প্রেসিডেন্সি কলেজের বারান্দাগুলো আমার কাছে
ছোটবেলায় হামাগুড়ি দেওয়ার উঠোনের মত আপন। অনেকদিন থেকেই ভাবি কলেজ নিয়ে কিছু একটা
লিখি। কি লিখি কি লিখি করে লেখা আর হয়ে ওঠে না। আসলে কলেজটার সাথে এত কিছু জড়িয়ে
আছে যে, একপাতা আকাশ কলমের মধ্যে তাকে ধরানো খুব মুশকিল। সেই প্রথমদিনের বৃষ্টি
ভেজা বন্ধুত্বগুলো এত দিনের এত পথচলা পার হয়ে এত নিজের, এত আপন, বুকের মধ্যের
জিনিস হয়ে গেছে, যে সেগুলোর কথা বলা মানে আমার অর্ধেক আত্মজীবনী। তাদের নিয়েই আমার
জীবনের পথচলা, জীবনের বাঁকে বাঁকে বার বার তাদেরকে নতুন করে পাব বলে হারানো বারে
বারে। সেই সাত পাঁচ চিন্তা করতে করতে হঠাতই ল্যাপটপ খুলে বসলাম কিছু লিখি বলে। কিন্তু
সব কথা বলা যায়না, সব কথা ভাগ করে নেওয়া যায়না সবার সাথে। কত খারাপ লাগা, ভালো
লাগায় সামিল হয়েছে জীবন এই তিন বছরে। কত ওঠা পড়ার সাথী এই কলেজ। তাই সবটুকুকে মনের
মধ্যে রেখে কিছু ভালোলাগা লিখে রাখার ইচ্ছে হল। সার্বিক রোমন্থন না হোক, কলেজের
অলি গলি দিয়ে হেঁটে তো আসা হবে।
সেদিন জুলাই মাসের সকাল বেলা। আকাশ ঘনঘোর
কৃষ্ণবর্ণ। সকালের বারাসাত লোকালটা ঠিক করা ছিল ধরব। সাথী হবে বারাসাতের আরো
কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবী। প্রথমদিন কলেজ যাওয়া। সদ্য স্কুল পার হয়ে এক অন্যরকম জীবন।
যেখানে কেউ বকবেনা ব্যাজ নেই বলে, প্রেয়ারের লাইনে দাঁড়িয়ে চুপিচুপি পাশের জনের পা
মাড়িয়ে দেওয়ার মত দুষ্টুমিও হবেনা সঙ্গী। তাই মনের মধ্যে এক অচেনা জীবনে পা রাখার
নিদারূণ আকুতি। কিন্তু এমন দিনে কি যাওয়া যায়, এমন ঘন ঘোর বরিষায়? বাবা বলল,
কলেজস্ট্রীটে এক হাঁটু জল জমে কিন্তু। আমি বললাম, ডিঙিয়ে যাব। কিন্তু প্রথমদিন
কলেজ মিস্ করার মত বোকা আমায় পাওনি। তাই বাবার হাত ছেড়ে প্রথমবারের জন্য চেপে
বসলাম ট্রেনে।
সেদিন জল জমেনি কলেজস্ট্রীটে। আমার এতবছরের
কলেজ জীবনের ওই প্রথম এবং শেষ বারের মত প্রবল বৃষ্টির পরেও জলশুণ্য দেখেছি
কলেজস্ট্রীট। মেন গেট থেকে পোর্টিকো পার হয়ে হেঁটে চলা ডিরোজিও হলের দিকে। ওখানেই
হবে ওরিয়েন্টেশন। প্রিন্সিপালের বক্তৃতা। সব ডিপার্টমেন্টের ফার্স্ট ইয়ার জমা হবে
ওখানে, তারপর যার যার ডিপার্টমেন্টের দিকে। অতঃপর গিয়ে পড়া এক ঝাঁক অচেনা মুখের
মাঝে। যাদের সাথে কাটাতে হবে সামনের তিন বছর। একটা হাসি মুখ, উস্কোখুস্কো চুল,
পিঠে স্কুলের ব্যাগ এগিয়ে এসে বলল, তুমি কি ফিজিক্স? অল্প হেসে হ্যাঁ বলি। নাম?
কোলাহল। প্রথম বন্ধু। ফিরতি প্রশ্নে বলি, কোলাহল যেখানে হয়, সৈকত।
ওরিয়েন্টেশন শেষ হয়। পথ ধরা ডিপার্টমেন্টের।
প্রথম এসেই যে মেয়েটাকে নজর করেছিলাম, তার গলায় ঝোলানো মোবাইল। টাটা ডোকোমোর সেই বিশাল
বড় হ্যান্ডসেট। চোখে চশমা। দেখলে বুদ্ধিমতী মনে হয়। বেশ ভালোলাগা মেশানো কৌতুহল
তৈরী হয়। ডিপার্টমেন্টের পথে মিলে যেতেই জেনে নিই নাম। সেমন্তী। সঙ্গে আর একজন,
মনোনীতা। ছোট খাটো চেহারা, মুখে সবসময় একটা আলতো হাসি। বন্ধুত্বের জন্য সময়
লাগেনা।
পথ চলতে থাকি একসাথে। ভালোলাগা, খারাপ লাগা
গুলো মিলে মিশে যায়। কলেজের বারান্দার রোদ-ছায়ায় চলে আড্ডা, গল্প, সেমন্তীর বেসুরো
গান। কলেজটার বিশাল বারান্দাটার একটা মন ভালো করা জাদু আছে। অথবা মেন বিল্ডিং-এর
পোর্টিকো। রোজ ক্লাস শুরুর আগে টুক করে সেরে নেওয়া নির্ভেজাল আড্ডাগুলো। বেকার
ল্যাবরেটরির কোরিডোর, পিএলটির ইতিহাস মাখা এক বিশালত্ত্ব, শীতকালের ক্লাশ ছুটে রোদ
মাখা মাঠে বসে রবীন্দ্রচর্চা, এই সবকিছুর মধ্যে দিয়ে দারুণ ভাবে ধমনীর মধ্যে তরঙ্গ
তোলে প্রেসিডেন্সি।
সব্যসাচীর কাছে প্রথম শুনি মোজার্ট। তার আগে
অবধি আমার অভিজ্ঞতা বলতে বেঠোফেনের ফিফ্থ আর সিক্সথ সিম্ফনি। সব্যসাচী আমায় একদিন
পিএলটি টুতে বসে শিস্ দিয়ে মোজার্ট শোনালো। হর্ন কনসার্তো। ভালো লাগা শুরু হল।
বাখ, বেঠোফেন, মোজার্ট, ভিভালডি, মাহ্লার, চাইকভ্স্কি। তারপর থেকে এখনো অবধি এমন
অনেকদিন গেছে, সাংঘাতিক মন খারাপের মাঝে দিশা দিয়েছে ভিভাল্ডির স্প্রিং-এর
আলেগ্রো।
কোলাহলের সাথে আমার এক নিবিড় বন্ধুত্বের ভিতরে
এক অন্যরকম পৃথিবী সবসময় ছিল। সেই পৃথিবীতে আমরা কখনও বেড়াতাম সাথে নিয়ে
মৃৎ-প্রদীপ, আকাশ থেকে নেমে আসা গৌড়মল্লার সাথী হত যখনতখন। সত্যি কথা বলতে আমার
সাহিত্যচর্চার গভীরতা বেড়েছে কোলাহলের জন্য। ওর কাছ থেকে অনেক অকাজের দুপুরে বসে
শরদিন্দুর বিদ্রোহী বা স্বখাত-সলিল শুনতে শুনতে মনের মধ্যে দাগ টেনে গেছে অনেক
উল্কার আলো। আজও অনেক না-ভালো লাগা রাতে আনমনে চলে যাই হাজার বছর পার হয়ে
তুঙ্গভদ্রার তীরে।
কলেজে একদিন মনোনীতাকে বলেছিলাম, যে তুই আমার
সবচেয়ে ভালো বন্ধু, কারণ তুই টিনটিন পড়িস। কোলাহল অভিমান ভরে বলেছিল, টিনটিনটাই সব
হল? এই সামান্য মান অভিমানের দোলদোলানি কোলাহল আর মনোনীতার মধ্যে যতটা ছিল, আমার
সাথে এদের কারোর সেটা ছিল না, বা থাকলেও আমি টের পাইনি কখনও। সেমন্তী ছাড়া।
সেমন্তীর সাথে আমার একটা চিরন্তন খুনসুটির সম্পর্ক আজও বিদ্যমান। তার ফাঁকে ফাঁকে
নানারকম মান অভিমানের পালা চলেছে।
ওই যে বলেছিলাম না, আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু
ছিল মনোনীতা। ওটা তখন মনে হয়েছিল টিনটিনই তার মূল কারণ, কিন্তু পরিণতির সাথে আরো
অনেক গভীর ভাবে খুঁজে পেয়েছি আমাদের বিশুদ্ধ বন্ধুত্বের সংজ্ঞা। ওর কথা লেখার জন্য
আমার এই রাতটা যথেষ্ট নয়। আমার কলেজ এবং কলেজোত্তর জীবনের অনেক পাথেয় আহরণ করি ওর
কাছ থেকে। আমার সব খারাপ থাকা সন্ধ্যেগুলোর একান্ত সাথী, আর ভালো থাকা ভোরগুলোর
প্রথম ফোনকল।
প্রেসিডেন্সি আমায় তিন বছরে অনেক দিয়েছে,
যেটা আমায় তার পরে বা আগে কেউ দেয়নি। আমার আনমনা বিকেলের অনেক মণি মুক্ত, আমার
পথবাতির হলদে আলোর সন্ধ্যে বেলা। ঝুপঝুপে বৃষ্টির দিনে বেকারের সিঁড়ি আমাদের জীবন
থেকে চলে গেছে আজ কয়েকটা বছর হয়ে গেছে। তবু বার বার ফিরে আসে মনের মধ্যে। আজ যখন
প্রতিটা দিনকে সন্ধ্যের দিকে টেনে টেনে নিয়ে যেতে যেতে আলোছায়া ভরা পথ গুলোর দিকে
পা বাড়াই, মন গিয়ে ঠেকে বার বার ওই বাড়িটার আনাচে কানাচে। শুধু একটা ইঁট কাঠে ভরা
দেড়-দুশো বছরের পুরোনো ইমারত নয় প্রেসিডেন্সি, নয় রোজকার খবরের শিরোনামে চলতে থাকা
উন্নয়নের হিসেবে বাঁধা উৎকর্ষের কেন্দ্র, আমার প্রতিটা জীবনকণার ছুটে চলার শুরু ওর
ওই বারান্দা দিয়ে। চৌখুপির রোদ-ছায়ায় ভরা আমার অনেক হারানো, আমার অনেক কাছের
অনেকগুলো সকাল নিয়ে জেগে থাকে প্রেসিডেন্সি, আমার বুকের অনেক গভীর কোন অতলান্তিকে।
1 comment:
Ami bakrudhdho.. ar kichu bolar nei. Onekdin bade mone holo abar chokher samne dekhte pachchi sei math, sei baranda, sei portico, sei Baker, sei amra ar amader sei prolaapgulo.. onek sotabdi por 're-live' korlam dinguloke. Time machine chore kamon laglo ta toke kothay bojhate parbo na, tobe ta bodhoy tui janis karon upore bondhutter bapare ja bolechis ta ubhoyoto. Oporer lekha onubhuti gulo sudhu tor akar noy, amader sobbar, atleast amar to botei...sudhu tor nijossyo onobodyo vasay take prokash korar jonnyo onek oneekk "tali tali tali". Dhuss...kichui thik kore bolte parchina. :( Sudhu etukui bole shesh kori "Those were the best days of my life" ar presidency amake atokichu dieche ja konodin bholar noy-kichu obismotoniyo smriti ar kichu "bondhu" who defines who I am today.
Post a Comment