ঝুপঝুপ করে বৃষ্টিটা নেমেই গেল। ভেবেছিলাম নামার আগেই ঘরে
ঢুকব। পা চালিয়েছিলাম জলদি। কিন্তু চড়াই এর পথে হাঁফ ধরে যায়। বেশী তাড়াতাড়ি চলা
যায় না। তাই অর্ধেক রাস্তা পৌঁছাতেই নেমে পড়ল বৃষ্টি। পাহাড়ের বৃষ্টি – তাই এখুনি
থেমে যাবে ভেবে পাশে একটা বন্ধ দোকানের টিনের শেডে আশ্রয় নিলাম। সন্ধের অন্ধকার
বেশ গাঢ় হয়ে এসেছে। ঘড়ির রেডিয়াম কাঁটায় দেখলাম সোয়া সাতটা।
শেডের তলায় দাঁড়াতেই বুঝলাম আমি একা
নেই। আবছা অন্ধকারে একটা অবয়ব দেখা গেল। দূরে রাস্তার আলোয় কপালের ওপর ভিজে লেপ্টে
থাকা চুলগুলো থেকে বোঝা গেল যে একটি মেয়ে। পিছন থেকে আলো আসার জন্যে মুখ বোঝা
যাচ্ছে না। পরনে একটি গাঢ় রঙের সোয়েটার, জিন্স। হাত দুটোকে বুকের কাছে জড় করে
দাঁড়িয়ে আছে। মনে হল সম্পূর্ণ ভিজে গেছে। কপালের ওপর বের হয়ে থাকা এক গাছি চুলের
ওপর একটা জলবিন্দু ঝুলে আছে। স্ট্রীট ল্যাম্পের আলোটা সেখানে প্রতিফলিত হয়ে
মুক্তোর মত লাগছে। হঠাৎ মাথা নাড়াতেই টুপ করে মিলিয়ে গেল মুক্তোটা। বৃষ্টির যা বহর
দেখছি এখুনি থামার কোন আশা নেই। একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলেই ফেলি, “বৃষ্টির যা
অবস্থা, আরো ঘন্টা খানেক টানবে। আর আপনি যেভাবে ভিজেছেন, এই ঠান্ডায় যদি আরো এক
ঘন্টা এভাবে থাকেন, তাহলে...”
-“কি করি বলুন।”
-“সেটা একটা সমস্যা। আমার কিছু
বলার নেই বটে।”
কোন উত্তর আসেনা। শুধু হাত দিয়ে
কপাল থেকে ভিজে চুলগুলো সরায়।
-“কোথায় থাকেন?” আমিই আবার বলি।
-“নিচের দিকে। ম্যালে গেছিলাম।
ভাবলাম হেঁটে ফিরি। কিন্তু এভাবে বৃষ্টি আসবে, বুঝিনি। আপনি?”
-“আমি ওপরের দিকে। রোজ বিকেলে
নিচের দিকে ওই পাইন বনের কাছে একটু বেড়াতে যাই। তাই গেছিলাম। দিব্যি পরিস্কার আকাশ
ছিল। অবশ্য পাহাড়ের আবহাওয়া এরকমই কোনও ভরসা নেই।”
-“তাই তো দেখছি। জানতাম না। তাহলে
হাতে একটা ছাতা রাখতাম।”
-“আমি তো জেনেও রাখিনা। ছাতা নিয়ে
হাঁটতে কেমন যেন বন্দী বন্দী লাগে। প্রকৃতির হাতে নিজেকে ছেড়ে দিয়ে বেড়ানোর মধ্যে
একটা মজা আছে, বুঝলেন।”
-“হুমমম্। দেখেই বুঝতে পারছি।
আপনিও তো কম ভেজেননি।”
-“ও ঠিক আছে। আমি অভ্যস্ত। আমি
বছরে অন্ততঃ দশবার এখানে আসি।”
-“এত ভালো লাগে? আমি তো দুদিনেই
হাঁফিয়ে গেছি। খালি ওঠা-নামা।”
-“আমার দারুণ লাগে। আমি আসলে লিখি।
মানে ওটাই আমার পেশা। তাই কোনও লেখার ফরমায়েস পেলেই এখানে চলে আসি। এক বন্ধুর
ফাঁকা বাড়ি আছে। থেকে যাই। নিজের মত লিখি, ঘুরে বেড়াই। আবার লেখা শেষ হলে কোলকাতায়
ফেরত।”
-“ওহ্। তাহলে তো আপনি বিখ্যাত
লোক। কি নাম আপনার? কিছু মনে করবেন না, আসলে লেখকেরা তো গল্প বা উপন্যাসের আড়ালে
থেকে যান, তাই তাঁদের মুখ দেখে চেনাটা একটু সমস্যা হয়ে যায়।”
-“না না, মনে করার কি আছে? আমি
প্রাণ রায়চৌধুরি।”
-“আচ্ছা। আসলে আমার বাঙলা সাহিত্য
সম্পর্কে জ্ঞান একটু কম। আমি মুম্বাই তে থাকি। মা বাবার দৌলতে বাঙলাটা ভালো করে
শিখেছি, কিন্তু বই পড়ার অভ্যাসটা রপ্ত হয়নি একেবারেই।”
-“বুঝতে পারছি। তা এখানে কি
ঘুরতে?”
-“বলতে পারেন। আসলে এক পুরনো
বন্ধুর সাথে দেখা করতে।”
-“আচ্ছা।”
-“তা আপনার এবারের নভেলটা কিসের
ওপর?”
-“ভাবছি। সব কিছুই বড্ড ক্লিশে
লাগছে। নতুন কিছু ভেবে পাওয়াটাই সমস্যা।”
-“হুম। তা ঠিক। সবই সেই ওল্ড ওয়াইন।”
-“যা বলেছেন।”
-“তবে মাঝে মাঝে আমার মাথায় দারুন
দারুন আইডিয়া আসে, জানেন? মনে হয় লিখে ফেলি। কিন্তু লিখতে বসলে আর কলম চলেনা।”
-“যেমন?”
-“যেমন আমি আপনাকে কিছু এখুনি বলতে
পারব না। কিন্তু আসে। ওই সময়টায় যদি কেউ রেকর্ডার চালিয়ে রাখে। আমি গড়গড় করে বলে
যেতে পারি। কিন্তু ঘরে এসে সেটা নিয়ে যদি লিখতে বসি, কিস্যু বেরবে না।”
-“আপনি নিজেই একটা রেকর্ডার রেখে
দিতে পারেন তো। মনে এলেই চালিয়ে দেবেন।”
-“তাই করতে হবে বলে মনে হচ্ছে।”
-“একটা কথা না বলে পারছিনা, আপনি
মুম্বাই তে থাকেন, বাঙলা পড়েন না বললেন, তাও আপনার বাঙলা কিন্তু বেশ ভালো।”
-“ওটা আমার রক্তের গুণ বলতে পারেন।
আর নিজের ভাষা, সেটা খারাপ বলার কি আছে?”
-“সেটাই। কিন্তু কোলকাতার ইংলিশ
মিডিয়াম স্কুল গুলোতে যান, ছেলেমেয়ে গুলো দুটো কথার মধ্যে তিনটে কথা ইংলিশ।”
-“হেহে। তা ঠিক। তা আপনি কোলকাতা
ছেড়ে এখানে আসেন কেন লিখতে?”
-“শান্তি। আর জানেন তো, এই বিশাল
হিমালয়কে দেখলে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি আসে। যেটা একটা ক্রিয়েশনের আগে খুব দরকার
হয়।”
-“আমি এত কিছু বুঝিনা। এটাই আমার
প্রথম হিমালয়ে আসা। তাই হিমালয় কে এখনো পুরোটা অনুভব করে উঠতে পারিনি।”
-“পারবেন আস্তে আস্তে। কতদিন
আছেন?”
-“কাল চলে যাব। এক সপ্তাহ ছিলাম।”
-“বন্ধুর সাথে দেখা করতে এসেছেন
বললেন না?”
-“হ্যাঁ।”
-“ওনার বাড়িতেই আছেন, নাকি?”
-“নাহ্। তার উপায় নেই।”
-“ওহ্। কেন? আই মিন, যদি
পার্সোনাল না হয়।”
-“বন্ধুটির বাড়ি নেই। ওই যে নিচের
দিকে মেন্টাল অ্যাসাইলামটা রয়েছে, ওখানে আছে ও। পেশেন্ট।”
-“ওহ। আহা রে। আপনি দেখতে এসেছেন?”
-“হ্যাঁ। ও মেন্টালি ইল হয়ে যাওয়ার
পর ওর কাউন্সিলার ওর কাছে আমাকে লেখা অনেক না পাঠানো চিঠি পায়। তারপর আমার সাথে
যোগাযোগ করে। জানেন, ওকে নাকি রাখা যাচ্ছিলনা। আমায় দেখে এত শান্ত, নীরব হয়ে গেল
যে একটাও কথা বলল না। শুধু আমার কোলের ওপর মাথা রেখে শুয়ে রইল সিলিং এর ঘুরন্ত
পাখার দিকে ফ্যাল্ফ্যাল্ করে তাকিয়ে।”
-“আহা রে। আগে যদি জানতে
পারতেন...”
-“আগে জানলে কি আর ওকে আমি এতটা
শান্তি দিতে পারতাম...” জিন্সের পকেট থেকে একটা রুমাল বের করেন। ”নাহ্, দেরী হয়ে
যাচ্ছে। বৃষ্টি তো থামার কোনও লক্ষণ নেই। ভিজেই চলে যাই। চলি, হ্যাঁ?”
বলে রাস্তার দিকে পা বাড়ান।
ধোঁয়াটে বৃষ্টির মধ্যে অবয়বটা মিলিয়ে যেতে থাকে। হঠাৎ কি মনে হতে চেঁচিয়ে
বলি,”আপনার নামটা জানা হল না তো?”
বৃষ্টির মধ্যে থেকে
গোপন কথার শেষটুকুর মত ভেসে আসে,
- “বনলতা। বনলতা সেন।“
পকেটের মোবাইলটা বেজে ওঠে।
কোলকাতার থেকে ফোন। ঝম্ঝম্ করে বৃষ্টির মধ্যে ধীরে ধীরে দ্রবীভূত হয়ে যায় একটা
মানুষ।
1 comment:
bah.. khub bhalo laglo..
Post a Comment