Wednesday, June 12, 2013

Post 21: গোধূলি

রোজ বিকেলে আমাদের বারান্দার সামনে একটা কাক এসে বসে। একই কাক যে রোজ বসে তা হলফ্‌ করে বলতে পারিনা, কিন্তু ওই ডানার কাছটা, প্রতিদিনই একটু ছেঁড়া লাগে। সারাদিনের উড়ে চলার ক্লান্তিটুকুকে রেখে বাসায় ফেরার জন্য গোধুলিবেলায় এই থমকে যাওয়া টুকু। আমাদের বাড়ির পাঁচতলার বারান্দা থেকে আকাশটাকে অনেকটা কাছে মনে হয়। রাতেরবেলা এখনও অনেকদিন বাবার সাথে তারা চেনার খেলা খেলি – ওই যে লুব্ধক, আর্দ্রা, ওই যে আর একটু উত্তরে ক্রতু, পুলহ, পুলস্ত্য – সপ্তর্ষির দল এক বিরাট প্রশ্ন চিহ্নে বেঁধে রেখেছে এই মহাজগতের রহস্যটুকু। সহস্র আলোকবর্ষের পথ ধরে বয়ে আসা সব অতীতের ছবি। আকাশটাকে আমার মাঝে মাঝে খুব অদ্ভুত লাগে। কখনো তার নিশ্ছিদ্র কালোর মাঝে ওই নক্ষত্র মন্ডলের বিশাল নীরব বরাভয় মুদ্রায় কালপুরষ, আবার কখনো গোধূলিবেলার রঙের মায়া।
সেদিন খুব বৃষ্টি নামল। এক আকাশ কালো মেঘ অনেকক্ষণের অপেক্ষার পর উজাড় করে দিল। এমনই এক না বিকেল না সন্ধ্যে হওয়া এক হলুদ রঙা গোধুলির মাঝে। এক পশলার পরে মাটির সোঁদা গন্ধ পৌঁছে যায় আমাদের এই বারান্দাতেও। সামনের বাড়ির পুটু পিসীর বাবা চুপচাপ বসে থাকেন তাঁদের বারান্দার এক কোণে। ওই রাতের কালপুরুষের মত নীরব অতীতের ছায়া হয়ে থাকা ছাড়া জীবনের বিকেলটুকু পেরিয়ে গিয়ে কিই বা করার থাকে আর। অনেক বিকেলেই দাদুর চুপচাপ বসে থাকা দেখেছি। পাশে চালিয়ে রাখা কাঠের রেডিও কখনো ধরছে কোলকাতা – ক কখনো কোলকাতা – খ। দাদুর নীরব চোখের ভাষাহীনতায় প্রশ্রয় পেয়ে বেজে চলেছে রাজ্যের খবর, দেশের খবর, তেলের দাম, ডলারের দাম... আবার কখনো শ্বাস নেওয়ার মত করে বেজে উঠেছে শ্যামল, মান্না, মানবেন্দ্র, হেমন্ত অথবা জগন্ময়।
দাদুর মৃত্যুটা খুব আচম্বিতে এসেছিল। স্কুলের বেলা শেষে ফেরার পথে মায়ের আঁচল চাপা মুখ, একটা চাপা ভীড় আর সদ্য কিনে আনা সাদা চাদর পাতা খাটে শোয়ানো মৃত্যুর সাথে হঠাৎ দেখা হয়ে গেছিল। সেই ম্লান হয়ে আসা গোধুলিবেলায় দূরে মিলিয়ে যাওয়া হরি-ধ্বনির মাঝে ইংরাজির শিক্ষক দাদুর কোন এক পুরনো ছাত্র শেক্সপীয়ারের চারলাইন বলে উঠল,
In me thou see'st the twilight of such day
As after sunset fadeth in the west;
Which by and by black night doth take away,
Death's second self, that seals up all in rest.
সেদিনের গোধূলির সাথে সাথে বরাবরের মত ছুটি হয়ে গেছিল ওই বারান্দার কোণের ইজি চেয়ার, পাশে টুলের ওপর রাখা রেডিওটার। পুটু পিসীদের বাড়ি থেকে কখনো আর স্কুল থেকে ফেরার পর শুনিনি পরপর বেজে চলেছে আবহাওয়ার খবর, রাজনীতির খবর আর ঠিক তারপরেই হেমন্তর দেবদত্ত কন্ঠে বেজে ওঠে -
আজি   গোধূলিলগনে এই বাদলগগনে
                তার  চরণধ্বনি আমি হৃদয়ে গণি
             ‘সে আসিবেআমার মন বলে সারাবেলা,
                অকারণ পুলকে আঁখি ভাসে জলে ॥
             অধীর পবনে তার উত্তরীয়   দূরের পরশন দিল কি ও
           রজনীগন্ধার পরিমলে   সে আসিবেআমার মন বলে ॥
   উতলা হয়েছে মলতীর লতা,   ফুরালো না তাহার মনের কথা ।
           বনে বনে আজি একি কানাকানি,
               কিসের বারতা ওরা পেয়েছে না জানি,
                  কাঁপন লাগে দিগঙ্গনার বুকের আঁচলে
                     ‘সে আসিবেআমার মন বলে ॥

বয়েসের মৃত্যুর পর মানুষের শোক থাকেনা। দাদুর ক্ষেত্রেও তাই ঘটলো। শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের সাথে সাথে সবার মন থেকে মুছে গেল ওই বারান্দার কোণ, রেডিওর গান, আর ওই গোধূলিভরা চোখদুটো। পুটু পিসীদের জীবন যেমন ছিল, ঠিক সেরকমই চলতে লাগল। আমি স্কুল ছেড়ে কলেজে গিয়ে পড়লাম। কলেজের ফিল্ম ফেস্টে দেখে ফেললাম কিম-কি ডুকের ‘স্প্রিং সামার ফল উইন্টার এন্ড স্প্রিং।‘ কিমের প্রথম ছবি, আমার দেখা। কি অসামান্য ক্ষমতায় এক বৌদ্ধ জীবনের সাথে মিলে গেছে ঋতু গুলি। সেখানেও সেই হেমন্তের গোধূলিবেলায় বৌদ্ধ ভিক্ষুর দেহত্যাগের দৃশ্য কখনো ভুলিনি। ডুবে যাওয়ার সূর্যের শেষ আলোকে সাথে নিয়ে কাগজের পটি দিয়ে নিজের শ্বাস রোধ করে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নিতে নিতে চোখের উপরের কাগজদুটির অল্প ভিজে ওঠা – এমন দৃশ্য বিশ্ব চলচ্চিত্রে আমি দেখিনি কখনো।
গোধূলি তো এমন কতই আসে, কতই যায় - প্রতিদিনের ডানা ছেঁড়া কাকের মত। কিন্তু এক একটা বেলা মনের মধ্যে থেকে যায়। ঠিক যেমন দাদুর মৃত্যু অথবা খুঁজে পাওয়া ভালোবাসা। সদ্য প্রেমিকার সাথে প্রথমবার ‘ডেটে’ বেড়িয়ে নন্দনের ম্যাটিনি শোয়ের শেষে এসে পড়া এস্প্ল্যানেডের মোড়ে। আমার ক্যামেরা সারাতে দেওয়া ছিল বেন্টিঙ্ক স্ট্রীটের ক্যাননের শোরুমে। পড়ন্ত বিকেলের রোদ ঝরা এসপ্ল্যানেডের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা খুঁজছিলাম আইসক্রিমওয়ালার গাড়ি। এক ছোট্ট লাল গাড়ির আইসক্রিম। ওর পছন্দের চকোলেট। আলতো হাতে চামচে করে আমার মুখে জোর করে গুঁজে দেওয়া। চলতে থাকা পথকে সাথী রেখে কখন যেন হাত ছুঁইয়ে গেছে হাত। হাতের মধ্যে হাতের ধুকপুকানি খুঁজতে শুরু করেছে হৃদয়ের খোঁজ। বিশাল বড় সিইএসসি বিল্ডিঙের ছায়ায় লুকিয়ে পড়া সেদিনের সূর্যের শেষ গোধুলিটুকু পিছলে যাচ্ছিল আমাদের শরীর দিয়ে।
মনে মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে, এই গোধূলি কি? প্রতিদিনের বিকেল আর সন্ধ্যাটুকুর এই নিয়মিত ফাঁকটুকুই কি শুধু? এক অনন্ত গতিময়তায় নিয়মিত ভাবে দিনের আসা, দিনের যাওয়ার মাঝের ওই থমকে দাঁড়ানোটাই বা রোজ এমনি আসে কেন? কেনই বা কনে দেখা রোদের রঙ দিয়ে জন্ম দিয়ে যায় এমন এক একটা আশ্চর্য গোধূলিবেলার? জীবন-মরণের ঠিক সীমাটির মত, যেখানে প্রাণের শ্বাস আর মরণের আশ্বাস দুইয়ে মিলে দিয়ে যায় জীবনের সার্থকতা। সূর্যের অপসারণের সাথে আঁধারের আগমনটুকু কেবল প্রাকৃতিক ঘটনা। এরসাথে হৃদয়ের এক সার্থক আলিঙ্গণে এক এক গোধূলি জন্ম নেয়, মনের ভিতরে বসে বলে যায় কত কথা, কত জীবনের প্রলাপ বাণী। এমন কিছু নান্দনিক গোধূলিতেই প্রাণের আরাম, মৃত্যুর নিঃসংশয়তা। শেষ কথায় সেই রবীন্দ্রনাথ,
আইল গোধূলি সৌর রঙ্গ ভূমে,-
নামিল পশ্চিমে ধীরে যবনিকা,
ধূসর বরণা; ফুরাইল ক্রমে
দিনেশ দৈনিক গতি অভিনয়।
অষ্টমীর চন্দ্ররজতের চাপ!
নভোমধ্যস্থলে বিষণ্ন বদনে
ভাসিল; লভিতে যেন প্রিয় রবি
আলিঙ্গন, ভ্রমিঅলক্ষেতে শশি
অর্ধ সৌর রাজ্য বিরহেতে কৃশ,

নিরাশা মলিন।

2 comments:

অনি said...

fatafati :) ... khanik agochalo ... jeno moner ek kone joma dhulo hathat domka batase elomelo ...khub valo

Digital Bangla News said...

সারাদেশে আজকের আবহাওয়ার খবর বা বার্তার পূর্বাভাস, সংকেত এলার্ট, বর্তমান তাপমাত্রাসহ সারাদিনের অবস্থা জানাতে পাতাটি প্রতিদিন আপডেট করা হয়।