Sunday, October 18, 2015

Post 30: সুনীল সাগরের শ্যামল কিনারে

প্লেনটা প্রায় আধঘন্টা লেট করল। এমনিতে ট্রেনের চেয়ে প্লেন লেট করলে আমার বিরক্তি বেশি হয়। কারণ প্লেনে উঠলেই বেশীরভাগ মানুষ কেমন যেন এলিট মুখ করে কানে হেডফোন গুঁজে চোখ বুজে বসে থাকেন। এক্ষেত্রে আধঘন্টা লেট করার জন্য আমার বিরক্তির উদ্রেক হওয়াটা খুব স্বাভাবিক এবং যুক্তিসংগত ছিল, কিন্তু হল না। না হাওয়ার একটা কারণ যদি হয় এরকম একটা ছোট প্লেনে চড়ার প্রথম অভিজ্ঞতা, দ্বিতীয় কারণ অবশ্যই জানালা দিয়ে দেখতে পাওয়া অনন্য সুন্দর ভূপ্রকৃতি।
চলছি গোয়া, গিন্নিকে নিয়ে। মাঝ সপ্তাহে ছুটি পাওয়াটা দুজনের কাছেই চ্যালেঞ্জের ছিল। কিন্তু পিছপা না হয়ে মৃত আত্মীয়দের আর একবার মৃত্যু ঘটিয়ে পালালাম অফিস থেকে। আর পাঁচজন গোয়া যাত্রীর মত মদ্যপান আর নাইটক্লাব আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না। উদ্দেশ্য ছিল পর্তুগিজ গোয়াকে চোখে দেখা। আর তার জন্যই ভীড় থেকে বাঁচতে এমন বর্ষায় গোয়া যাত্রা।
গুগুল ম্যাপ বলল, এয়ারপোর্ট থেকে আমাদের হোটেল নাকি প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূর। ঘড়ি বলছে বেলা প্রায় দুটো, খিদে চুই চুই পেটে লোকাল ট্রান্সপোর্ট এর ভরসা না করে প্রিপেইড ট্যাক্সি নিয়ে গা এলিয়ে দিলাম। সবুজ পাহাড় আর নীল সমুদ্রের কোলের মধ্যে দিয়ে গাড়ি ছুটে চলল ক্যান্ডলিমের দিকে। গাড়িতে বসে ভাবলাম একটু ঝালিয়ে নেওয়া যাক ইতিহাস।
পুরাণ বলছে, ঋষি পরশুরাম সহ্যাদ্রি (পশ্চিমঘাট পর্বত) থেকে একটি তীর ছোড়েন সমুদ্রের দিকে। আক্রোশের সঠিক কারণ জানি না কিন্তু সেই তীরের ভয়ে সমুদ্র পিছিয়ে যায়। তার ফলে যে স্থলভাগ জেগে ওঠে, তাই হল অধুনা গোয়া। মহাভারতে যার নাম আছে – গোপ রাষ্ট্র অর্থাৎ কিনা গোপালকের দেশ। পরবর্তীকালে ষোড়শ শতকে পর্তুগীজরা যখন গোয়াকে দখল করে, তখন তারা এর নাম পরিবর্তন করে রাখে “গোয়া”।
মৌর্য্য সাম্রাজ্যের পতনের পরে ভোজ রাজবংশ গোয়াতে রাজত্ব্ করে বেশ কিছু দিন। এরপর গোয়া এসেছে বিভিন্ন রাজবংশের অধীনে। সাতবাহন, চালুক্য, কদম্ব প্রভৃতি। অবশেষে ১৩১১ খ্রীস্টাব্দে দিল্লির মুসলিম শাসনে আসে গোয়া। কিন্তু জল পাহাড় ঘেরা এদেশে শাসন কায়েম রাখতে ব্যর্থ হন দিল্লীর সুলতানও। গোয়া চলে আসে বিজয়নগর সাম্রাজ্যের অধীনে। সদ্য স্থাপিত বিজয়নগরের রাজা তখন প্রথম হরিহর। এরপর প্রায় একশ বছর গোয়া বিজয়নগর সাম্রাজ্যের অধীনে থাকে। ১৪৭০ সালে গুলবর্মার বাহ্মনী রাজারা দখল নেয় গোয়ার। কিন্তু তাদের অধিকার করার কয়েক বছরের মধ্যেই সুলতান ইউসুফ আদিল শাহ্ গোয়াকে করায়ত্ত করেন। তখন পর্তুগীজ ব্যবসায়ী আর মিশনারীরা পা রেখেছেন এই দেশের মাটিতে। ক্রমে বণিকের মানদন্ড শাসকের রাজদন্ডে পরিনত হয়ে গেল। ইউসুফ আদিল শাহ্কে পরাস্ত করে গোয়া চলে গেল পর্তুগীজদের হাতে এবং তারপর প্রায় সাড়ে চারশ বছর গোয়া রয়ে গেল পর্তুগীজ উপনিবেশ হিসাবেই।
এইসব সাতপাঁচ পড়তে পড়তে অনেকটা চলে এসেছি। হুঁশ ফেরে মনীষার ডাকে - “দ্যাখ, দ্যাখ কি দারুণ!’’ মোবাইল ছেড়ে তাকাতে দেখি পার হচ্ছি জুয়াড়ি নদী। একদিকে রেলব্রীজ, অন্যদিকে নদী গিয়ে মিশেছে সমুদ্রের বুকে, গোয়ার মধ্যে দিয়ে আড়াআড়িভাবে প্রধান দুই নদী বয়ে গেছে। তার মধ্যে একটি হল জুয়াড়ি, অপরটি গোয়ার রাজধানী পাঞ্জিমের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া মান্তবী নদী।
প্রায় একঘন্টা পর আমাদের হোটেলে পৌঁছাল আমাদের ট্যাক্সি। মালপত্র ঘরে নিয়ে পৌঁছেই বেরিয়ে পড়লাম দুজনে। প্রথম উদ্দেশ্য খিদের আগুন নেভানো, দ্বিতীয় কারণ, সামনেই ক্যান্ডলিম বিচ। মনীষা বলল, চল আগে বিচে যাই, তারপর নাহয় খাবার জায়গা খুঁজব।
এক সমুদ্র শহরের বাসিন্দা হওয়ার কারণে সমুদ্রতটের প্রতি আমার আকর্ষণ কম। আসলে তটটুকু বাদ দিলে বাকি সমুদ্রটুকু আমার কাছে ভয়ঙ্কর রকম একঘেয়ে লাগে। একটা অসম্ভবরকম মনোটোনাস ভাবে খালি আকাশ রাঙ্গা জলরাশি।
তাও জলের দেশে এলে জল তো দেখতেই হয়। ক্যান্ডলিম অপেক্ষাকৃত কম জনবহুল। সমুদ্রের ধারেই পেয়ে গেলাম একটা স্যাক, তিনদিক খোলা, মাথায় ছাউনিযুক্ত রেস্তোরা। ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী সবসময়ই গদ্যময়। তাই ক্যামেরার ব্যাগমুক্তি ঘটল না। দুজনেই স্যাক এর ভিতরে ঢুকে মেনুকার্ড তুলে নিই হাতে।
খাবার আসতে আসতে এক ঝলক বৃষ্টি হয়ে গেল। আকাশটা ভারী হয়েছিল বেশ অনেকক্ষণ ধরেই। গোয়া পশ্চিমঘাট পর্বতের পশ্চিম পাদদেশে হওয়ায় বৃষ্টিপাত নাকি সাংঘাতিক হয়। আর সেই কারণে অধিকাংশ অট্টালিকার ঢালু ছাদ, যাতে জল জমে না থাকে।
ভেজা বালির ওপর দিয়ে বেশ খানিকটা হেঁটে ফেললাম দুজনে। পায়ের হাওয়াই চপ্পল হাতে নিয়ে মনীষা বলল ওই ঢিবিটার ওপর উঠে বসি। বসলাম দুজনে। সব কিছুর ওপরে গোয়া আসার একটা মস্ত কারণ ছিল, দুজন মিলে খানিকটা সময় কাটানো। চাকরির চোটে দুজনের কথাবার্তা দুরে থাক, দেখা হওয়াই প্রায় বন্ধ হওয়ার যোগাড়। তাই মাঝে মধ্যেই বেরিয়ে পড়ি এদিক সেদিক। আর কিছু না হোক একটু গল্প তো হবে।
ভারতের পশ্চিম উপকূল হওয়াতে সন্ধ্যা দেরিতে নামে। বসে থাকি ভেজা বালিতে। মেঘের পর্বতের পেছনে সুয্যিদেব কখন যে আরব সাগরে ডুবটি দিলেন টেরও পেলাম না। তবু মেঘের রং ঘন হয়ে আসে মন্দ মন্থরে সন্ধ্যা নেমে আসে ক্যান্ডলিম বিচের ওপর।
সকালটা যে ভিজে থাকবে তা রাতেই টের পেয়েছিলাম। শোয়ার সময় কানে এসেছিল মেঘের ডাক। ঘুম ভাঙতে বারান্দায় বেরিয়ে দেখি ভেজা রাস্তাঘাট। বৃষ্টি ধরে গেছে, কিন্তু মাটির সোঁদা গন্ধ যায়নি।

আজ আমাদের প্ল্যান ছিল উত্তর গোয়া ঘুরে দেখার। উত্তর গোয়া মূলতঃ ভিড়ে ভরা, পর্যটকদের আকর্ষণের সমস্ত উপকরণ যুক্ত। গোয়ার পৃথিবী বিখ্যাত অধিকাংশ বিচ উত্তর গোয়াতেই।
আমরা একটা গাড়ি ঠিক করে নিয়েছিলাম। কথা হল, ঘুরিয়ে দেখাবে বিচগুলো। তার সাথে আগুয়াড়া দুর্গ। ক্যালাঙ্গুট বিচের কাছ থেকে গাড়ি চড়ে চললাম প্রথমে আগুয়াড়া দুর্গের দিকে। ১৬১৩ সালে ডাচ্ এবং মারাঠিদের সামলানোর জন্য এই দুর্গ তৈরী হয়। সমুদ্র, পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে রাস্তা বেয়ে আগুযাড়া দুর্গে পৌছলাম, তখন মধ্যাহ্ণ। যদিও মেঘলা দিনে বেলা বোঝার উপায় নেই।
আগুয়া (Agua) শব্দের অর্থ জল, পর্তুগীজে। এই দুর্গ ছিল তৎকালীন পশ্চিম উপকুলের এক ল্যান্ডমার্ক। ইউরোপীয় বাণিজ্যতরী যত যেত – এই দুর্গের কাছে আসত পানীয় জল সংগ্রহের জন্য। সমুদ্রের একদম লাগোয়া আগুয়াড়া দুর্গের ভিতরে একটি লাইট হাউজও রয়েছে দেখলাম।
মন ভরে ছবি তোলার পর গাড়ি করে আবার চলা শুরু। এবার গন্তব্য ভাগাতুর বিচ। উত্তর গোয়াতে পর্যটকদের আকর্ষণ করে যে বিচগুলি, তার মধ্যে ভাগাতুর অন্যতম। পাথুরে সমুদ্রতট, মেঘ ঝুলে থাকা আকাশ তার নিরন্তর ঝাঁপিয়ে পড়তে থাকা ঢেউ। সবমিলিয়ে যেন এক সিম্ফনি বসিয়ে দিল মনের মধ্যে। কানে যেন ভেসে এল কোন দূরাগত গান – হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ঐশ্বরিক কন্ঠে বেজে উঠেছে –
“....শুধু সঙ্গে তারি গাইত আমার প্রাণ,
সদা নাচত হৃদয় অশান্ত।
হঠাৎ খেলার শেষে আজ কি দেখি ছবি –
স্তব্ধ আকাশ, নীরব শশী রবি,
তোমার চরণ– পানে নয়ন করি নত
ভুবন দাঁড়িয়ে আছে একান্ত।।”
এরপর একে একে দেখে নিলাম আজুনা, ক্যালাঙ্গুট, বাগা বিচ। কিন্তু ভাগাতুরের মতো কাউকে লাগল না। আসলে স্থান, কাল আর পাত্রের মিলেমিশে জন্ম নেয় কিছু মূহুর্ত। সেই সব মূহুর্তের জীবনকাল বিশ্বকর্মার কারখানায় তৈরী হওয়া মহামূল্যবান আংটির টপ করে সমুদ্র অতলে মিলিয়ে যাওয়ার মতো ক্ষণস্থায়ী কিন্তু মোহময়। ভাগাতুর বিচে কাকের গলার রঙের আকাশের তলায় আসামীকে সাক্ষাৎ করাটা এমনই কোনও এক মুহুর্ত জন্ম দিয়েছিল হয়ত আমার মনের মধ্যে।
পরদিন ঠিক করলাম ঘুরে দেখব পুরনো গোয়া, অর্থাৎ কিনা দক্ষিণ গোয়া। দক্ষিণ গোয়াতে আমার মূল আকর্ষণ ছিল গীর্জা। Bom Jesus Basillica – যেখানে রাখা আছে সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্সের দেহ। গোয়া ট্যুরিজমের বাসে চেপে পড়লাম। যাত্রাপথে পড়বে কোলাবা বিচ, মারিন মিউজিয়াম, এক পর্তুগীজ অট্টালিকা, শান্তদুর্গা মন্দির এবং সবশেষে দুটি গীর্জা। এর মধ্যে কোলাবা নাকি ভারতবর্ষের দীর্ঘতম বেলাভূমি। দ্বিতীয় আমাদের চেন্নাই-এর মারিনা বিচ। আকাশ বেশ পরিষ্কার ছিল। বিস্তৃত বেলাভূমিতে লোকসংখ্যা বেশ কম। কিছু সোনালী চুল বিদেশিনী রোদ পোহাচ্ছে। গোয়ার সাগরে সবুজ এমন মিশে থাকে, রবি ঠাকুরের ওই গানটা বরাবর মনে পড়ে – ‘সুনীল সাগরের শ্যামল কিনারে,’। আজ পথে যেতে দেখে নিলাম সোনালী চুলের তুলনাহীনাকে।
কোলাবা বিচ, মারিন অ্যাকোরিয়াম দেখে বাস ছুটল পর্তুগীজ অট্টালিকার দিকে। ততকালীন পর্তুগীজরা এদেশের মানুষদের সাথে তাদের শ্রেণীপার্থক্য প্রকট রাখার জন্য বাড়িও বানাত উঁচু ভিতের উপর। বেশ কিছু সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয় সদর দরজায়। প্রকান্ড অট্টালিকার ভিতর প্রচুর ঘর। প্রতি ঘরেই লাইট এন্ড সাউন্ডের মাধ্যমে দেখানো রয়েছে ততকালীন জীবন যাপন, বেশ সুন্দর টাইম ট্রাভেল। পুরনো স্থাপত্যের প্রতি আমার ব্যক্তিগত একটা ভালোলাগা আছে। কতকালের সব বাড়িঘর। যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, ঠিক সেই জায়গাতেই হয়ত ঝরে পড়েছিল কোনও অত্যাচারিতর নীরব অশ্রু। অথবা ওই গুমঘরের মধ্যে বন্দী হয়ে মরেছে কতজন – তাদের কেউ কেউ হয়ত আজও কেঁদে ফেরে এ বাড়ির অলিন্দ দিয়ে।
গোয়ার পর্তুগীজ জীবনকে প্রতক্ষ্য করে এগিয়ে চলা প্রাচীনতর নিদর্শনের দিকে, শান্তদুর্গা মন্দির। একবার শিব আর বিষ্ণুর মধ্যে ঝগড়া হয় – কে মহানতর তাই নিয়ে। দুজনে মিলে সহ্যাদ্রি পর্বতে এসে লড়তে থাকেন। দুই মহাশক্তির লড়ায়ের ফলে বিশ্ব যখন রসাতলে যাওয়ার যোগাড়, তখন সব দেবতারা পার্বতীকে এসে ধরেন, ওদের শান্ত করার জন্য। পার্বতী দুর্গা রূপে আবির্ভুত হয়ে মধ্যস্ততা করে তাদের শান্ত করেন। তাই তার নাম হয় শান্তদুর্গা।
এখানে মন্দিরগুলোর একটা অদ্ভুত সৌন্দর্য আছে। মন্দিরের গর্ভগৃহের উপর যে চূড়া বা গম্বুজ দেখা যায় তা এখানে অনুপস্থিত। বদলে সুবৃহৎ অট্টালিকার মত ঢালু ছাদ। আর একটি বৈশিষ্ট্য হল মন্দিরের সামনে অবস্থিত সপ্ততল স্তম্ভ, তার ওপরে দীপ। মানুষকে নাকি সাতবার জন্মাতে হয় – সম্পূর্ন মোক্ষের আগে। তারই প্রতিভূ এই সপ্ততল মিনার।
মন্দিরের পর থামা হল দ্বিপ্রাহরিক ভোজের জন্য। পাহাড়ের উপরে টুরিস্ট ডিপার্টমেন্টেরই রেস্টুরেন্ট। খাবারের মান সেরকম ভালো না হলেও খিদের পেটে সব কিছুই সুখাদ্য লাগে। খেয়ে নিলাম গপ্গপিয়ে। তারপর আবার চলা। এইবেলা চলতে চলতে গোয়ার খাবার নিয়ে দুকথা বলে রাখি। সমস্ত জায়গারই কিছু সিগ্‌নেচার ডিশ থাকে। গোয়া সমুদ্র লাগোয়া হওয়ার এখানে সি-ফুডের রমরমা। তার পাশাপাশি ইউরোপীয়ান আর ভারতীয় খাবারের মিশেলে তৈরী হয়েছে বিশুদ্ধ গোয়ানীজ কুইজিন, যার মধ্যে জাকুতি বা ভিন্ডালু কিন্তু বেশ বিখ্যাত।
খাবার কথা ভাবতে ভাবতে পৌঁছে গেছি গোয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত গীর্জা Bom Jesus Basillica -তে। এখানেই শায়িত আছেন সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স। এই অঞ্চলকে বলা হয় ওল্ড গোয়া। পর্তুগীজরা আসার পর এখানেই তাদের রাজধানী করেছিল। পরে এখানে প্লেগের প্রকোপ বাড়ায় রাজধানী পরিবর্তন করে পানাজি বা পাঞ্জিমে।
এই গীর্জা ভারতবর্ষের অন্যতম প্রাচীন। ১৬০৫ সালে তৈরী শেষ হয়। ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স চিনে দেহরক্ষা করলে, তার দেহ প্রায় দুই বছর পর নিয়ে আসা হয় গোয়াতে। এবং আশ্চর্য্যজনকভাবে এই দুই বছরে তাঁর দেহে কোনও পচন বা ক্ষয় হয়নি। গোয়ার এক ডাক্তার জেভিয়ার্সের ডান হাতটি কেটে নেন গবেষনার জন্য। কিন্তু রহস্য ভেদ হয় না। সেন্টের দেহ তখন টাস্কানির ডিউক কসিমো দ্য থার্ড-এর দেওয়া একটি কাসকেটের মধ্যে সংরক্ষিত করা হয়। এমনিতে কাসকেটটি গীর্জার ভিতর একটি উঁচু বেদিতে রাখা থাকে। প্রতি দশ বছরে তাকে বাইরে নিয়ে আসা হয়, মানুষকে কাছ থেকে দেখবার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। রাখা হয় ঠিক উল্টোদিকে অবস্থিত Se Cathedral এ।
Bom Jesus Basillica থেকে বের হয়ে রাস্তার অপর পারের Cathedral এ পৌঁছাই। প্রাচীন গোয়ার অনেক সাক্ষ্য ছড়িয়ে আছে এদিক ওদিক। রয়েছে মিরাকুলাস ক্রশ –যা নাকি গত প্রায় চারশ বছর ধরে নিজে নিজেই বাড়তে থাকে আকারে। এই প্রাচীন স্থাপত্যের মধ্যে দাড়িয়ে থাকলে সমস্ত কিংবদন্তিকে খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয়। চারশ বছর আগের জেসুইস্টেদের ধর্মপ্রচার, সাধারন মানুষকে জোর করে ধর্মান্তরিত করা –এই সব কথা যেন নীরব হয়ে রয়েছে এই সুবিশাল সব স্থাপত্যের আনাচে কানাচে। ইতিহাস, কান্না, রক্তের সাক্ষী এই সমস্ত ঠান্ডা দেয়ালে কান পাতলেই শোনা যাবে ঘোড়ার খুরের শব্দ, গাদা বন্দুকের গুলি বা নীরব প্রার্থনা।
দিন শেষে ফিরে চলি। আমোদ উৎসবের পিছনে ঢাকা পড়ে যাওয়া ইতিহাসের গোয়াকে একটু হলেও ছুঁতে পেলাম। ছড়িয়ে থাকা আরও বহু গীর্জারা অদেখা রয়ে গেল তাদের না জানা কত কিংবদন্তি নিয়ে। আসার পথে দেখলাম সেই ব্রীজ – যাকে গোয়ার শেষ ভাইসরয় ১৯৬১ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর আগ্রাসন ঠেকাতে ধ্বংস করে দিয়ে যান। পরে অনেক যোগাযোগ স্থাপন হয়েছে। কিন্তু হয়তো ঐ ব্রীজের মতোই এতো বছরের মাটির গন্ধ মাখা গোয়ার ইতিহাস অবহেলিত হয়ে পড়ে থাকে ভগ্নপ্রায় হয়ে। আবার ইচ্ছা রইল ফিরে আসার, না শোনা অনেক গল্পকে শোনার জন্য।

Thursday, October 8, 2015

Post 29: ।। আকাশপারের মেয়ে ।।

আকাশপারের মেয়ে
রোদ্দুরটা আমায় দিল
আঁধারটুকু নিয়ে।
ঝড়-বাদলের দিন!
ঝড়টা রেখে বলেছিল
‘বৃষ্টি ফোঁটা নিন’।
তেপান্তরের মাঠ!
পক্ষীরাজটা আমি-ই পেলাম
একাকী সম্রাট!
আকাশ অনেক দূর!
হাতে ছিল তানপুরাটা
আমায় দিল সুর।
সুর-রোদ্দুর হাতে
পার হয়েছি এদেশ-ওদেশ
পক্ষীরাজের পিঠে।
ভুলেই গেছি তাকে –
হঠাৎ, মেঘের রাজ্য থেকে
দেখতে পেলাম – অনেক নীচে অচেনা এক বাড়ি,
আকাশ-মেয়ে রোদ্দুরে দেয় বেগ্‌নে রঙের শাড়ি।

Thursday, August 13, 2015

Post 28: দাদান

কিছু মানুষ থাকেন যাঁরা গল্প বলতে পারেন খুব সুন্দর। সেরকম একজন আমার ঠাকুরদাদা, যাঁকে আমি দাদান বলেই ডাকি। আমার ছোটবেলায়, যখন অক্ষর পরিচয় ঘটেনি, দাদানের মুখের গল্পই ছিল সাহিত্যের সাথে আমার প্রথম পরিচয়। আমার দিব্যি মনে পড়ে ইস্কুলে ভর্তি হওয়ার পর মিস্‌রা বেশ চমকে গিয়েছিল আমার মহাভারত বা রামায়ণের প্রায় সব ঘটনাবলী কন্ঠস্থ দেখে। এর সমস্তটাই দাদানের মুখের গল্প শুনে।
মানুষ যখন নির্মিত হয়, তার সাথে মহিষাসুরমর্দিনীর এক মিল থাকে। তিলোত্তমা কে যেমন ব্রহ্মা, বিষ্ণু আর মহেশ্বর নিজের নিজের তেজ পুঞ্জিভুত করে সৃষ্টি করেছিলেন এবং সমস্ত দেবতারা নিজেদের অস্ত্র দিয়ে সজ্জিত করেছিলেন তাঁকে, মানুষের নির্মাণটাও ঠিক সেই ভাবেই হয়। আশ-পাশে ঘিরে থাকা আত্মীয় বা অনাত্মীয় মানুষদের থেকে প্রেরণা বা বোধ সঞ্চয় করে তার জীবনবোধ গড়ে ওঠে। আমিও তার কোনও ব্যতিক্রম নই। আমার বাবা যদি আমার বিজ্ঞান বোধের জন্য দায়ী হয়, আমার দাদান ছিল আমার সাথে বিশ্ব সাহিত্য এবং চলচ্চিত্রের সাথে যোগসূত্র। ছোট্টবেলার আনন্দমেলা পড়ে শোনানো থেকে শুরু করে 'দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন'এর গল্প। বড় হয়ে ছবিটা দেখেও সেই উপভোগ্যতাটা পাইনি যেটা ছিল দাদানের গল্পে। তাঁর অফুরন্ত গল্পের স্টক। আমার হাই স্কুল পার হয়ে যাওয়া অবধি একটা গল্প দ্বিতীয়বারের জন্য রিপিট হয়নি কখনো।
দাদান টাকী রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্র। ইস্কুলের গল্প শুনেছি ছোটবেলার থেকে। প্রতি গরমের ছুটির আগে নাকি মঞ্চ বেঁধে নাটক হত। দাদান তাতে পার্ট করত। তখন আমি সদ্য ক্লাশ ওয়ান। দাদানের মুখেই শোনা বৃত্রাসুরের গল্প নিয়ে আমার খাতার পিছনে লিখে ফেললাম একটা 'নাটক'। গরমের ছুটির আগের দিন ক্লাশের বন্ধুরা মিলে করেও ফেললাম। হাততালি কুড়োলাম বেশ। তারপর থেকে যতদিন ওই স্কুলে ছিলাম, কোনওবার রামু নামের এক ভুলো চাকরের গল্প, কোনোবার রবীন্দ্রনাথের গেছোবাবা অথবা সুকুমারের অবাক জলপান - নাটক বাদ পড়েনি একবারও।
বড় হওয়ার পর যখন নানারকম সুবিধা-অসুবিধার কারণে বাবা-মা আলাদা হয়ে চলে আসি অন্য বাড়িতে, প্রতি শনিবার হলেই দাদানের কাছে যাওয়াটা মিস্‌ হতনা - শুধুমাত্র গল্প শোনার জন্য। গল্প শুনতে শুনতেই শুনেছিলাম, তার রবীন্দ্রনাথের শেষযাত্রায় যোগ দেওয়ার কথা, শুনেছিলাম তার সত্যজিতকে দেখা - কোনও এক কনসার্ট হলের বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গান শুনতে। গল্প শুনেই জেনেছিলাম, হিচককের বার্ডস্‌, সাউন্ড অফ মিউজিক অথবা চার্লি চ্যাপলিনের গল্প।
কাল রাতে অফিস থেকে ফেরার পর যখন হঠাত ফোনে শুনলাম মানুষটা হঠাত নেই - অজস্র স্মৃতির ভীড়ে হারিয়ে ফেলেছিলাম নিজেকে। অনেকরাতের কোন বিমান না থাকায় তাঁকে শেষবারের মত বিদায় জানাতে পারলাম না। এখনো কোলকাতায় ফিরলে ক্ষীণ হয়ে আসা কন্ঠস্বরেও আমায় কাছে বসিয়ে একের পর এক গল্প বলে যেতেন - হয়ত সেগুলো আমার বহুবার শোনা বা পড়া - তবুও চুপ করে শুনে যেতাম - গল্প বলাটা যে একটা আর্ট সেটা শিখিনি, কিন্তু বুঝেছি দাদানের কাছ থেকে। ভালো থেকো দাদান।

Wednesday, May 13, 2015

Post 27: Kadombori - chhobi

কাদম্বরী দেখলাম কিছুদিন আগে আনন্দবাজারে কাদম্বরী ছবির প্রিভিউ হিসাবে রবি ঠাকুরেরবৌদিবাজিনিয়ে একটি ফিচার বেরিয়েছিল সেখানেবৌদিবাজিশব্দবন্ধ তে আমার তীব্র আপত্তি ছিল আনন্দবাজারের সস্তা পাবলিসিটির জন্যবৌদিবাজিজাতীয় শব্দবন্ধ ব্যবহার একটি বিরক্তির উদ্রেক করেছিল আমার মনে মনে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ স্তরের শিল্পী তথা দার্শনিকের ব্যক্তিগত জীবনের সম্পর্কের নামকরণের প্রতি আরও যত্নশীল হওয়া উচিত
কাদম্বরী দেখলাম বাস্তবিকই তাই দাঁড়ালো, থুড়ি, বলা ভালো দাঁড় করানো হল
কালকেই পিকু এবং বেলাশেষে বিষয়ক পোস্টটি পড়ে কোলকাতার একজন বিখ্যাত শিল্পী আমায় একটি মেসেজ করেন তাতে তিনি বলেন যে আজকাল সবাই পরিচালক হয়ে যাওয়ার দরুন, সিনেমার স্বীয় ভাষা ধীরে ধীরে লোপ পেয়ে যাচ্ছে তার জায়গায় কিভাবে সহজে লোক টানা যাবে তার প্রতিযোগিতা বাস্তবিকই তাই কাল অমিতাভ বচ্চনের জোর করে বাঙলা বলা যেমন বিরক্তির উদ্রেক করছিল, ঠিক তেমন ভাবেই আজকের রবীন্দ্রনাথ, কাদম্বরী, জ্যোতি দাদা, সুমন ঘোষ সবাই মিলে বিরক্ত করে গেলেন গোটা সিনেমা জুড়ে
পরিচালক হিসাবে সুমন ঘোষের প্রতি আমার প্রথম আপত্তি এই যে, তিনি স্ক্রিপ্টটি কপি পেস্ট না করে নিজে হাতে লিখলে ভালো করতেন। গোটা ছবিটি দেখে মনে হল, প্রথম আলো আর কবির বৌঠানের পাতা কেটেছেন আর সেঁটেছেন। তাও যদি সাজানোটা ঠিক হত! ইতিহাস যতদূর বলে, চন্দননগরের মোরান সাহেবের বাড়ি ছাড়ার পর সদর স্ট্রীটের বাড়িতে থাকার সময়নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গলেখেন রবীন্দ্রনাথ। সদর স্ট্রীটের বাড়ির ফলকও সেই কথা জানায় আমাদের। এক্ষেত্রে দেখলাম, চন্দননগর যাওয়ার আগে জোড়াসাঁকোর বাড়িতেই লিখে ফেললেন তিনি। লিখলেন বেশ, কিন্তু পরমব্রতর নরম গলার আবৃতি শুনে কাদম্বরী এত উতলা হয়ে প্রথম আলোর সংলাপ আউড়ে গেলেন কেন, তাও জানিনা – “তোমার আজ কী হয়েছে, রবি?”
গোটা ছবি জুড়ে একটাও চরিত্র নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারল না। মানছি যে ঠাকুরবাড়ির বিশাল পরিবারের অগুন্তি সদস্যদের সকলকে এই দেড় ঘন্টা সময়ে চরিত্রায়িত করা সম্ভবপর নয়, কিন্তু প্রধান তিনটি চরিত্র? জ্যোতিরিন্দ্রনাথ কে মনে হল লুম্পেন, রবীন্দ্রনাথবৌদিবাজএবং কাদম্বরী গায়ে পড়া বৌদি বিশেষ। ভয় পাচ্ছিলাম, বৃষ্টির রাতে রবীন্দ্রনাথ যখন সত্যেন্দ্রনাথের জন্মদিন থেকে ফিরে এলেন, তখন একটা বেড সীনই না ঢুকিয়ে দেন পরিচালক। সুনীল গাঙ্গুলিকে ধন্যবাদ তার জন্য (কারণ, ওই অংশটা প্রথম আলো থেকে কাটা ছিল) বাকি চরিত্রদের তো ছেড়েই দিলাম। জ্ঞানদানন্দিনী তো টেলি সিরিয়ালের হিংসুটে জায়ের ভুমিকায় বেশ সাবলীল অভিনয় করলেন।
আসলে রবীন্দ্রনাথ বা তাঁর সমজাতীয় কবি বা দার্শনিকদের মনোজগতে বিচরণ করার জন্য কপি পেস্ট করলে চলেনা। তাঁরা তো আমার আপনার মত সকালে অফিস, সন্ধ্যায় আই পি এল, রাতে সিরিয়াল দেখতে দেখতে রুটি আর আলুচচ্চরি খাওয়া মানুষ নন। তাঁদের ভাবজগতে নারীর অধিষ্ঠান শুধু রমনের জন্য থাকেনা, থাকে শিল্পের জন্য। রবীন্দ্রনাথের সাথে কাদম্বরীর সম্পর্কটা নিছক দেওর বৌদি বা পরম নির্ভরশীল বন্ধুর বাইরেও এমন কিছু ছিল যা জন্ম দিয়ে গেছে বহুবিধ সাহিত্যসুধা। রবীন্দ্রনাথের বিয়ের সাথে সাথে কাদম্বরীর প্রতি তাঁর অবহেলা বা উপেক্ষার কারণও সেটাই যে কবি তখন অন্য এক নারীর মধ্যে তাঁর সেই সৃষ্টির প্রেরণা বা প্রেমের সংজ্ঞা অনুসন্ধানে নিবদ্ধ করেন নিজেকে। কাদম্বরীর প্রতি তাঁর বন্ধুত্ব বা ব্যক্তিগত ভাবাবেগ হ্রাস পায়নি, সৃষ্টির প্রেরণাটুকু হয়ত দিনেকের জন্য পরিবর্তিত হয়েছিলো। এই ট্রানজিশনটাই গোটা ছবির মধ্যে অনুপস্থিত রয়ে গেল। ঠিক যেমন অনুপস্থিত রয়ে গেল জ্যোতিদাদার অনন্যসাধারণ প্রতিভার প্রকাশ। দু একবার ভায়োলিন বাজানো আর উনি এই করেন তাই করেন বলে ডায়লগ দিয়ে সহজে সব কাজ কি সারা যায়, সুমন বাবু? সৃষ্টি এত সহজ নয়।
আর হ্যাঁ, ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা বাড়ির সবার জন্য রোজকার রান্না নিজেরা করত দেখে তাজ্জব হলাম বটে!