Wednesday, April 27, 2016

Post 31: কেরী সাহেবের কিচেন ১

[ বাঙালীর সাথে খাওয়া ব্যাপারটা এতটাই ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গেছে যে তাকে ছাড়ানোই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই যে দেখুন, facebook-এ এক একটা গোটা গ্রুপ জুড়ে সকাল থেকে খালি খাই-খাই-খাই করতে লেগেছে সবাই। বেলের পানা থেকে লাউএর পায়েস হয়ে যেই লাঞ্চের দিকে গড়াবে গড়াবে করছে ব্যাপারটা একটা ঘটনা মনে পড়ল। বাঙালীর এক অজ্ঞাত ইতিহাস। হঠাত একদিন চোখের সামনে খুলে গেছিল আমার।
সেদিন কলেজ থেকে বেরিয়ে মনটা খাই খাই এমন করতে লাগল যে কী বলব! ইচ্ছে হল পুঁটিরামে ঢুঁ দিই। আহা, গরম গরম কচুরি আর একশো মিষ্টি দই। খেলেই মনে হওয় - স্বর্গ যদি সত্যি কোথাও থাকে তা এখানেই - পুঁটিরামের টেবিলে। তো যেমন ভাবা তেমন কাজ। ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে রোদ-চশমা বাগিয়ে কলেজ স্ট্রীট ছেড়ে যেই পা দেব দেব করছি সূর্য সেনে, অমনি ডাক - "ও দাদা, শুনছেন?”
চেনা বইওলা। পুরনো বই এর দোকানের ছায়া থেকে গলা বের করে, দেখি, ইগ্রেটের মত চেয়ে আছেন। শুভ কাজে বাধা পড়ায় বেজায় বিরক্ত লাগল। 
- "কী?” 
- “ এদিকে আসেন"
- “ কেন?”
- “ সেদিন পুরানো কোলকাতার ওপর একটা বই খুঁজছিলেন না?”
-” হুম।"
- “একটা ভালো জিনিস আছে। আসুন। আপনাকে দেখাবো বলে রেখে দিয়েছি।"
কৌতূহল নিরসনে ঢুকেই পড়ি ঠেলেঠুলে। ভদ্রলোক কোথা থেকে একটা ছেঁড়া খোঁড়া ডায়েরী বের করে হাতে দিলেন। উলটে পালটে দেখে তো চক্ষু ছানা বড়া। আশি টাকা দিয়ে কিনেই ফেললাম। তারপর গোটা দশেক কচুরি আর গোটা পাঁচেক রসগোল্লা সহযোগে সেই ডায়রি টা পড়ে ফেললাম। ডায়েরিটা কিছুইনা - একটা রান্নার খাতা, তবে তা এইট্‌টিন্থ সেঞ্চুরির এক ভদ্রমহিলার। বাঙালী। নাম ফুলি। আমাদের উইলিয়ম কেরির রাঁধুনি ছিলেন তিনি। তিনি জানতেন বাংলা রান্না। কেরি সাহেব, ভোলাভালা মানুষ। খেয়ে নেন সব কিছুই। কিন্তু মিসেস কেরির মুখে রোচে না। তাই ফুলিকে শিখতে হল ইংরিজি রান্না। ইংরিজি বাংলার মিশেলে কিছু অপূর্ব পদ আবিষ্কার করেন ফুলি। রামরাম বসুর কাছে লিখতে পড়তে শিখেছিলেন তিনি। আর তাই তাঁর সমস্ত রেসিপি লিপিবদ্ধ করে গেছেন এই খাতায়। সেইসব সাংঘাতিক রান্নাবান্না সবার জন্য পোস্ট করি ভাবলাম। 
ডায়রীর কথা হুবহু তুলে দেব ভেবেছিলুম। কিন্তু পরে ভেবে দেখলুম, তখনকার বাংলা, তায় আবার সদ্য-শিক্ষিতার হাতে লেখা। তাই একটু পরিমার্জন করে নিজের মত করে লেখাটাই ঠিক মনে করলুম। ]
****************************** 
।। ১ ।। 
রান্নাঘরে বসে মাছ কুটছিলাম। বসুদাদা এসে একখান এতবড় ইলিশ মাছ ধপ করে মেঝেতে ফেলে একটা পিঁড়ে টেনে নিয়ে বসল। কপালের ঘাম মুছে বলল, এক ঘটি জল দে তো ফুলি। যা রোদ! 
আমি আঁচলে হাত মুছে কলসি থেকে জল গড়িয়ে দিলাম।
- মেম সাহেবের আবদার। বসুদাদা বলল। 
- কী?
- ওই পোনা মাছ তার রুচছে না। তেল ঝাল ঝোল খেয়ে নাকি পেট ছেড়েছে - বুঝলি? চোখ মটকায় বসুদাদা। বলে, ওই তো সিদ্ধ পোড়া খাওয়া জাত - এসব রান্না কি আর পেটে সয়। কথায় বলে না...
দরজার কাছ থেকে একটা সাড়া পেয়ে বসুদাদা চুপ করে যায়। স্বয়ং মেমসাহেব। ইনি অবশ্য বাংলা বোঝেন না সেরকম। তাই ভয়ের কিছু নেই। মেমসাহেব রান্না ঘরে উঁকি দিয়ে খটমট করে ইংরিজি তে কিসব বললেন। বসুদাদা ঘাড় নেড়ে দিল। মেমসাহেব চলে যেতেই পিঁড়েটা টেনে নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে এসে বলল, বললাম না, সিদ্ধ চাই। 
আমি অবাক হয়ে বলি, মাছ আবার কেউ সিদ্ধ খায় নাকি! 
বসুদাদা হাসি হাসি মুখে বলল, আলবাত খায়! এরা সিদ্ধ মাছ খেয়েই দেশ জয় করে ফেলল রে! 
চিন্তায় পড়ে বলি, কিন্তু বানাব কী করে? 
বসুদাদা বলল, সে আমি জানিনা। তোকে এতগুলো টাকা কেন দেওয়া হয়? উপায় বের কর। আমি যাই, সাহেব এক্ষুনি এত্তেলা পাঠালেন বলে! 
হড়বড় করে চলে গেল। 
আমি গালে হাত দিয়ে ভাবতে বসি এই মাছ নিয়ে কী করি! সিদ্ধ মাছ তো বাপের জন্মে শুনিনি। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে মাছটা ধুয়ে কেটে ফেললাম। মাছ তো সিদ্ধ করে পাতে দিয়ে দিলেই হয় না! একটা স্বাদ বলে তো বস্তু আছে! কেরী সাহেব বলে বেরোন যে ফুলির রান্নার কি স্বাদ! ওই ডাইনি বৌটারই শুধু মুখে রোচে না! এমন দেবতুল্য মানুষকে অমন আলুনি বিস্বাদ মাছ সিদ্ধ খাওয়াতে পারবনা! তাই ভেবে চিন্তে একটু নুন, মরিচ, সরষের তেল (শেষ হয়ে এসেছে, বসু দাদাকে বলতে হবে আনার কথা), পাতি নেবুর রস, হলুদ দিয়ে ভালো করে মাখিয়ে রাখলুম। বসুদাদা একবার এসে ঢুঁ মেরে বলে গেল, কি রে ফুলি রান্না হচ্ছে তো? যেন না পারলে নিজে এসে করে দেবে! পারিনা বাপু! 
বেলা তো গড়াতে চলল। ভাত বসাতে তো হবে! তার আগে একটু লাউ ডাল করে নিলাম। যা গরম। শরীর ঠান্ডা হবে। একেই এরা ঠান্ডা দেশের মানুষজন। 
লাউ কেটে পাতা গুলো রাখা ছিল এক কোণে। ভাত বসিইয়ে মাছের কথা ভাবতেই মনে হল, এক কাজ করা যাক। ভাতের মাড়টা গলে গলে এসেছে এরকম সময়, এক একটা লাউপাতা নিয়ে তার মধ্যে মাখানো এক একটা মাছ রেখে ভাতের মধ্যে দিয়ে দিলাম এক এক করে। দিয়ে আঁচ কমিয়ে দিই উনানের। ওই ভাপেই সিদ্ধ হয়ে যাবে- চিন্তা নেই। 
বসুদাদা এসে বলল, কিরে, সাহেবের তো খিদে পেয়ে গেছে। উশখুশ করছে! তুই মাছ বানাতে তো বেলা শেষ করে দিলি! 
হাসি মুখে বলি, পাত পাড়ো। খাবার হয়ে গেছে।
মেমসাহেব সেই পাঁচন খাওয়া মুখে খেলেও, সাহেব কিন্তু ধন্য ধন্য করলেন। পরে আবার একদিন একগাদা ফিরিঙ্গি ইয়ার বন্ধু কে ডেকে এনে ভোজ দিয়েছিলেন। সেদিনও বানিয়েছিলাম। নাম দিয়েছিলাম - কেরী সাহেবের সিদ্ধ ইলিশ।

No comments: