Friday, November 9, 2012

Post 16: নুড়ি-পাথরের রাস্তা ১

দিনটা ছিল কোন এক শুক্রবার। তার আগের এক শনিবারের রাতে এক দমকে বলে ফেলা কথা গুলো নিয়ে ভেবেছি অনেক। অনেক দিনের জমে থাকা বাষ্পের স্রোতের মত কথার ঝাঁক যখন মনের মধ্যে থেকে বের হয়ে যায়, তখন ফাঁকা মনের মধ্যেটা জুড়ে শুধু থাকে খানিক ভাবনা আর চিন্তার খেলা। ঠিক ভুল বা শঙ্কা নিঃশঙ্কার দোলাচলে থাকা মনের তখন বড়ই করুণ দশা। এরকম এক জুলাই সন্ধ্যার এস এম এসের প্রত্যুত্তরে পাওয়া দেখা করার আশ্বাস।
বেশ কিছুদিন আগে, সেমিনারে শেষ দেখা মুখ। দুরন্ত বনগাঁ লোকালের রোজকার ভীড় ঠেলে প্রতিদিনের চেনা রাস্তায়ও নিজেকে হারিয়ে ফেলি। চিনতে পারব তো? এই চেনা অচেনার দ্বন্দ্বে ভরা নতুন ফুটে ওঠা এক রাশ ভালোলাগা কেবল সাথি হয়ে থাকে।পথঘাটের ভীড় ঠেলে প্রেসিডেন্সির ক্যান্টিনের কোণে বসেও তাই নতুন দেখা পাওয়ার এক পরম আশ্বাসে ঘড়ির শ্লথতা এক অদ্ভুত বুক ঢিপঢিপানির জন্ম দিয়ে যায় প্রতি সেকেন্ডে। বারবার মোবাইলের স্ক্রীনের দিকে তাকানো। কখন আসবে? ‘সে আসিবে আমার মন বলে সারা বেলা...’।
সবকটা প্রতীক্ষার মুহূর্তকে জড় করে আকার দেওয়ার আগেই মোবাইলএর শব্দে চটক ভাঙে। উঠে গুটিগুটি এগোই গেটের দিকে। মনেমনে একরাশ কল্পনা। বেশ কয়েক সপ্তাহ আগে দেখা মুখের সাথে মিলিয়ে নেওয়ার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। মণীষাকে দেখতে পাই। গেটের পাশে একরাশ লাল রঙা প্রথম দেখার আড়ষ্টতাকে সাথী করে দাঁড়িয়ে। ক্ষণিকের ইতস্ততায় পথচলা শুরু। হাঁটতে হাঁটতে পার হয়ে যাওয়া দুপুর ভরে থাকা কলেজ স্ট্রীটের ব্যস্ততা। ঠং ঠং করে গায়ের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া ট্রাম। আচমকা এসে পড়া টানা রিক্সার ভয়ে হাতে হাত লেগে যায়। একরাশ গরম হাওয়ায় ভেসে আসা ধুলো মাখা, ধোঁয়া মাখা কোলকাতার গন্ধে ভরে যায় চোখ মুখ। সব পার হয়ে সেন্ট্রাল আভেনিউ হয়ে চলতে থাকি কোলকাতার বুকের দিকে। আমার একার কোলকাতা কখন যেন হয়ে ওঠে আমাদের দুজনের। আমার একলা দাঁড়িয়ে থাকা নিয়ন বাতির আলোয় পার্ক স্ট্রীট রেলিঙের গায়ে দুজনের আঁকাবাঁকা দীর্ঘ ছায়াছবি। আমাদের চলার পথের আশে পাশে তখন সবাই পথচারি। নিশ্চুপ পরী মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভিক্টোরিয়াকে সাক্ষী রেখে তখন আমরা দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের কোলকাতার রাজপথে। যেন দুই পথের হঠাৎ মিলনে তৈরী হয়ে যাওয়া এক নিয়ন আলোর শহীদ মিনার।
সেদিন কথা ছিল সিনেমা দেখার। ঋতুপর্ণ ঘোষের সেদিন-ই রিলিজ হওয়া ছবি ‘খেলা’। নন্দনে চলছে। ঠিক হয়েছিল কলেজে দেখা করে ওখানেই যাব। কোলাহলও আসবে বলেছিল তমালিকে নিয়ে। কোলাহলের মুম্বাই যাওয়ার আগে বাড়ি লুকিয়ে শেষ ভিক্টোরিয়া। তাই আমরা ঠিক করেছিলাম প্রেমের সব পথ মিলে যাক আমাদের নন্দনে। কোলাহল বলে রেখেছিল ওরা ভিক্টোরিয়া যাওয়ার পথে টিকিট কেটে রাখবে। রেখেওছিল। আমাদের গিয়ে পড়ার ফাঁকে ওরা নিজেদের মত কিছুটা সময় কাটিয়ে নেবে ভিক্টোরিয়ার লনে। আমাদেরও মেট্রতে যেতে যেতে সলজ্জ আলাপচারিতা শুরু। শুরু নিজেদের কথা। ফেলে আসা দিনের থেকে তুলে দেওয়া সব মণি মুক্ত।
‘খেলা’ আমার দেখা ঋতুপর্ণর সবচেয়ে ‘খাজা’ সিনেমা। এত দুর্বল স্ক্রিপ্ট, ভাবা যায়না। যাই হোক, ‘খেলা’র সাথে শুরু হল প্রাণের খেলা। তখন একটা টিউশনি করতাম। মাসের শেষে তিনশ টাকা। তার থেকে বাঁচিয়ে রাখা একশ দশ টাকা নিয়ে বেরিয়েছিলাম। নন্দনের মধ্যিখানের দুটো সিটের জন্য কিছু আর বাকিটা আইস্ক্রীম।
আমার ক্যামেরা সারাতে দেওয়া ছিল বেন্টিঙ্ক স্ট্রীটের ক্যাননের শোরুমে। পড়ন্ত বিকেলের রোদ ঝরা এসপ্ল্যানেডের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা খুঁজছিলাম আইসক্রিমওয়ালার গাড়ি। এক ছোট্ট লাল গাড়ির আইসক্রিম। ওর পছন্দের চকোলেট। আলতো হাতে চামচে করে আমার মুখে জোর করে গুঁজে দেওয়া। চলতে থাকা পথকে সাথী রেখে কখন যেন হাত ছুঁইয়ে গেছে হাত। হাতের মধ্যে হাতের ধুকপুকানি খুঁজতে শুরু করেছে হৃদয়ের খোঁজ। বিশাল বড় সিইএসসি বিল্ডিঙের ছায়ায় লুকিয়ে পড়া সূর্যের শেষ গোধুলিটুকু পিছলে যাচ্ছিল আমাদের শরীর দিয়ে। রাতের অন্ধকারে ঢাকতে থাকা কোলকাতার শেষ আলোগুলোকে সঙ্গী করে ফেরার পথ ধরতে হয়। এক বুক পূর্ণতা নিয়ে স্টেটস্‌ম্যান বিল্ডিঙের গা ছুঁয়ে আমাদের ঘরে ফেরার শুরু হয়, ঠিক যেখানে আমাদের শহরের সূর্যদয়।

Tuesday, October 23, 2012

Post 15: Sunil

Baba-ke kono ekdin, raat-e khete bose jigyes korechhila, achcha, ei j Rabindranath chhilen, ba Jagadish Basu, erokom bikhyato manush ekhoon ke achhe? Nehat-i chhelemanush-er prosno. Aamar boyes takhon chhoy ki saat. Satyajit Ray mara gechhen bochhor khanek. Baba uttor diyechhilo, Sunil Gangyopadhyay.
Amader barite puro potro-potrikar janye duto boro baksho boraddo chhilo. tar nicher dike thakto purono pujobarshiki. Ami majhe modhyei kucho arshola tariye tene tune ek ekta Anandamela ber kore antam, ekla dupurer songi korar janye. Maa ektu ghumiye nito ei akajer dupur gulo-te. Ar ghorer thanda mejhe-te buk pete suye pata oltatam purono chapa vyapsa gondho makha Anandamla-r. Kakababu takon anek khani akorshoner jayga. Mishor Rohosyo, Agun Pakhir Rohosyo-r moto sob uponyas. Kon faanke bikel ghonato bujhtei partam na. Erokom ek gada romancho niye amar dadan, maane amar thakurdada-ke jigyesh korechhilam, Kakababu-r bari kothay go?
Dadan bolechhilo, dhur, esob ki satyi naki! esob to mithye!
Kakababu bole keu nei! Dhur, dadan je ki bole! Ektuo biswas hoyni sedin. Boro hoar sathe ei abiswas gulo biswas hoy. Tabe anandamela kena bondho hoyna. Ebochhor-o chennai theke fire saptami-r thakur dekhar faak-e college street theke kine fellam. Haat-e niyei pata ulte chole jai Kakababu-r pata-y. Jaani sei maan nei ar. Sobuj Dwip kinba Pahar churar sei gaa-er lom khara kore deoa uttejona fike hoye gechhe anekkhani, tabu chhele bela theke gaaye mekhe boro hoya choritra gulo-r maya chhara sohoj noy. Ke janto je maya chhartei hoy, jakhon kolom ar kotha bole na. Kolo haat-e dhora manush-tir chokhe neme ase ghum, Jeeb ar Jor-er bivajika-y danriye bakstobdho hridpindo ek govir nirobota-ke songi kore chhondo-paat ghota-y pran chhonder. Kono anmone suru hoya lekha sahityo hote giye thomke jay, athoba avyase likhe chola ek kakababu-r kotha hoye jay tar shesh avijaan.

Sunday, October 14, 2012

Post 14: Akashkolom 6

আজ মহালয়া। রোজকার মত ভোরবেলা ওঠা বা মহালয়া শোনার কোন ব্যাঘাত ঘটালাম না। পার্থক্য এই যে রেডিওর বদলে ল্যাপটপ। পারিপার্শ্বিকের সাথে বদলাতে হয় সবকিছু। তাই বদলাই নিজেকে। একটু একটু করে পালটে যাই রোজকারের তাড়নায়।
আমাদের বাড়িতে দাদানের, মানে আমার দাদুর একটা পুরোন বড় রেডিও ছিল। কাঠের, বেশ বড় সড়। তাতে রবিবারের গল্পদাদুর আসর, বা অনুরোধের আসর খুব কম শুনেছি আমি। কারণ, আমার দাদানের সিনেমার প্রতি যতটা আকর্ষণ ছিল, গান বা মিউজিকের প্রতি ততটা নয়। বা বলা ভালো আমি দেখিনি। তাই রেডিওতে রোববারের দুপুরের নাটক বাজতে শুনেছি অনেকদিন ভাতঘুম ঘোরে। কখন শম্ভু মিত্র, কখনো রুদ্রপ্রসাদের গলা দাপিয়ে বেড়াত আমাদের বাড়ির আনাচ-কানাচ।
মহালয়ার ভোরগুলো এ থেকে একটু আলাদা হত। পুজোর গন্ধ নিয়ে আসা এই মহালয়া। দাদানের রেডিওটা বেজে উঠত চারটের একটু আগেই। নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ধরতে হত কোলকাতা ক। মা এসে মাথায় হাত বুলিয়ে, গালে হামি দিয়ে ডাকত। মহালয়া শুনব। আগের রাতে বার বার মনে করিয়ে শুয়েছি। যাতে মা ডেকে দেয়। চোখ রগড়ে উঠে বসি। পাশের ঘরে তখন বেজে উঠেছে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের দৈব স্বর। গোটা বাড়িটা এই কাক না ডাকা ভোরে জেগে উঠেছে। বাবা কাকা সোফায় বসে। মা আমাকে মুখ ধুইয়ে চলে গেছে চায়ের ব্যাবস্থা করতে। দাদান, দিদিভাই রেডিওর সামনে। মনের মধ্যে খবর হয়ে গেল পুজো আসছে। বাইরে হাল্কা শিউলির গন্ধ, ঘুটঘুটে অন্ধকার থেকে ভেসে আসে 'বাজল তোমার আলোর বেণূ', পাড়ার আরো অন্য বাড়িতে রেডিও চলছে। গোটা পাড়াটার মধ্যে প্রাণ জেগে উঠেছে। পাশের বাড়ির টুলটুলি পিসি মাকে হাঁক দিয়ে জিজ্ঞেস করে, বৌদি, শুনছ তো? মা বলে, হ্যাঁ রে। কি শুনছ, কেউ বলে না, কেউ বলে দেয় না। সবাই শুনছে। আমি শুনছি, বাবা শুনছে, কাকা শুনছে, মা চা করতে করতে শুনছে। প্রতিবার শুনে শুনে গানগুলোর সব শব্দ মনে থেকে যাওয়া সত্ত্বেও সবাই সমান উৎকর্ণ। কখন শোনা যাবে হেমন্তর ঐশ্বরিক কন্ঠে, শুভ্র শঙ্খরবে বা দ্বিজেনের জাগো জাগো দুর্গা বলে কল্যানীকে আবাহন। ধরিত্রির সব দুষ্টের দমন করার জন্য। দেবীপক্ষের শুরু হয়ে যায়। আকাশে বাতাসে, দিকে দিগন্তরে সকল লোকে। কালো আকাশের বুক চিরে আলো দেখা যায়। পুব আকাশের কোলে লালচে ছাপ পড়ে। সূর্য ওঠার দেরি আছে। এটা তার আগের আলো। সে যে আসছে সেটা ঘরে ঘরে জানান দেওয়ার আলো। বাড়ির সামনে বাবার করা ছোট্ট বাগানের ঘাসগুলো ভিজে থাকে শিশির জলে। শিশির ভেজা ঘাস, মাটি মিশিয়ে একটা অদ্ভুত গন্ধ উঠত। সেটাও এইদিন পাওয়া যেত। বেলা বাড়লে রোদের সাথে সেসব কোথায় পালিয়ে যায়, অন্যদিন দেখিনি কখনো।
এরকম হারিয়ে ফেলা মহালয়াগুলো আর ফিরে আসেনা। কেন আসেনা? আমরা বড় হয়ে গেছি বলে? এই মাটিমাখা সম্পর্কগুলো, এই আকাশের গন্ধ মাখা দৈব ভোর গুলো চলে যাবে আমাদের কাছ থেকে? বড় হওয়াটা কি দোষের? ছোটবেলায় মাকে হারানো, অনেক দুঃখ চাপা আমার মাকে অনেক মহালয়ার আগের রাতে একা একা কাঁদতে দেখেছি। অথবা চোখের জলে ভেসে যেতে দেখেছি বাজল তোমার আলোর বেণুর সাথে। না জানি তারও ছোটবেলার কোন হারানো স্মৃতি, তার মায়ের কোলের মধ্যে শুয়ে শুয়ে মহালয়া শোনার কথা মনে পড়ে যায় হয়ত। আমারও এই মহালয়ার দিন কেমন যেন মায়ের জন্য খুব মন খারাপ করে। এই লেখাটা লিখতে লিখতেও গলার কাছটায় দলা পাকিয়ে উঠছে। আবার একটা কান্না মাখা ভোর কেটে গেল আমার মায়ের। বাড়ির রেডিওটা খারাপ হয়ে গেছে বেশ কয়েকদিন। তাই হয়ত এ বছর বাজছে না। এপাশ ওপাশ থেকে ভেসে আসা টুকরো মহালয়া নিয়েই হয়ত মায়ের এবছরের মহালয়া। আমাদের ফ্ল্যাটের একফালি বারান্দায় বসে পুব আকাশের আস্তে আস্তে ম্লান হয়ে আসা শুকতারাটার দিকে তাকিয়ে মা হয়ত হারিয়ে যাচ্ছে সেই ছোটবেলার দিনগুলোর মধ্যে। আর চোখ থেকে, অবিরত নেমে আসছে একটা নীরব গভীর জলের রেখা। আমরা সবাই শুনতে থাকি।এক পবিত্র মন্ত্রের মত, যা পুরোন হয়না, কি শুনছি কেউ প্রশ্ন করেনা। মা দুর্গার আবাহন করে, ডেকে আনে মনের মধ্যে স্মৃতির ভীড়। কিছুটা গভীর চোখের জল মাখা কোন হারানো কথা মিশে মিলে যায় ঝরে পড়ে থাকা শিশির ভেজা শিউলিগুলোর গন্ধের সাথে। শাঁখ বাজতে থাকে, উলু বাজে, আকাশের লাল ফিকে হয়ে আসে। দিন গুনতে থাকি আমরা সবাই, কবে বাড়ি ফিরব মায়ের কাছে, কবে মা আসবে আমাদের কাছে।

Tuesday, October 2, 2012

Post 13: My Presidency



প্রেসিডেন্সি কলেজের বারান্দাগুলো আমার কাছে ছোটবেলায় হামাগুড়ি দেওয়ার উঠোনের মত আপন। অনেকদিন থেকেই ভাবি কলেজ নিয়ে কিছু একটা লিখি। কি লিখি কি লিখি করে লেখা আর হয়ে ওঠে না। আসলে কলেজটার সাথে এত কিছু জড়িয়ে আছে যে, একপাতা আকাশ কলমের মধ্যে তাকে ধরানো খুব মুশকিল। সেই প্রথমদিনের বৃষ্টি ভেজা বন্ধুত্বগুলো এত দিনের এত পথচলা পার হয়ে এত নিজের, এত আপন, বুকের মধ্যের জিনিস হয়ে গেছে, যে সেগুলোর কথা বলা মানে আমার অর্ধেক আত্মজীবনী। তাদের নিয়েই আমার জীবনের পথচলা, জীবনের বাঁকে বাঁকে বার বার তাদেরকে নতুন করে পাব বলে হারানো বারে বারে। সেই সাত পাঁচ চিন্তা করতে করতে হঠাতই ল্যাপটপ খুলে বসলাম কিছু লিখি বলে। কিন্তু সব কথা বলা যায়না, সব কথা ভাগ করে নেওয়া যায়না সবার সাথে। কত খারাপ লাগা, ভালো লাগায় সামিল হয়েছে জীবন এই তিন বছরে। কত ওঠা পড়ার সাথী এই কলেজ। তাই সবটুকুকে মনের মধ্যে রেখে কিছু ভালোলাগা লিখে রাখার ইচ্ছে হল। সার্বিক রোমন্থন না হোক, কলেজের অলি গলি দিয়ে হেঁটে তো আসা হবে।
সেদিন জুলাই মাসের সকাল বেলা। আকাশ ঘনঘোর কৃষ্ণবর্ণ। সকালের বারাসাত লোকালটা ঠিক করা ছিল ধরব। সাথী হবে বারাসাতের আরো কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবী। প্রথমদিন কলেজ যাওয়া। সদ্য স্কুল পার হয়ে এক অন্যরকম জীবন। যেখানে কেউ বকবেনা ব্যাজ নেই বলে, প্রেয়ারের লাইনে দাঁড়িয়ে চুপিচুপি পাশের জনের পা মাড়িয়ে দেওয়ার মত দুষ্টুমিও হবেনা সঙ্গী। তাই মনের মধ্যে এক অচেনা জীবনে পা রাখার নিদারূণ আকুতি। কিন্তু এমন দিনে কি যাওয়া যায়, এমন ঘন ঘোর বরিষায়? বাবা বলল, কলেজস্ট্রীটে এক হাঁটু জল জমে কিন্তু। আমি বললাম, ডিঙিয়ে যাব। কিন্তু প্রথমদিন কলেজ মিস্‌ করার মত বোকা আমায় পাওনি। তাই বাবার হাত ছেড়ে প্রথমবারের জন্য চেপে বসলাম ট্রেনে।
সেদিন জল জমেনি কলেজস্ট্রীটে। আমার এতবছরের কলেজ জীবনের ওই প্রথম এবং শেষ বারের মত প্রবল বৃষ্টির পরেও জলশুণ্য দেখেছি কলেজস্ট্রীট। মেন গেট থেকে পোর্টিকো পার হয়ে হেঁটে চলা ডিরোজিও হলের দিকে। ওখানেই হবে ওরিয়েন্টেশন। প্রিন্সিপালের বক্তৃতা। সব ডিপার্টমেন্টের ফার্স্ট ইয়ার জমা হবে ওখানে, তারপর যার যার ডিপার্টমেন্টের দিকে। অতঃপর গিয়ে পড়া এক ঝাঁক অচেনা মুখের মাঝে। যাদের সাথে কাটাতে হবে সামনের তিন বছর। একটা হাসি মুখ, উস্কোখুস্কো চুল, পিঠে স্কুলের ব্যাগ এগিয়ে এসে বলল, তুমি কি ফিজিক্স? অল্প হেসে হ্যাঁ বলি। নাম? কোলাহল। প্রথম বন্ধু। ফিরতি প্রশ্নে বলি, কোলাহল যেখানে হয়, সৈকত।
ওরিয়েন্টেশন শেষ হয়। পথ ধরা ডিপার্টমেন্টের। প্রথম এসেই যে মেয়েটাকে নজর করেছিলাম, তার গলায় ঝোলানো মোবাইল। টাটা ডোকোমোর সেই বিশাল বড় হ্যান্ডসেট। চোখে চশমা। দেখলে বুদ্ধিমতী মনে হয়। বেশ ভালোলাগা মেশানো কৌতুহল তৈরী হয়। ডিপার্টমেন্টের পথে মিলে যেতেই জেনে নিই নাম। সেমন্তী। সঙ্গে আর একজন, মনোনীতা। ছোট খাটো চেহারা, মুখে সবসময় একটা আলতো হাসি। বন্ধুত্বের জন্য সময় লাগেনা।
পথ চলতে থাকি একসাথে। ভালোলাগা, খারাপ লাগা গুলো মিলে মিশে যায়। কলেজের বারান্দার রোদ-ছায়ায় চলে আড্ডা, গল্প, সেমন্তীর বেসুরো গান। কলেজটার বিশাল বারান্দাটার একটা মন ভালো করা জাদু আছে। অথবা মেন বিল্ডিং-এর পোর্টিকো। রোজ ক্লাস শুরুর আগে টুক করে সেরে নেওয়া নির্ভেজাল আড্ডাগুলো। বেকার ল্যাবরেটরির কোরিডোর, পিএলটির ইতিহাস মাখা এক বিশালত্ত্ব, শীতকালের ক্লাশ ছুটে রোদ মাখা মাঠে বসে রবীন্দ্রচর্চা, এই সবকিছুর মধ্যে দিয়ে দারুণ ভাবে ধমনীর মধ্যে তরঙ্গ তোলে প্রেসিডেন্সি।
সব্যসাচীর কাছে প্রথম শুনি মোজার্ট। তার আগে অবধি আমার অভিজ্ঞতা বলতে বেঠোফেনের ফিফ্‌থ আর সিক্সথ সিম্ফনি। সব্যসাচী আমায় একদিন পিএলটি টুতে বসে শিস্‌ দিয়ে মোজার্ট শোনালো। হর্ন কনসার্তো। ভালো লাগা শুরু হল। বাখ, বেঠোফেন, মোজার্ট, ভিভালডি, মাহ্‌লার, চাইকভ্‌স্কি। তারপর থেকে এখনো অবধি এমন অনেকদিন গেছে, সাংঘাতিক মন খারাপের মাঝে দিশা দিয়েছে ভিভাল্ডির স্প্রিং-এর আলেগ্রো।
কোলাহলের সাথে আমার এক নিবিড় বন্ধুত্বের ভিতরে এক অন্যরকম পৃথিবী সবসময় ছিল। সেই পৃথিবীতে আমরা কখনও বেড়াতাম সাথে নিয়ে মৃৎ-প্রদীপ, আকাশ থেকে নেমে আসা গৌড়মল্লার সাথী হত যখনতখন। সত্যি কথা বলতে আমার সাহিত্যচর্চার গভীরতা বেড়েছে কোলাহলের জন্য। ওর কাছ থেকে অনেক অকাজের দুপুরে বসে শরদিন্দুর বিদ্রোহী বা স্বখাত-সলিল শুনতে শুনতে মনের মধ্যে দাগ টেনে গেছে অনেক উল্কার আলো। আজও অনেক না-ভালো লাগা রাতে আনমনে চলে যাই হাজার বছর পার হয়ে তুঙ্গভদ্রার তীরে।
কলেজে একদিন মনোনীতাকে বলেছিলাম, যে তুই আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু, কারণ তুই টিনটিন পড়িস। কোলাহল অভিমান ভরে বলেছিল, টিনটিনটাই সব হল? এই সামান্য মান অভিমানের দোলদোলানি কোলাহল আর মনোনীতার মধ্যে যতটা ছিল, আমার সাথে এদের কারোর সেটা ছিল না, বা থাকলেও আমি টের পাইনি কখনও। সেমন্তী ছাড়া। সেমন্তীর সাথে আমার একটা চিরন্তন খুনসুটির সম্পর্ক আজও বিদ্যমান। তার ফাঁকে ফাঁকে নানারকম মান অভিমানের পালা চলেছে।
ওই যে বলেছিলাম না, আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু ছিল মনোনীতা। ওটা তখন মনে হয়েছিল টিনটিনই তার মূল কারণ, কিন্তু পরিণতির সাথে আরো অনেক গভীর ভাবে খুঁজে পেয়েছি আমাদের বিশুদ্ধ বন্ধুত্বের সংজ্ঞা। ওর কথা লেখার জন্য আমার এই রাতটা যথেষ্ট নয়। আমার কলেজ এবং কলেজোত্তর জীবনের অনেক পাথেয় আহরণ করি ওর কাছ থেকে। আমার সব খারাপ থাকা সন্ধ্যেগুলোর একান্ত সাথী, আর ভালো থাকা ভোরগুলোর প্রথম ফোনকল।
প্রেসিডেন্সি আমায় তিন বছরে অনেক দিয়েছে, যেটা আমায় তার পরে বা আগে কেউ দেয়নি। আমার আনমনা বিকেলের অনেক মণি মুক্ত, আমার পথবাতির হলদে আলোর সন্ধ্যে বেলা। ঝুপঝুপে বৃষ্টির দিনে বেকারের সিঁড়ি আমাদের জীবন থেকে চলে গেছে আজ কয়েকটা বছর হয়ে গেছে। তবু বার বার ফিরে আসে মনের মধ্যে। আজ যখন প্রতিটা দিনকে সন্ধ্যের দিকে টেনে টেনে নিয়ে যেতে যেতে আলোছায়া ভরা পথ গুলোর দিকে পা বাড়াই, মন গিয়ে ঠেকে বার বার ওই বাড়িটার আনাচে কানাচে। শুধু একটা ইঁট কাঠে ভরা দেড়-দুশো বছরের পুরোনো ইমারত নয় প্রেসিডেন্সি, নয় রোজকার খবরের শিরোনামে চলতে থাকা উন্নয়নের হিসেবে বাঁধা উৎকর্ষের কেন্দ্র, আমার প্রতিটা জীবনকণার ছুটে চলার শুরু ওর ওই বারান্দা দিয়ে। চৌখুপির রোদ-ছায়ায় ভরা আমার অনেক হারানো, আমার অনেক কাছের অনেকগুলো সকাল নিয়ে জেগে থাকে প্রেসিডেন্সি, আমার বুকের অনেক গভীর কোন অতলান্তিকে।   

Post 12: The Spring


যদিও এ ঘোর শরতে বসন্তের গান গাওয়া নিতান্ত বাতুলতা, তাও কেন জানিনা বসন্তের কথা মনে পড়ল। আসলে কালকেই এক বন্ধুর সাথে মশকরা করছিলাম। বেচারি পায়ের চোটে অর্ধেক শয্যাশায়ী। কিসব কঠিন নাম বলল, সেই সব হাড়ে নাকি সমস্যা। ভালো বুঝলাম না। কেবল আহা-উহু করে বললাম, লেগেছে বিষম চোট, কি জানি কি হয়? সে বেরসিক। বলে এতো শরত কাল, বসন্তের কথা কেন বলিস? গানটার শুরুর কথা মনে করিয়ে দিলাম। ‘চোটের কথাই যদি বললেন, তাহলে দুকলি শোনাই। যদিও এ শরতকাল, তবু মনের মধ্যে ফাগুন মাস’। এই কথা বলে আমিও তাই মুখবন্ধ করলাম আপনাদের। সোজা ভাষায় কৈফিয়ত দিলাম।

কালকের ওই বাসন্তিক আলোচনার পর, চেন্নাইয়ের (যেখানে সারা বছর গ্রীষ্মের অটোক্র্যাসি চলে) রোদে পুড়ে সারাদিনের কাজকর্মের পর আবার মনের মাঝে একটু বসন্ত জাগালো ফেস্‌বুকের পোস্ট। কেউ একজন ভিভাল্ডির ফোর সিজ্‌নের কথা লিখেছে। বারবার শোনা জুলিয়া ফিশারের ভায়োলিনের কথা মনে পড়ল। ইউ টিউবে জুলিয়ার স্প্রিং শুনে যে কতবার তার প্রেমে পড়েছি, তার তো ইয়ত্তা নেই। অল্প বয়েসী মেয়ে। চারটি তারে ছড় ঘসে চারিদিকে বসন্তের আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে। উঠছে, নামছে, ঢেউ খেলছে, সুরের ওপর সুর জাগছে। সুর জাগছে নদীর জলে, গাছের পাতায়, এমনকি পাতার গায়ে লেগে থাকা কাঁচপোকাটাও সুরের তালে রঙীন হয়ে উঠছে। কি অদ্ভুত এই সুর, তাই না? কিছু তারের কাঁপনে জেগে ওঠা এক মায়া। ভাসিয়ে নিয়ে চলে সব কিছু। এক বিশাল অতলান্তিকের উপর দুলতে থাকা শুভ্রফেন ঢেউএর মত। আগুন জ্বলে বসন্তের। বাসন্তী ভুবনমোহিনী। বসন্তের সুর জাগে নভোতলে, সরোবরে, নদী, গিরি, গুহা, পারাবারে। কি এই বসন্ত? কিভাবে জাগে এই সুর? আকাশ থেকে নেমে আসা বৃষ্টির মত সুর ঝরে পরে, মুখের পরে, বুকের পরে। এক মনে জাল বুনে চলা মাকড়সাটাও চঞ্চল হয়ে ওঠে। বসন্ত এসেছে। ফুলের বুকে জেগে ওঠে মধু। অলি বার বার ফিরে আসে। আকাশের ছেঁড়া মেঘের দল ভেসে চলে সেই সুরের দোলনায়।
সেদিন একলা ঘরে ল্যাপটপকে সঙ্গী করে ডুব মেরেছিলাম বসন্তকে আরো একটু গায়ে মাখব বলে। কানে এলো রাগ বাহার। রসিদ খানের দেবদত্ত গলায় কোথাও বেজে চলেছে, ‘মাতোয়ারি কোয়েলিয়া ডার ডার...’। চোখে ভেসে এল কয়েকটা ছেঁড়া পাতার মত দৃশ্যপট। এক মাঠ সবুজ ঘাসে পা ডুবিয়ে ভেসে চলা আমার কথা। আকাশের বুকে আঁচড় কেটে উড়ে চলা চিল। বারবার ঘুরে ঘুরে ফিরে আসে মুখরার মত। গাছে গাছে কোকিলের ডাক, এক ঝাঁক রঙীন প্রজাপতির উড়ে চলা এদিক সেদিক। যেন কতগুলো উড়ন্ত ফুলদল। কোকিলের ডাক, প্রজাপতির ডানা, ঘাসের পাতায় ঘাসফড়িং-এর ব্যস্ততা, সব মিলিয়ে কম্পোজ হয়ে চলেছে এক অনন্ত সুরের জাল। সবেতে আছে এক তরঙ্গ, আছে সুর। কিছু নিতান্ত ম্যাটার ওয়েভ মাধ্যম থেকে মাধ্যমে বয়ে চলে তৈরী করে চলে এই অদ্ভুত জাদুরাশি। নিজের মনের সাথে শুধু মিলিয়ে নেওয়ার অপেক্ষা। এই মিলনের জন্যেই আমাদের চির প্রতীক্ষা। বিশ্ব জগতের কেন্দ্রে জেগে ওঠা এই সুরের তালে নিজের হৃদয় ছন্দকে অনুরণিত করার এক অনন্ত অপেক্ষা। 

Tuesday, September 18, 2012

Post 11: নয় নয় এ মধুর খেলা



বন্ধুদের আড্ডায় আমি প্রায়ই এই প্রশ্ন শুনতে পাই যে জীবনে কটা প্রেম করেছিস? একটু হেসে উত্তর দিই, অসংখ্য। হাসির মানেটা সবার কাছে নানাভাবে পৌঁছায়। কেউ ভাবে সলজ্জ, কেউ ভাবে নির্লজ্জকিন্তু আসল ব্যাপারটা কেউ বোঝে না। আমার হাসি পায় এটা ভেবে যে, ‘প্রেম’ কিভাবে করে? এটা কি সকালের প্রাতঃকৃত্যের মত কিছু? নাকি বাজারের দরদাম করার মত? প্রশ্নটার উত্তরটা জানার জন্য মনটা কয়েকদিন ধরেই ঘুরঘুর করছে এর ওর দরজায়। ‘কেউ বলে ফাল্গুন, কেউ বলে পলাশের মাস...’। কেউ বা বলে অভ্যাস। প্রেম নিয়ে সবার কি মত, তাই ভেবে ঠিক করলাম কিছু একটা লিখি। সার্থক গদ্য নাহোক্‌, একটা স্ট্যাটিস্টিকাল রিপোর্ট তো হবে!
নবনীতা দেবসেনের একটা লেখা পড়েছিলাম প্রেম নিয়ে। উনি দশ কথার পর এক কথায় বলে দিলেন, এ শুধু মেঘের খেলা। কি গোলমেলে কথা বলুন দেখি। মেঘের খেলা কি একরকম হয়? কতরকম মেঘ, তার কতরকম খেলা। এর মানে কি বুঝবেন? তাই নবনীতাকে হাতে রেখে আর একটু আঁটঘাঁট বেঁধে বেরলাম প্রেম খুঁজতে। বন্ধু বান্ধবী, দাদা, কাকা, পিশে, মেশো – যাকে পাই জিগ্যেস করি (মানে যাদের জিগ্যেস করতে লজ্জা লাগেনা আর কি!), ওগো বলতে পার, প্রেম করা মানে কি? উত্তরের তালিকা দেখলে চিত্রগুপ্ত তার ফর্দ বের করতে লজ্জা পাবেন। মেশোর দল বললেন, প্রেম করা আবার কি? দেখিস না, তোদের বয়সী ছেলে মেয়ে গুলো পার্কে বসে ছাতার তলায় যা করে, তাই হল প্রেম করা। না দেখে থাকলে ইলিয়ট পার্ক ঘুরে আয়। কোনো বন্ধু বলল, ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড ইয়ার। কে জানে! আবার কোনো বন্ধুনি তো এমনতর প্রশ্ন শুনে ভাবল আমি বুঝি তার প্রেমেই পড়ে গেলাম! কি কান্ড! মেসেজের উত্তর দেয়না আর! এক বান্ধবী বলল, তার ছয় বছরের প্রেম জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে যে, প্রেম করা একটা অভ্যাস। রোজকার কাজকর্মের সাথে যার মিলে যাওয়া। যার ওঠা পড়া গুলো সময়ের সাথে থাকে, কিন্তু অ্যাটিনুয়েটেড হয়ে যায়, তবে মিলায় না কখনও। আর একজন বলল, অতশত বুঝিনা, ভালবাসি, ব্যাস। বিয়ে করব। ছানা পোনা মানুষ করব। সুখে থাকব। প্রেম কাকে বলে বুঝলেও যা, না বুঝলেও তাই। বরং বুঝলেই সমস্যা। খালি দ্বন্দ্ব আসবে। বান্ধবীর প্রেমিক জবাব দিল, জাস্ট ওয়েস্টেজ অফ টাইম। করেছ কি মরেছ। বন্ধুর প্রেমিকাটির মতে, এ হল, খুব ভাল একটা অভ্যাস। সকালের দাঁত মাজার মত আর কি! ভাইএর কথায়, কাঁঠালের আঠা, লাগাস না, ছাড়াতে পারবিনা।  
তাহলে প্রেম করা কি? এত উত্তরের ঝাঁকে মাথা পুরো ডেডলক হতে চলল। তবু প্রেম মেলে না। উত্তরের জন্যে গুরুদেবের রচনাবলী নামালাম তাক থেকে। সেখানে দেখি তিনি আর এক অভিযোগ করে বসে আছেন, এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম, প্রেম মেলেনা। আবার পাওয়ার আকুলতা নিয়ে বসে আছে, কি জানি সে আসবে কবে তার জন্য জাগতে হবে, এমনি তার আকুলতা। তাহলে? এই মিলনের আকাঙ্ক্ষা, এটাই প্রেম? নাকি ওই সুখ, যার জন্য সবাই প্রেমের যাচনা করে, সেটাই প্রেম? সব গুলিয়ে দিলেন তো গুরুদেব!
এপাশ ওপাশ তাকাতে মনে পড়ে গেল স্কুলের দিনগুলোর কথা। ক্লাশ নাইন। নতুন নতুন কোচিং –এ পড়তে যাওয়ার কথা। এক ঝাঁক নতুন মেয়ে। প্রাইমারি স্কুলে মেয়েরা পড়ত একসাথে। কিন্তু তখনও মেয়েদের নারীত্ব নামক অমোঘ জিনিসটি সম্পর্কে সচেতন হইনি। ক্লাশের বন্ধুদের সাথে নানারকম তাত্ত্বিক আলোচনা চলত। কিন্তু তাদেরকে একসাথে পেয়ে সবকিছু গুলিয়ে গেল। বন্ধু বান্ধবদের কাছ থেকে শচিনের বাউন্ডারি মারার মত ধপাধপ প্রেমে পড়ার গল্প শুনতে লাগলাম অফ্‌-পিরিয়ডে। উফ্‌, সে কি লোমহর্ষক কাহিনী সব! সে কি রহস্যময়তা! বিশেষ কোন মেয়ে আজ তাকিয়ে হেসেছে! ব্যাস্‌, স্বপ্ন দেখা শুরু। কেউ একজন আমার কাছে নোটস্‌ চেয়েছে! পরের দিন স্কুলের হেডলাইন!
স্কুলে থাকার সময় প্রেমের এই সরল রূপটা দিব্যি ছিল। বড় হয়েই বিপত্তি! ওই যে সুকুমার রায় বলেছেন না, বড় হলেই মানুষ গুলো সব হোঁতকা হয়ে যায়, সহজ জিনিসেরও মানে খুঁজতে চায় সবসময়। আমার হয়েছে সেই দশা। প্রেম করার আবার মানে কি হে! আর থাকলেও বা, জানার দরকার কি? জানলে কি চতুর্বর্গ লাভ হবে? মসফেটে কি দু অ্যাম্পিয়ার কারেন্ট বেশি যাবে, নাকি ভারতের জিডিপি বাড়বে? কিছুই না, তাহলে!
সেইটাই তো মুশকিল, কি করে বোঝাই? মনের মধ্যে প্রেম জেগেছে, তাও আবার মানে নিয়ে। কয়েকদিন আগে, একটা বই পড়ছিলাম। পাওলো কোয়েলহোর লেখা। সেখানেও এক অপূর্ব প্রেমের কথা শোনালেন তিনি। এক জাপানি মহিলার বেঁচে থাকা কিছু প্রেম বুকে নিয়ে। যার প্রেম, তিনি এক মহান লেখক, তিনি তাকে ছেড়ে গেছেন বহু বছর। তার কাছে সেই স্মৃতি আর ওই টুকরো প্রেম ছাড়া আর কিছু নেই। কি অদ্ভুত ভালোবাসা।
কিম-কি-দুকের কিছু ছবির কথা মনে আসে। দ্য টাইম। এক প্রেমিকার হঠাৎ মনে হয় যে তার প্রেমিক তার সাথে থেকে বোর হয়ে গেছে। সেই একই দেহ, সেই একই মুখ। রোজ রোজ দেখে দেখে প্রেমিকের একঘেয়েমি এসে গেছে, তাই হয়ত তাকে তার আর ভালো লাগছেনা। এ হেন মানসিকতায় সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে যে সব পালটে ফেলবে। প্লাস্টিক সার্জারি করে ফেললও পালটে। অপারেশনের ক্ষত শুকানোর জন্য গা ঢাকা দেয়। প্রেমিকটি কিছুই জানতে পারেনা। মেয়েটিকে পাগলের মত খুঁজে চলে। অতঃপর ঘটনা পরম্পরায় ছেলেটি জানতে পারে মেয়েটির এই কাজের কথা। খুব রাগ হয় তার। সেও ঠিক করে পালটে যাবে। প্লাস্টিক সার্জারি করে নিজেকে পালটেও ফেলে। এবার শুরু হয় দুজনের দুজনকে খুঁজে চলা। মন আছে সেই পুরানো, খুঁজে চলেছে তার সেই খুব চেনা, সবচেয়ে প্রিয় কাছের মানুষটিকে। কিন্তু তাদের চেহারা পালটে গেছে। হয়ত হয়ে গেছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর আর সুন্দরী। কিন্তু তারা কেউ কাউকে চিনতে পারছে না। পৃথিবীর পথে অসংখ্য মানুষের ভীড়ে খুঁজে চলে তারা একে অন্যকে। খুঁজতে থাকে তাদের প্রেমকে
এমনই এক গায়ে কাঁটা লাগানো প্রেম কাহিনি। কি এক মধুর খেলা এই প্রেম। এমনই যে সেই মাধুর্য অতিক্রম করে বেড়িয়ে পড়ে এই বেদনার্ত গল্পকথা। তাহলে প্রেম আর দেহ মিলে গেলেই কি এই যত বিপত্তি? কিন্তু দেহ ছাড়া প্রেম, সে কি করে হয়? সেত ওই কিছু দার্শনিক বইয়ের বিষয় ছাড়া কিছু নয়, প্লেটনিক লাভ- কামগন্ধ নাহি তায়।
আরো অনেকগুলি ছবির কথা মনে আসছেমৃণাল সেনের ‘অন্তরীন’-এর সেই ‘বন্দিনী’র সাথে লেখকের এক অদ্ভুত একে অপরকে না দেখা প্রেম,  পেড্রো আলমাদোভারের ‘টক টু হার’-এ ওই জড়বৎ নারীর সাথে পরিচারকের প্রেম। সমস্ত ক্ষতিকে হার মানিয়ে ভালোবাসার জয়গান। ‘অনুরণন’ ছবিতেও সেই এক সম্পর্কের কথা, যার কোন নাম হয় না। এমন হাজার এক প্রেমের নমুনা ঝেঁপে আসছে চারিদিক দিয়ে। তাহলে ‘প্রেম করা’টা আসলে কি? নাহ্‌। এ বড় কঠিন বিষয়।
মনে গেল পড়ে কোন এক আলো-আঁধারির সন্ধ্যাবেলা। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোতে দাঁড়িয়ে থাকা। বুকের ভিতর দুরুদুরু। সময় কখন আসবে? পাশ দিয়ে চলে যায় দু একটা রিক্সা, হর্ণ বাজিয়ে। দুই-একটা সাইকেলের আওয়াজ। ওই যে কাদের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না? তবে কি ওর টিউশন শেষ হল? নাহ, ওটা তো টিভির শব্দ। মাকে বলে এসেছি রিফিল কিনতে যাব। রিফিল কিনতে এতক্ষণ! নাহ্‌, এটা বড্ড বাড়াবাড়ি হচ্ছে। আজকেই কেন এত দেরী করছে? মাথার ওপর মশার ঝাঁক, বন্‌বন্‌ করছে। হাতের তালুতে ঘামে ভিজে যাওয়া একটুকরো কাগজ। আমার সব বজ্র-বিদ্যুৎ গুলো জমিয়ে রেখেছি ওর মধ্যে। রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর, চুপি চুপি লিখে ফেলা এই চিঠি আমার দৈনন্দিন চালচিত্রের থেকে বাঁচানো সময়টুকু দিয়ে। টিউশন শেষ হয়। ও আসে, ও চলে যায়। থেকে যায়, আমি, আমার হলুদ ল্যাম্পপোস্ট আর ঘামে ভেজা তালু।
এটাও তো প্রেম ছিল। কখন সে আসবে, তার একবার দেখা পাওয়ার অন্তহীন প্রতীক্ষা। সে প্রতীক্ষা কি কারো শেষ হয়? খ্যাপা খুঁজে খুঁজে ফিরতে থাকে প্রেমের পরশ পাথর। এক ঘাট থেকে অন্য ঘাটে ভেসে চলে নৌকা। কোন একজন মহান মানুষ বলেছিলেন, বিবাহেই নাকি প্রেমের সমাপ্তি। সত্যি কি তাই? তাহলে আমাদের বাবা-মা’রা দিব্যি হেসে খেলে রয়েছেন। তাতে কি প্রেম নেই? নাকি নিছকই অভ্যাস! স্বয়ং কন্দর্পই জানেন, বা হয়ত তিনিও জানেন না। মানুষের মনের তল পাওয়া কঠিন, যদিও তলিয়ে দেখলে এই জটিল সমাজের তুলনায় মানুষের মন অনেক সরল। সেখানে কোন নিয়ম থাকেনা, থাকেনা সমাজের বিধি নিষেধ চক্ষুলজ্জা। শুধু কিছু মোটা দাগের লোভ, কামনা, ভয়। তাই সমস্ত বাধা নিষেধ টপকে তার অগম্য কিছু নেই। তল পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাই অগত্যা হাল ছাড়তেই হয়। শরণ নিই রবীন্দ্রনাথের, ‘নয় নয় এ মধুর খেলা’। প্রেম করাই ভালো। মানে খুঁজে কাজ কি?

Post 10: Akashkolom 5



আকাশকলম ৫।।
আমাদের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের কোন ছবি ছিল না। আমার দাদু, ঠাকুমা কেউ রবীন্দ্রনাথকে পছন্দ করতেন না। বাবার ‘বদ অভ্যাস’ হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের গান শোনার। রবিবার দুপুর বেলা ছাদে গিয়ে চুপি চুপি রেডিও চালিয়ে রবীন্দ্রসংগীত শুনত। শব্দ জোরে হলে ধরা পড়ার ভয় ছিল। তাই বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের ছবি ছিলনা কোন। কিন্তু, গান ছিল। আমার বাবা গিটার বাজাত। হাওয়াইন গিটার। অনেক শনিবার বা রবিবার দুপুরে বা অনেক আধোঘুমের রাত্তিরে শুনেছি টি-টেবিলটার ওপর গিটার রেখে বাবা একমনে বাজাচ্ছে, তুমি সন্ধ্যাদীপের শিখা...।
আর মায়ের ওই বিশাল বড় হারমোনিয়ামটা। এগারো ঘাটের চেঞ্জার। চম্পককাকু আসত মাকে গান শেখাতে। আমি তখন খুব ছোট। খুব ছেঁড়া ছেঁড়া দৃশ্যপট মাথার মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। কানের মধ্যে দিয়ে মনের মধ্যে বসে থেকেছে রাগ আহির ভৈরোঁ, ইমন কল্যান, দরবারি কানাড়া। প্রতি সন্ধ্যায় রান্নাঘরের ক্লান্তি মুছে মা যখন হারমোনিয়াম নিয়ে বসত, এক অদ্ভুত আনন্দ দেখতাম তার চোখে, মুখে। পরম স্নেহে হারমোনিয়ামের গায়ে হাত বোলানো। মধ্য সপ্তক, তার সপ্তকে ঘোরা ফেরা করতে করতে মনে হত, সারা ঘরে খুব সুন্দর গন্ধ বেরোচ্ছে, ধুপ জ্বলছে, কেউ পুজো করছে। কোন এক আরব্যরজনীতে বাবা গল্প বলেছিল, মালকোষ রাগ নাকি জিনদের খুব প্রিয়। গাইলে তারা সারি দিয়ে বসে মন দিয়ে শোনে, আর যে গাইছে তাকে প্রভু বলে মানে। এর পর থেকে যখনই ‘মন তরপত হরি দরশন...’ করে গান ধরত মা, অনেকবার পিছনে ফিরে দেখেছি।
পুজোর আগে বা বৈশাখ মাসে আমাদের ক্যাসেট কেনা হত। তাসের দেশ, ক্ষীরের পুতুল, দেবব্রত, হেমন্ত, কণিকা এমন কত কি। বাবার একটা পুরোনো টেপ রেকর্ডার ছিল। দুপুর বেলা স্নান করার পর, মা সেখানে চালিয়ে দিত বুদ্ধু-ভুতুম বা লালকমল-নীলকমল। আমি খাটের ওপর চুপ করে বসে পাড়ি দিতাম খেজুর পাতার ডোঙায় করে রাজকণ্যের খোঁজে।
তারপর আস্তে আস্তে বড় হয়েছি। রূপকথার গানগুলো পালটে গেছে। সেই জায়গাগুলো নিয়ে নিয়েছে, রবীন্দ্রনাথ। পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করলে মাসি টাকা দিত। নিজের পছন্দ মত কিছু কেনার জন্য। এরকমই এক পরীক্ষার পর পঞ্চাশ টাকা দিয়ে কিনেছিলাম বিঠোফেনের ফিফ্‌থ আর সিক্সথ সিম্ফনি। এক নতুন জগতের স্পর্শ। সত্যজিতের ছবিতে যে জগতের হাল্কা অনুভব ছিল, তাকে এমন নিবিড় ভাবে পেয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেললাম। কত রাত বসে থেকেছি, এক আকাশ তারা আর মুন লাইট সোনাটা। রবীন্দ্রনাথ শেষের কবিতায় যাকে বলেছেন, চন্দ্রালোক গীতিকা। কলেজে উঠে সব্যসাচীর সাথে পরিচয় হল। ওর হাত ধরে ডুব মারলাম পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীতের এই অনিন্দ্য সাগরে। মোজার্ট, বাখ, চাইকোভ্‌স্কি, হ্যান্ডেল, ভিভালডি, মাহ্‌লারের সাথে শুধু ভেসে চললাম।
এর মধ্যে আরো গভীর ভাবে ধরা পড়েছেন রবীন্দ্রনাথ। গানের সুর ছেড়ে, কথার দিকে মন ঝুঁকেছে। কথা গুলোকে বার বার পড়ে আনন্দ পাই। মনেহয় ওগুলো গায়ে মাখি। একটা মানুষ কি করে এমন অনুভব করতে পারেন। ভেবে আকুল হই। এর মধ্যে পায়ে পায়ে এসে পড়েছে প্রেসিডেন্সি কলেজের বারান্দা দিয়ে লিওনার্ড কোহেন, হ্যারি বেলাফন্টে, ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা, পিঙ্ক ফ্লয়েড, জন ডেনভার, এলভিস প্রিসলি, বিট্‌ল্‌স্‌এর দল। আমি ভেসে চলি এদের সাথে।
সেদিন অনেক রাতে বৃষ্টি নামল। জেগে ছিলাম। এটা ওটা কাজে। জানলার বাইরে দিয়ে ঝম্‌ঝম্‌ শব্দটা কানে আসতেই অনেক দূরে মন চলে গেল। অনেকদিন আগের কোন আষাঢ় মাসের সন্ধ্যাবেলা। বাইরে ঝরে পড়ছে বৃষ্টি। মা হারমোনিয়ামে বসে। আমি অপার বিস্ময়ে ভেবে চলেছি ওই যন্ত্রটার রহস্য। কিকরে ওর ভিতর থেকে আওয়াজ বের হয়। মা মেঘ রাগে একটা আলাপ ধরেছিল। মধ্য, তার সপ্তকের গন্ডি পার হয়ে ঘরের মধ্যে এক ঝাঁক মেঘ ঢুকে পড়ল। আমি, মা, আমাদের ওই হারমোনিয়াম, সব যেন কোথায় হারিয়ে যেতে লাগল। এলোপাথারি জলের ছাঁট চোখে, মুখে। অনেক দূরের মেঘ পার হয়ে মায়ের গলা পাচ্ছি, কড়ি মা, শুদ্ধ নি। স্বর ঝরে পড়ছে। চারিদিকে গান। মিউজিক। রবীন্দ্রনাথ, বিঠোফেন, প্রাচ্য, পাশ্চাত্য, রক, লোকগীতি দিয়ে যা বাঁধা যায়না, যার বর্ণপ্রভেদ করা যায়না। বিশাল অতলান্তিকের ঢেউরাশির উপর শুধু ভেসে চলা যায়, সপ্তক থেকে সপ্তকে।

Thursday, August 30, 2012

Post 9: Kolkata, my city


আজ অনেকদিন পর কোলকাতায় এলাম। ভোর বেলায় ট্রেনের জানলা দিয়ে দূরে ধোঁয়াশায় ঢেকে থাকা হাওড়ার ব্রীজটা স্পষ্ট হতেই মনটা ভালো হয়ে গেল। আবার কোলকাতা। প্রায় পাঁচমাস পর। সেই ধোঁয়া ধুলো, মানুষের ভীড়ে ভরা কোলকাতা।
কোলকাতা তখন জাগছে। হাওড়ার স্টেশনের কুলিদের ঠেলাঠেলি, দর কষাকষি পার হয়ে একটা ট্যাক্সির মধ্যে গা এলিয়ে চোখে পড়ল সেই ‘হাওড়ার ব্রীজ চলে মস্ত সে বিছে, হ্যারিসন রোড চলে তার পিছে পিছে’। বড়বাজারের ভীড়, জীবিকা বা জীবনের তাড়নায় আধডোবা সূর্যকে পাশে রেখে মানুষের জেগে ওঠা। বড় বড় লঙ্কা, আলুর ঢিপি বানিয়ে তৈরী হওয়া আমাদের চাহিদার জন্য। এরকম মাঝে মাঝে মনে হয়, মানুষের জীবন আর জীবিকা যেন মাঝে মাঝে এক হয়ে যায়। পিঠে পঞ্চাশ কিলো আলুর বস্তা নিয়ে নিয়ে ভারে বেঁকে পড়া মানুষগুলো ছুটে বেড়ায় জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, জীবিকার তাড়নায়
জীবন জেগে ওঠে। ঘুমন্ত কোলকাতার প্রাণের স্পন্দন ছড়িয়ে যায়। হাওড়া ব্রীজ, বড়বাজার, স্ট্রান্ড রোড, বি কে পাল আভিন্যু হয়ে গোটা শহরের অলিতে, গলিতে। চারিদিকে থিতিয়ে পড়া ধুলো, ধোঁয়া আবার ভেসে ওঠে হাওয়ায়। পায়ের তলায় থেঁতলে যাওয়া সব্জির গন্ধে ভরে ওঠে প্রেসিডেন্সি কলেজের চত্ত্বর অবধি। দু’কাঁধে বাঁক ঝুলিয়ে চলে যায় ভারির দল চুঁইয়ে পড়া জলের রেখায় চেনা হয়ে যায় তাদের রাস্তাগুলো। আদি ভুতনাথ মন্দিরের দরজা খুলেছে। মাথায় চন্দনের ফোঁটা দেওয়া ব্রাহ্মণ পূজারিতার স্নান হয়েছে একটু আগে। রাস্তার ধারের কর্পোরেশনের জলে। বাবা বলেছিল, ওই জলগুলো নাকি গঙ্গার।
দু’একটা ভোরের বিমান উড়ে যায়। লন্ডন, দুবাই কিংবা ব্যাংকক যাবে হয়তো। জানলায় বসে মানুষগুলো প্রাণ ভরে দেখে নিচ্ছে কোলকাতার পথ-ঘাট, হাওড়ার ব্রীজ, তার তলার কালচে রূপোলি সুতর মতো পড়ে থাকা গঙ্গা। যারা দক্ষিণের যাত্রি, তাদের চোখে পড়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, তার মাথায় ঘুমন্ত পরী। জাগতে থাকা কোলকাতার রাস্তায় থাকা লক্ষ লক্ষ মানুষের উনুনের ধোঁয়ায় আস্তে আস্তে শহর ঢেকে যাবে এরপর। তখন ভিক্টোরিয়া, হাওড়া ব্রীজ, এমনকি গঙ্গাকেও খুব অস্পষ্ট লাগবে। নিচে শুধু থাকবে একটা ধোঁয়ার স্তর, উপরে মেঘের বুক চিরে উড়ে চলা শুধু।
কাল ছিল রবীন্দ্রজয়ন্তী। ২৫ শে বৈশাখ। এদিক ওদিক পড়ে থাকা আধভাঙা স্টেজ। শোলার তৈরী রবীন্দ্রনাথের শুধু দাড়িটা রয়ে গেছে। বাকিটা হয়ত ভেঙে উড়ে গেছে এদিক ওদিক। পিছনে শুকনো মালা, টেবিল চেয়ারের ধূলো, স্টেজ বাঁধার কাতার দড়ি। ঝাড়ুদার এসে ঝাড়ু দিয়ে সেগুলো ফেলছে ডাস্টবিনে। ছোট ডাস্টবিন থেকে সেগুলো যাবে বড় ডাস্টবিনে। একটু পরে কর্পরেশনের গাড়ি এসে সব তুলে নিয়ে চলে যাবে।
মনে পড়ল ওই গানটা। সুচিত্রা মিত্রর গলায় শুনেছিলাম। আমাদের বাড়িতে একটা ক্যাসেট ছিল সুচিত্রা মিত্রর। বাবা কোন এক সময় মা-কে গিফ্‌ট করেছিল। সেই ক্যাসেটের দুই নম্বর গান ছিল।
‘নব আনন্দে জাগ আজি নব রবিকিরণে
শুভ্র সুন্দর প্রীতি-উজ্জ্বল নির্মল জীবনে।
উৎসারিত নব জীবন নির্ঝর উচ্ছ্বাসিত আশাগীতি,
অমৃতপুষ্পগন্ধ বহে আজি এই শান্তিপবনে’।
আজ এই সকালটার মধ্যে গানের শব্দগুলো খুব খুঁজে পেলাম। ছড়িয়ে আছে এদিক ওদিক। রাস্তার ধারের কলে লাইন দিয়ে মানুষের কুলকুচি্র শব্দ, গাছের ওপর কাকেদের ঘুম ভেঙে চ্যাঁচামেচি, সবজি নিয়ে ঠ্যালা গাড়ির ক্যাঁচ-কোঁচ, টানা রিক্সার টন্‌টন্‌ করে একটানা শব্দ, ভোরের বাসের হর্ণ, প্রথম ট্রামের ঘট্‌ঘটাং-ঘট্‌ঘটাং, বাঁকে জল নিয়ে যাওয়ার ছলাত-ছলাত, সব মিলিয়ে এক ঐকতান তৈরী হয়েছেযান্ত্রিক কোলকাতার কলতানের আগে যেন এক অনন্য প্রিলিউড। যার শুরু থেকে শেষ অবধি শুধু জীবনের এদিক সেদিক, ‘উৎসারিত নব জীবন নির্ঝর উচ্ছ্বাসিত আশাগীতি
রাস্তার ধারের ঘুমন্ত ট্রাকগুলোকে দেখে কেমন কষ্ট লাগে। মনখারাপ লাগে। একটু পরেই ইঞ্জিন গর্জে উঠবে। পিঠে টন টন জিনিস নিয়ে চলা শুরু। দেশের এপ্রান্ত থেকে ওই প্রান্তের দিকে। মাঝে কোথাও ধরা পড়া ওভারওয়েটের জন্য। এই ভাবে চলতে থাকা, মাঝে মাঝে থেমে পড়া, আবার চলা। গ্রাম, শহর পার হয়ে চলে যাওয়া কোন দূরের দিকে, যেখানে সূর্য ওঠে অথবা সূর্য ডুবে যায়।
চলতে থাকা ট্যাক্সিতে পিছনে ফেলে আসি আধ জাগা, জাগতে থাকা কোলকাতার এটা-ওটা। এগিয়ে চলি চলতে থাকা কোলকাতার দিকে। ওঠা পড়া, ঘুম জাগার ঢেউ ঠেলে চলা। কোথাও বেজে ওঠে কোন মেয়ের সকালের রেওয়াজ। সা রে গা মা-র ওঠা নামা। প্রেশার কুকারের সিটি, কড়াইএ তেলের শব্দ। প্রিলিউড ছেড়ে জাগে জীবন। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চলি বাড়ির সিঁড়ি ধরে।