Wednesday, June 19, 2013

Post 22: আমার গান

মায়ের পুরোন চেঞ্জার হারমোনিয়ামটা নিয়ে বুধবার বিকেলে মা বসত বৃন্তাদিদির কাছে গান শেখার জন্য। আমি আর বাবাই জোর করে গানটা আবার ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলাম মাকে। বাক্স থেকে টেনে বের করে এক অদ্ভুত ভালোবাসা নিয়ে মা মাঝে মাঝে বসত। অনেকক্ষণ সরগম করার পরে হঠাতই হলুদ ডায়েরির পাতা থেকে গেয়ে উঠত এক একটা গান। অযত্নে বসে যাওয়া অথচ সুরেলা গলা দিয়ে অঝোরে বেরিয়ে আসা স্বরগুলোতে আমাদের ঘরগুলোয় একটা প্রাণ আসত। স্কুলের হোমটাস্ক, রান্না ঘরের কাজ, অফিসের চিন্তা, সব সরিয়ে তিন জনে মিলে মেতে উঠতাম গান গান খেলায়। তিন খন্ডের গীতবিতান নিয়ে একের পর এক পাতা উলটে গেয়ে চলা হত। স্বরলিপি না পেলে সা-পা ধরে গলা মেলানো হত। বার বার পিছলে যাওয়া সুরগুলোকে টেনে ধরে বসানো হত গায়ে গায়ে। মা’র ভুল হলে আমি, আমার ভুল হলে মা – আর দুজনের ভুল হলে বাবা কাঁপা কাঁপা অ-রেওয়াজি গলায় শুনিয়ে দিত ঠিক সুর।
মা’র খুব প্রিয় গান ছিল ‘রাত্রি এসে যেথায় মেশে দিনের পারাবারে।‘ গীতবিতানের পাতা উলটে ওখানে এসে থেমে গেলেই আমি ধরতাম। মানব কাকুর কাছে সদ্য শেখা স্বরলিপি ধরে একএকটা সুর মেপে মেপে গাওয়ার চেষ্টা করতাম, সেইখানেতে সাদায় কালোয় মিলে গেছে আঁধার-আলোয়, সেইখানেতে ঢেউ ছুটেছে এপারে ওইপারে।
বাবা মাথা নাড়ত। এমনই তো আছে খাতায় লেখা। মা টেনে নিত হারমোনিয়ামটা। ভারি হারমোনিয়ামের চাপে ছিঁড়ে যাওয়া চাদরটুকুতে হাত বুলিয়ে গেয়ে উঠত, নীতল নীল নীরব মাঝে বাজল গভীর বাণী.., অনভ্যাসের গলা থেকে বেরিয়ে আসা বোধটুকুতে পূর্ণ থাকত এক একটা শব্দোচ্চারণ। পূজো করার মত, মন্ত্র বলার মত করে শব্দগুলো ঘুরে ফিরে যায় এদিক ওদিক। আমাদের ফ্ল্যাটের ঘরখানা ভরে ওঠে সিকিমের কোন এক দূর গ্রামের ভিতরে লুকিয়ে থাকা মনাস্ট্রির দেওয়ালে আছড়ে পরা বৌদ্ধবাণীর মত এক অদ্ভুত দেবভাষায়। নাভি কুন্ডলীর থেকে উঠে আসা এক গভীর নিবেদন।
বৃন্তাদিদির কাছে মা গান শিখতে শুরু করল অনভ্যাসটা বন্ধ করার জন্য। প্রতি বুধবার অন্তত নিয়ম করে গলা সাধা হবে, কথা হবে গান নিয়ে, সময় বেঁধে অভ্যাস হবে রেওয়াজ করার। আমি স্কুল থেকে ফিরে আসলে মা আমাকে বলত, তুই ওঘরে বোস, নাহলে মাঠে খেলতে যা। আমি নাকি থাকলেই বৃন্তাদিদির গানের ভুল ধরি। যদিও আমি অমন কক্ষনো করতাম না, কিন্তু মা ভাবত যদি কোনদিন মুখের ওপর কিছু বলে দি। আমি পাশের ঘরে বসে বসে শুনতাম। কত অনায়াসে রেওয়াজি গলায় গান গেয়ে চলে বৃন্তা দিদি। কিন্তু একটা গান হয়ে গেলেই যেন একটা চ্যাপ্টার পড়া হয়ে গেল। বই বন্ধ। সুর তো হল, কিন্তু গান কই? সুরে বাজানো হারমোনিয়াম আর বাঁধা গলাই কি গান? এক এক গভীর রাতে ঘুম না আসা আমার মায়ের গলা শুনে আমার ঘুম ভেঙে যায়, একা একা বারান্দায় বসে অনেক দূর আকাশের আর্দ্রা নক্ষত্রের দিকে চেয়ে গেয়ে চলা ‘চেয়ে থাকি যে শূন্যে অন্যমনে সেথায় বিরহিণীর অশ্রু হরণ করেছে ওই তারা’ – হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা এই আকুতি তাহলে কি?
মা আমায় ক্লাশ ফাইভে ভর্তি করে দিয়েছিল মানব কাকুর কাছে। গান শেখার জন্য। রবি ঠাকুরের গান। মানব কাকুর মত ভালো মানুষ খুব কম দেখেছি আমি আজ অবধি। কাকুর বাড়িতে মেঝেতে মাদুর পেতে আমরা অনেকে গান শিখতাম। বড় বড় সব দিদিদের মাঝে আমি কিকরে জানিনা যায়গা নিয়েছিলাম কাকুর পাশে, হারমোনিয়াম আর বসার সোফার মাঝের ফাঁকটুকুতে। সরগম শিখে শিখে ক্লান্ত হয়ে খুব রাগ হত, কবে ওই গান শিখব। বাড়িতে বাবার গানের ডায়েরি দেখে লুকিয়ে লুকিয়ে তুলেছিলাম ধ্বনিল আহ্বান মধুর গম্ভীর প্রভাত অম্বর মাঝে। রোজ ইস্কুল যাওয়ার আগে রেওয়াজ করার পর এই গানটা গাইতাম। একদিন কাকুকে বলতেই বলল, শোনা দেখি। আমি ওমনি হারমোনিয়াম টেনে গাইতে থাকি, স্বর তরঙ্গিয়া গাও বিহঙ্গম, পূর্বপশ্চিমবন্ধুসঙ্গম–     মৈত্রিবন্ধনপুণ্যমন্ত্র-পবিত্র বিশ্বসমাজে। কাকু সেদিন আমায় প্রথম গান দিল। হারমোনিয়াম নিয়ে বারবার করে গেয়ে গেয়ে যেন আমার কান থেকে হৃদয়ের নিলয়ে পৌঁছে দিয়ে যেন তার ছুটি – আমার সকল রসের ধারা, তোমাতে আজ হোক না হারা... - সেই আমার প্রথম গান – খাতায় কলমে। বাবার সাথে মা’র সাথে ডুব সাঁতারে ভেসে চলা রবীন্দ্রনাথের মধ্যে দিয়ে। কলেজে উঠে চোখের বালি দেখে বাবাকে যেই বললাম আবহের কথা, জানো কি সুন্দর সুর দিয়েছে দেবজ্যোতি মিশ্র!
- ও সুর রবীন্দ্রনাথের। বলে গীতবিতান খুলে পাতা উলটে দেখিয়ে দেয় মায়ার খেলা, ‘মোরা জলে স্থলে কত ছলে মায়া জাল গাঁথি...।‘
এ সুরও রবীন্দ্রনাথের! সিডি, এমপিথ্রির যুগের এত বছর আগে একজন মানুষ এমন বিদেশীগানের সুরকে আপন করে গেঁথেছিলেন এমন মমতা দিয়ে?
স্কুলে থাকতে পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করার পর মাসীর দেওয়া পঞ্চাশ টাকা দিয়ে কিনেছিলাম বিঠোফেনের ফিফ্‌থ আর সিক্সথ সিম্ফনি। হ্যান্ড্‌লের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে বিদ্রোহের সুর দিয়ে শুরু ফিফথ সিম্ফনির সেই ঝঙ্কার, কত রাত জেগে পদার্থবিদ্যার বইয়ের পাশে টেপ রেকর্ডার নিয়ে শুনেছি ফিরে ফিরে। সেই আমার বিদেশী মিউজিক শোনা। তারপর ভেসে বেড়ানো। সব্যসাচীর কাছ থেকে সিডি এনে শোনা বাখ্‌, মোত্‌জার্ট, বিঠোফেনের ‘চন্দ্রালোক-গীতিকা’, চাইকভ্‌স্কির ‘সোয়ান লেক ।' কিন্তু আমার এই আস্তে আস্তে পালটে যেতে থাকা মিউজিক জগতের মধ্যে মা খুব একটা স্বস্তি পায়না। ভিভালডির স্প্রিং-এর থেকে, ডি এল রায়ের ‘আইল ঋতুরাজ’-এ তার স্বাচ্ছন্দ বেশী, মন বেশী তরূনের উদাত্ত গলায় ‘বসন্ত জাগ্রত দ্বারে’তে। আমিও সেই মাটির টান খুঁজে স্বাস্তির নিঃশ্বাস ফেলি দুটো রবীন্দ্রগান শুনে। বাখ্‌ কিংবা বিঠোফেনের মূর্ততা যেন বুকের মধ্যে এসে বাসা বাঁধে রবীন্দ্রগানে। ঠিক যেন আমার বিকেলবেলার রঙ ঝরা আকাশ অথবা অনেক রাত জেগে আকাশের দিকে চেয়ে নিজের মাকে খোঁজা আমার মায়ের দুর্গা-মুখ।  

Wednesday, June 12, 2013

Post 21: গোধূলি

রোজ বিকেলে আমাদের বারান্দার সামনে একটা কাক এসে বসে। একই কাক যে রোজ বসে তা হলফ্‌ করে বলতে পারিনা, কিন্তু ওই ডানার কাছটা, প্রতিদিনই একটু ছেঁড়া লাগে। সারাদিনের উড়ে চলার ক্লান্তিটুকুকে রেখে বাসায় ফেরার জন্য গোধুলিবেলায় এই থমকে যাওয়া টুকু। আমাদের বাড়ির পাঁচতলার বারান্দা থেকে আকাশটাকে অনেকটা কাছে মনে হয়। রাতেরবেলা এখনও অনেকদিন বাবার সাথে তারা চেনার খেলা খেলি – ওই যে লুব্ধক, আর্দ্রা, ওই যে আর একটু উত্তরে ক্রতু, পুলহ, পুলস্ত্য – সপ্তর্ষির দল এক বিরাট প্রশ্ন চিহ্নে বেঁধে রেখেছে এই মহাজগতের রহস্যটুকু। সহস্র আলোকবর্ষের পথ ধরে বয়ে আসা সব অতীতের ছবি। আকাশটাকে আমার মাঝে মাঝে খুব অদ্ভুত লাগে। কখনো তার নিশ্ছিদ্র কালোর মাঝে ওই নক্ষত্র মন্ডলের বিশাল নীরব বরাভয় মুদ্রায় কালপুরষ, আবার কখনো গোধূলিবেলার রঙের মায়া।
সেদিন খুব বৃষ্টি নামল। এক আকাশ কালো মেঘ অনেকক্ষণের অপেক্ষার পর উজাড় করে দিল। এমনই এক না বিকেল না সন্ধ্যে হওয়া এক হলুদ রঙা গোধুলির মাঝে। এক পশলার পরে মাটির সোঁদা গন্ধ পৌঁছে যায় আমাদের এই বারান্দাতেও। সামনের বাড়ির পুটু পিসীর বাবা চুপচাপ বসে থাকেন তাঁদের বারান্দার এক কোণে। ওই রাতের কালপুরুষের মত নীরব অতীতের ছায়া হয়ে থাকা ছাড়া জীবনের বিকেলটুকু পেরিয়ে গিয়ে কিই বা করার থাকে আর। অনেক বিকেলেই দাদুর চুপচাপ বসে থাকা দেখেছি। পাশে চালিয়ে রাখা কাঠের রেডিও কখনো ধরছে কোলকাতা – ক কখনো কোলকাতা – খ। দাদুর নীরব চোখের ভাষাহীনতায় প্রশ্রয় পেয়ে বেজে চলেছে রাজ্যের খবর, দেশের খবর, তেলের দাম, ডলারের দাম... আবার কখনো শ্বাস নেওয়ার মত করে বেজে উঠেছে শ্যামল, মান্না, মানবেন্দ্র, হেমন্ত অথবা জগন্ময়।
দাদুর মৃত্যুটা খুব আচম্বিতে এসেছিল। স্কুলের বেলা শেষে ফেরার পথে মায়ের আঁচল চাপা মুখ, একটা চাপা ভীড় আর সদ্য কিনে আনা সাদা চাদর পাতা খাটে শোয়ানো মৃত্যুর সাথে হঠাৎ দেখা হয়ে গেছিল। সেই ম্লান হয়ে আসা গোধুলিবেলায় দূরে মিলিয়ে যাওয়া হরি-ধ্বনির মাঝে ইংরাজির শিক্ষক দাদুর কোন এক পুরনো ছাত্র শেক্সপীয়ারের চারলাইন বলে উঠল,
In me thou see'st the twilight of such day
As after sunset fadeth in the west;
Which by and by black night doth take away,
Death's second self, that seals up all in rest.
সেদিনের গোধূলির সাথে সাথে বরাবরের মত ছুটি হয়ে গেছিল ওই বারান্দার কোণের ইজি চেয়ার, পাশে টুলের ওপর রাখা রেডিওটার। পুটু পিসীদের বাড়ি থেকে কখনো আর স্কুল থেকে ফেরার পর শুনিনি পরপর বেজে চলেছে আবহাওয়ার খবর, রাজনীতির খবর আর ঠিক তারপরেই হেমন্তর দেবদত্ত কন্ঠে বেজে ওঠে -
আজি   গোধূলিলগনে এই বাদলগগনে
                তার  চরণধ্বনি আমি হৃদয়ে গণি
             ‘সে আসিবেআমার মন বলে সারাবেলা,
                অকারণ পুলকে আঁখি ভাসে জলে ॥
             অধীর পবনে তার উত্তরীয়   দূরের পরশন দিল কি ও
           রজনীগন্ধার পরিমলে   সে আসিবেআমার মন বলে ॥
   উতলা হয়েছে মলতীর লতা,   ফুরালো না তাহার মনের কথা ।
           বনে বনে আজি একি কানাকানি,
               কিসের বারতা ওরা পেয়েছে না জানি,
                  কাঁপন লাগে দিগঙ্গনার বুকের আঁচলে
                     ‘সে আসিবেআমার মন বলে ॥

বয়েসের মৃত্যুর পর মানুষের শোক থাকেনা। দাদুর ক্ষেত্রেও তাই ঘটলো। শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের সাথে সাথে সবার মন থেকে মুছে গেল ওই বারান্দার কোণ, রেডিওর গান, আর ওই গোধূলিভরা চোখদুটো। পুটু পিসীদের জীবন যেমন ছিল, ঠিক সেরকমই চলতে লাগল। আমি স্কুল ছেড়ে কলেজে গিয়ে পড়লাম। কলেজের ফিল্ম ফেস্টে দেখে ফেললাম কিম-কি ডুকের ‘স্প্রিং সামার ফল উইন্টার এন্ড স্প্রিং।‘ কিমের প্রথম ছবি, আমার দেখা। কি অসামান্য ক্ষমতায় এক বৌদ্ধ জীবনের সাথে মিলে গেছে ঋতু গুলি। সেখানেও সেই হেমন্তের গোধূলিবেলায় বৌদ্ধ ভিক্ষুর দেহত্যাগের দৃশ্য কখনো ভুলিনি। ডুবে যাওয়ার সূর্যের শেষ আলোকে সাথে নিয়ে কাগজের পটি দিয়ে নিজের শ্বাস রোধ করে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নিতে নিতে চোখের উপরের কাগজদুটির অল্প ভিজে ওঠা – এমন দৃশ্য বিশ্ব চলচ্চিত্রে আমি দেখিনি কখনো।
গোধূলি তো এমন কতই আসে, কতই যায় - প্রতিদিনের ডানা ছেঁড়া কাকের মত। কিন্তু এক একটা বেলা মনের মধ্যে থেকে যায়। ঠিক যেমন দাদুর মৃত্যু অথবা খুঁজে পাওয়া ভালোবাসা। সদ্য প্রেমিকার সাথে প্রথমবার ‘ডেটে’ বেড়িয়ে নন্দনের ম্যাটিনি শোয়ের শেষে এসে পড়া এস্প্ল্যানেডের মোড়ে। আমার ক্যামেরা সারাতে দেওয়া ছিল বেন্টিঙ্ক স্ট্রীটের ক্যাননের শোরুমে। পড়ন্ত বিকেলের রোদ ঝরা এসপ্ল্যানেডের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা খুঁজছিলাম আইসক্রিমওয়ালার গাড়ি। এক ছোট্ট লাল গাড়ির আইসক্রিম। ওর পছন্দের চকোলেট। আলতো হাতে চামচে করে আমার মুখে জোর করে গুঁজে দেওয়া। চলতে থাকা পথকে সাথী রেখে কখন যেন হাত ছুঁইয়ে গেছে হাত। হাতের মধ্যে হাতের ধুকপুকানি খুঁজতে শুরু করেছে হৃদয়ের খোঁজ। বিশাল বড় সিইএসসি বিল্ডিঙের ছায়ায় লুকিয়ে পড়া সেদিনের সূর্যের শেষ গোধুলিটুকু পিছলে যাচ্ছিল আমাদের শরীর দিয়ে।
মনে মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে, এই গোধূলি কি? প্রতিদিনের বিকেল আর সন্ধ্যাটুকুর এই নিয়মিত ফাঁকটুকুই কি শুধু? এক অনন্ত গতিময়তায় নিয়মিত ভাবে দিনের আসা, দিনের যাওয়ার মাঝের ওই থমকে দাঁড়ানোটাই বা রোজ এমনি আসে কেন? কেনই বা কনে দেখা রোদের রঙ দিয়ে জন্ম দিয়ে যায় এমন এক একটা আশ্চর্য গোধূলিবেলার? জীবন-মরণের ঠিক সীমাটির মত, যেখানে প্রাণের শ্বাস আর মরণের আশ্বাস দুইয়ে মিলে দিয়ে যায় জীবনের সার্থকতা। সূর্যের অপসারণের সাথে আঁধারের আগমনটুকু কেবল প্রাকৃতিক ঘটনা। এরসাথে হৃদয়ের এক সার্থক আলিঙ্গণে এক এক গোধূলি জন্ম নেয়, মনের ভিতরে বসে বলে যায় কত কথা, কত জীবনের প্রলাপ বাণী। এমন কিছু নান্দনিক গোধূলিতেই প্রাণের আরাম, মৃত্যুর নিঃসংশয়তা। শেষ কথায় সেই রবীন্দ্রনাথ,
আইল গোধূলি সৌর রঙ্গ ভূমে,-
নামিল পশ্চিমে ধীরে যবনিকা,
ধূসর বরণা; ফুরাইল ক্রমে
দিনেশ দৈনিক গতি অভিনয়।
অষ্টমীর চন্দ্ররজতের চাপ!
নভোমধ্যস্থলে বিষণ্ন বদনে
ভাসিল; লভিতে যেন প্রিয় রবি
আলিঙ্গন, ভ্রমিঅলক্ষেতে শশি
অর্ধ সৌর রাজ্য বিরহেতে কৃশ,

নিরাশা মলিন।

Tuesday, June 11, 2013

Post 20: কবিসভা

কাব্য জিনিসটা আমার রক্তে নেই। এটা কেউ পরিস্কার করে না বললেও হাবে-ভাবে বুঝিয়ে দেয়। না না, তা বলে যে আমি বিন্দু মাত্র দুঃখিত এমনটা নয়। একবার একটা গল্প শুনেছিলাম। যদিও সবার অল্প-বিস্তর জানা, তাও নিজের মূর্খামি জাহির করার জন্য এটা পুনরাবৃত্তি না করে পারছিনা। মাফ করবেন।
একবার রাজা বিক্রমাদিত্যের সভায় এক নবীন কবি এসে কবি শ্রেষ্ঠ কালিদাসকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলে বসলেন যে, কালিদাস overrated কবি। আমি ওর চেয়ে ঢের ভাল কবিতা লিখি, কিন্তু রাজার পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় কল্কে পাইনা। রাজা বললেন, বেশ কথা, পরীক্ষা হোক। নব্যকবি বললেন, হোক। কালিদাস বললেন, জাঁহাপনার যা আজ্ঞা। রাজা বাগানে গিয়ে একটা শুকনো গাছের কান্ড দেখিয়ে বললেন, এই শুকনো গাছটা নিয়ে দু লাইন লিখে দেখাও দেখি। ওহে, নবীন, তুমি যদি এই বুড়ো ভামের চেয়ে বেশি ভালো লেখো, একে আমি এখুনি বিদায় করব। দুজনেই খস্‌খস্‌ করে দুলাইন লিখে ফেললেন। নবীন লিখলেন, শুষ্কং কাষ্ঠং তিষ্ঠতি অগ্রে। কালিদাস লিখলেন, নীরস তরুবর পুরোতি ভাগে।
এই গল্পের 'মরাল' ছিল কালিদাস দ্য গ্রেট। কিন্তু আমি বলেছিলুম প্রথমটা বেটার।
 কিন্তু আমার এ হেন রসাভাব সত্ত্বেও বেশ কিছু কবি বন্ধু জুটে গেছে নানা সময়। এবং তাদের কবিতার ল্যাজা মুড়ো না বুঝে পেলেও বাকিদের পিঠ চাপড়ানি দেখে আন্দাজ করে নিয়েছি যে তারা ভালো লেখে। এখন পাঠক যদি প্রশ্ন করেন যে কবিতার প্রতি আমার এরকম নির্দয় বিতৃষ্ণার কারণ কি, তাহলে একটা গল্প বলতে হয়। (অবশ্যই সব কবি এবং কবিতাই যে আমার নির্বোধের শিকার, তা নয়। Exceptions prove the law.)
ইস্কুলের শেষ ভাগ থেকে আমার একটু কবিতা লেখার ইচ্ছে হয়েছিল। আসলে ওই প্রেমে পড়লে বা ব্যর্থ হলে কবিতা লেখার যে ব্যাপারটা আসে, সেরকমই আর কি। রাত বিরেতে অঙ্ক খাতার পিছনে ইন্টিগ্রেশনের ফাঁকে লিখে ফেলা দুই এক লাইনের বেশি তা আর এগোয়নি। কবিতার বই কিনেছি দু-একটা। পড়ার চেষ্টাও করেছি। লোকের কাছ থেকে কবিতার বই ধার করে এনে পড়েছি। চিরঋনী থেকে গেছি অনেকের কাছেই। (কারণ সেই বই গুলো ফেরত দেওয়া হয়নি।) এই 'ধার করা' আর 'বই ফেরত দেওয়ার' কথায় আরো দুটো গল্প মনে পড়ল।
একবার রবীন্দ্রনাথ দিনু ঠাকুরকে বলেছিলেন, 'জানিস দিনু, আমার কাছে একবার একজন দশটাকা ধার নিয়েছিল। নিয়ে বলেছিল, গুরুদেব, আমি আপনার কাছে চিরঋণী হয়ে থাকলাম।' তারপর একটু থেমে বললেন, 'লোকটির অনেক দোষ থাকলেও মিথ্যেবাদী ছিল না। সে সত্যিই চিরঋণী হয়ে আছে।'
দ্বিতীয় গল্পটা মার্ক টোয়েইনকে নিয়ে। মার্কের ঘরে অনেক বই ছিল। কিন্তু সাংঘাতিক অগোছালো। একদিন এক বন্ধু এসে মার্ককে বলল, ভাই, তুমি একটা আলমারিতে বই গুলো সাজিয়ে রাখলে পারো তো। দেখতে ভালো লাগে। টোয়েইন তখন গম্ভীর ভাবে বললেন, দেখো ভাই, বইগুলো যেভাবে জোগাড় করেছি, আলমারি তো আর সেভাবে জোগাড় করা যায়না।
দুটো গল্পের সার্থকতা এই যে এই দুই ভদ্রলোকের কিছু গুণ আমার মধ্যে ছিল। তাই বাড়িতে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ছাড়াও বেশ কিছু কবিতার বই এসে বাসা বেঁধেছিল। সুবিধের মধ্যে এই যে একটা আলমারি ছিল, তাই টোয়েইনের মত দশা হয়নি আমার। এই সব কবিতার বই-টই পড়ে আমার কবিতা লেখার একটা ঝোঁক চাগাড় দিয়েছিল। সেসময় আমার এক বন্ধু নাগাড়ে কবিতা লিখত। এবং নানা কবি সভায় কবিতা পড়ে বেশ বাহবা পেত বলে শুনতাম। পরে যদিও তার বাড়ির আলমারি থেকে কিটকোতস্কি না কি এক বাপে খেদানো-মায়ে তাড়ানো রাশিয়ান কবির একটা বই আবিষ্কার করেছিলাম। সে কবির কবিতার এক অত্যাশ্চর্য ‘প্রতিফলন’ পেয়েছিলাম তার কবিতায়। যাক গে, তার কথায় দাঁড়ি টানি। একদিন হঠাৎ ফোন করে বলল, কবি সভায় যাবি? এরকম প্রস্তাবে ‘এক গাল মাছি’ হয়ে কিছুক্ষণ থেকে তারপর বলি, যাব। সে বলল, নিজের একটা কবিতা নিয়ে যাস। পড়বি। আমার মাথায় বজ্রাঘাত। কবিতা কোথায় পাব? শেষ-মেষ একটা বুদ্ধি চাগাড় দিল। একটা কবিতা তৈরী হল একটা উপায়ে। বলতে নেই, একেবারে আদ্যন্ত আধুনিক কবিতা।
অতঃপর বিকেল বেলা। ন্যাপথলিনের গন্ধওয়ালা একটা পাঞ্জাবি গায়ে চললাম কবি সভায়। হাতে একটা খাতা। তার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে ‘আমার সূর্য।‘ সভাটি যাঁর বাড়িতে হয়েছিল, তাঁর সাথে আমার এখনো বন্ধুত্ব আছে। তাই তাঁর নামে কিছু বলে আর ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্টের দৈর্ঘ হ্রাস করতে চাইনা। সভার কথাই বলি। কবি সভা সম্পর্কে সেরকম সম্যক কোন ধারণা আমার কাছে ছিলনা। গিয়ে দেখি, গোটা পাঁচজন কবি খাতা হাতে হাজির। মধ্য, পূর্ণ এবং অপূর্ণ (আমি) বয়স্ক – সবরকম কবিই আছেন তার মধ্যে। গুটি গুটি এক কোণে বসে পড়ি। কবিতা পড়া শুরু হল এক এক করে। এক একজন কবিতা পড়েন, বাকিরা সবাই মিলে আহা-উহু করেন। কাব্য রস, ভাব ইত্যাদি কঠিন বিষয় নিয়ে নিদারুণ বিশ্লেষণ। এর মধ্যে এক ব্যক্তি ছিলেন। ভদ্রলোকের হাব-ভাব এবং বাকিদের সম্মান প্রদর্শন ইত্যাদি দেখে মনে হচ্ছিল যে উনি বেশ কেউকেটা। নাকের আগার চশমার কাঁচের ধুলো পরিষ্কার করতে করতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে কবে চানাচুর খেয়েছিলেন, সেই গল্প শোনালেন। ভদ্রলোকের প্রতিভা স্বীকার না করে উপায় নেই। নাহলে নিতান্ত চানাচুর খাওয়ার মত জিনিস (সে যার সঙ্গেই হোক, সুনীল বা প্রিন্স অফ ওয়েলস্‌) এমন ফেনিয়ে বলা যায়, আগে জানতাম না।
এক্সময় আমার কবিতা পড়ার আহ্বান এল। আমায় করা সম্ভাষণ থেকে আমার কাব্য প্রতিভা সম্পর্কে নানারকম দ্যুতি বিচ্ছুরিত হল। ভয়ে ভয়ে খাতা বের করে পড়ে ফেললাম। কবিতাটা এরকম ছিল,
“তুমি আমার পলতা পাতা,
ঘন্টাকর্ণ শাক।
রাতের বিকেলে চলকে পড়ে
এক নিঃঝুম কাক।
নিয়ন আলো শহীদ মিনার
ঝিলের ধারে কই,
সন্ধ্যে আলো বর্ষা ভালো
তোমার সাথে সই।
রাত-বিরেতে বৃষ্টি বাদল
চায়ের কাপের সুখ,
মেঘের পরে মেঘের জমা
ঠোঁটের পরে মুখ।“
কবিতা পড়া শেষ হয়ে ভয়ে ভয়ে মুখ তুলে তাকাই। সমালোচকের দল ঝাঁপিয়ে পড়েন। তবে সবাই নির্দয় তা নয়। বাকিদের সম্পর্কে ধারণা না থাকলেও আমার নিজের কবিতা সম্পর্কে এবং তার ওরিজিন সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল। তাই প্রথমে ভয়ে, তারপর অবাক হয়ে এবং সব শেষে হাসি চাপতে হল। আমার কবিতার মধ্যে যে অদ্ভুত শব্দচয়ন তা তাঁদের মুগ্ধ করেছে। একজন তো বলেই ফেললেন, আধুনিক কাব্যে এরকম শব্দসজ্জা এবং তার আলঙ্কারিক প্রয়োগ অভুতপূর্ব। আমার কবিতার মধ্যে নারী ও নরের মধ্যের বাহ্যিক ও আন্তরিক সম্পর্কের ঠিক যে ভাবটা প্রকাশ পেয়েছে, তাও নাকি এক অসামান্যতার দাবী রাখে। কিন্তু ভাবটা যে ঠিক কি সেটা কেউ ঘুনাক্ষরেও বললেন না।
সভা শেষে বন্ধুকে নিয়ে রাস্তায়। সে বেচারি কিটকোতস্কি টুকেও প্রথম দিনে এত খ্যাতি পায়নি। ঈর্ষান্বিত মুখে প্রশ্ন করল, এরকম লিখলি কি করে?
আমি বললাম, লেখা নয়, একে বলে ম্যানুফ্যাকচার করা।
-মানে?
একটু হেসে বলি, খুব সিম্পল। গত বছর জুন আর জুলাই মাসে দেশ পত্রিকা দুটো নিয়ে কবিতার পাতা দুটো খুলবি। তাহলেই বুঝতে পারবি। এক একটা লাইন এক একটা কবিতা থেকে নিয়ে জাস্ট বসিয়ে দিয়েছি। শুধু অর্গানাইজ টা করতে হয়েছে, অন্তমিলটা যাতে ক্ষুণ্ণ না হয়।