Sunday, July 10, 2016

Post 34: ধৃ ধাতু থেকে নিষ্পন্ন 'ধর্ম' কথাটার অর্থ হল যা মানুষকে ধারণ করে...

ক্লাস নাইনে বা টেনে বাংলাতে টেক্সট ছিল - সধবার একাদশী। আমি বাংলা পড়তাম - ঠিক পড়তাম না, বরং বলা যায় বাংলায় আমার যেটুকু নিজস্বতা সেটুকুকে সযত্নে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সাহায্য নিতাম আমার দিদির কাছে। আমার মাসতুতো দিদি। সে যদিও যাদবপুরের রসায়নের ছাত্রী তখন, তবু আমাদের দুজনের বাংলা সাহিত্য নিয়ে ভালোবাসাটা একই রকম হওয়ায় রোববার সকালের নিয়ম করে বাংলা চর্চাটা বেশ মজাদার হত। সেই সধবার একাদশী নিয়ে একটা ব্যাখ্যা লিখেছিলাম আমি। ও সেটাকে ঠিক ঠাক করে দেয়। সেখানে একটা লাইন জুড়ে দিয়েছিল এরকম - "ধৃ ধাতু থেকে নিষ্পন্ন 'ধর্ম' কথাটার অর্থ হল যা মানুষকে ধারণ করে... "। এই লাইনটা পরে পরীক্ষাতেও লিখেছি। আজও মনে আছে - কেন জানিনা। 
এই তো আজ সকালেই কোথাও একটা কথা হচ্ছিল - আমাদের এই পেটুক রেস্টুর‍্যান্টে নাকি কাল "শিরনি" হয়েছিল। তার ছবিও দেখলাম ফেসবুকে। আমার যদি যাওয়া হয়নি। তো কথায় কথায় কেউ বলল 'শিন্নী'। মনে খটকা জাগল। আমি যতদূর জানি শব্দটা "শিরনি"। বর্ণাগম ঘটে "শিন্নী" হয়ে গেছে লোকমুখে। দ্বিধাভঞ্জনের জন্য 'চলন্তিকা' খুললাম। কথাটা "শিরনি" সন্দেহ নেই। সঠিক জানতাম। কিন্তু যা জানতাম না - তাহলো এর উৎপত্তি। রাজশেখর বসু বলছেন - এর উৎপত্তি ফার্সি শব্দ 'শিরিনি' থেকে - যা কিনা পীরের প্রসাদ। তারমানে একটি ফার্সি খাবার যা মুসলিম শাসক বা বণিকদের হাত ধরে এ দেশে আসে এবং শেষ মেশ হিন্দু দেবতা সত্যনারায়ণের প্রসাদে পরিণত হয়!  
মনে বেশ উৎসাহ জাগল। একত্ব বই পত্র এবং ইন্টারনেট ঘেঁটে কিছু তথ্য পেলুম। 
সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ যখন বাংলার মসনদে বসলেন তিনি সত্যপীরের উপাসনা চালু করেন। অর্থাৎ ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সময়টা ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ। উমর শেখ মির্জার ছেলে জাকির-উদ্দিন মুহাম্মদ তখন সতেরো বছরের কিশোর। উজবেকিস্তানে বাপের সাম্রাজ্যে বসে। দিল্লীর দিকে আসার প্ল্যান প্রোগ্রাম শুরুই হয়নি। দিল্লীতে লোদি বংশের সিকান্দার লোদি তখন সুলতান। আলাউদ্দিন হুসেন শাহের সাথে অম্লমধুর সম্পর্ক। শান্তির চুক্তির দোহাই দিয়ে কেউ কাউকে বেশী ঘাঁটান না। আর বাংলায় তখন এক নতুন প্রেমের জোয়ার আসব আসব করছে। চৈতন্য মহাপ্রভু তখন কিশোর। রূপ গোস্বামী, সনাতন গোস্বামীরা তখনও হুসেন শাহের রাজকার্যে নিযুক্ত। 
এই সময় বাংলায় সত্যপীরের উপাসনা প্রবর্তন হয়। হুসেন শাহ ঘরে ঘরে গিয়ে সত্যপীরের উপাসনা করতে বলেছিলেন কিনা সে গ্যারান্টি দিতে পারবোনা, তবে হ্যাঁ, সময়কাল অনুযায়ী এই সেই সময়। তো যা হোক, সত্যপীরের যে উপাসনা শুরু হয়, সেখানে মুসলিম ধর্ম অনুযায়ী স্বাভাবিক ভাবেই কোন দেবতা বা মূর্তি ছিল না। উপাসনা করা হত একটি খালি তক্তপোষের সামনে বসে। আবদুল করিম সাহেব বলছেন, “... এটি মুসলমানদের পীরানি ধারণার স্থানীয় প্রকাশ। ধর্মান্তরিত হওয়ার পর স্থানীয় জনগণের পীরানি ধারণার সঙ্গে তাদের পূর্বতন দেবতাদের অলৌকিক ক্ষমতার সংমিশ্রণ ঘটে। এই পরিবর্তন ধারার চরম পরিণতিতে দেখা দেয় পীর পূজা। পীরগণ অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী বলে তখন লোকজন বিশ্বাস করতে শুরু করে।” 
এই সত্যপীরের পূজাতে খুব স্বাভাবিক ভাবেই হিন্দু পুজোর রীতি (মনসা পূজো) যেরকম মিশেছিল, কিছু সময় পরে হিন্দু ঘরে এর দেখাদেখি যখন সত্যনারায়ণ পূজো শুরু হয়, খুব স্বাভাবিক ভাবেই সেখানে মিশ খেয়ে যায় এই সত্যপীরের পুজোর নিয়ম কানুন (এমনকি নামটাও?)। আর ঠিক তখনি সত্যনারায়ণের প্রসাদের তালিকায় ঢুকে পড়ে আদ্যন্ত ফার্সি খাবার এই ‘শিরিনি'। 
কি অদ্ভুত ভাবুন তো! ওদিকে চৈতন্যদেব বৈষ্ণব ধর্মর প্রেমের জোয়ারে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছেন শত সহস্র মানুষকে, ওদিকে মহাযান বৌদ্ধ ধর্ম প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে এই ভারতীয় ভূখণ্ডের থেকে, তিব্বত থেকে নেমে আসছে বজ্রযান। ওইদিকে ইউরোপের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি সদ্য এঁকে উঠেছেন মোনালিসা বা মাইকেল এঞ্জেলো তখনো মই এ চড়ে সিস্টিন চ্যাপেলের ছাদে রং করছেন। আর মার্টিন লুথার পোপের বিরুদ্ধে তথা সমগ্র ক্যাথলিক চার্চের বিরুদ্ধে হেঁকে বসেছেন এক যুক্তিপূর্ণ জেহাদ। আর ঠিক এই সময় কিনা এই বাংলাদেশে মুসলিমদের থেকে হিন্দুদের কাছে প্রবাহিত হয়ে চলেছে এক পূজা পদ্ধতি, তার উপকরণ, মায় প্রসাদ অব্ধি। একেই তো বলে ইউনিটি ইন ডাইভার্সিটি। 
সত্যি বলতে এত কিছু ভেবে মনটা খারাপ হয়ে যায় এই কারণেই যে এই দেশ তথা এই পৃথিবীতেই যখন মানুষ তথাকথিত সভ্যতর হয়েছে, এই ‘এজ অফ কমিউনিকেশন’ এ দাঁড়িয়ে কিনা আমাদের রোজকার রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে খবরের কাগজ, টিভি চ্যানেল জুড়ে হত্যালীলার খবর শোনা। এবং তার নব্বই ভাগ ধর্ম সংক্রান্ত সংঘাত। দিদির লিখে দেওয়া সেই লাইনটা তাই হয়ত উল্টো অর্থ নিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে আসে বারবার। 
গোটা সপ্তাহ জুড়ে রক্তের জলরঙে মানুষের কান্না আঁকা ক্যানভাসের ছবি দেখতে দেখতে ক্লান্ত মন নিয়ে আবার একটা নতুন সপ্তাহ শুরু হল। আশা করি, একটুও যেন রক্ত না ঝরে। 
"মানুষ বড় কাঁদছে ,তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও
মানুষই ফাঁদ পাতছে ,তুমি পাখির মত পাশে দাঁড়াও
মানুষ বড় একলা ,তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও ।
তোমাকে সেই সকাল থেকে তোমার মত মনে পড়ছে
সন্ধে হলে মনে পড়ছে ,রাতের বেলা মনে পড়ছে
মানুষ বড় একলা ,তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও ।
এসে দাঁড়াও, ভেসে দাঁড়াও এবং ভালোবেসে দাঁড়াও
মানুষ বড় কাঁদছে ,তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও

মানুষ বড় একলা ,তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও !” 

Friday, May 6, 2016

Post 33: কেরী সাহেবের কিচেন ৩

সায়েবের সাথে আরও দুই সায়েব এসে জুটেচে। কোথা থেকে এল কে জানে, বলল কদিন নাকি থাকবে! এদের সব ইয়ার বন্ধুর দল মাঝে মাঝেই এসে খাওয়া দাওয়া করে যাচ্চে। গনেশ আচে, তাই রক্ষে। নাহলে রাঁধতে রাঁধতেই আমার জীবন বের হয়ে যেত। তাদের কত ফরমায়েশ। জলখাবার এক, দুপুরে এক, রাতে এক। এত রান্না করা যায়! কবে যে যাবে জানিনা!
তবে চুপি চুপি একটা কাজ করেচি। কাউকে বলিনি। গনেশকেও না। বললে যদি সবাইকে বলে দেয় - আমার আর মুক লুকানোর জায়গা থাকবে না!
কাল সায়েবের বন্ধুরা মিলে অনেক রাত অবধি মোচ্ছব কচ্ছিল। সায়েব তো ভালোমানুষ। যীশু ঠাকুরকে পেন্নাম করে সকাল সকাল শুয়ে পড়েন। এদের মোচ্ছব শেষ হলে গনেশ গিয়ে সব পরিষ্কার করে, গেলাস বোতল সব রান্না ঘরে রেখে শুতে গেল। আমি তো রান্না ঘরের একদিকেই শুই। মটকা মেরে পড়েছিলাম। গনেশ চলে যেতে দেকলুম একটা রমের বোতল। বোতলটা পুরো খালি না। খানিকটা রয়ে গেচে। বিদেশী মদ - নিশ্চয়ই খুব ভালো খেতে। চাদ্দিক সুনসান দেখে ছিপি খুলে দিয়েচি গলায় ঢেলে। ও মা! গলা পুরো জ্বলে গেল গা! এসব খায় কি করে কি জানি বাপু! তবে গন্দটা কিন্তু খারাপ না। শুয়ে শুয়ে মনে হল রান্নায় যদি একটু দেওয়া যায় কেমন হয়? মেমসাহেব রান্নায় বিলিতি গন্দ পেয়ে নিশ্চয়ই বেজায় খুশি হবেন।
সকালে মুর্গী আনল গনেশ। কেটে কুটে ছাড়িয়ে বলল, অ ফুলি দিদি, এ কি ঝোল রাঁন্দবা?
- যাই রাঁধি, তাতে তোর কিরে হতভাগা?
- আমার আর কী! তবে সায়েবের বন্ধু সায়েব বলছিল, ভেজে দিতে - মদের চাট করবে রাতের বেলা।
মুখ ফসকে বেরিয়ে যাচ্চিল - ওই তো খেতে, তার জন্যে আবার এত কি! ভাগ্যিস সামলে নিয়েচি। গম্ভীর মুক করে বললুম, ঠিক আচে, তুই যা দেকি!
গনেশ চলে যেতে এদিক ওদিক দেখে বাসনের পিছন থেকে রমের বোতলটা বের করলুম। মাংসর ওপর দিয়ে ঢেলে দিলাম খানিকটা। অল্প নুন, মরিচ ভালো করে মাখিয়ে চাপা দিয়ে রেখে ভাবলুম পেঁয়াজ, রসুন গুলো কেটে নিই। পাশ ফিরতে পারিনি, গনেশ এসে হাজির।
- বলি অ ফুলি দিদি। ওটা কিসের গন্দ?
- কোতায়? কিসের গন্দ? মাংসটা জারাচ্চি তো। গন্দ আবার কিসের?
- না। এ তো... তারপর গলা নামিয়ে এনে বলে, তুমি মদ খাচ্চ?
- মরি মরি! আমি মদ খেতে যাব কেন র‍্যা? হতভাগা ছেলে! তুই দিনমানে খাচ্চিস মনে হচ্চে! মারব এক চড়। ভাগ এখান থেকে।
গনেশ একটু সন্দেহ মুখে নিয়ে চলে গেল। আমি তাড়াতাড়ি করে পেঁয়াজ, রসুন, আদা বেটে নিলাম।
তারপর যেমন মাংস বানাই। মাংসটা বসিয়ে দিয়ে চাপা দিয়েছি, সেদ্দ হবে বলে, আবার গনেশ এল।
- আবার কী চাই?
- মাংসটার কিন্তু বেশ গন্দ বেরিয়েচে। আমার জন্য দু'টুকরো রেখো কিন্তু।
- হ্যাঁ রে, রাখব। আর ওই সায়েবদের বলিস, কয়েক টুকরো সরিয়ে রেকেচি। রাতে ভেজে দেব। যা নেয়ে আয়। খেয়ে নিবি।
গনেশ চলে যায়। মাংসটা হয়ে এসেছে। নামানোর আগে আর একটু রাম ছড়িয়ে দিয়ে একটু বসিয়ে নামিয়ে নিলাম। বেশ খাসা গন্দ ছেড়েচে কিন্তু!
এই পেথমবার মেমসাহেবের মুকে হাসি দেকলাম। ইংরিজিতে খ্যাটম্যাট করে কিসব বলল। সবাই মাংস খেয়ে খুব খুশি।
রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে বোতলটা বের করে একটু জল মিশিয়ে আর এক ঢোক খেয়ে দেকলুম। খুব একটা খারাপ লাগলনি আজ!

Friday, April 29, 2016

Post 32: কেরী সাহেবের কিচেন ২

কেরী'স কিচেন ২।।
এই মদনাবাটি গ্রামে আসা ইস্তক মন ভালো লাগেনা আমার। বসুদাদাও কাল চলে গেল কোলকাতা। বসুদাদার বৌএর নাকি শরীর ভাল নেই। গণেশ বলে একজনকে রেখে দিয়ে গেল। বাজার দোকান ওই করবে।
যেদিন কোলকাতার পাট তুলে সাহেব এই মদনাবাটিতে আসবে বলে মনস্থির করলেন, সেদিনই বসুদাদা এসে আমায় বলেছিল, ফুলি, কোলকেতা ছেড়ে এবার সাহেব উত্তরে যাবেন। তুই যাবি তো?
আমার আর কী! আমার তিনকূলে কেউ নেই। মা বাপ তো সেই কোন ছেলেবেলাতেই গেছে। স্বামীও মরে গেছে আজ কত বছর হল! সেই যেবার খুব জল হল - আমাদের দাওয়া অবধি জল উঠে এল। সেবারেই কলেরা হয়ে শেষ হয়ে গেল। আগের পক্ষের বৌ চিতেয় গেল। আমার আর কি সে কপাল! নেহাত বসুদাদা ছিল, তাই রক্ষে। জন সাহেবের কাছে রেখে গেল। রান্নার জন্য। জন সাহেবও মরে গেলে ওনার বৌ বাচ্চা ফিরে গেলেন বিলেতে। তখন আবার বসুদাদাই আমায় এনে দিল কেরী সাহেবের কাছে।
যাওয়ার আগে আমার কাছে পুঁই চিংড়ি খেতে চেয়েছিল বসুদাদা। আমি তো সকালে উঠে ঊনান জ্বালিয়ে আঁচ গরম করছিলাম। বসুদাদা এসে এক কোণে দাঁড়িয়ে বলল, ফুলি। আমি চললাম।
দেখলাম, মুখটা ভার।
শুধোলেম, কী হয়েছে দাদা?
বসুদাদা মাথা নেড়ে বলল, কিছু না রে ফুলি। কোলকেতা বড় টানছে। তোর বৌদিদিরও নাকি শরীর টা ভালো নেই। পড়শি চিঠি দিয়েছে। তাই ভাবলাম এই গাঁ গঞ্জে পড়ে থেকে কী করব?
- আবার আসবে কবে?
- দেখি। না আসলেই বা কী? তুই তো ভালোই আছিস, সাহেবের কাছে।
- সে তো জন সাহেবের কাছেও ছিলাম।
একটু চুপ করে বলে, আমি আসব আবার। ওদিকটা একটু সামলে নিই।
- কখন যাবে?
- ভাবছি বেলাবেলিই বেড়িয়ে পড়ি।
- দুটি মুখে দিয়ে যেও।
- হ্যাঁ। সে তো যাবই। বলছি, একটু পুঁই চিংড়ি বানাবি? তোর বানানো পুঁই চিংড়ি অনেকদিন খাইনা। মনে বড় সাধ হল।
- সে কথা! তুমি দুটি চিংড়ি এনে দাও আমি এখুনি রেঁধে দিচ্ছি।
একটু পরে গনেশ এসে এত কটা চিংড়ি রেখে গেল। খোলা ছাড়াতে বসলাম। কত কথা মনে পড়ল। আমার যেটুকু বিদ্যে, সেতো বসুদাদার জন্যেই। আমায় সুযোগ পেলেই অ-আ পড়তে লিখতে শিখিয়েছে। একবারের জন্যেও আমার থেকে দূরে যায়নি। আর আজ এই এতদূরে আমায় ফেলে রেখে...। ঝাপসা হয়ে যায় চিংড়ি গুলো।
সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে সব কটা চিংড়ি ছাড়িয়ে ধুয়ে ফেললাম। আলু, কুমড়ো, পেঁয়াজ কেটে কুটে আগেই রেখে দিয়েছিলাম। শুধু আদা আর রসুনটা কেটে বেটে নিলাম। আর পুঁই শাক তো মাচাতেই হয়। খানিকটা পেড়ে আনলাম। সেটাও কেটে ধুয়ে নিলাম।
রান্নাতে মনই বসছেনা। মা বলত, রান্নার সময় সবসময় মনটা পুরো দিবি। যত মন দিয়ে রান্না করবি, তত স্বাদ ভালো হবে, দেখবি।
কিন্তু এমন দিনে কি আর মন বসে! খালি থেকে থেকে নানা ভয়, আশংকা, নানারকম পুরনো কথা মনের মধ্যে ভীড় করে আসছে। যত সেইসব সরিয়ে রাখতে চাই, ততো যেন চেপে বসে।
চিংড়ি গুলোকে নুন হলুদ মাখিয়ে রেখেছিলাম। এবার কড়াইতে তেল গরম করে হাল্কা ভেজে তুলে রাখলাম থালায়।
বসুদাদা কখন এসে দাঁড়িয়েছে খেয়ালই করিনি।
- কি রে ফুলি, কাঁদছিস কেন?
তাড়াতাড়ি কাপড়ে চোখ মুছে বলি, ও কিছুনা দাদা, পেঁয়াজের ঝাঁঝ।
বসুদাদা কী বোঝে জানিনা। আমার মাথায় হাত রেখে বলে, আমি কথা দিচ্ছি, ঠিক ফিরে আসব। আর তোকে তো লেখা পড়া শিখিয়েছি। কিছু বলার থাকলেই চিঠি দিস। আমি আসব।
বলে তাড়াতাড়ি চলে গেল রান্নাঘর থেকে।
আমি আবার রান্নায় মন দিই। যাওয়ার আগে যেন মানুষটাকে খারাপ কিছু না খাওয়াই। পেঁয়াজ, আদা, রসুন বাটা সব একসাথে নিয়ে কড়াতে পাঁচফোড়ন দিয়ে একটু নাড়িয়ে নিলাম। তারপর আলু আর কুমড়ো দিয়ে দিলাম ওর মধ্যে। যখন বেশ ভাজা ভাজা হয়ে এসেছে, পুঁইশাক দিয়ে নুন আর অল্প চিনি দিয়ে বসিয়ে দিলাম ঢাকা দিয়ে।
একবার জন সাহেবের বাড়িতে তখন রান্না করি, এইসব ইংরিজি ঠাঁটবাঁট বুঝিও না, পারি তো নাই। জন সাহেবের শালী এল বিলেত থেকে। তার জন্য স্যুপ বানাতে হবে। আমি কি ছাই ওসব পারি! আমি ঝাল ঝোল অম্বল রাঁধতেই শিখেছি। ভয়ে ভয়ে রান্না ঘরে বসে আছি। স্যুপের মানেই জানিনা, রাঁধব কী? শেষে বসুদাদা এসে আমায় সব বুঝিয়ে দিল। তারপর রেঁধে দিলাম। মা ঠিক কথাই বলত, যদি সব মশলার স্বাদ জানো, তাদের ধম্ম জানো, যত না জানা রান্নাই হোকনা কেন, স্বাদ ভালো হতেই হবে!
পুঁই শাকটা বোধহয় হয়ে এসেছে। ঢাকনা খুলে দেখলাম, হ্যাঁ। বেশ মিশ খেয়ে গেছে। এবার চিংড়ি গুলো দিয়ে দিলাম ওর মধ্যে। একটুক্ষণ রেখে নামিয়ে নিলাম।
ও দিকে বসুদাদাও চান টান করে এসে পড়েছে। পিঁড়ে পেতে বসিয়ে নিজে হাতে পরিবেশন করে খাওয়ালাম দাদাকে। যাওয়ার আগে আমায় মাথায় হাত দিয়ে বলল, যার হাতে এমন রান্নার স্বাদ, সে সাক্ষাৎ অন্নপূন্না না হয়ে যায় না রে! আমি তোর হাতের রান্না খেতেই বার বার ফিরে আসব তোর কাছে। - বলে কাপড়ের খুঁটোয় চোখ মুছে নদীর ঘাটের দিকে এগিয়ে চলল।

Wednesday, April 27, 2016

Post 31: কেরী সাহেবের কিচেন ১

[ বাঙালীর সাথে খাওয়া ব্যাপারটা এতটাই ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গেছে যে তাকে ছাড়ানোই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই যে দেখুন, facebook-এ এক একটা গোটা গ্রুপ জুড়ে সকাল থেকে খালি খাই-খাই-খাই করতে লেগেছে সবাই। বেলের পানা থেকে লাউএর পায়েস হয়ে যেই লাঞ্চের দিকে গড়াবে গড়াবে করছে ব্যাপারটা একটা ঘটনা মনে পড়ল। বাঙালীর এক অজ্ঞাত ইতিহাস। হঠাত একদিন চোখের সামনে খুলে গেছিল আমার।
সেদিন কলেজ থেকে বেরিয়ে মনটা খাই খাই এমন করতে লাগল যে কী বলব! ইচ্ছে হল পুঁটিরামে ঢুঁ দিই। আহা, গরম গরম কচুরি আর একশো মিষ্টি দই। খেলেই মনে হওয় - স্বর্গ যদি সত্যি কোথাও থাকে তা এখানেই - পুঁটিরামের টেবিলে। তো যেমন ভাবা তেমন কাজ। ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে রোদ-চশমা বাগিয়ে কলেজ স্ট্রীট ছেড়ে যেই পা দেব দেব করছি সূর্য সেনে, অমনি ডাক - "ও দাদা, শুনছেন?”
চেনা বইওলা। পুরনো বই এর দোকানের ছায়া থেকে গলা বের করে, দেখি, ইগ্রেটের মত চেয়ে আছেন। শুভ কাজে বাধা পড়ায় বেজায় বিরক্ত লাগল। 
- "কী?” 
- “ এদিকে আসেন"
- “ কেন?”
- “ সেদিন পুরানো কোলকাতার ওপর একটা বই খুঁজছিলেন না?”
-” হুম।"
- “একটা ভালো জিনিস আছে। আসুন। আপনাকে দেখাবো বলে রেখে দিয়েছি।"
কৌতূহল নিরসনে ঢুকেই পড়ি ঠেলেঠুলে। ভদ্রলোক কোথা থেকে একটা ছেঁড়া খোঁড়া ডায়েরী বের করে হাতে দিলেন। উলটে পালটে দেখে তো চক্ষু ছানা বড়া। আশি টাকা দিয়ে কিনেই ফেললাম। তারপর গোটা দশেক কচুরি আর গোটা পাঁচেক রসগোল্লা সহযোগে সেই ডায়রি টা পড়ে ফেললাম। ডায়েরিটা কিছুইনা - একটা রান্নার খাতা, তবে তা এইট্‌টিন্থ সেঞ্চুরির এক ভদ্রমহিলার। বাঙালী। নাম ফুলি। আমাদের উইলিয়ম কেরির রাঁধুনি ছিলেন তিনি। তিনি জানতেন বাংলা রান্না। কেরি সাহেব, ভোলাভালা মানুষ। খেয়ে নেন সব কিছুই। কিন্তু মিসেস কেরির মুখে রোচে না। তাই ফুলিকে শিখতে হল ইংরিজি রান্না। ইংরিজি বাংলার মিশেলে কিছু অপূর্ব পদ আবিষ্কার করেন ফুলি। রামরাম বসুর কাছে লিখতে পড়তে শিখেছিলেন তিনি। আর তাই তাঁর সমস্ত রেসিপি লিপিবদ্ধ করে গেছেন এই খাতায়। সেইসব সাংঘাতিক রান্নাবান্না সবার জন্য পোস্ট করি ভাবলাম। 
ডায়রীর কথা হুবহু তুলে দেব ভেবেছিলুম। কিন্তু পরে ভেবে দেখলুম, তখনকার বাংলা, তায় আবার সদ্য-শিক্ষিতার হাতে লেখা। তাই একটু পরিমার্জন করে নিজের মত করে লেখাটাই ঠিক মনে করলুম। ]
****************************** 
।। ১ ।। 
রান্নাঘরে বসে মাছ কুটছিলাম। বসুদাদা এসে একখান এতবড় ইলিশ মাছ ধপ করে মেঝেতে ফেলে একটা পিঁড়ে টেনে নিয়ে বসল। কপালের ঘাম মুছে বলল, এক ঘটি জল দে তো ফুলি। যা রোদ! 
আমি আঁচলে হাত মুছে কলসি থেকে জল গড়িয়ে দিলাম।
- মেম সাহেবের আবদার। বসুদাদা বলল। 
- কী?
- ওই পোনা মাছ তার রুচছে না। তেল ঝাল ঝোল খেয়ে নাকি পেট ছেড়েছে - বুঝলি? চোখ মটকায় বসুদাদা। বলে, ওই তো সিদ্ধ পোড়া খাওয়া জাত - এসব রান্না কি আর পেটে সয়। কথায় বলে না...
দরজার কাছ থেকে একটা সাড়া পেয়ে বসুদাদা চুপ করে যায়। স্বয়ং মেমসাহেব। ইনি অবশ্য বাংলা বোঝেন না সেরকম। তাই ভয়ের কিছু নেই। মেমসাহেব রান্না ঘরে উঁকি দিয়ে খটমট করে ইংরিজি তে কিসব বললেন। বসুদাদা ঘাড় নেড়ে দিল। মেমসাহেব চলে যেতেই পিঁড়েটা টেনে নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে এসে বলল, বললাম না, সিদ্ধ চাই। 
আমি অবাক হয়ে বলি, মাছ আবার কেউ সিদ্ধ খায় নাকি! 
বসুদাদা হাসি হাসি মুখে বলল, আলবাত খায়! এরা সিদ্ধ মাছ খেয়েই দেশ জয় করে ফেলল রে! 
চিন্তায় পড়ে বলি, কিন্তু বানাব কী করে? 
বসুদাদা বলল, সে আমি জানিনা। তোকে এতগুলো টাকা কেন দেওয়া হয়? উপায় বের কর। আমি যাই, সাহেব এক্ষুনি এত্তেলা পাঠালেন বলে! 
হড়বড় করে চলে গেল। 
আমি গালে হাত দিয়ে ভাবতে বসি এই মাছ নিয়ে কী করি! সিদ্ধ মাছ তো বাপের জন্মে শুনিনি। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে মাছটা ধুয়ে কেটে ফেললাম। মাছ তো সিদ্ধ করে পাতে দিয়ে দিলেই হয় না! একটা স্বাদ বলে তো বস্তু আছে! কেরী সাহেব বলে বেরোন যে ফুলির রান্নার কি স্বাদ! ওই ডাইনি বৌটারই শুধু মুখে রোচে না! এমন দেবতুল্য মানুষকে অমন আলুনি বিস্বাদ মাছ সিদ্ধ খাওয়াতে পারবনা! তাই ভেবে চিন্তে একটু নুন, মরিচ, সরষের তেল (শেষ হয়ে এসেছে, বসু দাদাকে বলতে হবে আনার কথা), পাতি নেবুর রস, হলুদ দিয়ে ভালো করে মাখিয়ে রাখলুম। বসুদাদা একবার এসে ঢুঁ মেরে বলে গেল, কি রে ফুলি রান্না হচ্ছে তো? যেন না পারলে নিজে এসে করে দেবে! পারিনা বাপু! 
বেলা তো গড়াতে চলল। ভাত বসাতে তো হবে! তার আগে একটু লাউ ডাল করে নিলাম। যা গরম। শরীর ঠান্ডা হবে। একেই এরা ঠান্ডা দেশের মানুষজন। 
লাউ কেটে পাতা গুলো রাখা ছিল এক কোণে। ভাত বসিইয়ে মাছের কথা ভাবতেই মনে হল, এক কাজ করা যাক। ভাতের মাড়টা গলে গলে এসেছে এরকম সময়, এক একটা লাউপাতা নিয়ে তার মধ্যে মাখানো এক একটা মাছ রেখে ভাতের মধ্যে দিয়ে দিলাম এক এক করে। দিয়ে আঁচ কমিয়ে দিই উনানের। ওই ভাপেই সিদ্ধ হয়ে যাবে- চিন্তা নেই। 
বসুদাদা এসে বলল, কিরে, সাহেবের তো খিদে পেয়ে গেছে। উশখুশ করছে! তুই মাছ বানাতে তো বেলা শেষ করে দিলি! 
হাসি মুখে বলি, পাত পাড়ো। খাবার হয়ে গেছে।
মেমসাহেব সেই পাঁচন খাওয়া মুখে খেলেও, সাহেব কিন্তু ধন্য ধন্য করলেন। পরে আবার একদিন একগাদা ফিরিঙ্গি ইয়ার বন্ধু কে ডেকে এনে ভোজ দিয়েছিলেন। সেদিনও বানিয়েছিলাম। নাম দিয়েছিলাম - কেরী সাহেবের সিদ্ধ ইলিশ।