Tuesday, June 11, 2013

Post 20: কবিসভা

কাব্য জিনিসটা আমার রক্তে নেই। এটা কেউ পরিস্কার করে না বললেও হাবে-ভাবে বুঝিয়ে দেয়। না না, তা বলে যে আমি বিন্দু মাত্র দুঃখিত এমনটা নয়। একবার একটা গল্প শুনেছিলাম। যদিও সবার অল্প-বিস্তর জানা, তাও নিজের মূর্খামি জাহির করার জন্য এটা পুনরাবৃত্তি না করে পারছিনা। মাফ করবেন।
একবার রাজা বিক্রমাদিত্যের সভায় এক নবীন কবি এসে কবি শ্রেষ্ঠ কালিদাসকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলে বসলেন যে, কালিদাস overrated কবি। আমি ওর চেয়ে ঢের ভাল কবিতা লিখি, কিন্তু রাজার পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় কল্কে পাইনা। রাজা বললেন, বেশ কথা, পরীক্ষা হোক। নব্যকবি বললেন, হোক। কালিদাস বললেন, জাঁহাপনার যা আজ্ঞা। রাজা বাগানে গিয়ে একটা শুকনো গাছের কান্ড দেখিয়ে বললেন, এই শুকনো গাছটা নিয়ে দু লাইন লিখে দেখাও দেখি। ওহে, নবীন, তুমি যদি এই বুড়ো ভামের চেয়ে বেশি ভালো লেখো, একে আমি এখুনি বিদায় করব। দুজনেই খস্‌খস্‌ করে দুলাইন লিখে ফেললেন। নবীন লিখলেন, শুষ্কং কাষ্ঠং তিষ্ঠতি অগ্রে। কালিদাস লিখলেন, নীরস তরুবর পুরোতি ভাগে।
এই গল্পের 'মরাল' ছিল কালিদাস দ্য গ্রেট। কিন্তু আমি বলেছিলুম প্রথমটা বেটার।
 কিন্তু আমার এ হেন রসাভাব সত্ত্বেও বেশ কিছু কবি বন্ধু জুটে গেছে নানা সময়। এবং তাদের কবিতার ল্যাজা মুড়ো না বুঝে পেলেও বাকিদের পিঠ চাপড়ানি দেখে আন্দাজ করে নিয়েছি যে তারা ভালো লেখে। এখন পাঠক যদি প্রশ্ন করেন যে কবিতার প্রতি আমার এরকম নির্দয় বিতৃষ্ণার কারণ কি, তাহলে একটা গল্প বলতে হয়। (অবশ্যই সব কবি এবং কবিতাই যে আমার নির্বোধের শিকার, তা নয়। Exceptions prove the law.)
ইস্কুলের শেষ ভাগ থেকে আমার একটু কবিতা লেখার ইচ্ছে হয়েছিল। আসলে ওই প্রেমে পড়লে বা ব্যর্থ হলে কবিতা লেখার যে ব্যাপারটা আসে, সেরকমই আর কি। রাত বিরেতে অঙ্ক খাতার পিছনে ইন্টিগ্রেশনের ফাঁকে লিখে ফেলা দুই এক লাইনের বেশি তা আর এগোয়নি। কবিতার বই কিনেছি দু-একটা। পড়ার চেষ্টাও করেছি। লোকের কাছ থেকে কবিতার বই ধার করে এনে পড়েছি। চিরঋনী থেকে গেছি অনেকের কাছেই। (কারণ সেই বই গুলো ফেরত দেওয়া হয়নি।) এই 'ধার করা' আর 'বই ফেরত দেওয়ার' কথায় আরো দুটো গল্প মনে পড়ল।
একবার রবীন্দ্রনাথ দিনু ঠাকুরকে বলেছিলেন, 'জানিস দিনু, আমার কাছে একবার একজন দশটাকা ধার নিয়েছিল। নিয়ে বলেছিল, গুরুদেব, আমি আপনার কাছে চিরঋণী হয়ে থাকলাম।' তারপর একটু থেমে বললেন, 'লোকটির অনেক দোষ থাকলেও মিথ্যেবাদী ছিল না। সে সত্যিই চিরঋণী হয়ে আছে।'
দ্বিতীয় গল্পটা মার্ক টোয়েইনকে নিয়ে। মার্কের ঘরে অনেক বই ছিল। কিন্তু সাংঘাতিক অগোছালো। একদিন এক বন্ধু এসে মার্ককে বলল, ভাই, তুমি একটা আলমারিতে বই গুলো সাজিয়ে রাখলে পারো তো। দেখতে ভালো লাগে। টোয়েইন তখন গম্ভীর ভাবে বললেন, দেখো ভাই, বইগুলো যেভাবে জোগাড় করেছি, আলমারি তো আর সেভাবে জোগাড় করা যায়না।
দুটো গল্পের সার্থকতা এই যে এই দুই ভদ্রলোকের কিছু গুণ আমার মধ্যে ছিল। তাই বাড়িতে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ছাড়াও বেশ কিছু কবিতার বই এসে বাসা বেঁধেছিল। সুবিধের মধ্যে এই যে একটা আলমারি ছিল, তাই টোয়েইনের মত দশা হয়নি আমার। এই সব কবিতার বই-টই পড়ে আমার কবিতা লেখার একটা ঝোঁক চাগাড় দিয়েছিল। সেসময় আমার এক বন্ধু নাগাড়ে কবিতা লিখত। এবং নানা কবি সভায় কবিতা পড়ে বেশ বাহবা পেত বলে শুনতাম। পরে যদিও তার বাড়ির আলমারি থেকে কিটকোতস্কি না কি এক বাপে খেদানো-মায়ে তাড়ানো রাশিয়ান কবির একটা বই আবিষ্কার করেছিলাম। সে কবির কবিতার এক অত্যাশ্চর্য ‘প্রতিফলন’ পেয়েছিলাম তার কবিতায়। যাক গে, তার কথায় দাঁড়ি টানি। একদিন হঠাৎ ফোন করে বলল, কবি সভায় যাবি? এরকম প্রস্তাবে ‘এক গাল মাছি’ হয়ে কিছুক্ষণ থেকে তারপর বলি, যাব। সে বলল, নিজের একটা কবিতা নিয়ে যাস। পড়বি। আমার মাথায় বজ্রাঘাত। কবিতা কোথায় পাব? শেষ-মেষ একটা বুদ্ধি চাগাড় দিল। একটা কবিতা তৈরী হল একটা উপায়ে। বলতে নেই, একেবারে আদ্যন্ত আধুনিক কবিতা।
অতঃপর বিকেল বেলা। ন্যাপথলিনের গন্ধওয়ালা একটা পাঞ্জাবি গায়ে চললাম কবি সভায়। হাতে একটা খাতা। তার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে ‘আমার সূর্য।‘ সভাটি যাঁর বাড়িতে হয়েছিল, তাঁর সাথে আমার এখনো বন্ধুত্ব আছে। তাই তাঁর নামে কিছু বলে আর ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্টের দৈর্ঘ হ্রাস করতে চাইনা। সভার কথাই বলি। কবি সভা সম্পর্কে সেরকম সম্যক কোন ধারণা আমার কাছে ছিলনা। গিয়ে দেখি, গোটা পাঁচজন কবি খাতা হাতে হাজির। মধ্য, পূর্ণ এবং অপূর্ণ (আমি) বয়স্ক – সবরকম কবিই আছেন তার মধ্যে। গুটি গুটি এক কোণে বসে পড়ি। কবিতা পড়া শুরু হল এক এক করে। এক একজন কবিতা পড়েন, বাকিরা সবাই মিলে আহা-উহু করেন। কাব্য রস, ভাব ইত্যাদি কঠিন বিষয় নিয়ে নিদারুণ বিশ্লেষণ। এর মধ্যে এক ব্যক্তি ছিলেন। ভদ্রলোকের হাব-ভাব এবং বাকিদের সম্মান প্রদর্শন ইত্যাদি দেখে মনে হচ্ছিল যে উনি বেশ কেউকেটা। নাকের আগার চশমার কাঁচের ধুলো পরিষ্কার করতে করতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে কবে চানাচুর খেয়েছিলেন, সেই গল্প শোনালেন। ভদ্রলোকের প্রতিভা স্বীকার না করে উপায় নেই। নাহলে নিতান্ত চানাচুর খাওয়ার মত জিনিস (সে যার সঙ্গেই হোক, সুনীল বা প্রিন্স অফ ওয়েলস্‌) এমন ফেনিয়ে বলা যায়, আগে জানতাম না।
এক্সময় আমার কবিতা পড়ার আহ্বান এল। আমায় করা সম্ভাষণ থেকে আমার কাব্য প্রতিভা সম্পর্কে নানারকম দ্যুতি বিচ্ছুরিত হল। ভয়ে ভয়ে খাতা বের করে পড়ে ফেললাম। কবিতাটা এরকম ছিল,
“তুমি আমার পলতা পাতা,
ঘন্টাকর্ণ শাক।
রাতের বিকেলে চলকে পড়ে
এক নিঃঝুম কাক।
নিয়ন আলো শহীদ মিনার
ঝিলের ধারে কই,
সন্ধ্যে আলো বর্ষা ভালো
তোমার সাথে সই।
রাত-বিরেতে বৃষ্টি বাদল
চায়ের কাপের সুখ,
মেঘের পরে মেঘের জমা
ঠোঁটের পরে মুখ।“
কবিতা পড়া শেষ হয়ে ভয়ে ভয়ে মুখ তুলে তাকাই। সমালোচকের দল ঝাঁপিয়ে পড়েন। তবে সবাই নির্দয় তা নয়। বাকিদের সম্পর্কে ধারণা না থাকলেও আমার নিজের কবিতা সম্পর্কে এবং তার ওরিজিন সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল। তাই প্রথমে ভয়ে, তারপর অবাক হয়ে এবং সব শেষে হাসি চাপতে হল। আমার কবিতার মধ্যে যে অদ্ভুত শব্দচয়ন তা তাঁদের মুগ্ধ করেছে। একজন তো বলেই ফেললেন, আধুনিক কাব্যে এরকম শব্দসজ্জা এবং তার আলঙ্কারিক প্রয়োগ অভুতপূর্ব। আমার কবিতার মধ্যে নারী ও নরের মধ্যের বাহ্যিক ও আন্তরিক সম্পর্কের ঠিক যে ভাবটা প্রকাশ পেয়েছে, তাও নাকি এক অসামান্যতার দাবী রাখে। কিন্তু ভাবটা যে ঠিক কি সেটা কেউ ঘুনাক্ষরেও বললেন না।
সভা শেষে বন্ধুকে নিয়ে রাস্তায়। সে বেচারি কিটকোতস্কি টুকেও প্রথম দিনে এত খ্যাতি পায়নি। ঈর্ষান্বিত মুখে প্রশ্ন করল, এরকম লিখলি কি করে?
আমি বললাম, লেখা নয়, একে বলে ম্যানুফ্যাকচার করা।
-মানে?
একটু হেসে বলি, খুব সিম্পল। গত বছর জুন আর জুলাই মাসে দেশ পত্রিকা দুটো নিয়ে কবিতার পাতা দুটো খুলবি। তাহলেই বুঝতে পারবি। এক একটা লাইন এক একটা কবিতা থেকে নিয়ে জাস্ট বসিয়ে দিয়েছি। শুধু অর্গানাইজ টা করতে হয়েছে, অন্তমিলটা যাতে ক্ষুণ্ণ না হয়।  

No comments: