Sunday, July 10, 2016

Post 34: ধৃ ধাতু থেকে নিষ্পন্ন 'ধর্ম' কথাটার অর্থ হল যা মানুষকে ধারণ করে...

ক্লাস নাইনে বা টেনে বাংলাতে টেক্সট ছিল - সধবার একাদশী। আমি বাংলা পড়তাম - ঠিক পড়তাম না, বরং বলা যায় বাংলায় আমার যেটুকু নিজস্বতা সেটুকুকে সযত্নে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সাহায্য নিতাম আমার দিদির কাছে। আমার মাসতুতো দিদি। সে যদিও যাদবপুরের রসায়নের ছাত্রী তখন, তবু আমাদের দুজনের বাংলা সাহিত্য নিয়ে ভালোবাসাটা একই রকম হওয়ায় রোববার সকালের নিয়ম করে বাংলা চর্চাটা বেশ মজাদার হত। সেই সধবার একাদশী নিয়ে একটা ব্যাখ্যা লিখেছিলাম আমি। ও সেটাকে ঠিক ঠাক করে দেয়। সেখানে একটা লাইন জুড়ে দিয়েছিল এরকম - "ধৃ ধাতু থেকে নিষ্পন্ন 'ধর্ম' কথাটার অর্থ হল যা মানুষকে ধারণ করে... "। এই লাইনটা পরে পরীক্ষাতেও লিখেছি। আজও মনে আছে - কেন জানিনা। 
এই তো আজ সকালেই কোথাও একটা কথা হচ্ছিল - আমাদের এই পেটুক রেস্টুর‍্যান্টে নাকি কাল "শিরনি" হয়েছিল। তার ছবিও দেখলাম ফেসবুকে। আমার যদি যাওয়া হয়নি। তো কথায় কথায় কেউ বলল 'শিন্নী'। মনে খটকা জাগল। আমি যতদূর জানি শব্দটা "শিরনি"। বর্ণাগম ঘটে "শিন্নী" হয়ে গেছে লোকমুখে। দ্বিধাভঞ্জনের জন্য 'চলন্তিকা' খুললাম। কথাটা "শিরনি" সন্দেহ নেই। সঠিক জানতাম। কিন্তু যা জানতাম না - তাহলো এর উৎপত্তি। রাজশেখর বসু বলছেন - এর উৎপত্তি ফার্সি শব্দ 'শিরিনি' থেকে - যা কিনা পীরের প্রসাদ। তারমানে একটি ফার্সি খাবার যা মুসলিম শাসক বা বণিকদের হাত ধরে এ দেশে আসে এবং শেষ মেশ হিন্দু দেবতা সত্যনারায়ণের প্রসাদে পরিণত হয়!  
মনে বেশ উৎসাহ জাগল। একত্ব বই পত্র এবং ইন্টারনেট ঘেঁটে কিছু তথ্য পেলুম। 
সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ যখন বাংলার মসনদে বসলেন তিনি সত্যপীরের উপাসনা চালু করেন। অর্থাৎ ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সময়টা ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ। উমর শেখ মির্জার ছেলে জাকির-উদ্দিন মুহাম্মদ তখন সতেরো বছরের কিশোর। উজবেকিস্তানে বাপের সাম্রাজ্যে বসে। দিল্লীর দিকে আসার প্ল্যান প্রোগ্রাম শুরুই হয়নি। দিল্লীতে লোদি বংশের সিকান্দার লোদি তখন সুলতান। আলাউদ্দিন হুসেন শাহের সাথে অম্লমধুর সম্পর্ক। শান্তির চুক্তির দোহাই দিয়ে কেউ কাউকে বেশী ঘাঁটান না। আর বাংলায় তখন এক নতুন প্রেমের জোয়ার আসব আসব করছে। চৈতন্য মহাপ্রভু তখন কিশোর। রূপ গোস্বামী, সনাতন গোস্বামীরা তখনও হুসেন শাহের রাজকার্যে নিযুক্ত। 
এই সময় বাংলায় সত্যপীরের উপাসনা প্রবর্তন হয়। হুসেন শাহ ঘরে ঘরে গিয়ে সত্যপীরের উপাসনা করতে বলেছিলেন কিনা সে গ্যারান্টি দিতে পারবোনা, তবে হ্যাঁ, সময়কাল অনুযায়ী এই সেই সময়। তো যা হোক, সত্যপীরের যে উপাসনা শুরু হয়, সেখানে মুসলিম ধর্ম অনুযায়ী স্বাভাবিক ভাবেই কোন দেবতা বা মূর্তি ছিল না। উপাসনা করা হত একটি খালি তক্তপোষের সামনে বসে। আবদুল করিম সাহেব বলছেন, “... এটি মুসলমানদের পীরানি ধারণার স্থানীয় প্রকাশ। ধর্মান্তরিত হওয়ার পর স্থানীয় জনগণের পীরানি ধারণার সঙ্গে তাদের পূর্বতন দেবতাদের অলৌকিক ক্ষমতার সংমিশ্রণ ঘটে। এই পরিবর্তন ধারার চরম পরিণতিতে দেখা দেয় পীর পূজা। পীরগণ অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী বলে তখন লোকজন বিশ্বাস করতে শুরু করে।” 
এই সত্যপীরের পূজাতে খুব স্বাভাবিক ভাবেই হিন্দু পুজোর রীতি (মনসা পূজো) যেরকম মিশেছিল, কিছু সময় পরে হিন্দু ঘরে এর দেখাদেখি যখন সত্যনারায়ণ পূজো শুরু হয়, খুব স্বাভাবিক ভাবেই সেখানে মিশ খেয়ে যায় এই সত্যপীরের পুজোর নিয়ম কানুন (এমনকি নামটাও?)। আর ঠিক তখনি সত্যনারায়ণের প্রসাদের তালিকায় ঢুকে পড়ে আদ্যন্ত ফার্সি খাবার এই ‘শিরিনি'। 
কি অদ্ভুত ভাবুন তো! ওদিকে চৈতন্যদেব বৈষ্ণব ধর্মর প্রেমের জোয়ারে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছেন শত সহস্র মানুষকে, ওদিকে মহাযান বৌদ্ধ ধর্ম প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে এই ভারতীয় ভূখণ্ডের থেকে, তিব্বত থেকে নেমে আসছে বজ্রযান। ওইদিকে ইউরোপের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি সদ্য এঁকে উঠেছেন মোনালিসা বা মাইকেল এঞ্জেলো তখনো মই এ চড়ে সিস্টিন চ্যাপেলের ছাদে রং করছেন। আর মার্টিন লুথার পোপের বিরুদ্ধে তথা সমগ্র ক্যাথলিক চার্চের বিরুদ্ধে হেঁকে বসেছেন এক যুক্তিপূর্ণ জেহাদ। আর ঠিক এই সময় কিনা এই বাংলাদেশে মুসলিমদের থেকে হিন্দুদের কাছে প্রবাহিত হয়ে চলেছে এক পূজা পদ্ধতি, তার উপকরণ, মায় প্রসাদ অব্ধি। একেই তো বলে ইউনিটি ইন ডাইভার্সিটি। 
সত্যি বলতে এত কিছু ভেবে মনটা খারাপ হয়ে যায় এই কারণেই যে এই দেশ তথা এই পৃথিবীতেই যখন মানুষ তথাকথিত সভ্যতর হয়েছে, এই ‘এজ অফ কমিউনিকেশন’ এ দাঁড়িয়ে কিনা আমাদের রোজকার রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে খবরের কাগজ, টিভি চ্যানেল জুড়ে হত্যালীলার খবর শোনা। এবং তার নব্বই ভাগ ধর্ম সংক্রান্ত সংঘাত। দিদির লিখে দেওয়া সেই লাইনটা তাই হয়ত উল্টো অর্থ নিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে আসে বারবার। 
গোটা সপ্তাহ জুড়ে রক্তের জলরঙে মানুষের কান্না আঁকা ক্যানভাসের ছবি দেখতে দেখতে ক্লান্ত মন নিয়ে আবার একটা নতুন সপ্তাহ শুরু হল। আশা করি, একটুও যেন রক্ত না ঝরে। 
"মানুষ বড় কাঁদছে ,তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও
মানুষই ফাঁদ পাতছে ,তুমি পাখির মত পাশে দাঁড়াও
মানুষ বড় একলা ,তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও ।
তোমাকে সেই সকাল থেকে তোমার মত মনে পড়ছে
সন্ধে হলে মনে পড়ছে ,রাতের বেলা মনে পড়ছে
মানুষ বড় একলা ,তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও ।
এসে দাঁড়াও, ভেসে দাঁড়াও এবং ভালোবেসে দাঁড়াও
মানুষ বড় কাঁদছে ,তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও

মানুষ বড় একলা ,তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও !” 

Friday, May 6, 2016

Post 33: কেরী সাহেবের কিচেন ৩

সায়েবের সাথে আরও দুই সায়েব এসে জুটেচে। কোথা থেকে এল কে জানে, বলল কদিন নাকি থাকবে! এদের সব ইয়ার বন্ধুর দল মাঝে মাঝেই এসে খাওয়া দাওয়া করে যাচ্চে। গনেশ আচে, তাই রক্ষে। নাহলে রাঁধতে রাঁধতেই আমার জীবন বের হয়ে যেত। তাদের কত ফরমায়েশ। জলখাবার এক, দুপুরে এক, রাতে এক। এত রান্না করা যায়! কবে যে যাবে জানিনা!
তবে চুপি চুপি একটা কাজ করেচি। কাউকে বলিনি। গনেশকেও না। বললে যদি সবাইকে বলে দেয় - আমার আর মুক লুকানোর জায়গা থাকবে না!
কাল সায়েবের বন্ধুরা মিলে অনেক রাত অবধি মোচ্ছব কচ্ছিল। সায়েব তো ভালোমানুষ। যীশু ঠাকুরকে পেন্নাম করে সকাল সকাল শুয়ে পড়েন। এদের মোচ্ছব শেষ হলে গনেশ গিয়ে সব পরিষ্কার করে, গেলাস বোতল সব রান্না ঘরে রেখে শুতে গেল। আমি তো রান্না ঘরের একদিকেই শুই। মটকা মেরে পড়েছিলাম। গনেশ চলে যেতে দেকলুম একটা রমের বোতল। বোতলটা পুরো খালি না। খানিকটা রয়ে গেচে। বিদেশী মদ - নিশ্চয়ই খুব ভালো খেতে। চাদ্দিক সুনসান দেখে ছিপি খুলে দিয়েচি গলায় ঢেলে। ও মা! গলা পুরো জ্বলে গেল গা! এসব খায় কি করে কি জানি বাপু! তবে গন্দটা কিন্তু খারাপ না। শুয়ে শুয়ে মনে হল রান্নায় যদি একটু দেওয়া যায় কেমন হয়? মেমসাহেব রান্নায় বিলিতি গন্দ পেয়ে নিশ্চয়ই বেজায় খুশি হবেন।
সকালে মুর্গী আনল গনেশ। কেটে কুটে ছাড়িয়ে বলল, অ ফুলি দিদি, এ কি ঝোল রাঁন্দবা?
- যাই রাঁধি, তাতে তোর কিরে হতভাগা?
- আমার আর কী! তবে সায়েবের বন্ধু সায়েব বলছিল, ভেজে দিতে - মদের চাট করবে রাতের বেলা।
মুখ ফসকে বেরিয়ে যাচ্চিল - ওই তো খেতে, তার জন্যে আবার এত কি! ভাগ্যিস সামলে নিয়েচি। গম্ভীর মুক করে বললুম, ঠিক আচে, তুই যা দেকি!
গনেশ চলে যেতে এদিক ওদিক দেখে বাসনের পিছন থেকে রমের বোতলটা বের করলুম। মাংসর ওপর দিয়ে ঢেলে দিলাম খানিকটা। অল্প নুন, মরিচ ভালো করে মাখিয়ে চাপা দিয়ে রেখে ভাবলুম পেঁয়াজ, রসুন গুলো কেটে নিই। পাশ ফিরতে পারিনি, গনেশ এসে হাজির।
- বলি অ ফুলি দিদি। ওটা কিসের গন্দ?
- কোতায়? কিসের গন্দ? মাংসটা জারাচ্চি তো। গন্দ আবার কিসের?
- না। এ তো... তারপর গলা নামিয়ে এনে বলে, তুমি মদ খাচ্চ?
- মরি মরি! আমি মদ খেতে যাব কেন র‍্যা? হতভাগা ছেলে! তুই দিনমানে খাচ্চিস মনে হচ্চে! মারব এক চড়। ভাগ এখান থেকে।
গনেশ একটু সন্দেহ মুখে নিয়ে চলে গেল। আমি তাড়াতাড়ি করে পেঁয়াজ, রসুন, আদা বেটে নিলাম।
তারপর যেমন মাংস বানাই। মাংসটা বসিয়ে দিয়ে চাপা দিয়েছি, সেদ্দ হবে বলে, আবার গনেশ এল।
- আবার কী চাই?
- মাংসটার কিন্তু বেশ গন্দ বেরিয়েচে। আমার জন্য দু'টুকরো রেখো কিন্তু।
- হ্যাঁ রে, রাখব। আর ওই সায়েবদের বলিস, কয়েক টুকরো সরিয়ে রেকেচি। রাতে ভেজে দেব। যা নেয়ে আয়। খেয়ে নিবি।
গনেশ চলে যায়। মাংসটা হয়ে এসেছে। নামানোর আগে আর একটু রাম ছড়িয়ে দিয়ে একটু বসিয়ে নামিয়ে নিলাম। বেশ খাসা গন্দ ছেড়েচে কিন্তু!
এই পেথমবার মেমসাহেবের মুকে হাসি দেকলাম। ইংরিজিতে খ্যাটম্যাট করে কিসব বলল। সবাই মাংস খেয়ে খুব খুশি।
রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে বোতলটা বের করে একটু জল মিশিয়ে আর এক ঢোক খেয়ে দেকলুম। খুব একটা খারাপ লাগলনি আজ!

Friday, April 29, 2016

Post 32: কেরী সাহেবের কিচেন ২

কেরী'স কিচেন ২।।
এই মদনাবাটি গ্রামে আসা ইস্তক মন ভালো লাগেনা আমার। বসুদাদাও কাল চলে গেল কোলকাতা। বসুদাদার বৌএর নাকি শরীর ভাল নেই। গণেশ বলে একজনকে রেখে দিয়ে গেল। বাজার দোকান ওই করবে।
যেদিন কোলকাতার পাট তুলে সাহেব এই মদনাবাটিতে আসবে বলে মনস্থির করলেন, সেদিনই বসুদাদা এসে আমায় বলেছিল, ফুলি, কোলকেতা ছেড়ে এবার সাহেব উত্তরে যাবেন। তুই যাবি তো?
আমার আর কী! আমার তিনকূলে কেউ নেই। মা বাপ তো সেই কোন ছেলেবেলাতেই গেছে। স্বামীও মরে গেছে আজ কত বছর হল! সেই যেবার খুব জল হল - আমাদের দাওয়া অবধি জল উঠে এল। সেবারেই কলেরা হয়ে শেষ হয়ে গেল। আগের পক্ষের বৌ চিতেয় গেল। আমার আর কি সে কপাল! নেহাত বসুদাদা ছিল, তাই রক্ষে। জন সাহেবের কাছে রেখে গেল। রান্নার জন্য। জন সাহেবও মরে গেলে ওনার বৌ বাচ্চা ফিরে গেলেন বিলেতে। তখন আবার বসুদাদাই আমায় এনে দিল কেরী সাহেবের কাছে।
যাওয়ার আগে আমার কাছে পুঁই চিংড়ি খেতে চেয়েছিল বসুদাদা। আমি তো সকালে উঠে ঊনান জ্বালিয়ে আঁচ গরম করছিলাম। বসুদাদা এসে এক কোণে দাঁড়িয়ে বলল, ফুলি। আমি চললাম।
দেখলাম, মুখটা ভার।
শুধোলেম, কী হয়েছে দাদা?
বসুদাদা মাথা নেড়ে বলল, কিছু না রে ফুলি। কোলকেতা বড় টানছে। তোর বৌদিদিরও নাকি শরীর টা ভালো নেই। পড়শি চিঠি দিয়েছে। তাই ভাবলাম এই গাঁ গঞ্জে পড়ে থেকে কী করব?
- আবার আসবে কবে?
- দেখি। না আসলেই বা কী? তুই তো ভালোই আছিস, সাহেবের কাছে।
- সে তো জন সাহেবের কাছেও ছিলাম।
একটু চুপ করে বলে, আমি আসব আবার। ওদিকটা একটু সামলে নিই।
- কখন যাবে?
- ভাবছি বেলাবেলিই বেড়িয়ে পড়ি।
- দুটি মুখে দিয়ে যেও।
- হ্যাঁ। সে তো যাবই। বলছি, একটু পুঁই চিংড়ি বানাবি? তোর বানানো পুঁই চিংড়ি অনেকদিন খাইনা। মনে বড় সাধ হল।
- সে কথা! তুমি দুটি চিংড়ি এনে দাও আমি এখুনি রেঁধে দিচ্ছি।
একটু পরে গনেশ এসে এত কটা চিংড়ি রেখে গেল। খোলা ছাড়াতে বসলাম। কত কথা মনে পড়ল। আমার যেটুকু বিদ্যে, সেতো বসুদাদার জন্যেই। আমায় সুযোগ পেলেই অ-আ পড়তে লিখতে শিখিয়েছে। একবারের জন্যেও আমার থেকে দূরে যায়নি। আর আজ এই এতদূরে আমায় ফেলে রেখে...। ঝাপসা হয়ে যায় চিংড়ি গুলো।
সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে সব কটা চিংড়ি ছাড়িয়ে ধুয়ে ফেললাম। আলু, কুমড়ো, পেঁয়াজ কেটে কুটে আগেই রেখে দিয়েছিলাম। শুধু আদা আর রসুনটা কেটে বেটে নিলাম। আর পুঁই শাক তো মাচাতেই হয়। খানিকটা পেড়ে আনলাম। সেটাও কেটে ধুয়ে নিলাম।
রান্নাতে মনই বসছেনা। মা বলত, রান্নার সময় সবসময় মনটা পুরো দিবি। যত মন দিয়ে রান্না করবি, তত স্বাদ ভালো হবে, দেখবি।
কিন্তু এমন দিনে কি আর মন বসে! খালি থেকে থেকে নানা ভয়, আশংকা, নানারকম পুরনো কথা মনের মধ্যে ভীড় করে আসছে। যত সেইসব সরিয়ে রাখতে চাই, ততো যেন চেপে বসে।
চিংড়ি গুলোকে নুন হলুদ মাখিয়ে রেখেছিলাম। এবার কড়াইতে তেল গরম করে হাল্কা ভেজে তুলে রাখলাম থালায়।
বসুদাদা কখন এসে দাঁড়িয়েছে খেয়ালই করিনি।
- কি রে ফুলি, কাঁদছিস কেন?
তাড়াতাড়ি কাপড়ে চোখ মুছে বলি, ও কিছুনা দাদা, পেঁয়াজের ঝাঁঝ।
বসুদাদা কী বোঝে জানিনা। আমার মাথায় হাত রেখে বলে, আমি কথা দিচ্ছি, ঠিক ফিরে আসব। আর তোকে তো লেখা পড়া শিখিয়েছি। কিছু বলার থাকলেই চিঠি দিস। আমি আসব।
বলে তাড়াতাড়ি চলে গেল রান্নাঘর থেকে।
আমি আবার রান্নায় মন দিই। যাওয়ার আগে যেন মানুষটাকে খারাপ কিছু না খাওয়াই। পেঁয়াজ, আদা, রসুন বাটা সব একসাথে নিয়ে কড়াতে পাঁচফোড়ন দিয়ে একটু নাড়িয়ে নিলাম। তারপর আলু আর কুমড়ো দিয়ে দিলাম ওর মধ্যে। যখন বেশ ভাজা ভাজা হয়ে এসেছে, পুঁইশাক দিয়ে নুন আর অল্প চিনি দিয়ে বসিয়ে দিলাম ঢাকা দিয়ে।
একবার জন সাহেবের বাড়িতে তখন রান্না করি, এইসব ইংরিজি ঠাঁটবাঁট বুঝিও না, পারি তো নাই। জন সাহেবের শালী এল বিলেত থেকে। তার জন্য স্যুপ বানাতে হবে। আমি কি ছাই ওসব পারি! আমি ঝাল ঝোল অম্বল রাঁধতেই শিখেছি। ভয়ে ভয়ে রান্না ঘরে বসে আছি। স্যুপের মানেই জানিনা, রাঁধব কী? শেষে বসুদাদা এসে আমায় সব বুঝিয়ে দিল। তারপর রেঁধে দিলাম। মা ঠিক কথাই বলত, যদি সব মশলার স্বাদ জানো, তাদের ধম্ম জানো, যত না জানা রান্নাই হোকনা কেন, স্বাদ ভালো হতেই হবে!
পুঁই শাকটা বোধহয় হয়ে এসেছে। ঢাকনা খুলে দেখলাম, হ্যাঁ। বেশ মিশ খেয়ে গেছে। এবার চিংড়ি গুলো দিয়ে দিলাম ওর মধ্যে। একটুক্ষণ রেখে নামিয়ে নিলাম।
ও দিকে বসুদাদাও চান টান করে এসে পড়েছে। পিঁড়ে পেতে বসিয়ে নিজে হাতে পরিবেশন করে খাওয়ালাম দাদাকে। যাওয়ার আগে আমায় মাথায় হাত দিয়ে বলল, যার হাতে এমন রান্নার স্বাদ, সে সাক্ষাৎ অন্নপূন্না না হয়ে যায় না রে! আমি তোর হাতের রান্না খেতেই বার বার ফিরে আসব তোর কাছে। - বলে কাপড়ের খুঁটোয় চোখ মুছে নদীর ঘাটের দিকে এগিয়ে চলল।

Wednesday, April 27, 2016

Post 31: কেরী সাহেবের কিচেন ১

[ বাঙালীর সাথে খাওয়া ব্যাপারটা এতটাই ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গেছে যে তাকে ছাড়ানোই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই যে দেখুন, facebook-এ এক একটা গোটা গ্রুপ জুড়ে সকাল থেকে খালি খাই-খাই-খাই করতে লেগেছে সবাই। বেলের পানা থেকে লাউএর পায়েস হয়ে যেই লাঞ্চের দিকে গড়াবে গড়াবে করছে ব্যাপারটা একটা ঘটনা মনে পড়ল। বাঙালীর এক অজ্ঞাত ইতিহাস। হঠাত একদিন চোখের সামনে খুলে গেছিল আমার।
সেদিন কলেজ থেকে বেরিয়ে মনটা খাই খাই এমন করতে লাগল যে কী বলব! ইচ্ছে হল পুঁটিরামে ঢুঁ দিই। আহা, গরম গরম কচুরি আর একশো মিষ্টি দই। খেলেই মনে হওয় - স্বর্গ যদি সত্যি কোথাও থাকে তা এখানেই - পুঁটিরামের টেবিলে। তো যেমন ভাবা তেমন কাজ। ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে রোদ-চশমা বাগিয়ে কলেজ স্ট্রীট ছেড়ে যেই পা দেব দেব করছি সূর্য সেনে, অমনি ডাক - "ও দাদা, শুনছেন?”
চেনা বইওলা। পুরনো বই এর দোকানের ছায়া থেকে গলা বের করে, দেখি, ইগ্রেটের মত চেয়ে আছেন। শুভ কাজে বাধা পড়ায় বেজায় বিরক্ত লাগল। 
- "কী?” 
- “ এদিকে আসেন"
- “ কেন?”
- “ সেদিন পুরানো কোলকাতার ওপর একটা বই খুঁজছিলেন না?”
-” হুম।"
- “একটা ভালো জিনিস আছে। আসুন। আপনাকে দেখাবো বলে রেখে দিয়েছি।"
কৌতূহল নিরসনে ঢুকেই পড়ি ঠেলেঠুলে। ভদ্রলোক কোথা থেকে একটা ছেঁড়া খোঁড়া ডায়েরী বের করে হাতে দিলেন। উলটে পালটে দেখে তো চক্ষু ছানা বড়া। আশি টাকা দিয়ে কিনেই ফেললাম। তারপর গোটা দশেক কচুরি আর গোটা পাঁচেক রসগোল্লা সহযোগে সেই ডায়রি টা পড়ে ফেললাম। ডায়েরিটা কিছুইনা - একটা রান্নার খাতা, তবে তা এইট্‌টিন্থ সেঞ্চুরির এক ভদ্রমহিলার। বাঙালী। নাম ফুলি। আমাদের উইলিয়ম কেরির রাঁধুনি ছিলেন তিনি। তিনি জানতেন বাংলা রান্না। কেরি সাহেব, ভোলাভালা মানুষ। খেয়ে নেন সব কিছুই। কিন্তু মিসেস কেরির মুখে রোচে না। তাই ফুলিকে শিখতে হল ইংরিজি রান্না। ইংরিজি বাংলার মিশেলে কিছু অপূর্ব পদ আবিষ্কার করেন ফুলি। রামরাম বসুর কাছে লিখতে পড়তে শিখেছিলেন তিনি। আর তাই তাঁর সমস্ত রেসিপি লিপিবদ্ধ করে গেছেন এই খাতায়। সেইসব সাংঘাতিক রান্নাবান্না সবার জন্য পোস্ট করি ভাবলাম। 
ডায়রীর কথা হুবহু তুলে দেব ভেবেছিলুম। কিন্তু পরে ভেবে দেখলুম, তখনকার বাংলা, তায় আবার সদ্য-শিক্ষিতার হাতে লেখা। তাই একটু পরিমার্জন করে নিজের মত করে লেখাটাই ঠিক মনে করলুম। ]
****************************** 
।। ১ ।। 
রান্নাঘরে বসে মাছ কুটছিলাম। বসুদাদা এসে একখান এতবড় ইলিশ মাছ ধপ করে মেঝেতে ফেলে একটা পিঁড়ে টেনে নিয়ে বসল। কপালের ঘাম মুছে বলল, এক ঘটি জল দে তো ফুলি। যা রোদ! 
আমি আঁচলে হাত মুছে কলসি থেকে জল গড়িয়ে দিলাম।
- মেম সাহেবের আবদার। বসুদাদা বলল। 
- কী?
- ওই পোনা মাছ তার রুচছে না। তেল ঝাল ঝোল খেয়ে নাকি পেট ছেড়েছে - বুঝলি? চোখ মটকায় বসুদাদা। বলে, ওই তো সিদ্ধ পোড়া খাওয়া জাত - এসব রান্না কি আর পেটে সয়। কথায় বলে না...
দরজার কাছ থেকে একটা সাড়া পেয়ে বসুদাদা চুপ করে যায়। স্বয়ং মেমসাহেব। ইনি অবশ্য বাংলা বোঝেন না সেরকম। তাই ভয়ের কিছু নেই। মেমসাহেব রান্না ঘরে উঁকি দিয়ে খটমট করে ইংরিজি তে কিসব বললেন। বসুদাদা ঘাড় নেড়ে দিল। মেমসাহেব চলে যেতেই পিঁড়েটা টেনে নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে এসে বলল, বললাম না, সিদ্ধ চাই। 
আমি অবাক হয়ে বলি, মাছ আবার কেউ সিদ্ধ খায় নাকি! 
বসুদাদা হাসি হাসি মুখে বলল, আলবাত খায়! এরা সিদ্ধ মাছ খেয়েই দেশ জয় করে ফেলল রে! 
চিন্তায় পড়ে বলি, কিন্তু বানাব কী করে? 
বসুদাদা বলল, সে আমি জানিনা। তোকে এতগুলো টাকা কেন দেওয়া হয়? উপায় বের কর। আমি যাই, সাহেব এক্ষুনি এত্তেলা পাঠালেন বলে! 
হড়বড় করে চলে গেল। 
আমি গালে হাত দিয়ে ভাবতে বসি এই মাছ নিয়ে কী করি! সিদ্ধ মাছ তো বাপের জন্মে শুনিনি। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে মাছটা ধুয়ে কেটে ফেললাম। মাছ তো সিদ্ধ করে পাতে দিয়ে দিলেই হয় না! একটা স্বাদ বলে তো বস্তু আছে! কেরী সাহেব বলে বেরোন যে ফুলির রান্নার কি স্বাদ! ওই ডাইনি বৌটারই শুধু মুখে রোচে না! এমন দেবতুল্য মানুষকে অমন আলুনি বিস্বাদ মাছ সিদ্ধ খাওয়াতে পারবনা! তাই ভেবে চিন্তে একটু নুন, মরিচ, সরষের তেল (শেষ হয়ে এসেছে, বসু দাদাকে বলতে হবে আনার কথা), পাতি নেবুর রস, হলুদ দিয়ে ভালো করে মাখিয়ে রাখলুম। বসুদাদা একবার এসে ঢুঁ মেরে বলে গেল, কি রে ফুলি রান্না হচ্ছে তো? যেন না পারলে নিজে এসে করে দেবে! পারিনা বাপু! 
বেলা তো গড়াতে চলল। ভাত বসাতে তো হবে! তার আগে একটু লাউ ডাল করে নিলাম। যা গরম। শরীর ঠান্ডা হবে। একেই এরা ঠান্ডা দেশের মানুষজন। 
লাউ কেটে পাতা গুলো রাখা ছিল এক কোণে। ভাত বসিইয়ে মাছের কথা ভাবতেই মনে হল, এক কাজ করা যাক। ভাতের মাড়টা গলে গলে এসেছে এরকম সময়, এক একটা লাউপাতা নিয়ে তার মধ্যে মাখানো এক একটা মাছ রেখে ভাতের মধ্যে দিয়ে দিলাম এক এক করে। দিয়ে আঁচ কমিয়ে দিই উনানের। ওই ভাপেই সিদ্ধ হয়ে যাবে- চিন্তা নেই। 
বসুদাদা এসে বলল, কিরে, সাহেবের তো খিদে পেয়ে গেছে। উশখুশ করছে! তুই মাছ বানাতে তো বেলা শেষ করে দিলি! 
হাসি মুখে বলি, পাত পাড়ো। খাবার হয়ে গেছে।
মেমসাহেব সেই পাঁচন খাওয়া মুখে খেলেও, সাহেব কিন্তু ধন্য ধন্য করলেন। পরে আবার একদিন একগাদা ফিরিঙ্গি ইয়ার বন্ধু কে ডেকে এনে ভোজ দিয়েছিলেন। সেদিনও বানিয়েছিলাম। নাম দিয়েছিলাম - কেরী সাহেবের সিদ্ধ ইলিশ।

Sunday, October 18, 2015

Post 30: সুনীল সাগরের শ্যামল কিনারে

প্লেনটা প্রায় আধঘন্টা লেট করল। এমনিতে ট্রেনের চেয়ে প্লেন লেট করলে আমার বিরক্তি বেশি হয়। কারণ প্লেনে উঠলেই বেশীরভাগ মানুষ কেমন যেন এলিট মুখ করে কানে হেডফোন গুঁজে চোখ বুজে বসে থাকেন। এক্ষেত্রে আধঘন্টা লেট করার জন্য আমার বিরক্তির উদ্রেক হওয়াটা খুব স্বাভাবিক এবং যুক্তিসংগত ছিল, কিন্তু হল না। না হাওয়ার একটা কারণ যদি হয় এরকম একটা ছোট প্লেনে চড়ার প্রথম অভিজ্ঞতা, দ্বিতীয় কারণ অবশ্যই জানালা দিয়ে দেখতে পাওয়া অনন্য সুন্দর ভূপ্রকৃতি।
চলছি গোয়া, গিন্নিকে নিয়ে। মাঝ সপ্তাহে ছুটি পাওয়াটা দুজনের কাছেই চ্যালেঞ্জের ছিল। কিন্তু পিছপা না হয়ে মৃত আত্মীয়দের আর একবার মৃত্যু ঘটিয়ে পালালাম অফিস থেকে। আর পাঁচজন গোয়া যাত্রীর মত মদ্যপান আর নাইটক্লাব আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না। উদ্দেশ্য ছিল পর্তুগিজ গোয়াকে চোখে দেখা। আর তার জন্যই ভীড় থেকে বাঁচতে এমন বর্ষায় গোয়া যাত্রা।
গুগুল ম্যাপ বলল, এয়ারপোর্ট থেকে আমাদের হোটেল নাকি প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূর। ঘড়ি বলছে বেলা প্রায় দুটো, খিদে চুই চুই পেটে লোকাল ট্রান্সপোর্ট এর ভরসা না করে প্রিপেইড ট্যাক্সি নিয়ে গা এলিয়ে দিলাম। সবুজ পাহাড় আর নীল সমুদ্রের কোলের মধ্যে দিয়ে গাড়ি ছুটে চলল ক্যান্ডলিমের দিকে। গাড়িতে বসে ভাবলাম একটু ঝালিয়ে নেওয়া যাক ইতিহাস।
পুরাণ বলছে, ঋষি পরশুরাম সহ্যাদ্রি (পশ্চিমঘাট পর্বত) থেকে একটি তীর ছোড়েন সমুদ্রের দিকে। আক্রোশের সঠিক কারণ জানি না কিন্তু সেই তীরের ভয়ে সমুদ্র পিছিয়ে যায়। তার ফলে যে স্থলভাগ জেগে ওঠে, তাই হল অধুনা গোয়া। মহাভারতে যার নাম আছে – গোপ রাষ্ট্র অর্থাৎ কিনা গোপালকের দেশ। পরবর্তীকালে ষোড়শ শতকে পর্তুগীজরা যখন গোয়াকে দখল করে, তখন তারা এর নাম পরিবর্তন করে রাখে “গোয়া”।
মৌর্য্য সাম্রাজ্যের পতনের পরে ভোজ রাজবংশ গোয়াতে রাজত্ব্ করে বেশ কিছু দিন। এরপর গোয়া এসেছে বিভিন্ন রাজবংশের অধীনে। সাতবাহন, চালুক্য, কদম্ব প্রভৃতি। অবশেষে ১৩১১ খ্রীস্টাব্দে দিল্লির মুসলিম শাসনে আসে গোয়া। কিন্তু জল পাহাড় ঘেরা এদেশে শাসন কায়েম রাখতে ব্যর্থ হন দিল্লীর সুলতানও। গোয়া চলে আসে বিজয়নগর সাম্রাজ্যের অধীনে। সদ্য স্থাপিত বিজয়নগরের রাজা তখন প্রথম হরিহর। এরপর প্রায় একশ বছর গোয়া বিজয়নগর সাম্রাজ্যের অধীনে থাকে। ১৪৭০ সালে গুলবর্মার বাহ্মনী রাজারা দখল নেয় গোয়ার। কিন্তু তাদের অধিকার করার কয়েক বছরের মধ্যেই সুলতান ইউসুফ আদিল শাহ্ গোয়াকে করায়ত্ত করেন। তখন পর্তুগীজ ব্যবসায়ী আর মিশনারীরা পা রেখেছেন এই দেশের মাটিতে। ক্রমে বণিকের মানদন্ড শাসকের রাজদন্ডে পরিনত হয়ে গেল। ইউসুফ আদিল শাহ্কে পরাস্ত করে গোয়া চলে গেল পর্তুগীজদের হাতে এবং তারপর প্রায় সাড়ে চারশ বছর গোয়া রয়ে গেল পর্তুগীজ উপনিবেশ হিসাবেই।
এইসব সাতপাঁচ পড়তে পড়তে অনেকটা চলে এসেছি। হুঁশ ফেরে মনীষার ডাকে - “দ্যাখ, দ্যাখ কি দারুণ!’’ মোবাইল ছেড়ে তাকাতে দেখি পার হচ্ছি জুয়াড়ি নদী। একদিকে রেলব্রীজ, অন্যদিকে নদী গিয়ে মিশেছে সমুদ্রের বুকে, গোয়ার মধ্যে দিয়ে আড়াআড়িভাবে প্রধান দুই নদী বয়ে গেছে। তার মধ্যে একটি হল জুয়াড়ি, অপরটি গোয়ার রাজধানী পাঞ্জিমের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া মান্তবী নদী।
প্রায় একঘন্টা পর আমাদের হোটেলে পৌঁছাল আমাদের ট্যাক্সি। মালপত্র ঘরে নিয়ে পৌঁছেই বেরিয়ে পড়লাম দুজনে। প্রথম উদ্দেশ্য খিদের আগুন নেভানো, দ্বিতীয় কারণ, সামনেই ক্যান্ডলিম বিচ। মনীষা বলল, চল আগে বিচে যাই, তারপর নাহয় খাবার জায়গা খুঁজব।
এক সমুদ্র শহরের বাসিন্দা হওয়ার কারণে সমুদ্রতটের প্রতি আমার আকর্ষণ কম। আসলে তটটুকু বাদ দিলে বাকি সমুদ্রটুকু আমার কাছে ভয়ঙ্কর রকম একঘেয়ে লাগে। একটা অসম্ভবরকম মনোটোনাস ভাবে খালি আকাশ রাঙ্গা জলরাশি।
তাও জলের দেশে এলে জল তো দেখতেই হয়। ক্যান্ডলিম অপেক্ষাকৃত কম জনবহুল। সমুদ্রের ধারেই পেয়ে গেলাম একটা স্যাক, তিনদিক খোলা, মাথায় ছাউনিযুক্ত রেস্তোরা। ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী সবসময়ই গদ্যময়। তাই ক্যামেরার ব্যাগমুক্তি ঘটল না। দুজনেই স্যাক এর ভিতরে ঢুকে মেনুকার্ড তুলে নিই হাতে।
খাবার আসতে আসতে এক ঝলক বৃষ্টি হয়ে গেল। আকাশটা ভারী হয়েছিল বেশ অনেকক্ষণ ধরেই। গোয়া পশ্চিমঘাট পর্বতের পশ্চিম পাদদেশে হওয়ায় বৃষ্টিপাত নাকি সাংঘাতিক হয়। আর সেই কারণে অধিকাংশ অট্টালিকার ঢালু ছাদ, যাতে জল জমে না থাকে।
ভেজা বালির ওপর দিয়ে বেশ খানিকটা হেঁটে ফেললাম দুজনে। পায়ের হাওয়াই চপ্পল হাতে নিয়ে মনীষা বলল ওই ঢিবিটার ওপর উঠে বসি। বসলাম দুজনে। সব কিছুর ওপরে গোয়া আসার একটা মস্ত কারণ ছিল, দুজন মিলে খানিকটা সময় কাটানো। চাকরির চোটে দুজনের কথাবার্তা দুরে থাক, দেখা হওয়াই প্রায় বন্ধ হওয়ার যোগাড়। তাই মাঝে মধ্যেই বেরিয়ে পড়ি এদিক সেদিক। আর কিছু না হোক একটু গল্প তো হবে।
ভারতের পশ্চিম উপকূল হওয়াতে সন্ধ্যা দেরিতে নামে। বসে থাকি ভেজা বালিতে। মেঘের পর্বতের পেছনে সুয্যিদেব কখন যে আরব সাগরে ডুবটি দিলেন টেরও পেলাম না। তবু মেঘের রং ঘন হয়ে আসে মন্দ মন্থরে সন্ধ্যা নেমে আসে ক্যান্ডলিম বিচের ওপর।
সকালটা যে ভিজে থাকবে তা রাতেই টের পেয়েছিলাম। শোয়ার সময় কানে এসেছিল মেঘের ডাক। ঘুম ভাঙতে বারান্দায় বেরিয়ে দেখি ভেজা রাস্তাঘাট। বৃষ্টি ধরে গেছে, কিন্তু মাটির সোঁদা গন্ধ যায়নি।

আজ আমাদের প্ল্যান ছিল উত্তর গোয়া ঘুরে দেখার। উত্তর গোয়া মূলতঃ ভিড়ে ভরা, পর্যটকদের আকর্ষণের সমস্ত উপকরণ যুক্ত। গোয়ার পৃথিবী বিখ্যাত অধিকাংশ বিচ উত্তর গোয়াতেই।
আমরা একটা গাড়ি ঠিক করে নিয়েছিলাম। কথা হল, ঘুরিয়ে দেখাবে বিচগুলো। তার সাথে আগুয়াড়া দুর্গ। ক্যালাঙ্গুট বিচের কাছ থেকে গাড়ি চড়ে চললাম প্রথমে আগুয়াড়া দুর্গের দিকে। ১৬১৩ সালে ডাচ্ এবং মারাঠিদের সামলানোর জন্য এই দুর্গ তৈরী হয়। সমুদ্র, পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে রাস্তা বেয়ে আগুযাড়া দুর্গে পৌছলাম, তখন মধ্যাহ্ণ। যদিও মেঘলা দিনে বেলা বোঝার উপায় নেই।
আগুয়া (Agua) শব্দের অর্থ জল, পর্তুগীজে। এই দুর্গ ছিল তৎকালীন পশ্চিম উপকুলের এক ল্যান্ডমার্ক। ইউরোপীয় বাণিজ্যতরী যত যেত – এই দুর্গের কাছে আসত পানীয় জল সংগ্রহের জন্য। সমুদ্রের একদম লাগোয়া আগুয়াড়া দুর্গের ভিতরে একটি লাইট হাউজও রয়েছে দেখলাম।
মন ভরে ছবি তোলার পর গাড়ি করে আবার চলা শুরু। এবার গন্তব্য ভাগাতুর বিচ। উত্তর গোয়াতে পর্যটকদের আকর্ষণ করে যে বিচগুলি, তার মধ্যে ভাগাতুর অন্যতম। পাথুরে সমুদ্রতট, মেঘ ঝুলে থাকা আকাশ তার নিরন্তর ঝাঁপিয়ে পড়তে থাকা ঢেউ। সবমিলিয়ে যেন এক সিম্ফনি বসিয়ে দিল মনের মধ্যে। কানে যেন ভেসে এল কোন দূরাগত গান – হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ঐশ্বরিক কন্ঠে বেজে উঠেছে –
“....শুধু সঙ্গে তারি গাইত আমার প্রাণ,
সদা নাচত হৃদয় অশান্ত।
হঠাৎ খেলার শেষে আজ কি দেখি ছবি –
স্তব্ধ আকাশ, নীরব শশী রবি,
তোমার চরণ– পানে নয়ন করি নত
ভুবন দাঁড়িয়ে আছে একান্ত।।”
এরপর একে একে দেখে নিলাম আজুনা, ক্যালাঙ্গুট, বাগা বিচ। কিন্তু ভাগাতুরের মতো কাউকে লাগল না। আসলে স্থান, কাল আর পাত্রের মিলেমিশে জন্ম নেয় কিছু মূহুর্ত। সেই সব মূহুর্তের জীবনকাল বিশ্বকর্মার কারখানায় তৈরী হওয়া মহামূল্যবান আংটির টপ করে সমুদ্র অতলে মিলিয়ে যাওয়ার মতো ক্ষণস্থায়ী কিন্তু মোহময়। ভাগাতুর বিচে কাকের গলার রঙের আকাশের তলায় আসামীকে সাক্ষাৎ করাটা এমনই কোনও এক মুহুর্ত জন্ম দিয়েছিল হয়ত আমার মনের মধ্যে।
পরদিন ঠিক করলাম ঘুরে দেখব পুরনো গোয়া, অর্থাৎ কিনা দক্ষিণ গোয়া। দক্ষিণ গোয়াতে আমার মূল আকর্ষণ ছিল গীর্জা। Bom Jesus Basillica – যেখানে রাখা আছে সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্সের দেহ। গোয়া ট্যুরিজমের বাসে চেপে পড়লাম। যাত্রাপথে পড়বে কোলাবা বিচ, মারিন মিউজিয়াম, এক পর্তুগীজ অট্টালিকা, শান্তদুর্গা মন্দির এবং সবশেষে দুটি গীর্জা। এর মধ্যে কোলাবা নাকি ভারতবর্ষের দীর্ঘতম বেলাভূমি। দ্বিতীয় আমাদের চেন্নাই-এর মারিনা বিচ। আকাশ বেশ পরিষ্কার ছিল। বিস্তৃত বেলাভূমিতে লোকসংখ্যা বেশ কম। কিছু সোনালী চুল বিদেশিনী রোদ পোহাচ্ছে। গোয়ার সাগরে সবুজ এমন মিশে থাকে, রবি ঠাকুরের ওই গানটা বরাবর মনে পড়ে – ‘সুনীল সাগরের শ্যামল কিনারে,’। আজ পথে যেতে দেখে নিলাম সোনালী চুলের তুলনাহীনাকে।
কোলাবা বিচ, মারিন অ্যাকোরিয়াম দেখে বাস ছুটল পর্তুগীজ অট্টালিকার দিকে। ততকালীন পর্তুগীজরা এদেশের মানুষদের সাথে তাদের শ্রেণীপার্থক্য প্রকট রাখার জন্য বাড়িও বানাত উঁচু ভিতের উপর। বেশ কিছু সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয় সদর দরজায়। প্রকান্ড অট্টালিকার ভিতর প্রচুর ঘর। প্রতি ঘরেই লাইট এন্ড সাউন্ডের মাধ্যমে দেখানো রয়েছে ততকালীন জীবন যাপন, বেশ সুন্দর টাইম ট্রাভেল। পুরনো স্থাপত্যের প্রতি আমার ব্যক্তিগত একটা ভালোলাগা আছে। কতকালের সব বাড়িঘর। যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, ঠিক সেই জায়গাতেই হয়ত ঝরে পড়েছিল কোনও অত্যাচারিতর নীরব অশ্রু। অথবা ওই গুমঘরের মধ্যে বন্দী হয়ে মরেছে কতজন – তাদের কেউ কেউ হয়ত আজও কেঁদে ফেরে এ বাড়ির অলিন্দ দিয়ে।
গোয়ার পর্তুগীজ জীবনকে প্রতক্ষ্য করে এগিয়ে চলা প্রাচীনতর নিদর্শনের দিকে, শান্তদুর্গা মন্দির। একবার শিব আর বিষ্ণুর মধ্যে ঝগড়া হয় – কে মহানতর তাই নিয়ে। দুজনে মিলে সহ্যাদ্রি পর্বতে এসে লড়তে থাকেন। দুই মহাশক্তির লড়ায়ের ফলে বিশ্ব যখন রসাতলে যাওয়ার যোগাড়, তখন সব দেবতারা পার্বতীকে এসে ধরেন, ওদের শান্ত করার জন্য। পার্বতী দুর্গা রূপে আবির্ভুত হয়ে মধ্যস্ততা করে তাদের শান্ত করেন। তাই তার নাম হয় শান্তদুর্গা।
এখানে মন্দিরগুলোর একটা অদ্ভুত সৌন্দর্য আছে। মন্দিরের গর্ভগৃহের উপর যে চূড়া বা গম্বুজ দেখা যায় তা এখানে অনুপস্থিত। বদলে সুবৃহৎ অট্টালিকার মত ঢালু ছাদ। আর একটি বৈশিষ্ট্য হল মন্দিরের সামনে অবস্থিত সপ্ততল স্তম্ভ, তার ওপরে দীপ। মানুষকে নাকি সাতবার জন্মাতে হয় – সম্পূর্ন মোক্ষের আগে। তারই প্রতিভূ এই সপ্ততল মিনার।
মন্দিরের পর থামা হল দ্বিপ্রাহরিক ভোজের জন্য। পাহাড়ের উপরে টুরিস্ট ডিপার্টমেন্টেরই রেস্টুরেন্ট। খাবারের মান সেরকম ভালো না হলেও খিদের পেটে সব কিছুই সুখাদ্য লাগে। খেয়ে নিলাম গপ্গপিয়ে। তারপর আবার চলা। এইবেলা চলতে চলতে গোয়ার খাবার নিয়ে দুকথা বলে রাখি। সমস্ত জায়গারই কিছু সিগ্‌নেচার ডিশ থাকে। গোয়া সমুদ্র লাগোয়া হওয়ার এখানে সি-ফুডের রমরমা। তার পাশাপাশি ইউরোপীয়ান আর ভারতীয় খাবারের মিশেলে তৈরী হয়েছে বিশুদ্ধ গোয়ানীজ কুইজিন, যার মধ্যে জাকুতি বা ভিন্ডালু কিন্তু বেশ বিখ্যাত।
খাবার কথা ভাবতে ভাবতে পৌঁছে গেছি গোয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত গীর্জা Bom Jesus Basillica -তে। এখানেই শায়িত আছেন সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স। এই অঞ্চলকে বলা হয় ওল্ড গোয়া। পর্তুগীজরা আসার পর এখানেই তাদের রাজধানী করেছিল। পরে এখানে প্লেগের প্রকোপ বাড়ায় রাজধানী পরিবর্তন করে পানাজি বা পাঞ্জিমে।
এই গীর্জা ভারতবর্ষের অন্যতম প্রাচীন। ১৬০৫ সালে তৈরী শেষ হয়। ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স চিনে দেহরক্ষা করলে, তার দেহ প্রায় দুই বছর পর নিয়ে আসা হয় গোয়াতে। এবং আশ্চর্য্যজনকভাবে এই দুই বছরে তাঁর দেহে কোনও পচন বা ক্ষয় হয়নি। গোয়ার এক ডাক্তার জেভিয়ার্সের ডান হাতটি কেটে নেন গবেষনার জন্য। কিন্তু রহস্য ভেদ হয় না। সেন্টের দেহ তখন টাস্কানির ডিউক কসিমো দ্য থার্ড-এর দেওয়া একটি কাসকেটের মধ্যে সংরক্ষিত করা হয়। এমনিতে কাসকেটটি গীর্জার ভিতর একটি উঁচু বেদিতে রাখা থাকে। প্রতি দশ বছরে তাকে বাইরে নিয়ে আসা হয়, মানুষকে কাছ থেকে দেখবার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। রাখা হয় ঠিক উল্টোদিকে অবস্থিত Se Cathedral এ।
Bom Jesus Basillica থেকে বের হয়ে রাস্তার অপর পারের Cathedral এ পৌঁছাই। প্রাচীন গোয়ার অনেক সাক্ষ্য ছড়িয়ে আছে এদিক ওদিক। রয়েছে মিরাকুলাস ক্রশ –যা নাকি গত প্রায় চারশ বছর ধরে নিজে নিজেই বাড়তে থাকে আকারে। এই প্রাচীন স্থাপত্যের মধ্যে দাড়িয়ে থাকলে সমস্ত কিংবদন্তিকে খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয়। চারশ বছর আগের জেসুইস্টেদের ধর্মপ্রচার, সাধারন মানুষকে জোর করে ধর্মান্তরিত করা –এই সব কথা যেন নীরব হয়ে রয়েছে এই সুবিশাল সব স্থাপত্যের আনাচে কানাচে। ইতিহাস, কান্না, রক্তের সাক্ষী এই সমস্ত ঠান্ডা দেয়ালে কান পাতলেই শোনা যাবে ঘোড়ার খুরের শব্দ, গাদা বন্দুকের গুলি বা নীরব প্রার্থনা।
দিন শেষে ফিরে চলি। আমোদ উৎসবের পিছনে ঢাকা পড়ে যাওয়া ইতিহাসের গোয়াকে একটু হলেও ছুঁতে পেলাম। ছড়িয়ে থাকা আরও বহু গীর্জারা অদেখা রয়ে গেল তাদের না জানা কত কিংবদন্তি নিয়ে। আসার পথে দেখলাম সেই ব্রীজ – যাকে গোয়ার শেষ ভাইসরয় ১৯৬১ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর আগ্রাসন ঠেকাতে ধ্বংস করে দিয়ে যান। পরে অনেক যোগাযোগ স্থাপন হয়েছে। কিন্তু হয়তো ঐ ব্রীজের মতোই এতো বছরের মাটির গন্ধ মাখা গোয়ার ইতিহাস অবহেলিত হয়ে পড়ে থাকে ভগ্নপ্রায় হয়ে। আবার ইচ্ছা রইল ফিরে আসার, না শোনা অনেক গল্পকে শোনার জন্য।

Thursday, October 8, 2015

Post 29: ।। আকাশপারের মেয়ে ।।

আকাশপারের মেয়ে
রোদ্দুরটা আমায় দিল
আঁধারটুকু নিয়ে।
ঝড়-বাদলের দিন!
ঝড়টা রেখে বলেছিল
‘বৃষ্টি ফোঁটা নিন’।
তেপান্তরের মাঠ!
পক্ষীরাজটা আমি-ই পেলাম
একাকী সম্রাট!
আকাশ অনেক দূর!
হাতে ছিল তানপুরাটা
আমায় দিল সুর।
সুর-রোদ্দুর হাতে
পার হয়েছি এদেশ-ওদেশ
পক্ষীরাজের পিঠে।
ভুলেই গেছি তাকে –
হঠাৎ, মেঘের রাজ্য থেকে
দেখতে পেলাম – অনেক নীচে অচেনা এক বাড়ি,
আকাশ-মেয়ে রোদ্দুরে দেয় বেগ্‌নে রঙের শাড়ি।

Thursday, August 13, 2015

Post 28: দাদান

কিছু মানুষ থাকেন যাঁরা গল্প বলতে পারেন খুব সুন্দর। সেরকম একজন আমার ঠাকুরদাদা, যাঁকে আমি দাদান বলেই ডাকি। আমার ছোটবেলায়, যখন অক্ষর পরিচয় ঘটেনি, দাদানের মুখের গল্পই ছিল সাহিত্যের সাথে আমার প্রথম পরিচয়। আমার দিব্যি মনে পড়ে ইস্কুলে ভর্তি হওয়ার পর মিস্‌রা বেশ চমকে গিয়েছিল আমার মহাভারত বা রামায়ণের প্রায় সব ঘটনাবলী কন্ঠস্থ দেখে। এর সমস্তটাই দাদানের মুখের গল্প শুনে।
মানুষ যখন নির্মিত হয়, তার সাথে মহিষাসুরমর্দিনীর এক মিল থাকে। তিলোত্তমা কে যেমন ব্রহ্মা, বিষ্ণু আর মহেশ্বর নিজের নিজের তেজ পুঞ্জিভুত করে সৃষ্টি করেছিলেন এবং সমস্ত দেবতারা নিজেদের অস্ত্র দিয়ে সজ্জিত করেছিলেন তাঁকে, মানুষের নির্মাণটাও ঠিক সেই ভাবেই হয়। আশ-পাশে ঘিরে থাকা আত্মীয় বা অনাত্মীয় মানুষদের থেকে প্রেরণা বা বোধ সঞ্চয় করে তার জীবনবোধ গড়ে ওঠে। আমিও তার কোনও ব্যতিক্রম নই। আমার বাবা যদি আমার বিজ্ঞান বোধের জন্য দায়ী হয়, আমার দাদান ছিল আমার সাথে বিশ্ব সাহিত্য এবং চলচ্চিত্রের সাথে যোগসূত্র। ছোট্টবেলার আনন্দমেলা পড়ে শোনানো থেকে শুরু করে 'দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন'এর গল্প। বড় হয়ে ছবিটা দেখেও সেই উপভোগ্যতাটা পাইনি যেটা ছিল দাদানের গল্পে। তাঁর অফুরন্ত গল্পের স্টক। আমার হাই স্কুল পার হয়ে যাওয়া অবধি একটা গল্প দ্বিতীয়বারের জন্য রিপিট হয়নি কখনো।
দাদান টাকী রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্র। ইস্কুলের গল্প শুনেছি ছোটবেলার থেকে। প্রতি গরমের ছুটির আগে নাকি মঞ্চ বেঁধে নাটক হত। দাদান তাতে পার্ট করত। তখন আমি সদ্য ক্লাশ ওয়ান। দাদানের মুখেই শোনা বৃত্রাসুরের গল্প নিয়ে আমার খাতার পিছনে লিখে ফেললাম একটা 'নাটক'। গরমের ছুটির আগের দিন ক্লাশের বন্ধুরা মিলে করেও ফেললাম। হাততালি কুড়োলাম বেশ। তারপর থেকে যতদিন ওই স্কুলে ছিলাম, কোনওবার রামু নামের এক ভুলো চাকরের গল্প, কোনোবার রবীন্দ্রনাথের গেছোবাবা অথবা সুকুমারের অবাক জলপান - নাটক বাদ পড়েনি একবারও।
বড় হওয়ার পর যখন নানারকম সুবিধা-অসুবিধার কারণে বাবা-মা আলাদা হয়ে চলে আসি অন্য বাড়িতে, প্রতি শনিবার হলেই দাদানের কাছে যাওয়াটা মিস্‌ হতনা - শুধুমাত্র গল্প শোনার জন্য। গল্প শুনতে শুনতেই শুনেছিলাম, তার রবীন্দ্রনাথের শেষযাত্রায় যোগ দেওয়ার কথা, শুনেছিলাম তার সত্যজিতকে দেখা - কোনও এক কনসার্ট হলের বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গান শুনতে। গল্প শুনেই জেনেছিলাম, হিচককের বার্ডস্‌, সাউন্ড অফ মিউজিক অথবা চার্লি চ্যাপলিনের গল্প।
কাল রাতে অফিস থেকে ফেরার পর যখন হঠাত ফোনে শুনলাম মানুষটা হঠাত নেই - অজস্র স্মৃতির ভীড়ে হারিয়ে ফেলেছিলাম নিজেকে। অনেকরাতের কোন বিমান না থাকায় তাঁকে শেষবারের মত বিদায় জানাতে পারলাম না। এখনো কোলকাতায় ফিরলে ক্ষীণ হয়ে আসা কন্ঠস্বরেও আমায় কাছে বসিয়ে একের পর এক গল্প বলে যেতেন - হয়ত সেগুলো আমার বহুবার শোনা বা পড়া - তবুও চুপ করে শুনে যেতাম - গল্প বলাটা যে একটা আর্ট সেটা শিখিনি, কিন্তু বুঝেছি দাদানের কাছ থেকে। ভালো থেকো দাদান।