আজ অনেকদিন পর কোলকাতায় এলাম। ভোর বেলায়
ট্রেনের জানলা দিয়ে দূরে ধোঁয়াশায় ঢেকে থাকা হাওড়ার ব্রীজটা স্পষ্ট হতেই মনটা ভালো
হয়ে গেল। আবার কোলকাতা। প্রায় পাঁচমাস পর। সেই ধোঁয়া ধুলো, মানুষের ভীড়ে ভরা
কোলকাতা।
কোলকাতা তখন জাগছে। হাওড়ার স্টেশনের কুলিদের
ঠেলাঠেলি, দর কষাকষি পার হয়ে একটা ট্যাক্সির মধ্যে গা এলিয়ে চোখে পড়ল সেই ‘হাওড়ার
ব্রীজ চলে মস্ত সে বিছে, হ্যারিসন রোড চলে তার পিছে পিছে’। বড়বাজারের ভীড়, জীবিকা
বা জীবনের তাড়নায় আধডোবা সূর্যকে পাশে রেখে মানুষের জেগে ওঠা। বড় বড় লঙ্কা, আলুর
ঢিপি বানিয়ে তৈরী হওয়া আমাদের চাহিদার জন্য। এরকম মাঝে মাঝে মনে হয়, মানুষের জীবন
আর জীবিকা যেন মাঝে মাঝে এক হয়ে যায়। পিঠে পঞ্চাশ কিলো আলুর বস্তা নিয়ে নিয়ে ভারে
বেঁকে পড়া মানুষগুলো ছুটে বেড়ায় জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, জীবিকার তাড়নায়।
জীবন জেগে ওঠে। ঘুমন্ত কোলকাতার প্রাণের
স্পন্দন ছড়িয়ে যায়। হাওড়া ব্রীজ, বড়বাজার, স্ট্রান্ড রোড, বি কে পাল আভিন্যু হয়ে
গোটা শহরের অলিতে, গলিতে। চারিদিকে থিতিয়ে পড়া ধুলো, ধোঁয়া আবার ভেসে ওঠে হাওয়ায়। পায়ের
তলায় থেঁতলে যাওয়া সব্জির গন্ধে ভরে ওঠে প্রেসিডেন্সি কলেজের চত্ত্বর অবধি। দু’কাঁধে
বাঁক ঝুলিয়ে চলে যায় ভারির দল। চুঁইয়ে পড়া জলের রেখায় চেনা হয়ে যায় তাদের রাস্তাগুলো। আদি ভুতনাথ
মন্দিরের দরজা খুলেছে। মাথায় চন্দনের ফোঁটা দেওয়া ব্রাহ্মণ পূজারি। তার স্নান হয়েছে একটু
আগে। রাস্তার ধারের কর্পোরেশনের জলে। বাবা বলেছিল, ওই জলগুলো নাকি গঙ্গার।
দু’একটা ভোরের বিমান উড়ে যায়। লন্ডন, দুবাই
কিংবা ব্যাংকক যাবে হয়তো। জানলায় বসে মানুষগুলো প্রাণ ভরে দেখে নিচ্ছে কোলকাতার
পথ-ঘাট, হাওড়ার ব্রীজ, তার তলার কালচে রূপোলি সুতর মতো পড়ে থাকা গঙ্গা। যারা
দক্ষিণের যাত্রি, তাদের চোখে পড়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, তার মাথায় ঘুমন্ত পরী।
জাগতে থাকা কোলকাতার রাস্তায় থাকা লক্ষ লক্ষ মানুষের উনুনের ধোঁয়ায় আস্তে আস্তে
শহর ঢেকে যাবে এরপর। তখন ভিক্টোরিয়া, হাওড়া ব্রীজ, এমনকি গঙ্গাকেও খুব অস্পষ্ট
লাগবে। নিচে শুধু থাকবে একটা ধোঁয়ার স্তর, উপরে মেঘের বুক চিরে উড়ে চলা শুধু।
কাল ছিল রবীন্দ্রজয়ন্তী। ২৫ শে বৈশাখ। এদিক
ওদিক পড়ে থাকা আধভাঙা স্টেজ। শোলার তৈরী রবীন্দ্রনাথের শুধু দাড়িটা রয়ে গেছে।
বাকিটা হয়ত ভেঙে উড়ে গেছে এদিক ওদিক। পিছনে শুকনো মালা, টেবিল চেয়ারের ধূলো, স্টেজ
বাঁধার কাতার দড়ি। ঝাড়ুদার এসে ঝাড়ু দিয়ে সেগুলো ফেলছে ডাস্টবিনে। ছোট ডাস্টবিন
থেকে সেগুলো যাবে বড় ডাস্টবিনে। একটু পরে কর্পরেশনের গাড়ি এসে সব তুলে নিয়ে চলে
যাবে।
মনে পড়ল ওই গানটা। সুচিত্রা মিত্রর গলায়
শুনেছিলাম। আমাদের বাড়িতে একটা ক্যাসেট ছিল সুচিত্রা মিত্রর। বাবা কোন এক সময়
মা-কে গিফ্ট করেছিল। সেই ক্যাসেটের দুই নম্বর গান ছিল।
‘নব আনন্দে জাগ আজি নব রবিকিরণে
শুভ্র সুন্দর প্রীতি-উজ্জ্বল নির্মল জীবনে।
উৎসারিত নব জীবন নির্ঝর উচ্ছ্বাসিত আশাগীতি,
অমৃতপুষ্পগন্ধ বহে আজি এই শান্তিপবনে’।
আজ এই সকালটার মধ্যে গানের শব্দগুলো খুব খুঁজে পেলাম। ছড়িয়ে আছে এদিক ওদিক।
রাস্তার ধারের কলে লাইন দিয়ে মানুষের কুলকুচি্র শব্দ, গাছের ওপর কাকেদের ঘুম ভেঙে
চ্যাঁচামেচি, সবজি নিয়ে ঠ্যালা গাড়ির ক্যাঁচ-কোঁচ, টানা রিক্সার টন্টন্ করে
একটানা শব্দ, ভোরের বাসের হর্ণ, প্রথম ট্রামের ঘট্ঘটাং-ঘট্ঘটাং, বাঁকে জল নিয়ে
যাওয়ার ছলাত-ছলাত, সব মিলিয়ে এক ঐকতান তৈরী হয়েছে। যান্ত্রিক কোলকাতার কলতানের আগে যেন এক অনন্য প্রিলিউড। যার শুরু থেকে শেষ অবধি শুধু জীবনের এদিক সেদিক, ‘উৎসারিত নব জীবন নির্ঝর উচ্ছ্বাসিত আশাগীতি।’
রাস্তার ধারের ঘুমন্ত ট্রাকগুলোকে দেখে কেমন
কষ্ট লাগে। মনখারাপ লাগে। একটু পরেই ইঞ্জিন গর্জে উঠবে। পিঠে টন টন জিনিস নিয়ে চলা
শুরু। দেশের এপ্রান্ত থেকে ওই প্রান্তের দিকে। মাঝে কোথাও ধরা পড়া ওভারওয়েটের
জন্য। এই ভাবে চলতে থাকা, মাঝে মাঝে থেমে পড়া, আবার চলা। গ্রাম, শহর পার হয়ে চলে
যাওয়া কোন দূরের দিকে, যেখানে সূর্য ওঠে অথবা সূর্য ডুবে যায়।
চলতে থাকা ট্যাক্সিতে পিছনে ফেলে আসি আধ
জাগা, জাগতে থাকা কোলকাতার এটা-ওটা। এগিয়ে চলি চলতে থাকা কোলকাতার দিকে। ওঠা পড়া,
ঘুম জাগার ঢেউ ঠেলে চলা। কোথাও বেজে ওঠে কোন মেয়ের সকালের রেওয়াজ। সা রে গা মা-র
ওঠা নামা। প্রেশার কুকারের সিটি, কড়াইএ তেলের শব্দ। প্রিলিউড ছেড়ে জাগে জীবন। গুটি
গুটি পায়ে এগিয়ে চলি বাড়ির সিঁড়ি ধরে।