মায়ের পুরোন চেঞ্জার হারমোনিয়ামটা নিয়ে বুধবার বিকেলে মা বসত বৃন্তাদিদির কাছে গান শেখার জন্য। আমি আর বাবাই জোর করে গানটা আবার ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলাম মাকে। বাক্স থেকে টেনে বের করে এক অদ্ভুত ভালোবাসা নিয়ে মা মাঝে মাঝে বসত। অনেকক্ষণ সরগম করার পরে হঠাতই হলুদ ডায়েরির পাতা থেকে গেয়ে উঠত এক একটা গান। অযত্নে বসে যাওয়া অথচ সুরেলা গলা দিয়ে অঝোরে বেরিয়ে আসা স্বরগুলোতে আমাদের ঘরগুলোয় একটা প্রাণ আসত। স্কুলের হোমটাস্ক, রান্না ঘরের কাজ, অফিসের চিন্তা, সব সরিয়ে তিন জনে মিলে মেতে উঠতাম গান গান খেলায়। তিন খন্ডের গীতবিতান নিয়ে একের পর এক পাতা উলটে গেয়ে চলা হত। স্বরলিপি না পেলে সা-পা ধরে গলা মেলানো হত। বার বার পিছলে যাওয়া সুরগুলোকে টেনে ধরে বসানো হত গায়ে গায়ে। মা’র ভুল হলে আমি, আমার ভুল হলে মা – আর দুজনের ভুল হলে বাবা কাঁপা কাঁপা অ-রেওয়াজি গলায় শুনিয়ে দিত ঠিক সুর।
মা’র খুব প্রিয় গান ছিল ‘রাত্রি এসে যেথায় মেশে দিনের পারাবারে।‘ গীতবিতানের পাতা উলটে ওখানে এসে থেমে গেলেই আমি ধরতাম। মানব কাকুর কাছে সদ্য শেখা স্বরলিপি ধরে একএকটা সুর মেপে মেপে গাওয়ার চেষ্টা করতাম, সেইখানেতে সাদায় কালোয় মিলে গেছে আঁধার-আলোয়, সেইখানেতে ঢেউ ছুটেছে এপারে ওইপারে।
বাবা মাথা নাড়ত। এমনই তো আছে খাতায় লেখা। মা টেনে নিত হারমোনিয়ামটা। ভারি হারমোনিয়ামের চাপে ছিঁড়ে যাওয়া চাদরটুকুতে হাত বুলিয়ে গেয়ে উঠত, নীতল নীল নীরব মাঝে বাজল গভীর বাণী.., অনভ্যাসের গলা থেকে বেরিয়ে আসা বোধটুকুতে পূর্ণ থাকত এক একটা শব্দোচ্চারণ। পূজো করার মত, মন্ত্র বলার মত করে শব্দগুলো ঘুরে ফিরে যায় এদিক ওদিক। আমাদের ফ্ল্যাটের ঘরখানা ভরে ওঠে সিকিমের কোন এক দূর গ্রামের ভিতরে লুকিয়ে থাকা মনাস্ট্রির দেওয়ালে আছড়ে পরা বৌদ্ধবাণীর মত এক অদ্ভুত দেবভাষায়। নাভি কুন্ডলীর থেকে উঠে আসা এক গভীর নিবেদন।
বৃন্তাদিদির কাছে মা গান শিখতে শুরু করল অনভ্যাসটা বন্ধ করার জন্য। প্রতি বুধবার অন্তত নিয়ম করে গলা সাধা হবে, কথা হবে গান নিয়ে, সময় বেঁধে অভ্যাস হবে রেওয়াজ করার। আমি স্কুল থেকে ফিরে আসলে মা আমাকে বলত, তুই ওঘরে বোস, নাহলে মাঠে খেলতে যা। আমি নাকি থাকলেই বৃন্তাদিদির গানের ভুল ধরি। যদিও আমি অমন কক্ষনো করতাম না, কিন্তু মা ভাবত যদি কোনদিন মুখের ওপর কিছু বলে দি। আমি পাশের ঘরে বসে বসে শুনতাম। কত অনায়াসে রেওয়াজি গলায় গান গেয়ে চলে বৃন্তা দিদি। কিন্তু একটা গান হয়ে গেলেই যেন একটা চ্যাপ্টার পড়া হয়ে গেল। বই বন্ধ। সুর তো হল, কিন্তু গান কই? সুরে বাজানো হারমোনিয়াম আর বাঁধা গলাই কি গান? এক এক গভীর রাতে ঘুম না আসা আমার মায়ের গলা শুনে আমার ঘুম ভেঙে যায়, একা একা বারান্দায় বসে অনেক দূর আকাশের আর্দ্রা নক্ষত্রের দিকে চেয়ে গেয়ে চলা ‘চেয়ে থাকি যে শূন্যে অন্যমনে সেথায় বিরহিণীর অশ্রু হরণ করেছে ওই তারা’ – হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা এই আকুতি তাহলে কি?
মা আমায় ক্লাশ ফাইভে ভর্তি করে দিয়েছিল মানব কাকুর কাছে। গান শেখার জন্য। রবি ঠাকুরের গান। মানব কাকুর মত ভালো মানুষ খুব কম দেখেছি আমি আজ অবধি। কাকুর বাড়িতে মেঝেতে মাদুর পেতে আমরা অনেকে গান শিখতাম। বড় বড় সব দিদিদের মাঝে আমি কিকরে জানিনা যায়গা নিয়েছিলাম কাকুর পাশে, হারমোনিয়াম আর বসার সোফার মাঝের ফাঁকটুকুতে। সরগম শিখে শিখে ক্লান্ত হয়ে খুব রাগ হত, কবে ওই গান শিখব। বাড়িতে বাবার গানের ডায়েরি দেখে লুকিয়ে লুকিয়ে তুলেছিলাম ধ্বনিল আহ্বান মধুর গম্ভীর প্রভাত অম্বর মাঝে। রোজ ইস্কুল যাওয়ার আগে রেওয়াজ করার পর এই গানটা গাইতাম। একদিন কাকুকে বলতেই বলল, শোনা দেখি। আমি ওমনি হারমোনিয়াম টেনে গাইতে থাকি, স্বর তরঙ্গিয়া গাও বিহঙ্গম, পূর্বপশ্চিমবন্ধুসঙ্গম– মৈত্রিবন্ধনপুণ্যমন্ত্র-পবিত্র বিশ্বসমাজে। কাকু সেদিন আমায় প্রথম গান দিল। হারমোনিয়াম নিয়ে বারবার করে গেয়ে গেয়ে যেন আমার কান থেকে হৃদয়ের নিলয়ে পৌঁছে দিয়ে যেন তার ছুটি – আমার সকল রসের ধারা, তোমাতে আজ হোক না হারা... - সেই আমার প্রথম গান – খাতায় কলমে। বাবার সাথে মা’র সাথে ডুব সাঁতারে ভেসে চলা রবীন্দ্রনাথের মধ্যে দিয়ে। কলেজে উঠে চোখের বালি দেখে বাবাকে যেই বললাম আবহের কথা, জানো কি সুন্দর সুর দিয়েছে দেবজ্যোতি মিশ্র!
- ও সুর রবীন্দ্রনাথের। বলে গীতবিতান খুলে পাতা উলটে দেখিয়ে দেয় মায়ার খেলা, ‘মোরা জলে স্থলে কত ছলে মায়া জাল গাঁথি...।‘
এ সুরও রবীন্দ্রনাথের! সিডি, এমপিথ্রির যুগের এত বছর আগে একজন মানুষ এমন বিদেশীগানের সুরকে আপন করে গেঁথেছিলেন এমন মমতা দিয়ে?
স্কুলে থাকতে পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করার পর মাসীর দেওয়া পঞ্চাশ টাকা দিয়ে কিনেছিলাম বিঠোফেনের ফিফ্থ আর সিক্সথ সিম্ফনি। হ্যান্ড্লের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে বিদ্রোহের সুর দিয়ে শুরু ফিফথ সিম্ফনির সেই ঝঙ্কার, কত রাত জেগে পদার্থবিদ্যার বইয়ের পাশে টেপ রেকর্ডার নিয়ে শুনেছি ফিরে ফিরে। সেই আমার বিদেশী মিউজিক শোনা। তারপর ভেসে বেড়ানো। সব্যসাচীর কাছ থেকে সিডি এনে শোনা বাখ্, মোত্জার্ট, বিঠোফেনের ‘চন্দ্রালোক-গীতিকা’, চাইকভ্স্কির ‘সোয়ান লেক ।' কিন্তু আমার এই আস্তে আস্তে পালটে যেতে থাকা মিউজিক জগতের মধ্যে মা খুব একটা স্বস্তি পায়না। ভিভালডির স্প্রিং-এর থেকে, ডি এল রায়ের ‘আইল ঋতুরাজ’-এ তার স্বাচ্ছন্দ বেশী, মন বেশী তরূনের উদাত্ত গলায় ‘বসন্ত জাগ্রত দ্বারে’তে। আমিও সেই মাটির টান খুঁজে স্বাস্তির নিঃশ্বাস ফেলি দুটো রবীন্দ্রগান শুনে। বাখ্ কিংবা বিঠোফেনের মূর্ততা যেন বুকের মধ্যে এসে বাসা বাঁধে রবীন্দ্রগানে। ঠিক যেন আমার বিকেলবেলার রঙ ঝরা আকাশ অথবা অনেক রাত জেগে আকাশের দিকে চেয়ে নিজের মাকে খোঁজা আমার মায়ের দুর্গা-মুখ।
মা’র খুব প্রিয় গান ছিল ‘রাত্রি এসে যেথায় মেশে দিনের পারাবারে।‘ গীতবিতানের পাতা উলটে ওখানে এসে থেমে গেলেই আমি ধরতাম। মানব কাকুর কাছে সদ্য শেখা স্বরলিপি ধরে একএকটা সুর মেপে মেপে গাওয়ার চেষ্টা করতাম, সেইখানেতে সাদায় কালোয় মিলে গেছে আঁধার-আলোয়, সেইখানেতে ঢেউ ছুটেছে এপারে ওইপারে।
বাবা মাথা নাড়ত। এমনই তো আছে খাতায় লেখা। মা টেনে নিত হারমোনিয়ামটা। ভারি হারমোনিয়ামের চাপে ছিঁড়ে যাওয়া চাদরটুকুতে হাত বুলিয়ে গেয়ে উঠত, নীতল নীল নীরব মাঝে বাজল গভীর বাণী.., অনভ্যাসের গলা থেকে বেরিয়ে আসা বোধটুকুতে পূর্ণ থাকত এক একটা শব্দোচ্চারণ। পূজো করার মত, মন্ত্র বলার মত করে শব্দগুলো ঘুরে ফিরে যায় এদিক ওদিক। আমাদের ফ্ল্যাটের ঘরখানা ভরে ওঠে সিকিমের কোন এক দূর গ্রামের ভিতরে লুকিয়ে থাকা মনাস্ট্রির দেওয়ালে আছড়ে পরা বৌদ্ধবাণীর মত এক অদ্ভুত দেবভাষায়। নাভি কুন্ডলীর থেকে উঠে আসা এক গভীর নিবেদন।
বৃন্তাদিদির কাছে মা গান শিখতে শুরু করল অনভ্যাসটা বন্ধ করার জন্য। প্রতি বুধবার অন্তত নিয়ম করে গলা সাধা হবে, কথা হবে গান নিয়ে, সময় বেঁধে অভ্যাস হবে রেওয়াজ করার। আমি স্কুল থেকে ফিরে আসলে মা আমাকে বলত, তুই ওঘরে বোস, নাহলে মাঠে খেলতে যা। আমি নাকি থাকলেই বৃন্তাদিদির গানের ভুল ধরি। যদিও আমি অমন কক্ষনো করতাম না, কিন্তু মা ভাবত যদি কোনদিন মুখের ওপর কিছু বলে দি। আমি পাশের ঘরে বসে বসে শুনতাম। কত অনায়াসে রেওয়াজি গলায় গান গেয়ে চলে বৃন্তা দিদি। কিন্তু একটা গান হয়ে গেলেই যেন একটা চ্যাপ্টার পড়া হয়ে গেল। বই বন্ধ। সুর তো হল, কিন্তু গান কই? সুরে বাজানো হারমোনিয়াম আর বাঁধা গলাই কি গান? এক এক গভীর রাতে ঘুম না আসা আমার মায়ের গলা শুনে আমার ঘুম ভেঙে যায়, একা একা বারান্দায় বসে অনেক দূর আকাশের আর্দ্রা নক্ষত্রের দিকে চেয়ে গেয়ে চলা ‘চেয়ে থাকি যে শূন্যে অন্যমনে সেথায় বিরহিণীর অশ্রু হরণ করেছে ওই তারা’ – হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা এই আকুতি তাহলে কি?
মা আমায় ক্লাশ ফাইভে ভর্তি করে দিয়েছিল মানব কাকুর কাছে। গান শেখার জন্য। রবি ঠাকুরের গান। মানব কাকুর মত ভালো মানুষ খুব কম দেখেছি আমি আজ অবধি। কাকুর বাড়িতে মেঝেতে মাদুর পেতে আমরা অনেকে গান শিখতাম। বড় বড় সব দিদিদের মাঝে আমি কিকরে জানিনা যায়গা নিয়েছিলাম কাকুর পাশে, হারমোনিয়াম আর বসার সোফার মাঝের ফাঁকটুকুতে। সরগম শিখে শিখে ক্লান্ত হয়ে খুব রাগ হত, কবে ওই গান শিখব। বাড়িতে বাবার গানের ডায়েরি দেখে লুকিয়ে লুকিয়ে তুলেছিলাম ধ্বনিল আহ্বান মধুর গম্ভীর প্রভাত অম্বর মাঝে। রোজ ইস্কুল যাওয়ার আগে রেওয়াজ করার পর এই গানটা গাইতাম। একদিন কাকুকে বলতেই বলল, শোনা দেখি। আমি ওমনি হারমোনিয়াম টেনে গাইতে থাকি, স্বর তরঙ্গিয়া গাও বিহঙ্গম, পূর্বপশ্চিমবন্ধুসঙ্গম– মৈত্রিবন্ধনপুণ্যমন্ত্র-পবিত্র বিশ্বসমাজে। কাকু সেদিন আমায় প্রথম গান দিল। হারমোনিয়াম নিয়ে বারবার করে গেয়ে গেয়ে যেন আমার কান থেকে হৃদয়ের নিলয়ে পৌঁছে দিয়ে যেন তার ছুটি – আমার সকল রসের ধারা, তোমাতে আজ হোক না হারা... - সেই আমার প্রথম গান – খাতায় কলমে। বাবার সাথে মা’র সাথে ডুব সাঁতারে ভেসে চলা রবীন্দ্রনাথের মধ্যে দিয়ে। কলেজে উঠে চোখের বালি দেখে বাবাকে যেই বললাম আবহের কথা, জানো কি সুন্দর সুর দিয়েছে দেবজ্যোতি মিশ্র!
- ও সুর রবীন্দ্রনাথের। বলে গীতবিতান খুলে পাতা উলটে দেখিয়ে দেয় মায়ার খেলা, ‘মোরা জলে স্থলে কত ছলে মায়া জাল গাঁথি...।‘
এ সুরও রবীন্দ্রনাথের! সিডি, এমপিথ্রির যুগের এত বছর আগে একজন মানুষ এমন বিদেশীগানের সুরকে আপন করে গেঁথেছিলেন এমন মমতা দিয়ে?
স্কুলে থাকতে পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করার পর মাসীর দেওয়া পঞ্চাশ টাকা দিয়ে কিনেছিলাম বিঠোফেনের ফিফ্থ আর সিক্সথ সিম্ফনি। হ্যান্ড্লের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে বিদ্রোহের সুর দিয়ে শুরু ফিফথ সিম্ফনির সেই ঝঙ্কার, কত রাত জেগে পদার্থবিদ্যার বইয়ের পাশে টেপ রেকর্ডার নিয়ে শুনেছি ফিরে ফিরে। সেই আমার বিদেশী মিউজিক শোনা। তারপর ভেসে বেড়ানো। সব্যসাচীর কাছ থেকে সিডি এনে শোনা বাখ্, মোত্জার্ট, বিঠোফেনের ‘চন্দ্রালোক-গীতিকা’, চাইকভ্স্কির ‘সোয়ান লেক ।' কিন্তু আমার এই আস্তে আস্তে পালটে যেতে থাকা মিউজিক জগতের মধ্যে মা খুব একটা স্বস্তি পায়না। ভিভালডির স্প্রিং-এর থেকে, ডি এল রায়ের ‘আইল ঋতুরাজ’-এ তার স্বাচ্ছন্দ বেশী, মন বেশী তরূনের উদাত্ত গলায় ‘বসন্ত জাগ্রত দ্বারে’তে। আমিও সেই মাটির টান খুঁজে স্বাস্তির নিঃশ্বাস ফেলি দুটো রবীন্দ্রগান শুনে। বাখ্ কিংবা বিঠোফেনের মূর্ততা যেন বুকের মধ্যে এসে বাসা বাঁধে রবীন্দ্রগানে। ঠিক যেন আমার বিকেলবেলার রঙ ঝরা আকাশ অথবা অনেক রাত জেগে আকাশের দিকে চেয়ে নিজের মাকে খোঁজা আমার মায়ের দুর্গা-মুখ।