আরো অবাক হয়ে যায়। এত তাড়াতাড়ি মেয়েটা গেল কোথায়? রাস্তাও তো সোজা।
-“চল্, সাম্য। অনেক মজা হয়েছে। এবার ফিরি। আমার আর ভালো লাগছেনা।” প্রত্যুষ ভয় পাওয়া গলায় বলে।
-“হ্যাঁ রে, চল ফিরি।” সাম্যও একটু ভয় পেয়েছে
বোঝা যায়। দুজনেই ফিরতে থাকে।
জোহানের বাড়িতে ফেরা মাত্রই সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল। সাম্যদের ফ্যাকাশে মুখ দেখে সবাই বুঝে গেছে যে মিশন সাকশেসফুল নয়।
“মার খাসনি তো রে?” প্রতীক বলে।
আরো সবাই দু-একটা ইয়ার্কি মারার
মাঝখানে জোহানের ফোনটা বেজে ওঠে।
“দাঁড়া। সুজানের বাবা, ক্রিস্টোফার আঙ্কেল
ফোন করছেন।” বলে ফোন নিয়ে বারান্দায় বেরিয়ে যায়। একমিনিট পরেই ফিরে এসে বলে,”মেয়েটা তো এখনও বাড়ি ফেরেনি। মোবাইলও বন্ধ। কোথা অবধি দেখে এসেছিস তোরা?”
-“সেকি!” সাম্য লাফিয়ে ওঠে।
সাম্য দু-এক কথায় বুঝিয়ে তিনচারজন
মিলে টর্চ নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ে। রাস্তার ওই মোড়টায়
এসে সাম্য দেখিয়ে দেয় লাস্ট কোথায় ওরা সুজানকে দেখেছিল। ঠিক তার পাশে একটা অর্ধেক তৈরী হওয়া বাড়ি দেখিয়ে জোহান বলল,”তোদের ভয়ে ওর মধ্যে ঢুকে বসে নেই তো?”
সবাই মিলে বাড়ির সামনে গিয়ে দু-একবার ‘সুজান’ ‘সুজান’ বলে ডাকে। কোন সাড়া মেলেনা। নিচের তলায় শুধু পিলার থাকায় কোথাও লুকোনোর জায়গা নেই। তাও সব জায়গাটা টর্চ ফেলে দেখে নেয় জোহান।
“জোহান, দোতলায়।” বলে সাম্য সিঁড়ির
দিকে পা বাড়ায়।
দোতলায় ঘরের দেওয়াল গাঁথা হয়ে গেছে। আবার ওর কয়েকবার
নাম ধরে ডাকে। কোন সাড়া নেই। প্রথম ঘরটা ফাঁকা। জোহান এগিয়ে গিয়ে দ্বিতীয় ঘরে পা দিয়েই চিৎকার করে
ওঠে। সবাই দৌড়ে গিয়ে দেখে মেঝের ওপর সুজান পড়ে আছে। চোখের মণি দুটো স্থির। আর বুকের ঠিক ওপর একটা গোলাপ ফুল।
প্রতিদিন সকালে যাবতীয় কাজকর্ম শুরু করার আগে খবরের কাগজটা
মন দিয়ে না পড়লে সব্যসাচীর মনটা খুঁতখুঁত করতে থাকে। তাই যেদিন কাগজ আসতে দেরী
হয়, কোন কাজেই মন বসেনা। আজও সেই। প্রায় আটটা বাজতে চলল, এখন খবরের
কাগজের পাত্তা নেই। ব্রেফফাস্ট টেবিলে বসে মোবাইল
ফোনে টাইমস অফ ইন্ডিয়া পড়েই কাজ চালাচ্ছিলেন আর বারবার বাইরের দিকে তাকাচ্ছিলেন, কাগজের
ছোকরাটা এল কিনা। এলে কি বলে বকবেন, সেটাও মনেমনে
রিহার্স করে রাখছিলেন কফির কাপে চুমুক মারতে মারতে।
হঠাৎ ফোনটা বেজে ওঠাতে ই-কাগজ পড়া
আর রিহার্সাল দুটোতেই ব্যাঘাত ঘটল। মোবাইলটা কানে লাগিয়ে “হ্যালো”
বলতেই ওপাশ থেকে একটা পরিচিত গলা শুনতে পেলেন।
-“সব্যসাচী, আমি শুভ বলছি রে। শুভ ব্যানার্জী।”
-“কি ব্যাপার, ডি জি সাহেব? এত সকাল সকাল?”
-“তোর একটু সাহায্য চাই।”
-“আমার সাহায্য? কি ব্যাপার?” একহাতে কফিকাপ নিয়ে কানে মোবাইল ধরে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন সব্যসাচী মজুমদার।
-“একটা বছর কুড়ির মেয়ে, অ্যাংলো। কাল রাতে তাকে মৃত অবস্থায়
পাওয়া গেছে। উপর মহল থেকে চাপ এসেছে
উইদিন আ উইক কেসটা সল্ভ করার। পুলিশের যা লোক, এক সপ্তাহ
কেন, এক বছরেও কিছু হবেনা। তুই যদি একটু…”
-“সক্কাল সক্কাল এইসব! এখন কাগজ পড়া হয়নি।” বলতে বলতে
কাগজের ছেলেটি কাগজটি রেলিঙের ফাঁক দিয়ে গলিয়ে দিয়ে হাওয়া। কানে ফোন থাকায় কিছু বলতেই
পারলেন না সব্যসাচী। “তা আমি কি করব বল?”
-“আমি লোকাল থানায় সব জানিয়ে দিচ্ছি। ঘটনাটা ঘটেছে তোদের ম্যাকমোহনপুরেই।”
-“সে কি! মেয়েটা কে?”
-“সুজান ম্যাকমোহন।”
-“সুজান!! কি বলছিস এই সক্কাল বেলায়!
আমি তো খুব ভালো করে চিনি। থানায় একটা রেফেরান্স দিয়ে
দে। আমি যাচ্ছি আধঘন্টার মধ্যে।”
-“কি যে বলে…”
-“পরে বলবি, আপাতত থানায় বলে রাখ।” বলে ফোনটা
কেটে দেন সব্যসাচী।
ডিজি শুভ ব্যানার্জী সব্যসাচী মজুমদারের কলেজের বন্ধু। দুজনেই প্রেসিডেন্সি কলেজ
থেকে একসাথে পাস করেন। তারপর সব্যসাচী আই এফ
এস আর শুভ আই পি এস। পঞ্চাশ বছর বয়েসে এসে সব্যসাচীর মনেহয় এসব চাকরি করে কি হবে!
তাই সব ছেড়ে দিয়ে অকৃতদার সব্যসাচী এই ম্যাকমোহনপুরে এসে একটা বাড়ি করে রয়ে গেছেন।
জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে পাখি দেখেই অধিকাংশ সময় কাটে। আর বাকি সময় মানুষের মনের খোঁজে।
ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটা কেসে পুলিশকে সাহায্য করে বেশ বিখ্যাত। আর সেই কারণেই সকাল
বেলা কলেজের বন্ধুর কাছ থেকে ফোন।
থানায় পৌঁছাতেই ওসি জয়ন্ত বসাক খুব আদর আপ্যায়ণ করে
নিজের ঘরে নিয়ে বসালেন। প্রথমত সব্যসাচী এই অঞ্চলের একজন নামকরা লোক, দ্বিতীয়ত
ডিজি সাহেবের রেফেরেন্স।
-“বলুন স্যর, চা না কফি?”
-“কিছুনা। ঠিক কি হয়েছে বলুন কেসটা। গুছিয়ে। এইটুকু একটা মেয়ে…”
-“হ্যাঁ, স্যর। কি আর বলব। এতদিন ধরে পুলিশে আছি, কত খুন
জখম দেখলাম, কিন্তু এরকম ফুলের মত সুন্দর একটা মেয়েকে…
আবার খুন করে একটা গোলাপফুল রেখে গেছে।”
-“খুন, আপনি শিওর তো?”
-“মানে?”
-“মানে সুইসাইড নয় তো?” সব্যসাচী একটা চুরুট
ধরান।
-“একটা মেয়ে বন্ধুর বাড়ির পার্টি থেকে ফিরছে। সে কেন… তারওপর
গলায় যেভাবে দাগ, তাতে…”
-“গলায় দড়ি?”
-“দেখে তো মনে হচ্ছে দড়ি জাতীয় কিছু, কিন্তু
সেটা কোথাও পাওয়া যায়নি। আমাদের ডাক্তার বললেন দড়ি
নয়, কারণ দড়ি হলে একটা মোটা দাগ পড়ত। কিন্তু এখানে অনেক গুলো
সুক্ষ দাগ, মানে ঠিক অনেক গুলো সরু সরু সুতো একসাথে করে নিলে যেরকম হয়,
সেরকম।”
-“ইন্টারেস্টিং…”
-“সুইসাইড হলে তো সেই জিনিসটাও ওখানেই পাওয়া যেত, তাই না?”
-“ঠিক।“
-“সেইজন্যই...”
-“ঘটনাটা গোড়া থেকে বলুন শুনি।”
জয়ন্ত বসাক ঘটনাটা জোহানদের কাছ থেকে যেরকম শুনেছিলেন
সেটাই বললেন সব্যসাচীকে। সব্যসাচী চোখ বুজে চুরুট মুখে সবটা মন দিয়ে শুনে
বললেন,”এদের সবার জেরা হয়েছে?”
-“হ্যাঁ। রুটিন জেরা তো হয়েইছে। এবার আপনি চাইলে আর
একবার...”
-“চাই তো বটেই, তবে এখুনি না। আপনি আমাকে কাল যারা
যারা ওখানে ছিল, তাদের নাম ফোন নাম্বার আর ঠিকানাটা একটা কাগজে লিখে দিন।”
-“নিশ্চয়ই স্যর।” বলে ইন্সপেক্টর বসাক একটা কাগজে
সবার নাম ধাম লিখে দিলেন ওনার নিজের খাতা দেখে। সব্যসাচী কাগজটা নিয়ে মন দিয়ে
খানিক্ষণ দেখে বললেন,”এরা সবাই কাল পার্টিতে ছিল?”
-“আজ্ঞে, হ্যাঁ স্যর। এরা সবাই মেয়েটির কলেজের
বন্ধু।”
-“বেশ। এবার আপনি বলুন, এই কেস সম্পর্কে আপনার কি
অ্যানালিসিস?”
-“আজ্ঞে, মানে এখনও পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট আসেনি। তার
আগে...”
-“মুশকিলটা কি জানেন? এই আধুনিক ডাক্তার আর পুলিশরা
রিপোর্ট আসার আগে অবধি কিছুই করতে পারেনা। ভগবান আপনাদের সহজাত ইনটুইশন কি করতে
দিয়েছেন, কে জানে?”
-“না, মানে সেরকম ভাবে তো কিছু বোঝা যাচ্ছেনা। তবে,
কোন চোর-ডাকাত হলে তো একটা ধস্তাধস্তির চিহ্ন থাকত, তাও নেই। সেকারণে খুব কনফিউজড
হয়ে গেছি, স্যর।”
-“ঠিক আছে। দেখছি। তবে আমার দুটো জিনিস চাই। প্রথমত
একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট। এই বয়েসে দৌড়দৌড়ি পোষায় না।”
-“ওকে, স্যর, আমার সাব-ইনস্পেক্টর রূপককে বলে দিচ্ছি।
ও আপনাকে যাবতীয় হেল্প করবে। খুব ইন্টেলিজেন্ট ছেলে।”
-“বেশ, দ্বিতীয়ত, আমি সুজানদের বাড়ি যেতে চাই।”
-“নিশ্চয়ই। আপনি নিজের মত জেরা করুন।”
-“জেরার জন্য নয়, জয়ন্ত। সমবেদনা জানাতে। ওই টুকু
একটা মেয়ে...”
-“তা ঠিক। আসলে পুলিশে থেকে থেকে এই মানবিকতা গুলো
উবে যাচ্ছে স্যর। কি করি বলুন তো?”
-“বই পড়।” সব্যসাচী চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েন। বলেন,”একবার
ঘটনাস্থলটা দেখা যায়?”
-“নিশ্চয়ই। চলুন।”
পুলিশের গাড়ি করে ঘটনাস্থলে পৌঁছে সব্যসাচী দেখলেন
উৎসাহী লোকজনের ভীড়, দুজন পুলিশ ঢোকার মুখে পাহারা দিচ্ছে। সব্যসাচীরা ভিতরে গিয়ে
দোতলায় উঠে যান।
-“এইখানে পাওয়া গেছিল, স্যর।” জয়ন্ত বসাক জায়গাটা
দেখান। একটা সাদা চক দিয়ে মার্ক করা রয়েছে। সব্যসাচী চারদিকটায় একবার চোখ বুলিয়ে
নেন। এক কোণায় কিছু ইঁট আর বালি জমা করা রয়েছে, আর কয়েকটা বাঁশ। বাইরের দিকের
দেওয়ালে ভাড়া বাঁধা আছে। নিয়মিত কাজ চলছে বোঝাই যাচ্ছে। তবে অন্যান্য ঘরগুলোর
তুলনায় এই জায়গাটা পরিষ্কার। এখনও ঘর বলা যায়না। কারণ চারটে ইঁট গাঁথা দেওয়াল ছাড়া
আর কিছুই নেই।
“আপনারা থরোলি সার্চ করেছেন?” সব্যসাচী বলেন।
-“হ্যাঁ। করা হয়েছে। কিন্তু সেরকম কিছুই পাওয়া
যায়নি।”
-“কিছু কি পাওয়া গেছে?”
-“ওই গোলাপফুল।”
-“আমি একবার দেখি।” বলে সব্যসাচী হাঁটু গেড়ে বসে
পড়েন। তারপর বেশ অনেকক্ষন মাটিতে প্রায় নাক ঠেকিয়ে এদিক ওদিক দেখেন। পকেট থেকে
একটা ম্যাগনিফায়িং গ্লাস বের করেও মাটিতে কিসব দেখে একটা ছোট্ট কাগজের টুকরো তুলে
নিয়ে পকেটে রাখেন।
জয়ন্ত বসাক বললেন,”কিছু পেলেন?”
সব্যসাচী অন্য কিছু ভাবছিলেন। আনমনা হয়েই বললেন,”আপনি
কোন রাজমিস্ত্রিকে কাজের ফাঁকে বই পড়তে দেখেছেন?”
সুজানদের বাড়িটা পুরোন ইউরোপিয়ান ধাঁচে তৈরী। সামনে
বেশ খানিকটা লন। দেখাশোনা হলেও খুব যে যত্ন হয়না, সেটা দেখলেই বোঝা যায়। সামনের
বাগানের দরজা ঠেলে ঢুকতেই সব্যসাচীর মনটা খুব ভারি হয়ে গেল। হয়ত কালকেই এই বাগানের
পথে হেঁটে গেছে মেয়েটা। আজ আর সে নেই। সত্যি কি অদ্ভুত মানুষের এই জীবন। এরকম
চুড়ান্ত আনসার্টেইন হওয়া সত্ত্বেও সবাই কেমন আজ থেকে পাঁচ বছর পর কি করবে, তার
জন্য প্ল্যান করতে থাকে। এটাই চরম আশ্চর্য। যুধিষ্ঠির ঠিকই বলেছিলেন।
সুজানের বাবা ক্রিস্টোফার ম্যাকমোহানের সাথে
সব্যসাচীর পূর্বপরিচয় ছিল। উনি একসময় এখানকার এম এল এ ছিলেন। এখনও পার্টি করেন।
পরেরবার ভোটে হয়ত আবার প্রার্থী হতে পারেন বলে কথা হচ্ছে। ভদ্রলোকের বয়েস
পঞ্চাশের ঘরে। কিন্তু মেয়ে হারানোর শোকে এক রাতেই যেন বৃদ্ধ হয়ে গেছেন অনেক। একটা
আরাম কেদারাতে গা এলিয়ে চুপ করে চেয়ে আছেন সিলিং-এর দিকে। সব্যসাচীকে ঘরে নিয়ে এল
সুজানের দিদি এলিসা। বসতে বলে ক্রিস্টোফারকে আস্তে আস্তে বলল,”বাবা, সব্যসাচী
আঙ্কেল এসেছেন। দেখা করতে। কথা বল একটু। উঠে বস।”
এলিসার কথা শুনে খুব ধীরে ধীরে চেয়ারে উঠে বসলেন
ক্রিস্টোফার। সব্যসাচী এগিয়ে গিয়ে একটা হাত চেপে ধরে চুপ করে বসে রইলেন পাশে। কিছুক্ষণ
পর আস্তে আস্তে মুখ খুললেন,”ক্রিস্টোফার, এ দুঃখের কোন ভাষা হয়না। আমি সকাল থেকে
শোনার পর থেকেই... আমাকে ডিজি শুভ ফোনে খবরটা দিল। ও চায় যে আমি দোষীকে খুঁজে বের
করি। তুমি কি রাজি আছ?”
সব্যসাচীর কথাটা শুনে প্রায় তিরিশ সেকেন্ড চুপ করে
থাকার পর খুব ধীরে ধীরে ক্রিস্টোফার বললেন,”যা ভালো বোঝ। আমার মেয়েটাকে তো ফেরাতে
পারবেনা।”
-“ঈশ্বরকে বল ও যেন ভালো থাকে। তুমি একা থাক। আমি
এলিসার সাথে কথা বলি একটু।” বলে সব্যসাচী পাশের ঘরের দিকে পা বাড়ায়।
এলিসা আর সুজান দুই বোন। ওরা বাবার কাছেই মানুষ।
সুজানের পাঁচ বছর বয়েসে ওদের মা মারা যান। ক্রিস্টোফারও আর বিয়ে করেননি। একাই মা
বাবা দুজনের অভাব পুরণ করেছেন এতদিন।
এলিসা নিজের ঘরে জানলার দিকে ফিরে চুপচাপ বসেছিল।
সব্যসাচীর পায়ের শব্দে দরজার দিকে ফিরে তাকায়।
-“আসতে পারি?”
-“নিশ্চয়ই। আসুন।”
-“মা, এই শোকের দিনে আমার অন্যায় আবদার করছি। সুজানের ব্যাপারে কিছু কথা
ছিল। আসলে, পুলিশ থেকে আমাকেই ধরল খুনীকে ধরার জন্য। বাবার বয়স হয়েছে, শোকে আরও
ভেঙে পড়েছেন। তুই যদি একটু সাহায্য করিস…”
-“বলুন। বসুন আপনি।” বলে
একটি চেয়ার এগিয়ে দেয়। চেয়ারে বসে সব্যসাচী বলে,”তোর কি মনে হয় আমায় বলত? এরকম কে
করতে পারে?”
একটু চুপ থেকে এলিসা বলল,”সত্যি কথা বলতে আমি এই
প্রশ্নটা অনেকবার ভেবেছি। কিন্তু এখনও উত্তর পাইনি।”
-“বোনের সাথে তোর সম্পর্ক কেমন ছিল? মানে সব কথা
শেয়ার করত?”
এলিসা অন্যকিছু ভেবে বলে উঠল,”হঠাৎ করে সব কেমন পাস্ট
টেন্স হয়ে গেল, বলুন? এই তো কাল অবধি ‘আছে’ ছিল। আজ ‘ছিল’।” আবার একটু থেমে বলে
ওঠে,”হ্যাঁ আবার না। ও খুব চাপা ছিল। খুব মনের কথা কারোর সাথেই কোনদিন শেয়ার করত
না। তবে রোজকার কথা, যেমন ধরুন কলেজে কি হচ্ছে, বন্ধুদের কথা, এসব হত। কিন্তু সেসব
থেকে এই ঘটনা লিঙ্ক করার মত কিছু তো পাচ্ছিনা।”
-“কারো সাথে কোনও সম্পর্ক? মানে তোরা যাকে বয়ফ্রেন্ড
বলিস?”
-“ছিল। ওর সাথে স্কুলেই পড়ত ছেলেটি। ঋতম। কিন্তু ছেলেটির স্বভাব ভালো ছিলনা। পড়াশোনাতেও খুব খারাপ। কলেজে আসার পর ওদের
সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে যায়। বোনই ডিসকন্টিনিউ করে। ছেলেটি অনেক জ্বালিয়েছে। ফোন করে
বাবাকে অবধি থ্রেটনিং করেছে।”
-“পুলিশকে বলেছিস এটা?”
-“বলেছি। কিন্তু, আমার কেমন জানি মনে হচ্ছে, ও এটা
করবেনা।”
-“কেন?”
-“প্রথমত, এটা প্রায় দু’বছর আগের ঘটনা। কিছু করার
হলে, তখনই করত। আর দ্বিতীয়ত, ছেলেটি এখন আর একজনের সাথে এনগেজ্ড। সুতরাং... ”
-“ছেলেটির পুরো নাম আর ঠিকানা জানিস? তাহলে একটা
কাগজে একটু লিখে দিবি?”
এলিসা মাথা নেড়ে টেবিলের ওপর রাখা একটি কাগজে লিখে
দেয়। সব্যসাচী কাগজটা পকেটে রাখেন। বলেন,”এটা কি তোদের দুজনের ঘর?”
এলিসা মাথা নাড়ায় নিঃশব্দে। সব্যসাচী উঠে গিয়ে
বুকশেলফের সামনে দাঁড়ান।
-“সুজান ইংলিশ নিয়ে পড়ত?”
-“হ্যাঁ।”
-“এই সব বই ওর?”
-“ম্যাক্সিমাম। আমি তো কেমিস্ট্রির স্টুডেন্ট। তাই যত
লিটেরাচার দেখছেন, সব ওর।”
-“বাহ্। ভালো পড়াশোনা ছিল তো! একটু দেখব ঘরটা?”
-“দেখুন। আপনার জন্য কফি করে আনি?”
-“না রে। এসব কিছু দরকার নেই। তুই বোস। তোর সাথে কথা
বলতে বলতেই ঘরটা দেখি একটু।”
সব্যসাচী উঠে গিয়ে বুক-শেলফের সামনে দাঁড়ান। মন দিয়ে বই
গুলো লক্ষ্য করতে থাকেন। নিজের মনেই বলেন,”কবিতার বই-ই তো সব। শেলী, ব্রাউনিং থেকে
টেড হিউস। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ-ও আছেন দেখছি। বাহ্।” এলিসার দিকে ফিরে বলেন,”ও
কি কবিতা লিখত নিজে?”
-“মাঝে মধ্যে। আমাকে কয়েকবার পড়িয়েছিল।”
-“সেগুলো আছে কোথায়?”
-“টেবিলের ওপর ওর ওই হলুদ ডায়েরিটা।”
সব্যসাচী গিয়ে ডায়েরিটা হাতে নেন। হিজিবিজি অনেক
স্ক্রিবল্-এ ভর্তি। মাঝে মধ্যে কয়েকটা কবিতা। ইংলিশে। উল্টে-পালটে দেখে বললেন,
“এটা আমি একটু নিয়ে যেতে পারি? আমাকে হয়তো কিছু সাহায্য করতে পারে।”
-“ঠিক আছে। নিন।”
-“থ্যাঙ্কু। ও কোন ডায়েরি মেনটেন করত? মানে যাকে বলে
রোজনামচা?”
-“নাহ। আমি তো দেখিনি সেরকম কিছু। করত না। তাহলে আমি
জানতাম।”
-“এটাই ওর রিসেন্ট ডায়েরি তো?”
-“হ্যাঁ।”
-“পুরোন ডায়েরি? বা এরকম স্ক্রিবলিং-এর খাতা? ধর
দুবছর আগের?”
-“মানে যেসময় ঋতমের সাথে ব্রেক-আপ হয়?”
-“ইন্টেলিজেন্ট। একদম ঠিক।”
-“দাঁড়ান।” বলে এলিসা উঠে এসে একটা ড্রয়ার খুলে তিনটে
খাতা বের করে। “এগুলো সব নানা সময়ের খাতা ওর। আপনি রেখে দিন। কাজে লাগতে পারে হয়তো।”
সব্যসাচী খাতা গুলো নিয়ে উলটে-পালটে দেখে নেন। মধ্যে
মধ্যে কিছু ভাঁজ করা কাগজ রাখা। সব্যসাচী সেগুলোকে না দেখে খাতা চারটে নিয়ে কাঁধের
ব্যাগের রেখে দেন।
-“অনেক সাহায্য করলি রে, মা। আজ চলি। তুইও বোনের
জিনিসপত্র দেখিস। কিছু যদি সিগনিফিকেন্ট মনেহয় আমায় ফোন করিস। আমার নাম্বারটা রেখে
দে। তোর নাম্বারটাও আমায় দে।”
রূপক ছেলেটিকে দেখে বেশ বুদ্ধিমান মনেহয়। জয়ন্ত বসাক
বিকেলবেলাই সাব-ইন্সপেক্টর রূপক মুখার্জিকে সব্যসাচীর বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। সব্যসাচী
বারান্দায় বসেছিলেন হাতে কফির মগ আর সুজানের ডায়েরীগুলো নিয়ে। অনেককিছু লেখা।
বেশীরভাগই কবিতা। মনের কথা কয়েক জায়গায়। একটা
জায়গায় একটা লিমেরিক লেখা দেখে চোখ আটকে গেল সব্যসাচীর। ব্যাপারটা একটু অস্বাভাবিক
লাগল। কারণ, সুজানের বাকি কবিতার যা ধরণ, তার সাথে লিমেরিক
জিনিসটা ঠিক খাপ খায়না। আর লিমেরিকটাও একটু অদ্ভুত। বেশ রোম্যান্টিক।
খবর পেলাম দখিন হাওয়ায় তোমার বাড়ির কাছে
আমার নামে ছোট্ট এক ঠিকানা রাখা আছে
প্রদীপ নিয়ে হাতে
উতলা হৃদয়েতে
রাতের আলোয় তোমায় পেলাম কদম বনের মাঝে।
সব্যসাচী বেশকয়েকবার লিমেরিকটি পড়লেন। খুব রিসেন্টলি লেখা হয়েছে, বোঝা যাচ্ছে। কারণ তার পরে আর মাত্র দশ
পাতা লেখা। তারমধ্যেও আর কোথাও কোন
লিমেরিক লেখা নেই। যদি নতুন ধাঁচে কবিতা লেখা
শুরু করার চেষ্টা করত তাহলে তো আরো দু-তিনটে থাকাই উচিত। নাকি, একটা লিখেই
স্যাটিসফায়েড না হয়ে ছেড়ে দিয়েছিল লেখা? এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়াল গেটের সামনে। রূপক এসে বলল ওকে জয়ন্ত
বসাক পাঠিয়েছেন, এই কেসে সব্যসাচীকে হেল্প করার জন্য। ছেলেটির বয়স বেশী নয়। দেখলে মনে হয় তিরিশের আশেপাশে। প্রায় ছ’ফুট লম্বা। মেদহীন সুন্দর চেহারা।
সব্যসাচী ওকে বসতে বলে জিজ্ঞেস করেন,”কি নেবে?
চা, কফি? নাকি বিয়ার?”
-“কফিই চলুক। অন ডিউটি বিয়ারটা ঠিক হজম
হবেনা, স্যর।”
-“তা ঠিক। জিজ্ঞেস করাটাই বোকামি হয়েছে। বোস। ‘তুমি’
করেই বলছি। আমার চেয়ে অ-নে-ক ছোট তুমি।”
-“নিশ্চয়ই।”
সব্যসাচী ঘরের ভিতরে গিয়ে অনুকুলকে বলে আসেন আর একটা কফি
পাঠানোর কথা। অনুকুল প্রথম প্রথম বাড়িতে
পুলিশ দেখে ভড়কে যেত। এখন সয়ে গেছে।
-“আমি একটু ধুমপান করলে তোমার নিশ্চয়ই অসুবিধা নেই?”
-“না না, ঠিক আছে।”
সব্যসাচী একটা চুরুট ধরান। তারপর একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বলেন,”তোমার কি
অ্যানালিসিস কেসটা নিয়ে? নাকি, তুমিও জয়ন্তর
মত বলবে যে পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট না এলে কিছু বলা যাবেনা!”
-“না, তা নয়। তবে কি জানেন? আমাদের
তো হাত-পা বাঁধা থাকে। মেথডিক্যাল ভাবেই কাজ করতে
হয়। ভুলচুক কিছু থেকে গেলেই প্রেস থেকে মন্ত্রী অবধি সবাই পেছনে পড়ে যাবে। তাই সব দোষ পুলিশকে দিয়ে
লাভ নেই। তবে এই কেসটা নিয়ে আমার কিছু ভিউজ আছে। যেরকম ধরুন, খুনটা কিভাবে
করা হল, সেটা নিয়ে। আপনি নিশ্চয়ই সেই রাতের
ঘটনা শুনেছেন।”
সব্যসাচী মাথা নাড়েন। রূপক বলতে থাকে,”সে রাতে
যারা দুজন পিছু নিয়েছিল। তারা এই ব্যাপারটা করতে
পারে। এসে বাকিটা বানিয়ে বলছে।”
-“মোটিভ?”
-“জানিনা। খুঁজতে হবে। দ্বিতীয়ত, আর একটি
সম্ভাবনা। সেই প্রাক্তন প্রেমিক ঋতম।”
-“কিন্তু সে কি ভাবে জানবে যে… আচ্ছা,
তুমি বলতে চাও এই ছেলেদুটির মধ্যে কেউ ঋতমের ইনফর্মার হয়ে কাজ করেছে। কিন্তু, এতদিন পর
হঠাৎ করে ঋতমই বা বদলা নিতে তৎপর হবে কেন?”
-“এগুলো সবই ওপেন। আমার কাছে কোন জবাব নেই। আমাদের আরো কোন সম্ভাবনা
আছে কিনা খুঁটিয়ে দেখতে হবে।”
-“গুড। তা তুমি কিভাবে এগোতে বলছ? আই মিন
আমাদের প্রথম স্টেপ কি হওয়া উচিত?”
-“আগে সবার সাথে কথা বলা দরকার। পুলিশ একবার বলেছে। কিন্তু আপনি একবার বলুন।”
-“পুলিশের সাথে কি কথা হয়েছে, তার রেকর্ড আছে?”
-“হ্যাঁ, অবশ্যই।”
-“এনেছ?”
-“হ্যাঁ। আপনার জন্যে জেরক্স করে
এনেছি এক কপি।”
-“বাহ্। তুমি তো বেশ কাজের ছেলে
হে।” সব্যসাচী বাচ্চাদের মত তালি দিয়ে বলে ওঠেন। রূপক স্টেপল্ করা কয়েকটা
কাগজ বাড়িয়ে দেয়। সব্যসাচী সেটা হাতে নিয়ে
উলটে পালটে দেখেন। তারপর বলেন,”আজ রাতটা
আমায় একটু সময় দাও। এই কেসের সাথে জড়িত কেউ
যেন বাইরে কোথাও না যায়। এটা এনশিওর কর। কাল সকাল ঠিক নটায় আমায়
পিক আপ কোরো।”
-“কোথায় যাবেন?”
-“এদের সাথে কথা বলা দরকার। তবে কার সাথে কখন কথা বলব
সেটা রাতে ডিসাইড করব।”
-“ওকে, স্যর। চলি তাহলে?”
-“এস।”
রূপক চলে যেতে সব্যসাচী সামনের বাগানে একটু হাঁটতে বেরোলেন। মনটা সাংঘাতিক খারাপ হয়ে
রয়েছে। এখনো তিনি প্রফেশনাল গোয়েন্দা হয়ে উঠতে পারেননি যে এরকম একটা মর্মান্তিক ঘটনার
পরও স্থিতপ্রজ্ঞমুনিপ্রবর হয়ে থাকতে পারবেন। তাই কেসটা সল্ভ করার রোখটা
আরও বেশি পেয়ে বসেছে। কিন্তু এখনও অবধি ক্লু কিছু নেই হাতে। শুধু ওই খাতাগুলো।
রাতের বেলা আবার ওগুলো নিয়ে বসতে হবে।
সকাল ঠিক নটার সময় রূপক গাড়ি নিয়ে হাজির হল। ছেলেটির
পাংচুয়ালিটি দেখে বেশ খুশি হলেন সব্যসাচী। আগেই ব্রেকফাস্ট করে স্নান করে তৈরী
ছিলেন। রূপক আসতেই বেরিয়ে পড়লেন। প্রথমে যেতে চাইলেন জোহানের বাড়ি। যেহেতু ওইদিন
ওর বাড়িতেই পার্টি ছিল। তাই ওকে দিয়েই শুরু করা যাক।
রাতের বেলা সুজানের সবকটা ডায়েরি মন দিয়ে পড়েছেন
সব্যসাচী। ঋতমের সাথে যখন ওর ব্রেক-আপ হয় সেই সময়ের ঘটনাও। ঋতম খুব খারাপ ব্যবহার
করেছে। এমনকি ওকে লাইফ থ্রেটও দিয়েছে, সে কথাও লিখেছে সুজান। তার সাথে ওর নিজের মনের
অনেক কথা। যদি সত্যি-ই একজন ভালোবাসে তাহলে কিকরে এরকম ব্যবহার করতে পারে? পড়লেই
বোঝা যায়, তখন ওর মনের অবস্থা খুব খারাপ ছিল।
গাড়িতে যেতে যেতে রূপকের সাথে টুকটাক কথা বলছিলেন
সব্যসাচী। প্রধানত এই কেসটা নিয়ে। এছাড়াও টুকতাক এটা ওটা নিয়ে। ছেলেটিকে বেশ লাগছিল
সব্যসাচীর। অনেক বিষয়ে অনেক পড়াশোনা আছে। সাহিত্য তো বটেই, পাখি, গাছ-পালা নিয়েও
বেশ উৎসাহী।
যোহানের সাথে কথা বলে সব্যসাচী খুব বেশী কিছু ইনফর্মেশন
পেলেন না। সেরাতে যা যা ঘটেছিল সেটা আবার ব্রিফ করল যোহান। বোঝা গেল পুলিশ যা বলেছে, সেটা যোহানের
কথাই। যোহানের সাথে সুজানের বন্ধুত্ব
ছিল ভালোই। দুই পরিবারের মধ্যেও ভালো
সম্পর্ক থাকার জন্য সুজান আর যোহান দুজনেই ভাই-বোনের মত বড় হয়েছে।
-“তুমি কাউকে সন্দেহ কর, যে এই কাজ করতে পারে?”
সব্যসাচী ডান পাটা বাঁ পায়ের ওপর তুলে প্রশ্ন করেন।
-“নাহ্। ওর মত মেয়ের কোন শত্রু থাকতে
পারে এটাই তো ভাবতে পারছিনা। বিলিভ মি আঙ্কেল, ও এতটাই
ভালো ছিল যে… মানে কি বলব? ওকে সবাই ক্লাশে
নানা নাম দিত, খ্যাপাত। আমি কোনদিন ওকে কারোর সাথে
ঝগড়া করতে দেখিনি।”
-“ওর পার্সোনাল লাইফ সম্পর্কে কতটা জানো? মানে
প্রেম…”
-“খুব বেশি নয়। সেই ঋতমের ব্যাপারটা আমরা
সবাই জানি। ব্যাস্, ওটুকুই। তারপর ও খুব মনমরা থাকত। তবে… সেটা অবশ্য
আমার ভুল হতে পারে।”
-“কি?”
-“ইদানিং, মানে বেশ কিছুদিন ধরে ওকে দেখেছিলাম,
সেই ঋতমের ব্যাপারটা মনে হচ্ছিল কাটিয়ে উঠেছে। আমি জানিনা, আমি ওকে
ছোট থেকে দেখেছি তো, তাই কেন জানিনা মনে হয়েছে যে ও বোধহয় নতুন
করে কারো সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে নিজেকে। দু-একবার জিজ্ঞেস
করেছি। বাট, কিছু বলেনি।”
-“কিছু বলেনি, নাকি বলবেনা বলেছে?”
-“না, বলেছে যে, অ্যাজ
টাইম হিলস্ এভেরিথিং, ও-ও রিকভার করে উঠেছে।”
-“তুমি ছাড়া ওর আর কোন ক্লোজ ফ্রেন্ড। মেয়েদের মধ্যে কেউ?”
-“সুদেষ্ণা, মৈত্রী ওর ভালো বন্ধু। তবে মনে হয়না যে ও কারো
সাথে সব কথা শেয়ার করত।”
-“আচ্ছা, ওদের ফোন নাম্বারগুলো আমায় একটু লিখে
দেবে?” সব্যসাচী নিজের লাল ডায়েরীটা বাড়িয়ে দিলেন। যোহান নিজের মোবাইল থেকে
দেখে ওদের ফোন নাম্বারদুটো লিখে ডায়েরীটা ফেরৎ দেয়।
-“মেনি মেনি থ্যাঙ্কস্। তোমার বাবার সাথে কথা বলা
যায় একবার?”
-“নিশ্চয়ই। দাঁড়ান, বাবাকে
ডেকে দিচ্ছি।”
-“নাহ্। ডাকতে হবেনা। যদি অসুবিধা না থাকে আমি
একা গিয়ে একটু কথা বলতে চাই।”
-“ওহ্, আসুন।” সব্যসাচী
রূপককে বসতে বলে ভিতরে চলে যায় যোহানের সাথে।
রূপক যে ব্যাপারটাতে খুশি হয়নি ওর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। সব্যসাচী সেটা লক্ষ্য করেই
বললেন,”কি ব্যাপার? অখুশি মনে হচ্ছে?”
-“নাহ্। পুলিশকে এভাবে অন্ধকারে
রেখে তদন্ত করাটা কি ঠিক?”
-“অন্ধকার কোথায় হে? রবি ঠাকুর পড়নি?
অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো।”
-“সেই, এত আলো যে অন্ধ হয়ে যাচ্ছি প্রায়।”
-“রাগ করেনা। দেখ, যোহানের
বাবা তোমায় চেনেননা। তাই তোমার সামনে হয়ত সব
কথা খুলে বলতে সঙ্কোচ করবেন, মানে যেগুলো হয়ত আমায় একা দেখলে বলবেন,
সেগুলো তোমার সামনে নাও বলতে পারেন।”
-“প্রথম কথা হল, যে উনি তো কোনভাবেই এই কেসের
সাথে যুক্ত নন, তা ছাড়া, যদি কিছু জানেনও
সেটা পুলিশকে জানানো তাঁর প্রাইমারি কর্তব্য।”
-“উফ্। এত বুকিশ হয়ো না। সাইকোলজি ভাব। উনি এমন অনেক কিছু হয়ত জানেন
যেগুল এই কেসের সাথে যুক্ত নয়। কিন্তু কেসের ব্যাকগ্রাউন্ড
তৈরী করার জন্য খুব প্রয়োজনীয়। আর সেটা আমি হয়তো বুঝব, বা তোমায়
বললে তুমি বুঝবে, কিন্তু উনি সেটা না বুঝে তোমার সামনে হয়ত ডিসক্লোজ্
নাও করতে পারেন।”
-“তাহলে এবার তো আমায় বলুন অ্যাট লিস্ট। উনি কি বললেন?”
-“বাদুড় বলে ওরে ও ভাই সজারু, আজকে রাতে দেখবি
একটা মজারু।”
-“সে আবার কি?”
-“ধৈর্যং রহু। যথা সময়ে সব জানতে পারবে।” বলে সব্যসাচী
জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে গুনগুন করে একটা সুর ভাঁজতে থাকলেন। যোহানের বাবার ঘরে যখন ঢুকেছিলেন, ওদের পুরোন
রেকর্ড প্লেয়ারে বাখের এই সিম্ফনিটা বাজছিল।
সুদেষ্ণা আর
মৈত্রী দুজনের সাথেই দেখা হল সব্যসাচীর। দুজনেই বাকিদের থেকে
অতিরিক্ত সেরকম কিছু বলতে পারল না। তবে দুজনেই যোহানের কথার সাথে একমত হল যে সুজান
ঋতমের ব্যাপারটা থেকে ইদানিং বেশ রিকভার করে উঠেছিল। তবে সেটা কারোর সাথে নতুন
সম্পর্কের জন্য কিনা সেটা তারা শিওর নয়।
সুদেষ্ণার বাড়ি থেকে বেরিয়ে সব্যসাচী ঠিক করলেন ঋতমের
বাড়ি যাবেন। ঘড়িতে বারোটা বাজে প্রায়। সাম্য আর প্রত্যুষকে ফোন করা হয়েছিল। কিন্তু
ওরা বাড়ির বাইরে থাকায় বিকেলের দিকে দেখা করবে বলেছে। ঋতমকে ফোনে পাওয়া যায়নি। তাই
সব্যসাচী ঠিক করলেন ওর বাড়ি গিয়েই সরাসরি দেখা করবেন।
ঋতমদের বাড়িটা প্রায় ছোটখাটো প্রাসাদ একটা। ওর বাবা এখানকার
একটি রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত। একসময় স্থানীয় কাউন্সিলর ছিলেন। এখন এম এল এ হওয়ার
লড়াইয়ে আছেন। বাড়ির দরজায় বেল বাজাতেই একজন কাজের লোক বেরিয়ে এল।
-“ঋতম আছে? বলুন পুলিশ থেকে এসছি।”
-“না, ঋতমদাদা তো নেই।”
-“বাড়িতে যে আছেন, ডাকুন।”
-“একটু দাঁড়ান।” বলে সে ভিতরে চলে যায়। মিনিট দুয়েক
পর একজন ভদ্রমহিলা এসে দরজা ফাঁক করেন।
-“কি ব্যাপার?”
-“নমস্কার। আপনি কি ঋতমের মা?”
-“হ্যাঁ, ঋতম বাড়ি নেই। কি ব্যাপার?”
-“আমরা একটি কেসের ব্যাপারে ঋতমের সাথে কথা বলতে
চাই।”
-“কি কেস?”
-“কাল রাতে এখানে একটি মেয়ে খুন হয়েছে, সেই ব্যাপারে!”
-“মানে? ঋতম ওইসব খুন খারাপিতে কি করবে?”
-“মেয়েটির সাথে ঋতমের আগে সম্পর্ক ছিল। তাই আমরা
ঋতমের সাথে কথা বলতে চাই।”
-“এসব মিথ্যে কথা। ঋতমের সাথে কারো কোন সম্পর্ক
ছিলনা। ঋতম বাড়ি নেই। আর আপনাদের সাথে কোন কথা বলবেনা। ওর বাবার সাথে কথা বলবেন।”
বলে ধরাম্ করে দরজা বন্ধ করে দেন। সব্যসাচী বোকার মত মুখ করে রূপকের দিকে তাকান।
রূপক মিটিমিটি হাসছিল।
-“পলিটিক্যাল লিডার। তাও আবার রুলিং পার্টি। এবার উপর
থেকে চাপ আসল বলে।” রূপক গাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলে।
-“যদি নির্দোষই হয়, তাহলে কথা বলতে কি অসুবিধা?”
সব্যসাচীও পা বাড়ান গাড়ির দিকে।
-“সেটাই তো চিন্তার ব্যাপার, স্যর! থানায় তুলে নিয়ে
গিয়ে পিটিয়ে কথা বের করা যেত যদি ওর ওই বাপ না থাকত মাথার ওপর।” বোঝা গেল রূপক বেশ
রেগে গেছে ভদ্রমহিলার ব্যবহারে।
-“দাঁড়াও, মাথা ঠান্ডা রাখো। ভাবতে হবে। এইসব টপকেও
ওকে ধরা যায় কিনা।” সব্যসাচী গাড়িতে বসে বলেন।
-“এখন কোথায়? লাঞ্চ করে নেওয়া যাক্, নাকি?”
-“চল। তুমি আমায় আমার বাড়িতে ড্রপ করে দাও। দিয়ে ঠিক
তিনটেয় ফিরে এস। বাকি দুজনের সাথে কথা বলে নিতে হবে। তাহলে আশা করি আজকের মত কাজ
শেষ।”
লাঞ্চের পর সব্যসাচী নিজের ঘরে বসে সুজানের খাতাগুলো
আবার উলটে পালটে দেখছিলেন। ঘড়িতে সবে দুটো কুড়ি। এখনো চল্লিশ মিনিট বাকি বেরনোর।
আজ এখনো অবধি যাদের সাথে কথা হল, সেগুলো থেকে ইম্পর্ট্যান্ট পয়েন্টগুলো একটা
ডায়েরীতে আগেই লিখে ফেলেছেন। সুজানের খাতাটা ওল্টাতে ওল্টাতে সেইসব একসাথেই চিন্তা
করছিলেন। হঠাৎ সদর দরজায় বেল বাজাতে চিন্তার সূত্র ছিঁড়ে গেল। অনুকুল বোধহয় ছাদের
ঘরে ঘুম দিচ্ছে। সব্যসাচী নিজেই উঠে যান খোলার জন্য।
দরজা খুলতেই একটি চোয়াড়ে গোছের ছেলে ঘরে ঢুকে আসে। বাইরে
আরো দুজন দুটো বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে। ছেলেটি ঘরে ঢুকেই বেশ কিছু গালি-গালাজ করে বলতে
থাকে,”বয়স হয়েছে, টিকটিকিগিরি করার স্বভাব গেল না? আমার পিছনে পড়োনা কাকা। বেশি
ওস্তাদি মারলে আমার বাবাকেও লাগবেনা, আমি ওই ঠ্যাঙদুটো ভেঙে দেব। বলে রাখলাম।”
সব্যসাচী কিছু বলার আগেই বেড়িয়ে বাইকে বসে অদৃশ্য হয়ে
যায়। বুঝতে একটুও কষ্ট হয়না যে এই হল ঋতম। থ্রেট শুনেও খুব একটা হেলদোল হলনা সব্যসাচীর। নির্লিপ্ত ভাবে এসে আবার ডায়েরীগুলো খুলে বসলেন। মনের মধ্যে অনেকগুলো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। নিজের ডায়েরীতে সেগুলো লিখতে শুরু করলেন।
১। খুন হল কেন?
২। যে খুন করবে, সে কি জানত সুজান ওই সময় ওখানে আসবে?
৩। জানত যদি কি করে জানল?
৪। যে ছেলেদুটি পিছু নিয়েছিল, ওদের সাথে যোগসাজশ ছিল কি? নাকি
সুজান নিজেই বলেছিল?
৫। হত্যা করার অস্ত্র কি? এবং কোথায়?
৬। হত্যার পর বুকের ওপর গোলাপফুলই বা রাখল কেন?
৭। ঋতম কি জড়িত? ওর অ্যালিবাই? (রূপককে বলতে হবে খোঁজ
নিতে)
৮। সুজানের খাতা পড়ে কিছু একটা খটকা লাগছে – কিন্তু
সেটা কি?
৯। রাজমিস্ত্রি কি বই পড়ে?
এত অবধি লিখতে লিখতেই বাইরে গাড়ির আওয়াজ হল। রূপক এসে
গেছে। ঘড়িতে ঠিক তিনটে বাজে। সময় জ্ঞান আছে বলতে হবে।
সাম্য ছেলেটিকে দেখে মনেহয়না যে খারাপ কিছু করতে
পারে। দুষ্টু সবাই কমবেশি হয়। বিশেষ করে এই বয়েসে। কিন্তু বদমাইশ আর দুষ্টুর মধ্যে
পার্থক্য আছে। সাম্য হল দুষ্টু। কিন্তু তাকে দোষী হিসাবে ভাবাই যায়না। সব্যসাচী
নিজের ফিলিংসকে সরিয়ে রাখলেন। সাম্যর বাড়িতে সবাই বেশ ভয় পেয়েছে বোঝা যাচ্ছে। ওর
মা তো প্রায় কেঁদেই ফেলবেন মনে হচ্ছে। বাবাও গম্ভীর খুব। ছেলের সাথে তো কথাই বলতে
দেবেননা প্রথমে। তারপর সব্যসাচী ওনাকে বোঝালেন যে ওঁর ছেলেকে সন্দেহ করা হচ্ছেনা,
কিন্তু দোষীকে ধরার জন্যে ওর সাহায্য চাই। তখন কিছুটা নিমরাজী হয়ে দিলেন।
সাম্য সেদিন রাতে যা ঘটেছিল সেটা আবার বলল। সব্যসাচী
সবার কাছ থেকেই রাতের ঘটনাটা শুনছেন, কোন অসঙ্গতি আছে কি না শুনতে চাইছেন। এখনও
অবধি কোন অসঙ্গতি ধরা পরেনি। সাম্যর কথার সাথেও বাকিদের কথা মিলে গেল।
-“তোমরা একটা বাইকের আওয়াজ শুনেছিলে বললে। দেখেছিলে
বাইকটাকে?”
-“না। আমরা শুধু আওয়াজ শুনেছিলাম। রাতের বেলা, এইসময়,
শীতকালে তো অনেক দূরের থেকেও আওয়াজ পাওয়া যায়।”
-“হেডলাইট?”
-“নাহ্। তাও দেখিনি। আসলে আওয়াজ শুনেই তো আমরা ওই
একটা বাড়ির আড়ালে লুকিয়ে পড়েছিলাম। তাই কিছু দেখতে পাইনি।”
-“আচ্ছা। তা যেখানে লুকিয়েছিলে, সেখান থেকে রাস্তা
দেখতে পাচ্ছিলে?”
-“হ্যাঁ। বাড়ির সামনের রাস্তাটা দেখা যাচ্ছিল।”
-“সেখান দিয়ে বাইকটাকে যেতেও দেখনি। তাই তো?”
-“না, দেখিনি।”
-“ওখানে তো কোন মোড় নেই যে ওটা অন্য রাস্তায় যাবে।”
-“এটা হতে পারে যে এসে আবার ফিরে গেছে।” রূপক বলে।
-“হুম। ভাবাচ্ছে ব্যাপারটা। এমনও তো হতে পারে যে বাইক
আরোহী এসেছিল সুজানের সাথেই দেখা করতে। এবং দুজনে ওই বাড়িতে ঢোকে, তারপর খুন করে।
কিন্তু বাইক আরোহী যদি খুনীই হয়, তাহলে সুজান ওর সাথে কেন যাবে? আর যদি জোর করেই
নিয়ে যায়, তাহলে সাম্যরা কিছুটা হলেও চিৎকার শুনতে পেত, বা কোন আওয়াজ পেত। কিন্তু
সেসব তো কিছু শোননি। তাই না?”
-“না, স্যর।” সাম্য বলে।
-“সেটাই হচ্ছে কথা। আচ্ছা, রূপক ওর মোবাইলের কল বা
মেসেজ রেকর্ড থেকেও কিছু পাওয়া যায়নি, তাই না?”
-“সেটা আপনি দুদিন পর, আজ জিজ্ঞেস করছেন?” রূপক একটু
অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করে।
-“হ্যাঁ। কারণ, ওখান থেকে কিছু পাওয়া গেলে তোমরাই
কেসটা সল্ভ করতে আমায় ডাকতে হত না।”
-“তা বটে। নাহ্। সব চাঁছাপোছা। কিচ্ছু ছিলনা। একজন
অনেক প্ল্যান করে যেন সমস্ত কিছু ডিলিট করেছে মোবাইল থেকে।”
-“তারমানে সে সুজানের মোবাইল স্ট্রাকচারটাও জানত।”
-“অথবা মোবাইলটা রিসেট করেছিল। সিমপ্লি।” রূপক ওর
ভাবনাটাতে দিশা পায়।
সাম্যদের বাড়ি থেকে বেরোতেই বেশ জোর বৃষ্টি নামল।
সকাল থেকেই বেশ মেঘ করেছিল। এখন সেটা ঝমঝমিয়ে নেমে গেল। খানিকটা যাওয়ার পর
ড্রাইভার বলল এত বৃষ্টিতে চালানো যাচ্ছেনা।
-“আমার কোয়ার্টার কাছেই। যাবেন? কফি খাবেন চলুন।”
রূপক বলে।
-“অগত্যা। চল। ঠান্ডায় কফিটা ভালোই জমবে।” সব্যসাচী
রাজি হয়ে যান।
রূপকের কোয়ার্টারে ঢুকে একটু আরাম বোধ হল সব্যসাচীর। “আপনি
একটু বসুন, আমি কফি বসাই।” বলে কিচেনের দিকে চলে যায় রূপক।
সব্যসাচী ঘুরে ঘুরে রূপকের ঘরটা দেখছিলেন এই ফাঁকে।
আসবাব কিছু নেই তেমন। ব্যাচেলরস্ রুম। একটা টেবিল। তারওপরে কিছু বইপত্র ছড়ানো। বেশীরভাগই
সাহিত্য। ব্রাউনিং, শেলী, অচিন্ত্য সেনগুপ্ত, লীলা মজুমদার – নানারকম। একদিকে একটা
দেওয়াল আলমারি। একটা পাল্লা খোলা। নিচের তাক থেকে কিছু বই আর উপরে জামাকাপড় উঁকি
মারছে। সব্যসাচী টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ান। একটা মধুসূদন রচনাবলী দেখে হাতে তুলে
নেন। পাতা ওল্টাতেই রূপক এসে ঢোকে। ধূমায়িত কফি সহ।
সব্যসাচী একটা কাপ তুলে নিয়ে চেয়ারে বসেন। “তুমি
মধুসূদন পড় নাকি?” সব্যসাচী প্রশ্নটা করে গরম কফিতে একটা চুমুক দেন।
-“হ্যাঁ, চেষ্টা করি।”
-“পড়ার অভ্যাস খুব ভালো। এখন তো মোবাইল, ফেসবুকের
যুগে বইপড়ার অভ্যাস কমেই যাচ্ছে। একদিন দেখবে বই কি জিনিস সবাই ভুলে গেছে।”
-“ফারেনহেইট ফোর ফিফটি ওয়ান?”
-“হ্যাঁ, কাইন্ড অফ। শুধু ওখানে রাষ্ট্র করেছিল,
এখানে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় করবে।”
-“তা ঠিক।” বলে রূপক চেয়ার টেনে নিয়ে বসে।
-“যাই হোক, কেসটা নিয়ে কি ভাবছ?”
-“দেখুন এটা যদি একটা জমাটি গোয়েন্দা গল্প হত, তাহলে অবশ্যই একজন বোকা পুলিশ হিসাবে
ঋতমকে তুলে নিয়ে যেতাম থানায়।” সব্যসাচীর মুখে একটু হাসি খেলে যায়। রূপক বলতে থাকে,”কিন্তু
আমি এখনই কোন কনক্লুশনে আসতে চাইনা। মে বি ঋতমই খুন করেছে, কিন্তু মোটিভ নিয়ে একটু
ডাউট আছে। দুজনের বাবা দুটো বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এম এল এ পদপ্রার্থী। সেটা নিয়ে এরকম
নোংরা খেলা খেলতেই পারে। কিন্তু প্রমাণ কই?”
সব্যসাচী মন দিয়ে সবটা শুনে বলেন,”সেদিন রাতে সাম্যরা যে বাইকের আওয়াজ শুনেছিল,
সেটা রূপকের হতে পারে। এমন কি হতে পারে যে, একা রাস্তায় সুজান কে দেখে রূপক ওকে ধরে
নিয়ে যায়। খারাপ কিছু করতে গেছিল, কিন্তু সুজান বাধা দেওয়ায় হয়ত হত্যা করে।”
রূপক প্রবাল মাথা নেড়ে বলে,”এটা কি বলছেন, স্যর? তাহলে ওই ছেলে দুটো একবারও কোনো
আওয়াজ শুনবে না? অন্তত একটা চিৎকার তো শোনাই উচিৎ।”
সব্যসাচী মাথা নেড়ে বলেন,”ঠিক বলেছ। যদি ওরা ক্লিন হয়।”
-“মানে?”
-“মানে হয়ত ওরাই বাইক ওয়ালাকে ডেকে আনে। এখন পুলিশের বিশ্বাস যোগ্যতা অর্জনের জন্য
আধা সত্যি বলছে।”
-“সেটা যুক্তিপূর্ণ হলেও আমার কেন জানি মনে হয় ছেলেদুটো খারাপ
নয়।”
-“দেখ ভাই, সব মনে হওয়া দিয়ে কাজ চলেনা। আর কাউকে
ক্লিন বা কাউকে দোষী ধরে নিয়ে যুক্তি সাজালে ভুল থেকে যায়। যুক্তি সাজিয়ে এই
সিদ্ধান্তে আসা উচিৎ।”
রূপক মাথা নেড়ে, “তা ঠিক” বলে চুপ করে যায়। দুজনে
কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর সব্যসাচী বলেন,”আচ্ছা, ওই গোলাপফুলের ব্যাপারে কি মত?”
-“কোন গোলাপফুল?”
-“সুজানের বুকের ওপর একটা রাখা ছিল।”
-“ওহ্। জানিনা। হয়ত সুজানের কাছে ছিল। খুনের পর সেটা
কোনভাবে পড়ে যায়। খুনি সেটা বুকের ওপর রেখে চলে যায়।”
-“প্রথম কথা হল, সেটাকে তুলে অত সুন্দর করে সাজিয়ে
রেখে কেন যাবে? দ্বিতীয়ত, কেউ কোনদিন খ্রীষ্টমাস পার্টিতে গোলাপ ফুল নিয়ে যায়?”
-“সেটা ঠিক কথা। তাহলে কি বলতে চান, খুনির সাথে
সুজানের কোন সম্পর্ক...”
-“থাকতে পারে। আচ্ছা, এখানে ফুলের দোকান কি অনেক
আছে?”
-“বাজারের দিকে আছে কিছু।” একটু থেমে আবার বলে,”আপনি
কি ভাবছেন, গিয়ে খোঁজ নেবেন যে গোলাপ ফুল কিনেছিল কিনা, সেদিন কেউ?”
-“ভাবছিলাম।”
-“দেখা যেতে পারে। কিন্তু কোন ফল পাওয়ার সম্ভাবনা খুব
কম। দু-তিনদিন আগে কে একজন একটা গোলাপফুল কিনেছে, সেটা মনে করে রেখে দেবেনা। আর
গোলাপফুল নাও কিনতে পারে, কে বলতে পারে, তার বাড়িতে গাছ থাকতে পারে। নয় কি?”
-“তা ঠিক।”
-“তবে একবার গিয়ে দেখা যেতে পারে। বৃষ্টিটা থামলে
চলুন একবার।”
“হুম্” বলে সব্যসাচী চুপ মেরে যান। রূপক একটু পরে
বলে,”কি ব্যাপার? আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে, আপনি সব হাল ছেড়ে দিচ্ছেন।”
-“তা যা বলেছ! এরকম কেস পাইনি কখনো। কোন ক্লু-ই
পাচ্ছিনা। সত্যি নেই, নাকি দেখতে পাচ্ছিনা, কি জানি?”
-“ফ্যাক্টস যা যা আছে, তা থেকেই ভাবতে হবে। কেউ তো আর
খুনীর নাম লিখে দিয়ে যাবেনা।”
সব্যসাচী কফি শেষ করে কাপটা টেবিলের ওপর রেখে আবার
মধুসূদন রচনাবলী তুলে নেন।
রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর নোটস আর সুজানের ডায়েরী গুলো
নিয়ে সব্যসাচী টেবিলে বসতেই ফোনটা বেজে ওঠে। এলিসা।
-“হ্যাঁ রে, মা, বল।”
-“আঙ্কেল, আপনাকে ডিস্টার্ব করলাম না তো?”
-“একদম না। বল্।”
-“আসলে হঠাৎ একটা কথা মাথায় এল। বোন সেদিন মানে
খ্রীষ্টমাসের দিন রাতে যোহানদের বাড়ি যাওয়ার সময় হাতে একটা বই নিয়ে বেরিয়েছিল। এটা
ওর নতুন কিছু নয়, কিন্তু বইটা কি পুলিশ পেয়েছে?”
-“না তো। আমায় জয়ন্ত বসাক, মানে ইন্সপেক্টর বলল শুধু
গোলাপফুল আর সুজানের মোবাইল ছাড়া আর কিছু ছিল না।”
-“ওহ্। তাহলে কি ওর বন্ধুদের কাউকে দেওয়ার জন্য...”
-“দাঁড়া আমি ওর বন্ধুদের ফোন করে জিজ্ঞেস করে তোকে
জানাচ্ছি।”
-“ওকে, আঙ্কেল, গুড নাইট।”
-“গুড নাইট।”
খানিকক্ষণ চুপচাপ বসে ভাবলেন সব্যসাচী। তারপর সুজানের
ডায়েরীটা হাতে নিয়ে আনমনে পাতা ওল্টাতে লাগলেন। হঠাৎ একজায়গায় এসে চোখ আটকে গেল।
সব্যসাচীর মাথার মধ্যেকার অন্ধকার যেন এক ধাক্কায় সরে গিয়ে কিছুটা আলো দেখা দিল।
চেয়ার ছেড়ে প্রায় লাফিয়ে উঠে ফোন নিয়ে রূপককে ফোন করলেন।
-“হ্যালো রূপক। এই ম্যাকমোহনপুরে অবাঙালী কিন্তু
ভারতীয় কোন ফ্যামিলি আছে?”
-“থাকতেই পারে। হঠাৎ?”
-“একটা ক্লু পেয়েছিলাম মনে হচ্ছে। তুমি কি বাড়ি, না
থানায়?”
-“থানায়।”
-“তাহলে আমায় একটু খোঁজ নিয়ে জানাও, জলদি।”
-“ওকে, বাট ক্লুটা কি?”
-“আগে জানাও, দেন শিওর হয়ে বলব।”
-“আচ্ছা। আপনাকে আমি কল ব্যাক করছি।”
ফোনটা রেখে ঘরের মধ্যে পায়চারী করতে থাকেন সব্যসাচী।
যা ভাবছেন, সেটা কি ঠিক? নাকি কোথাও ভুল হচ্ছে? এরকম সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই রূপকের
ফোন আসে।
-“স্যর, এখানে অবাঙালী পরিবার একটিই আছে। জুয়েল
শর্মা। বাজারে দোকান আছে।”
-“ওহ্,” সব্যসাচী একটু যেন দমে যান, “কাপুর পদবীর
কেউ নেই?”
-“কাপুর? নাহ্। ওই একজনই আছে। কিন্তু আপনার হঠাৎ
‘কাপুর’ দিয়ে কি হবে?”
-“না হে, তাহলে ভুল ইন্টারপ্রেট করেছিলাম। আবার
অন্ধকারে ডুবে গেলাম।” সব্যসাচী ফোনটা রেখে আবার বসে পড়েন। কপালটা সাঙ্ঘাতিক
কুঁচকে আছে। এবার তো মনে হচ্ছে ঋতম কে থানায় তুলে নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে কিছু করা ছাড়া
আর কোন উপায় নেই। খুব বিরক্ত লাগতে শুরু করল নিজের ওপর। তারমধ্যে বাইরের ঘরে
অনুকুল টিভিতে কিছু একটা হিন্দি সিনেমা চালিয়েছে। তার ‘ধাঁই-ধুঁই’ আওয়াজ আসছে।
বিরক্তিটা শেষ সীমা স্পর্শ করতেই মনেহল অনুকুলকে বলবেন টিভি বন্ধ করতে। উঠে বাইরের
ঘরে এসে দেখলেন অনুকুল দিব্যি নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। টিভি নিজের মনে চলে যাচ্ছে।
সিনেমা শেষ, ক্রেডিট উঠছে। রিমোট কন্ট্রোলটা নিয়ে টিভিটা অফ্ করতে গিয়ে স্ক্রীনে
চোখ আটকে গেল। আবার মাথার মধ্যে একটা স্পার্ক।
ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে খানিকক্ষণ বিছানায় চুপচাপ বসে
রইলেন। কাল রাতেই কেসটা প্রায় সল্ভ্ করে ফেলেছেন, শুধু শুভর কাছ থেকে একটা খবর
জানতে চেয়েছেন। সেটা এলেই হয়ে যাবে। বসে বসে সেই কথাই ভাবছিলেন। এরকম অদ্ভুত কেস
তিনি আগে কখনো পাননি। কত রকম মানুষ হয়। আসলে সবাই পাগল, সাইকো। কারো ক্ষেত্রে সেই
পাগলামো গুলো আর একজনের ক্ষতি করে, তখনই তারা সমাজের চোখে অপরাধী হয়ে যায়। কাল
রাতে কলেজের দুজন বন্ধুকে ফোন করেছিলেন। একজন ইংলিশের মৈত্রেয়ী বসু, আর একজন
সাইকোলজির সৌমিত্র সেন। ওদের কথার ওপর ভরসা করেই কেসটাতে ইতি টানলেন। আর একটা খটকা
কাটানোর জন্য শুভকে বলতে হল একটা খবর জোগাড় করে দিতে।
খবরটা শুভ সময় মতই পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। কেসটার ফলাফল
নিয়ে কথা বলার জন্য সবাই মিলে রূপকের কোয়ার্টারে জড় হলেন ঠিক বিকেল ছটায়। সবাই
বলতে সব্যসাচী, রূপক, শুভ আর জয়ন্ত বসাক। সব্যসাচী ফোন করে সবাইকে বলে দিয়েছিলেন
যে অ্যাকশন প্ল্যান বানানোর জন্য এই মিটিংটা দরকার।
এক রাউন্ড কফি পর্ব শেষ হতেই সব্যসাচী ধীরে ধীরে বলতে
শুরু করেন,”এই গল্পের শুরু আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগে। সুজানের বাবা,
ক্রিস্টোফার তখন চা বাগানের মালিক। এক রাত্রে হাতি তাড়াতে গিয়ে বন্দুকের গুলিতে এক
কর্মীর ছোট ছেলেকে আহত করেন। তার দুদিন পরে ছেলেটি মারা যায়। এটা নিয়ে পুলিশ কেস
হতে পারত, কিন্তু হয়নি ক্রিস্টোফারের প্রচুর প্রভাব আর পয়সার জোরে। সেই কর্মচারী
এই অঞ্চল ছেড়ে চলে যান – কোথায় জানা যায়না। এই গল্পটা আমি জানতে পেরেছিলাম যোহানের বাবার
কাছ থেকে। টাকা-পয়সা দিয়ে হয়ত মুখ কিছুদিনের জন্য বন্ধ রাখা
যায়, কিন্তু বুকের ভিতরের আগুন তো বন্ধ হয়না। প্রতিশোধের জ্বালা থেকেই যায়। সেই
কর্মচারীর বড় ছেলে ম্যাকমোহনপুরে ফিরে আসেন ওই ঘটনার প্রায় বাইশ বছর পর।
ক্রিস্টোফারকে খুঁজে বের করতে কষ্ট হয়নি। কারণ তিনি তখন এখানকার এম এল এ।
ক্রিস্টোফারের ছোটমেয়ে সুজান তখন স্কুলের শেষ পর্যায়ে। ঋতমের সাথে ব্রেক-আপ হওয়ার
পর খুব মনমরা। সবার চোখের আড়ালে সুজানের সাথে বন্ধুত্ব শুরু হয় তার। সুজান নিজে খুব
চাপা হওয়ায় একথা কেউই জানতে পারেনা, একমাত্র ওর নিজের ডায়েরী ছাড়া। তাও সহজভাবে নয়
– কৌশলে। সেটা কি কৌশল সেটায় পরে আসছি। এদিকে দুজনের বন্ধুত্ব প্রেমে পরিণত হয়
বছরখানেকের মধ্যে। সুজান নিজের পছন্দগুলো শেয়ার করতে পারত। তাকেই ফেরত দেওয়ার জন্য
একটি বই নিয়ে সুজান সেই খ্রিষ্টমাসে রাতে বেরিয়েছিল এবং দেখা করার জন্য তাড়াতাড়ি
যোহানের বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে। এর মধ্যে সাম্যরা মজা করার জন্য তাকে ফলো করতে শুরু
করে। এবং তাকে ওই বাড়ীটার সামনে গিয়ে হারিয়ে ফেলে। এখানে বলে রাখি যে সেদিন যে
বাইকের আওয়াজ পেয়ে সাম্যরা লুকিয়ে পড়ে, সেই বাইকে আমাদের খুনী ছিলেন না। সেটা কে
ছিল এখনও জানা যায়নি। খুনী তথা সুজানের প্রেমিক ইতোমধ্যেই ওই বাড়িটার মধ্যে হাজির
ছিলেন। কারণ ওটাই ছিল তাদের মিটিং পয়েন্ট। প্রতিশোধের এই মওকা ছাড়তে রাজি ছিলনা
সে। সুজান কবিতা ভালোবাসত। তাকে এক কবিতা অবলম্বনেই হত্যার ছক করে অপরাধী।”
-“কবিতা অবলম্বনে মৃত্যু?” জয়ন্ত বসাক অবাক। সব্যসাচী পকেট থেকে একটি কাগজ বের করে
বলেন,”তাহলে পড়ি, শুনুন...।
…While I debated what to do.
That moment she was mine, mine, fair,
Perfectly pure and good: I found
A thing to do, and all her hair
In one long yellow string I wound
Three times her little throat around,
And strangled her. No pain felt she;
I am quite sure she felt no pain.
As a shut bud that holds a bee,
I warily oped her lids: again
Laughed the blue eyes without a stain.
And I untightened next the tress
About her neck; her cheek once more
Blushed bright beneath my burning kiss:...”
-“রবার্ট ব্রাউনিং। পরফাইরিয়াস্ লাভার।” রূপক ধীরে ধীরে বলে।
-“তুমিও কবিতা পড় নাকি?” জয়ন্ত বসাক বলেন।
-“কবিতা না পড়লে কি এভাবে কাব্যিক খুন করা যায়,
জয়ন্তবাবু?” সব্যসাচী বলে ওঠেন।
-“মানে?” জয়ন্ত বসাক সাংঘাতিক অবাক।
-“মানেটা আমার কাছেও পরিষ্কার ছিলনা। পরিষ্কার হয়
সুজানের কাছ থেকে।”
-“সুজানের কাছ থেকে পরিষ্কার হয়? কি আবোল-তাবোল
বকছেন?” জয়ন্ত বসাকের ধৈর্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে মনে হয়।
-“মানুষ মারা যাওয়ার পরেও তার থেকে যাওয়া জিনিসপত্র তার হয়ে কথা বলে। যেমন
সুজানের ডায়েরী। আমি হঠাৎ একটা লিমেরিক আবিষ্কার করি। লিমেরিক হল পাঁচ লাইনের
কবিতা, প্রথম দু-লাইন আর শেষ লাইনে একই ছন্দ থাকে, আর মাঝের দুলাইন থাকে আলাদা
ছন্দে। এরকম কবিতা বিশেষত মজার কবিতা হয়। যেমন এডোয়ার্ড লিয়ার লিখে গেছেন। সুজানের
অন্যান্য কবিতা অনেক বেশী ভাবগম্ভীর। সেখানে লিমেরিকের জায়গা নেই। তারমধ্যে হঠাৎ একটি
লিমেরিক দেখে আমার খটকা লাগে। কবিতাটি পড়ি, শুনুন -
খবর পেলাম দখিন হাওয়ায় তোমার বাড়ির কাছে
আমার নামে ছোট্ট এক ঠিকানা রাখা আছে
প্রদীপ নিয়ে হাতে
উতলা হৃদয়েতে
রাতের আলোয় তোমায় পেলাম কদম বনের মাঝে।
কবিতাটা পরে কিছু বুঝলেন? নাহ্। আমিও কিছু
বুঝিনি। সেদিন হঠাৎ বৃষ্টিতে আটকে পড়ে এখানে এসে মধুসূদন রচনাবলী ওলটাতে গিয়ে
মানেটা খুঁজে পাই। মধুসূদন তাঁর প্রিয় বন্ধু গৌরকে নিয়ে যে acrostic লিখেছিলেন, এ হল
তাই। কিন্তু তাও বেশ জটিল ভাবে। কবিতাটা বাংলায় লেখা থাকলে কিছুই মানে বেরোয়না।
মানে বেরোয় এটাকে phonetically যদি রোমানে লেখেন।“
-“অ্যাক্রস্টিক কি বস্তু?” জয়ন্ত বসাক প্রশ্ন
করেন।
-“ওহ্, জয়ন্ত বাবু, একটু সাহিত্য ওল্টান।
তাহলে কাজে সুবিধা হয়। Acrostic হল একরকমের কবিতা যার প্রতিটা লাইনের প্রথম
অক্ষরটা নিলে কারোর একজনের নাম পাওয়া যায়। যেমন Through the looking glass-এ Alice কে নিয়ে Carroll লিখেছেন।
A boat, beneath a sunny sky
Lingering
onward dreamily
In
an evening of July -
Children
three that nestle near,
Eager
eye and willing ear,…
যাইহোক্, সুজানের এই কবিতাটিকে যদি রোমান
হরফে লেখেন, তাহলে পাঁচটি লাইনের প্রথম লেটারগুলো হয় যথাক্রমে – K, A, P, U, R – অর্থাৎ Kapur. আমি রূপককে কাল রাতে জিজ্ঞেস করি কাপুর পদবীর কেউ আছে কিনা এখানে।
কিন্তু কেউ নেই। হঠাৎ টিভিতে কোন একটি সিনেমার ক্রেডিট লিস্টে রনবীর কাপুরের নাম
দেখে আমার মাথায় আসে যে কাপুররা বানান লেখেন KAPOOR, KAPUR নয়। সুতরাং আমি এটাকে জাস্ট উলটে দিতেই আমার কাছে সব পরিস্কার হয়ে গেল –
RUPAK.”
জয়ন্তবাবুর চোয়াল প্রায় ঝুলে বুকের কাছে নেমে
এসেছে – এত অবাক হয়ে গেছেন। অনেক কষ্টে সামলে বললেন,”মা-নে?”
-“মানেটা আরো পরিষ্কার হয়ে যাবে যদি আপনাদের
একটা জিনিস দেখাই।” বলে সব্যসাচী টেবিলের ওপর থেকে ব্রাউনিং-এর একটা বই হাতে নেন।
পকেট থেকে একটা ছেঁড়া কাগজের টুকরো বের করে বলেন,”এই কাগজটা মনে আছে, জয়ন্ত বাবু?
সুজান যেখানে খুন হয় সেখান থেকে পেয়েছিলাম। এবার দেখুন ছেঁড়া পাতার টুকরো কেমন
মিলে যাবে এই বইটার একটি ছেঁড়া পাতার সাথে।” সব্যসাচী বইটা খুলে একটি পাতার কোণায়
ওই টুকরোটা লাগিয়ে বলেন,”আমি এলিসার কাছ থেকে জানতে পারি যে ওইদিন সুজান একটি বই
নিয়ে বেরিয়েছিল এবং যোহানের কাছ থেকে জানতে পারি ওইদিন সুজানের কাছে ব্রাউনিং-এর
একটা কবিতার বই দেখেছিল সে। বাকিটা দুই-এ দুই-এ চার। খুনের সময় কোনভাবে বইএর ছেঁড়া
পাতার টুকরো ঘটনাস্থলে পড়ে যায়। রূপক বইটা নিয়ে পালিয়ে আসে, কিন্তু এটা তার চোখ
এড়িয়ে যায়।”
ঘরে পিন পড়লে শব্দ শোনা যাবে। সব্যসাচী টেবিল
থেকে জলের বোতল নিয়ে জল খেতে যায়। রূপক ধীরে ধীরে বলে, “আমি আমার কয়েকটা জিনিস
সাথে নিতে চাই। কয়েকতা বই। যদি পাশের ঘরে গিয়ে নিয়ে আসার অনুমতি দেন। ভয় নেই,
পালাবোনা।”
সব্যসাচী মাথা নেড়ে অনুমতি দেন। রূপক উঠে
যায়। জয়ন্ত বাবু হতভম্ভ ভাবটা কাটিয়ে উঠেছেন খানিকটা। পকেট থেকে হ্যান্ডকাপ বের
করে বলেন,”আমি তো ভাবতেও পারছিনা।” শুভ এতক্ষণ চুপচাপ ছিলেন। এবার বলেন,”আপনি
ভাবতে পারবেননা বলেই তো, কাজটা সব্যসাচীকে দেওয়া হয়েছিল। থ্যাঙ্কস রে।” সব্যসাচী
কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু একটা জোর শব্দ শুনে সকলে চমকে উঠলেন। “বন্দুক,
গুলি” বলেই জয়ন্ত বাবু পাশের ঘরে ছুটে গেলেন, পিছনে বাকিরা। রূপক সার্ভিস রিভলবার
থেকে নিজেকে গুলি করেছে। হাতের মুঠোয় বন্দুক। অন্য হাতে একটা কাগজ।
ফেরার সময় শুভ গাড়ি করে বন্ধুকে পৌঁছে দেবেন
বলেছিলেন। আসতে আসতে বললেন,”সুইসাইড নোটে কি লেখা রে? তোকে উদ্দেশ্য করে...”
সব্যসাচী খুব মনমরা হয়ে জানলা দিয়ে তাকিয়ে
ছিলেন বাইরে। আজকাল এই মৃত্যু জিনিসটা আর সহ্য করতে পারছেননা তিনি। শুভর কথাটা
শুনে বললেন,
-“ কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও?
তারি রথ নিত্যই উধাও
জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন-
চক্রে পিষ্ট আঁধারের বক্ষফাটা তারার ক্রন্দন।
ওগো বন্ধু,
সেই ধাবমান কাল
জড়ায়ে ধরিলো মোরে ফেলি তার জাল-
তুলে নিল দ্রুত রথে
দুঃসাহসী ভ্রমনের পথে
তোমা হতে বহু দূরে।
মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে
পার হয়ে আসিলাম
আজি নব প্রভাতের শিখরচুড়ায়;
রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়
আমার পুরানো নাম।
ফিরিবার পথ নাহি;
দূর হতে যদি দেখো চাহি
পারিবে না চিনিতে আমায়।
হে বন্ধু বিদায়।
"