Thursday, August 30, 2012

Post 9: Kolkata, my city


আজ অনেকদিন পর কোলকাতায় এলাম। ভোর বেলায় ট্রেনের জানলা দিয়ে দূরে ধোঁয়াশায় ঢেকে থাকা হাওড়ার ব্রীজটা স্পষ্ট হতেই মনটা ভালো হয়ে গেল। আবার কোলকাতা। প্রায় পাঁচমাস পর। সেই ধোঁয়া ধুলো, মানুষের ভীড়ে ভরা কোলকাতা।
কোলকাতা তখন জাগছে। হাওড়ার স্টেশনের কুলিদের ঠেলাঠেলি, দর কষাকষি পার হয়ে একটা ট্যাক্সির মধ্যে গা এলিয়ে চোখে পড়ল সেই ‘হাওড়ার ব্রীজ চলে মস্ত সে বিছে, হ্যারিসন রোড চলে তার পিছে পিছে’। বড়বাজারের ভীড়, জীবিকা বা জীবনের তাড়নায় আধডোবা সূর্যকে পাশে রেখে মানুষের জেগে ওঠা। বড় বড় লঙ্কা, আলুর ঢিপি বানিয়ে তৈরী হওয়া আমাদের চাহিদার জন্য। এরকম মাঝে মাঝে মনে হয়, মানুষের জীবন আর জীবিকা যেন মাঝে মাঝে এক হয়ে যায়। পিঠে পঞ্চাশ কিলো আলুর বস্তা নিয়ে নিয়ে ভারে বেঁকে পড়া মানুষগুলো ছুটে বেড়ায় জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, জীবিকার তাড়নায়
জীবন জেগে ওঠে। ঘুমন্ত কোলকাতার প্রাণের স্পন্দন ছড়িয়ে যায়। হাওড়া ব্রীজ, বড়বাজার, স্ট্রান্ড রোড, বি কে পাল আভিন্যু হয়ে গোটা শহরের অলিতে, গলিতে। চারিদিকে থিতিয়ে পড়া ধুলো, ধোঁয়া আবার ভেসে ওঠে হাওয়ায়। পায়ের তলায় থেঁতলে যাওয়া সব্জির গন্ধে ভরে ওঠে প্রেসিডেন্সি কলেজের চত্ত্বর অবধি। দু’কাঁধে বাঁক ঝুলিয়ে চলে যায় ভারির দল চুঁইয়ে পড়া জলের রেখায় চেনা হয়ে যায় তাদের রাস্তাগুলো। আদি ভুতনাথ মন্দিরের দরজা খুলেছে। মাথায় চন্দনের ফোঁটা দেওয়া ব্রাহ্মণ পূজারিতার স্নান হয়েছে একটু আগে। রাস্তার ধারের কর্পোরেশনের জলে। বাবা বলেছিল, ওই জলগুলো নাকি গঙ্গার।
দু’একটা ভোরের বিমান উড়ে যায়। লন্ডন, দুবাই কিংবা ব্যাংকক যাবে হয়তো। জানলায় বসে মানুষগুলো প্রাণ ভরে দেখে নিচ্ছে কোলকাতার পথ-ঘাট, হাওড়ার ব্রীজ, তার তলার কালচে রূপোলি সুতর মতো পড়ে থাকা গঙ্গা। যারা দক্ষিণের যাত্রি, তাদের চোখে পড়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, তার মাথায় ঘুমন্ত পরী। জাগতে থাকা কোলকাতার রাস্তায় থাকা লক্ষ লক্ষ মানুষের উনুনের ধোঁয়ায় আস্তে আস্তে শহর ঢেকে যাবে এরপর। তখন ভিক্টোরিয়া, হাওড়া ব্রীজ, এমনকি গঙ্গাকেও খুব অস্পষ্ট লাগবে। নিচে শুধু থাকবে একটা ধোঁয়ার স্তর, উপরে মেঘের বুক চিরে উড়ে চলা শুধু।
কাল ছিল রবীন্দ্রজয়ন্তী। ২৫ শে বৈশাখ। এদিক ওদিক পড়ে থাকা আধভাঙা স্টেজ। শোলার তৈরী রবীন্দ্রনাথের শুধু দাড়িটা রয়ে গেছে। বাকিটা হয়ত ভেঙে উড়ে গেছে এদিক ওদিক। পিছনে শুকনো মালা, টেবিল চেয়ারের ধূলো, স্টেজ বাঁধার কাতার দড়ি। ঝাড়ুদার এসে ঝাড়ু দিয়ে সেগুলো ফেলছে ডাস্টবিনে। ছোট ডাস্টবিন থেকে সেগুলো যাবে বড় ডাস্টবিনে। একটু পরে কর্পরেশনের গাড়ি এসে সব তুলে নিয়ে চলে যাবে।
মনে পড়ল ওই গানটা। সুচিত্রা মিত্রর গলায় শুনেছিলাম। আমাদের বাড়িতে একটা ক্যাসেট ছিল সুচিত্রা মিত্রর। বাবা কোন এক সময় মা-কে গিফ্‌ট করেছিল। সেই ক্যাসেটের দুই নম্বর গান ছিল।
‘নব আনন্দে জাগ আজি নব রবিকিরণে
শুভ্র সুন্দর প্রীতি-উজ্জ্বল নির্মল জীবনে।
উৎসারিত নব জীবন নির্ঝর উচ্ছ্বাসিত আশাগীতি,
অমৃতপুষ্পগন্ধ বহে আজি এই শান্তিপবনে’।
আজ এই সকালটার মধ্যে গানের শব্দগুলো খুব খুঁজে পেলাম। ছড়িয়ে আছে এদিক ওদিক। রাস্তার ধারের কলে লাইন দিয়ে মানুষের কুলকুচি্র শব্দ, গাছের ওপর কাকেদের ঘুম ভেঙে চ্যাঁচামেচি, সবজি নিয়ে ঠ্যালা গাড়ির ক্যাঁচ-কোঁচ, টানা রিক্সার টন্‌টন্‌ করে একটানা শব্দ, ভোরের বাসের হর্ণ, প্রথম ট্রামের ঘট্‌ঘটাং-ঘট্‌ঘটাং, বাঁকে জল নিয়ে যাওয়ার ছলাত-ছলাত, সব মিলিয়ে এক ঐকতান তৈরী হয়েছেযান্ত্রিক কোলকাতার কলতানের আগে যেন এক অনন্য প্রিলিউড। যার শুরু থেকে শেষ অবধি শুধু জীবনের এদিক সেদিক, ‘উৎসারিত নব জীবন নির্ঝর উচ্ছ্বাসিত আশাগীতি
রাস্তার ধারের ঘুমন্ত ট্রাকগুলোকে দেখে কেমন কষ্ট লাগে। মনখারাপ লাগে। একটু পরেই ইঞ্জিন গর্জে উঠবে। পিঠে টন টন জিনিস নিয়ে চলা শুরু। দেশের এপ্রান্ত থেকে ওই প্রান্তের দিকে। মাঝে কোথাও ধরা পড়া ওভারওয়েটের জন্য। এই ভাবে চলতে থাকা, মাঝে মাঝে থেমে পড়া, আবার চলা। গ্রাম, শহর পার হয়ে চলে যাওয়া কোন দূরের দিকে, যেখানে সূর্য ওঠে অথবা সূর্য ডুবে যায়।
চলতে থাকা ট্যাক্সিতে পিছনে ফেলে আসি আধ জাগা, জাগতে থাকা কোলকাতার এটা-ওটা। এগিয়ে চলি চলতে থাকা কোলকাতার দিকে। ওঠা পড়া, ঘুম জাগার ঢেউ ঠেলে চলা। কোথাও বেজে ওঠে কোন মেয়ের সকালের রেওয়াজ। সা রে গা মা-র ওঠা নামা। প্রেশার কুকারের সিটি, কড়াইএ তেলের শব্দ। প্রিলিউড ছেড়ে জাগে জীবন। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চলি বাড়ির সিঁড়ি ধরে।

Post 8: The Way to God


সেবার আমার দ্বিতীয়বার কেদারনাথ যাওয়া। প্রথমবার যখন গেছিলাম, আমার বয়স তখন চার। তাই স্মৃতি মলিন। কিছু কিছু ছেঁড়া আবছা চিত্রপট ছাড়া সবই অন্ধকার।
এবার বাবা ঠিক করল একবারে গৌরীকুন্ড থেকে কেদারে উঠব না। প্রায় চোদ্দ কিলোমিটার রাস্তা। তাই শ্রম হয়, নান্দনিকতার আস্বাদন ঢাকা পড়ে যায়। আসলে আমরা বেড়াতে যাই, যাকে বিশুদ্ধ বাংলায় বলে ‘ভ্রমণ’। ভ্রমণ শব্দটির উৎপত্তি ‘ভ্রম’ ধাতু থেকে, যার অর্থ হল জরায়ুর মধ্যে প্রাণের স্পন্দন, জেগে ওঠা। নবনীতা দেবসেন বলেছেন, এই ভ্রম কিছুটা আর কিছুটা রমণ, দুইয়ে মিলে ভ্রমণ। তাই বেড়ানোর মধ্যে যদি নান্দনিকতা না থাকে, ওই জেগে ওঠার অবসর টুকু না মেলে, তাহলে পরিতৃপ্তি আসে নাকি! বিদেশীরা যেমন ‘ট্রাভেল’ করে। ‘ট্রাভেল’ শব্দের উৎস ‘ত্রাভায়ি’, যার অর্থ হল পরিশ্রম করা। আমি তাই ট্রাভেল কখনো করতে ভালোবাসি না, ভ্রমণ করি।
যাক, নিজের জ্ঞান জাহির করতে গিয়ে ধান ভানতে শিবের গীত গেয়ে ফেল্লুম। ফিরে আসি কেদারে। এইসব সাতপাঁচ চিন্তা করে বাবা বলল যে মাঝে রামওয়াড়া চটিতে থাকা হবে রাত। পরদিন বাকি পথটুকু হেঁটে কেদার। গৌরীকুন্ড থেকে ধর্মোৎসাহী মানুষের ভীড় ঠেলে এগিয়ে চলা। দুদিকের অপার সৌন্দর্যের দিকে কারো চোখ নেই, পায়ে হেঁটে, দন্ডি কেটে, খচ্চরে চড়ে, পালকি চেপে এগিয়ে চলেছে দেব দর্শনের জন্যে। বর্তমানে মরে থেকে পরকাল বাঁচতে চাওয়ার আকুতি। কখনো কখনো হাক্সলে সাহেবের কথাটা খাঁটি সত্যি মনেহয়, ভারতের মানুষ ধর্মের নেশায় সব হারিয়েছে।
হিমালয়ের কোল কেটে যখন রামওয়াড়া পৌঁছালাম, সুর্য অস্তায়মান। Twilight-এর অপরূপ মায়া ছড়িয়ে পড়েছে বরফের গায়ে গায়ে। একটা ছোট হোটেল পাওয়া গেল রাতটুকুর জন্যে। বিকেলের রোদ্দুর গায়ে মাখিয়ে বারান্দায় বসা, গরম চা-এর পেয়ালায় নিজেকে গরম করে নেওয়ার চুমুক দিই। চোখে পড়ে বারান্দার এক কোণ ঘেঁসে বসে থাকা এক সাধু। সোয়েটার, জ্যাকেট চাপিয়েও আমরা জমে যাচ্ছি, আর সাধুর উর্ধাঙ্গ অনাবৃত। মুখে একটা মিটিমিটি হাসি। দেখে খুব অবাক হই। হিন্দিতে বাবা জিগ্যেস করে, আপনি কোথায় চলেছেন?
-কেদারনাথ। সাধুর জবাব।
-আসছেন কোথা থেকে? মা এবার প্রশ্ন করে।
-বদ্রীনাথ।
-কিভাবে এলেন?
-হেঁটে। সাধুর নির্লিপ্ত উত্তর।
-আপনি এই ভাবে শীতের জামা ছাড়া হেঁটে হেঁটে বদ্রী থেকে এতদূর এসেছেন! আমাদের সকলের চোখে মুখে বিস্ময়।
-হ্যাঁ, আমার কষ্ট হয় না। আমি এভাবেই ঘুরি। তার আগে ছিলাম রূদ্রনাথ। সেখান থেকে বদ্রী চলে গেলাম। ভালো লাগল না বেশীদিন। এখন চলেছি বাবা কেদারকে দেখব। বারবার আসি। কিন্তু যা চাই, সেটা কোথাও খুঁজে পাইনা।
-কি চান আপনি?
-সেটাই তো বুঝিনা। কে যে আমায় তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়... পার্থিব দুঃখ, কষ্ট, কিছু গায়ে লাগেনা। খুঁজে চলেছি।
দুচার কথার পর আমরা উঠে আসি। সাধু বললেন, বারান্দাতেই রাত কাটাব।
তারপর, টুপটাপ বরফ পরার শব্দ শুনতে শুনতে মোটা লেপের তলায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। সারাদিন পথ হাঁটার ক্লান্তি।
ভোরবেলা ঘুম ভাঙে। বাইরে সারারাত বরফ পড়েছে। বারান্দার কোণটা ফাঁকা। কেয়ার-টেকার বলে সাধু ভোরের আলো ফোটার আগেই বেড়িয়ে পড়েছেন।
একটা কৌপিন সম্বল করে অবিরাম তুষারের মধ্যে রাত কাটিয়েছেন। তারপর বেড়িয়ে পরেছেন অজানার খোঁজে। আমরা তৈরি হয়ে হাঁটা শুরু করি কেদার-এর উদ্দেশ্যে। ততক্ষণে উনি হয়তো আরো অনেকখানি এগিয়ে গেছেন ঈশ্বরের কাছে। মনে মনে বললাম, ওহে হাক্সলে, মানুষের শুধু হারানোটাই দেখলে, পাওয়ার জন্যে এরকম আকুলতাটা চোখে পড়ল না?

Post 7: Akash Kolom 4

আকাশকলম 
৪ ।।
আমার প্রথম ইস্কুল থেকে বাবা যখন আমায় নতুন ইস্কুলে ভর্তি করল, তখন আমি ক্লাশ ওয়ান। পুরোন ইস্কুলের মতো এখানে পঞ্চাশ জনের ক্লাশঘর নয়। নতুন ইস্কুল বেশ ফাঁকা ফাঁকা। আমাদের ক্লাশ ওয়ানে চারজন ছিল। আমি, অর্পণ, মল্লিকা, আর সৌরভ। উপরের ক্লাশ টু-তে মাত্র দুজন – সুমিত আর সুপর্ণা। একটা পার্টিশনের এপাশ আর ওপাশে ক্লাশ হত। ওই ইস্কুলের সিস্টাররা এখানে আন্টি হয়ে গেছে। শীলা আন্টি খুব রাগী ছিল। অর্পণ একবার ‘শ্রদ্ধা’ বানানে দন্ত্য’স লাগিয়েছিল বলে ওকে কান ধরে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।
সেবার আমাদের ইস্কুলের অ্যানুয়াল ফাংশন হবে বড় করে, ঠিক হল। গান হবে, নাচ হবে। আবোল-তাবোল হবে অভিনয় করে। আর হবে ‘জটায়ু বধ’। অপূর্ব কাকু আসত আমাদের রিহার্সাল করাতে। তাকে যে ডিরেক্টর বলে, সে জ্ঞান তখনও হয়নি। তবু তার কথা শুনে চলতে বেশ লাগত। প্রথম দিন আমাদের সবাইকে ডাকা হল ইস্কুলের বড় ঘরটায়। টিফিন পার হয়ে গেছে তখন। আর ক্লাশ হবেনা শুনলাম। বরাবরের লম্বা-চওড়া, মোটা-সোটা চেহারার আমাকে অপূর্ব কাকু ডেকে অন্যদিকে দাঁড়াতে বলল। তারপর অর্পণ, সৌরভ, নিচের ক্লাশের মৌমিতা আরও কয়েকজন। ‘জটায়ু বধ’এ আমি নাকি রাবণ হব, আর ‘আবোল-তাবোল’এ হুঁকোমুখো হ্যাংলা! বেশ মজা লাগলো। ততদিনে দাদান, মানে, আমার ঠাকুরদাদার কাছে রামায়ণ শুনে শুনে আমার সব ঘটনা বলতে গেলে মুখস্থ। আর বইমেলা থেকে বাবা কিনে দিয়েছিল হলুদ মলাটের আবোল-তাবোল। নিউ স্ক্রিপ্টের। ওখানে হুঁকোমুখো হ্যাংলার দুটো ল্যাজওয়ালা চেহারাটা বেশ ইন্টারেস্টিং। জোর কদমে চলতে লাগল রিহার্সাল। মৌমিতা সীতা হয়েছিল। নাটকটা ‘জটায়ু বধ’এ সমাপ্ত হওয়াতে আমাকে বধ হতে হয়নি, তাবে সীতাকে হরণ করার সৌভাগ্যটুকু হয়েছিল। বাবা বলেছিল, এই বয়েসেই পরস্ত্রী হরণ!
নাটকের দিন শেঠপুকুরের মাঠে বিশাল স্টেজ হয়েছিল। স্পিরিট গাম দিয়ে লাগানো গোঁফ নিয়ে, সত্যিকারের তরোয়াল নিয়ে (এত দিন বাড়িতে ঝাঁটার কাঠির তরোয়াল নিয়েই কত দস্যু হত্যা করেছি, রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়েছি, তার ইয়ত্তা ছিলনা!), রাজার জমকালো ড্রেস সেফটিপিন দিয়ে আটকে নিজেকে রাবণ-ই মনেহল সত্যিকারের। অতঃপর জটায়ুর ডানা কেটে সীতাকে নিয়ে পগার পার। মাঝখানে শুধু কোমর থেকে একবার তরোয়াল খুলে পড়ে গেছিল জটায়ুর সাথে যুদ্ধ করার সময়। আমি স্মার্টলি জটায়ুরূপী সৌরভকে বললাম, দাঁড়া, দেখছিস না, তরোয়াল পড়ে গেছে। বলে তরোয়ালটা কুড়িয়ে ওর ডানা কেটে তবেই ওর মুক্তি দিলাম।
এরপরেও ইস্কুলে অনেক নাটক করেছি। গরমের ছুটি যেদিন পড়ত, তার আগেরদিন। সেই এক ভুলো চাকরের গল্প, রামু। ওটাই প্রথম। গল্পটা শুনেছিলাম কারোর কাছে। স্ক্রিপ্ট বানালাম আমিই। অর্পণ চাকর, রামু। আর আমি বাবু। মনে আছে, বেশ হাততালি পেয়েছিলাম। এরপর ‘বৃত্রাসুর বধ’। সেটাও বেশ মনে আছে। আমার একটা ছোট্ট নোটবুকে লিখেছিলাম নাটকটা। আমি ইন্দ্র হয়েছিলাম। বৃত্রাসুর কে হয়েছিল মনে নেই, মনেহয় সৌরভ। ক্লাশ টুতে রবীন্দ্রনাথের ‘গেছো বাবা’ করেছিলাম। আসলে সে বছর বইমেলা থেকে বাবা ‘সে’ কিনে দিয়েছিল। তারমধ্যেই এই নাটকটা আছে। কিন্তু যে কারণেই হোক নাটকের শেষটা আমার পছন্দ হয়নি। তাই দিলাম কলম চালিয়ে রবীন্দ্রনাথের উপর। নিজের মত করে সাজিয়ে নিলাম স্ক্রিপ্ট। জোর কদমে প্রতিদিন টিফিনের সময় চলতে লাগল রিহার্সাল। দেখতে দেখতে চলে এল সেই ছুটি পড়ার দিন। লো বেঞ্চ খাড়া করে বানানো হল গাছ। তার ওপর সবুজ রঙ করা পিস্‌বোর্ড দিয়ে পাতা। তার পিছনে গেছো দাদা।
এরকম গেছোদাদারা আমার কাছ থেকে আজকাল অনেকটা দূরে সরে গেছে। সেইসব ক্ষুদে ক্ষুদে ডাইরির পাতায় লেখা ‘বৃত্রাসুরের’ স্ক্রিপ্ট, নির্ভয়ে কলম চালানো রবীন্দ্রনাথে, সব কেমন যেন দূরে সরে যায় বড় হওয়ার সাথে। জীবনের জটিলতা যতই বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে তত নিজের বোধ, বুদ্ধি। আর ততই নানারকম দার্শনিকতা বেড়িয়ে আসে। রবীন্দ্রনাথের লেখা থেকে একটা লাইন বাদ দেওয়ার আগে তার অর্থ বুঝতে হয়, গভীরতা অনুভব করতে হয়। নিশ্চিন্তে জটায়ুকে দাঁড় করিয়ে রেখে, যাওয়া যায়না তাকেই মারার জন্য তরোয়াল কুড়িয়ে আনতে।

Post 6: Akash Kolom 3

আকাশকলম
৩।।
আমার একটা খাতা ছিল। তার নাম দিয়েছিলাম ‘পাতার খাতা’। দিয়েছিলাম বললে ভুল হবে, বাবা দিয়েছিল। পুরানো সব এটা ওটা থেকে সাদা কাগজ নিয়ে নিয়ে একসাথে সেলাই করা। সপ্তাহ, মাস বা বছরের ওইসব লাল রঙা দিনগুলোতে যখন বিকেলবেলা বাবার হাত ধরে ছুট লাগাতাম এদিক-ওদিক, তখন বাবা চিনিয়ে দিত। এটা অশ্বত্থ, ওটা বট, এটা শেয়ালকাঁটা, ওটা শিরীষ...। মাঠের ধারে ঘাসের আনাচে কানাচে হয়ে থাকত আমরুলি পাতার দল। পাড়ার দিদিদের দেখতাম ওই পাতাগুলো দিয়ে খেলনাবাটি সংসারের লুচি তৈরী করত। ওরা লুচি পাতাই বলত। আমিও ওদের খেলনা বাড়ির অতিথি হয়ে ‘মিচি-মিচি’ নেমন্তন্ন খেয়েছিলাম কয়েকবার। তাই আমিও জানতাম ওগুলো ‘লুচি পাতা’। বাবা ভুল ভেঙে দেয়। একটা বাঁশঝাড় ছিল মাঠের পাশে। মা বলত ওখানে নাকি ‘ভুঁড়ো শেয়াল’ থাকে। সেই অজানা ‘ভুঁড়ো’ জাতের কোন এক ভয়ঙ্কর শেয়ালের ভয়ে কোনোদিন পা দিতে সাহস করিনি। বাবা ওখান থেকে একটা বাঁশ পাতা নিয়ে এসেছিল। বাবা সৌভাগ্য বশতঃ ওই দানবিক ‘ভুঁড়ো শেয়ালের’ দর্শন লাভ করেনি। সেই চিনেছিলাম বাঁশপাতার গায়ে লম্বা লম্বা দাগ কাটা। অনেকটা তেজপাতার মত। আমার খাতায় জমে গেছিল অনেক পাতা। বাড়ি এসে ছুটি মায়ের কাছে। সমস্ত বিকেলটা জুড়ে আগান-বাগান হেঁটে যে কটা পাতা তুলে এনেছি, সেসব ঢেলে দেওয়া। তারপর সমস্ত মণি-মাণিক্য নিয়ে সাজাতে বসি খাতার পাতায়। না-জানা পাতার পাশে লাগে পরিচয়ের ছোঁয়া। আমার পাতার খাতায় ঝেঁপে এসে বসে এক আকাশ সন্ধ্যে বেলা, জ্বলজ্বল করা সব নক্ষত্রের দল নিয়ে।   

Post 5: Akash-kolom 2


আকাশকলম
২।।
আমাদের বাড়ির সামনে একটা টগরগাছ ছিল। ‘ছিল’ বলছি এইকারণেই যে সেই বাড়িটা এখন আছে, সেখানে শুধু আমি বা ওই টগরগাছটা নেই। ওই বিশাল বড় ঝুপসি গাছটা জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকত বাগানের এক কোণে। সামনে তিনটে লম্বা লম্বা সুপুরি গাছের তিনটে সমান্তরাল ছায়ায় ঢাকা পড়ত তার চোখমুখ। শীতের সকালগুলোতে ওই গাছটার পাশে একটা টুলে বসে দাদান রোদ পোয়াত। ঘাসগালিচার আনাচে কানাচে পড়ে থাকা টগর ফুলগুলোর জন্য কেন জানিনা খুব মন খারাপ লাগে। নীল হাফপ্যান্ট, আর সাদা জামা পড়ে ইস্কুল যাওয়ার সময় দাদানকে খুব জোরে বলি, যাচ্ছি! –যাচ্ছি বলেনা, বল আসছি, দাদান হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে। মাথা নেড়ে বলি ঠিক আছে। গেট থেকে বেড়িয়ে যেতে যেতে হাত নাড়ি ওই টগর গাছের দিকে। গাছটা এক নিঃঝুম চোখে তাকিয়ে দেখে আমার চলে যাওয়া। ইস্কুল থেকে ফেরার সময় বাড়িটার বড় ছায়াটার তলায় চাপা পড়ে থাকত টগর গাছটা। ভাত খেয়ে টগর গাছের তলায় বসে কুল খাই। মা বেশ বিটনুন দিয়ে মেখে দেয় লাল লাল টোপাকুল। দানাগুলো ছুঁড়ে মারি টগর গাছটার গায়ে, একটা একটা করে। ও কিছু বলেনা। মাঝে মাঝে টুপটাপ ঝরে পড়ে কয়েকটা ফুল। একটা প্লাসটিকের প্যাকেটে জমা করি। কৃষ্ণ ঠাকুরের একটা ঘুণে কাটা ফোটো খুঁজে পেয়েছিলাম ওই লালঘরে রাখা পুরানো সিন্দুকটা থেকে কোনোদিন। টগরফুল গুলো ওর জন্যেই রাখি। পুজো করব। সোফার কোণে রেখে টগর ফুল দিয়ে সাজাব আমার ঘুণে কাটা আধখানা কৃষ্ণঠাকুরকে।