কেরী'স কিচেন ২।।
এই মদনাবাটি গ্রামে আসা ইস্তক মন ভালো লাগেনা আমার। বসুদাদাও কাল চলে গেল কোলকাতা। বসুদাদার বৌএর নাকি শরীর ভাল নেই। গণেশ বলে একজনকে রেখে দিয়ে গেল। বাজার দোকান ওই করবে।
যেদিন কোলকাতার পাট তুলে সাহেব এই মদনাবাটিতে আসবে বলে মনস্থির করলেন, সেদিনই বসুদাদা এসে আমায় বলেছিল, ফুলি, কোলকেতা ছেড়ে এবার সাহেব উত্তরে যাবেন। তুই যাবি তো?
আমার আর কী! আমার তিনকূলে কেউ নেই। মা বাপ তো সেই কোন ছেলেবেলাতেই গেছে। স্বামীও মরে গেছে আজ কত বছর হল! সেই যেবার খুব জল হল - আমাদের দাওয়া অবধি জল উঠে এল। সেবারেই কলেরা হয়ে শেষ হয়ে গেল। আগের পক্ষের বৌ চিতেয় গেল। আমার আর কি সে কপাল! নেহাত বসুদাদা ছিল, তাই রক্ষে। জন সাহেবের কাছে রেখে গেল। রান্নার জন্য। জন সাহেবও মরে গেলে ওনার বৌ বাচ্চা ফিরে গেলেন বিলেতে। তখন আবার বসুদাদাই আমায় এনে দিল কেরী সাহেবের কাছে।
যাওয়ার আগে আমার কাছে পুঁই চিংড়ি খেতে চেয়েছিল বসুদাদা। আমি তো সকালে উঠে ঊনান জ্বালিয়ে আঁচ গরম করছিলাম। বসুদাদা এসে এক কোণে দাঁড়িয়ে বলল, ফুলি। আমি চললাম।
দেখলাম, মুখটা ভার।
শুধোলেম, কী হয়েছে দাদা?
বসুদাদা মাথা নেড়ে বলল, কিছু না রে ফুলি। কোলকেতা বড় টানছে। তোর বৌদিদিরও নাকি শরীর টা ভালো নেই। পড়শি চিঠি দিয়েছে। তাই ভাবলাম এই গাঁ গঞ্জে পড়ে থেকে কী করব?
- আবার আসবে কবে?
- দেখি। না আসলেই বা কী? তুই তো ভালোই আছিস, সাহেবের কাছে।
- সে তো জন সাহেবের কাছেও ছিলাম।
একটু চুপ করে বলে, আমি আসব আবার। ওদিকটা একটু সামলে নিই।
- কখন যাবে?
- ভাবছি বেলাবেলিই বেড়িয়ে পড়ি।
- দুটি মুখে দিয়ে যেও।
- হ্যাঁ। সে তো যাবই। বলছি, একটু পুঁই চিংড়ি বানাবি? তোর বানানো পুঁই চিংড়ি অনেকদিন খাইনা। মনে বড় সাধ হল।
- সে কথা! তুমি দুটি চিংড়ি এনে দাও আমি এখুনি রেঁধে দিচ্ছি।
যেদিন কোলকাতার পাট তুলে সাহেব এই মদনাবাটিতে আসবে বলে মনস্থির করলেন, সেদিনই বসুদাদা এসে আমায় বলেছিল, ফুলি, কোলকেতা ছেড়ে এবার সাহেব উত্তরে যাবেন। তুই যাবি তো?
আমার আর কী! আমার তিনকূলে কেউ নেই। মা বাপ তো সেই কোন ছেলেবেলাতেই গেছে। স্বামীও মরে গেছে আজ কত বছর হল! সেই যেবার খুব জল হল - আমাদের দাওয়া অবধি জল উঠে এল। সেবারেই কলেরা হয়ে শেষ হয়ে গেল। আগের পক্ষের বৌ চিতেয় গেল। আমার আর কি সে কপাল! নেহাত বসুদাদা ছিল, তাই রক্ষে। জন সাহেবের কাছে রেখে গেল। রান্নার জন্য। জন সাহেবও মরে গেলে ওনার বৌ বাচ্চা ফিরে গেলেন বিলেতে। তখন আবার বসুদাদাই আমায় এনে দিল কেরী সাহেবের কাছে।
যাওয়ার আগে আমার কাছে পুঁই চিংড়ি খেতে চেয়েছিল বসুদাদা। আমি তো সকালে উঠে ঊনান জ্বালিয়ে আঁচ গরম করছিলাম। বসুদাদা এসে এক কোণে দাঁড়িয়ে বলল, ফুলি। আমি চললাম।
দেখলাম, মুখটা ভার।
শুধোলেম, কী হয়েছে দাদা?
বসুদাদা মাথা নেড়ে বলল, কিছু না রে ফুলি। কোলকেতা বড় টানছে। তোর বৌদিদিরও নাকি শরীর টা ভালো নেই। পড়শি চিঠি দিয়েছে। তাই ভাবলাম এই গাঁ গঞ্জে পড়ে থেকে কী করব?
- আবার আসবে কবে?
- দেখি। না আসলেই বা কী? তুই তো ভালোই আছিস, সাহেবের কাছে।
- সে তো জন সাহেবের কাছেও ছিলাম।
একটু চুপ করে বলে, আমি আসব আবার। ওদিকটা একটু সামলে নিই।
- কখন যাবে?
- ভাবছি বেলাবেলিই বেড়িয়ে পড়ি।
- দুটি মুখে দিয়ে যেও।
- হ্যাঁ। সে তো যাবই। বলছি, একটু পুঁই চিংড়ি বানাবি? তোর বানানো পুঁই চিংড়ি অনেকদিন খাইনা। মনে বড় সাধ হল।
- সে কথা! তুমি দুটি চিংড়ি এনে দাও আমি এখুনি রেঁধে দিচ্ছি।
একটু পরে গনেশ এসে এত কটা চিংড়ি রেখে গেল। খোলা ছাড়াতে বসলাম। কত কথা মনে পড়ল। আমার যেটুকু বিদ্যে, সেতো বসুদাদার জন্যেই। আমায় সুযোগ পেলেই অ-আ পড়তে লিখতে শিখিয়েছে। একবারের জন্যেও আমার থেকে দূরে যায়নি। আর আজ এই এতদূরে আমায় ফেলে রেখে...। ঝাপসা হয়ে যায় চিংড়ি গুলো।
সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে সব কটা চিংড়ি ছাড়িয়ে ধুয়ে ফেললাম। আলু, কুমড়ো, পেঁয়াজ কেটে কুটে আগেই রেখে দিয়েছিলাম। শুধু আদা আর রসুনটা কেটে বেটে নিলাম। আর পুঁই শাক তো মাচাতেই হয়। খানিকটা পেড়ে আনলাম। সেটাও কেটে ধুয়ে নিলাম।
রান্নাতে মনই বসছেনা। মা বলত, রান্নার সময় সবসময় মনটা পুরো দিবি। যত মন দিয়ে রান্না করবি, তত স্বাদ ভালো হবে, দেখবি।
কিন্তু এমন দিনে কি আর মন বসে! খালি থেকে থেকে নানা ভয়, আশংকা, নানারকম পুরনো কথা মনের মধ্যে ভীড় করে আসছে। যত সেইসব সরিয়ে রাখতে চাই, ততো যেন চেপে বসে।
চিংড়ি গুলোকে নুন হলুদ মাখিয়ে রেখেছিলাম। এবার কড়াইতে তেল গরম করে হাল্কা ভেজে তুলে রাখলাম থালায়।
বসুদাদা কখন এসে দাঁড়িয়েছে খেয়ালই করিনি।
- কি রে ফুলি, কাঁদছিস কেন?
তাড়াতাড়ি কাপড়ে চোখ মুছে বলি, ও কিছুনা দাদা, পেঁয়াজের ঝাঁঝ।
বসুদাদা কী বোঝে জানিনা। আমার মাথায় হাত রেখে বলে, আমি কথা দিচ্ছি, ঠিক ফিরে আসব। আর তোকে তো লেখা পড়া শিখিয়েছি। কিছু বলার থাকলেই চিঠি দিস। আমি আসব।
বলে তাড়াতাড়ি চলে গেল রান্নাঘর থেকে।
আমি আবার রান্নায় মন দিই। যাওয়ার আগে যেন মানুষটাকে খারাপ কিছু না খাওয়াই। পেঁয়াজ, আদা, রসুন বাটা সব একসাথে নিয়ে কড়াতে পাঁচফোড়ন দিয়ে একটু নাড়িয়ে নিলাম। তারপর আলু আর কুমড়ো দিয়ে দিলাম ওর মধ্যে। যখন বেশ ভাজা ভাজা হয়ে এসেছে, পুঁইশাক দিয়ে নুন আর অল্প চিনি দিয়ে বসিয়ে দিলাম ঢাকা দিয়ে।
একবার জন সাহেবের বাড়িতে তখন রান্না করি, এইসব ইংরিজি ঠাঁটবাঁট বুঝিও না, পারি তো নাই। জন সাহেবের শালী এল বিলেত থেকে। তার জন্য স্যুপ বানাতে হবে। আমি কি ছাই ওসব পারি! আমি ঝাল ঝোল অম্বল রাঁধতেই শিখেছি। ভয়ে ভয়ে রান্না ঘরে বসে আছি। স্যুপের মানেই জানিনা, রাঁধব কী? শেষে বসুদাদা এসে আমায় সব বুঝিয়ে দিল। তারপর রেঁধে দিলাম। মা ঠিক কথাই বলত, যদি সব মশলার স্বাদ জানো, তাদের ধম্ম জানো, যত না জানা রান্নাই হোকনা কেন, স্বাদ ভালো হতেই হবে!
পুঁই শাকটা বোধহয় হয়ে এসেছে। ঢাকনা খুলে দেখলাম, হ্যাঁ। বেশ মিশ খেয়ে গেছে। এবার চিংড়ি গুলো দিয়ে দিলাম ওর মধ্যে। একটুক্ষণ রেখে নামিয়ে নিলাম।
ও দিকে বসুদাদাও চান টান করে এসে পড়েছে। পিঁড়ে পেতে বসিয়ে নিজে হাতে পরিবেশন করে খাওয়ালাম দাদাকে। যাওয়ার আগে আমায় মাথায় হাত দিয়ে বলল, যার হাতে এমন রান্নার স্বাদ, সে সাক্ষাৎ অন্নপূন্না না হয়ে যায় না রে! আমি তোর হাতের রান্না খেতেই বার বার ফিরে আসব তোর কাছে। - বলে কাপড়ের খুঁটোয় চোখ মুছে নদীর ঘাটের দিকে এগিয়ে চলল।
সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে সব কটা চিংড়ি ছাড়িয়ে ধুয়ে ফেললাম। আলু, কুমড়ো, পেঁয়াজ কেটে কুটে আগেই রেখে দিয়েছিলাম। শুধু আদা আর রসুনটা কেটে বেটে নিলাম। আর পুঁই শাক তো মাচাতেই হয়। খানিকটা পেড়ে আনলাম। সেটাও কেটে ধুয়ে নিলাম।
রান্নাতে মনই বসছেনা। মা বলত, রান্নার সময় সবসময় মনটা পুরো দিবি। যত মন দিয়ে রান্না করবি, তত স্বাদ ভালো হবে, দেখবি।
কিন্তু এমন দিনে কি আর মন বসে! খালি থেকে থেকে নানা ভয়, আশংকা, নানারকম পুরনো কথা মনের মধ্যে ভীড় করে আসছে। যত সেইসব সরিয়ে রাখতে চাই, ততো যেন চেপে বসে।
চিংড়ি গুলোকে নুন হলুদ মাখিয়ে রেখেছিলাম। এবার কড়াইতে তেল গরম করে হাল্কা ভেজে তুলে রাখলাম থালায়।
বসুদাদা কখন এসে দাঁড়িয়েছে খেয়ালই করিনি।
- কি রে ফুলি, কাঁদছিস কেন?
তাড়াতাড়ি কাপড়ে চোখ মুছে বলি, ও কিছুনা দাদা, পেঁয়াজের ঝাঁঝ।
বসুদাদা কী বোঝে জানিনা। আমার মাথায় হাত রেখে বলে, আমি কথা দিচ্ছি, ঠিক ফিরে আসব। আর তোকে তো লেখা পড়া শিখিয়েছি। কিছু বলার থাকলেই চিঠি দিস। আমি আসব।
বলে তাড়াতাড়ি চলে গেল রান্নাঘর থেকে।
আমি আবার রান্নায় মন দিই। যাওয়ার আগে যেন মানুষটাকে খারাপ কিছু না খাওয়াই। পেঁয়াজ, আদা, রসুন বাটা সব একসাথে নিয়ে কড়াতে পাঁচফোড়ন দিয়ে একটু নাড়িয়ে নিলাম। তারপর আলু আর কুমড়ো দিয়ে দিলাম ওর মধ্যে। যখন বেশ ভাজা ভাজা হয়ে এসেছে, পুঁইশাক দিয়ে নুন আর অল্প চিনি দিয়ে বসিয়ে দিলাম ঢাকা দিয়ে।
একবার জন সাহেবের বাড়িতে তখন রান্না করি, এইসব ইংরিজি ঠাঁটবাঁট বুঝিও না, পারি তো নাই। জন সাহেবের শালী এল বিলেত থেকে। তার জন্য স্যুপ বানাতে হবে। আমি কি ছাই ওসব পারি! আমি ঝাল ঝোল অম্বল রাঁধতেই শিখেছি। ভয়ে ভয়ে রান্না ঘরে বসে আছি। স্যুপের মানেই জানিনা, রাঁধব কী? শেষে বসুদাদা এসে আমায় সব বুঝিয়ে দিল। তারপর রেঁধে দিলাম। মা ঠিক কথাই বলত, যদি সব মশলার স্বাদ জানো, তাদের ধম্ম জানো, যত না জানা রান্নাই হোকনা কেন, স্বাদ ভালো হতেই হবে!
পুঁই শাকটা বোধহয় হয়ে এসেছে। ঢাকনা খুলে দেখলাম, হ্যাঁ। বেশ মিশ খেয়ে গেছে। এবার চিংড়ি গুলো দিয়ে দিলাম ওর মধ্যে। একটুক্ষণ রেখে নামিয়ে নিলাম।
ও দিকে বসুদাদাও চান টান করে এসে পড়েছে। পিঁড়ে পেতে বসিয়ে নিজে হাতে পরিবেশন করে খাওয়ালাম দাদাকে। যাওয়ার আগে আমায় মাথায় হাত দিয়ে বলল, যার হাতে এমন রান্নার স্বাদ, সে সাক্ষাৎ অন্নপূন্না না হয়ে যায় না রে! আমি তোর হাতের রান্না খেতেই বার বার ফিরে আসব তোর কাছে। - বলে কাপড়ের খুঁটোয় চোখ মুছে নদীর ঘাটের দিকে এগিয়ে চলল।
No comments:
Post a Comment