আকাশকলম
৪ ।।
আমার প্রথম ইস্কুল থেকে বাবা যখন আমায় নতুন ইস্কুলে ভর্তি করল, তখন আমি
ক্লাশ ওয়ান। পুরোন ইস্কুলের মতো এখানে পঞ্চাশ জনের ক্লাশঘর নয়। নতুন ইস্কুল বেশ
ফাঁকা ফাঁকা। আমাদের ক্লাশ ওয়ানে চারজন ছিল। আমি, অর্পণ, মল্লিকা, আর সৌরভ। উপরের
ক্লাশ টু-তে মাত্র দুজন – সুমিত আর সুপর্ণা। একটা পার্টিশনের এপাশ আর ওপাশে ক্লাশ
হত। ওই ইস্কুলের সিস্টাররা এখানে আন্টি হয়ে গেছে। শীলা আন্টি খুব রাগী ছিল। অর্পণ
একবার ‘শ্রদ্ধা’ বানানে দন্ত্য’স লাগিয়েছিল বলে ওকে কান ধরে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।
সেবার আমাদের ইস্কুলের অ্যানুয়াল ফাংশন হবে বড় করে, ঠিক হল। গান হবে, নাচ
হবে। আবোল-তাবোল হবে অভিনয় করে। আর হবে ‘জটায়ু বধ’। অপূর্ব কাকু আসত আমাদের
রিহার্সাল করাতে। তাকে যে ডিরেক্টর বলে, সে জ্ঞান তখনও হয়নি। তবু তার কথা শুনে
চলতে বেশ লাগত। প্রথম দিন আমাদের সবাইকে ডাকা হল ইস্কুলের বড় ঘরটায়। টিফিন পার হয়ে
গেছে তখন। আর ক্লাশ হবেনা শুনলাম। বরাবরের লম্বা-চওড়া, মোটা-সোটা চেহারার আমাকে
অপূর্ব কাকু ডেকে অন্যদিকে দাঁড়াতে বলল। তারপর অর্পণ, সৌরভ, নিচের ক্লাশের মৌমিতা
আরও কয়েকজন। ‘জটায়ু বধ’এ আমি নাকি রাবণ হব, আর ‘আবোল-তাবোল’এ হুঁকোমুখো হ্যাংলা!
বেশ মজা লাগলো। ততদিনে দাদান, মানে, আমার ঠাকুরদাদার কাছে রামায়ণ শুনে শুনে আমার
সব ঘটনা বলতে গেলে মুখস্থ। আর বইমেলা থেকে বাবা কিনে দিয়েছিল হলুদ মলাটের
আবোল-তাবোল। নিউ স্ক্রিপ্টের। ওখানে হুঁকোমুখো হ্যাংলার দুটো ল্যাজওয়ালা চেহারাটা
বেশ ইন্টারেস্টিং। জোর কদমে চলতে লাগল রিহার্সাল। মৌমিতা সীতা হয়েছিল। নাটকটা
‘জটায়ু বধ’এ সমাপ্ত হওয়াতে আমাকে বধ হতে হয়নি, তাবে সীতাকে হরণ করার সৌভাগ্যটুকু
হয়েছিল। বাবা বলেছিল, এই বয়েসেই পরস্ত্রী হরণ!
নাটকের দিন শেঠপুকুরের মাঠে বিশাল স্টেজ হয়েছিল। স্পিরিট গাম দিয়ে লাগানো
গোঁফ নিয়ে, সত্যিকারের তরোয়াল নিয়ে (এত দিন বাড়িতে ঝাঁটার কাঠির তরোয়াল নিয়েই কত
দস্যু হত্যা করেছি, রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়েছি, তার ইয়ত্তা ছিলনা!), রাজার জমকালো
ড্রেস সেফটিপিন দিয়ে আটকে নিজেকে রাবণ-ই মনেহল সত্যিকারের। অতঃপর জটায়ুর ডানা কেটে
সীতাকে নিয়ে পগার পার। মাঝখানে শুধু কোমর থেকে একবার তরোয়াল খুলে পড়ে গেছিল জটায়ুর
সাথে যুদ্ধ করার সময়। আমি স্মার্টলি জটায়ুরূপী সৌরভকে বললাম, দাঁড়া, দেখছিস না,
তরোয়াল পড়ে গেছে। বলে তরোয়ালটা কুড়িয়ে ওর ডানা কেটে তবেই ওর মুক্তি দিলাম।
এরপরেও ইস্কুলে অনেক নাটক করেছি। গরমের ছুটি যেদিন পড়ত, তার আগেরদিন। সেই
এক ভুলো চাকরের গল্প, রামু। ওটাই প্রথম। গল্পটা শুনেছিলাম কারোর কাছে। স্ক্রিপ্ট
বানালাম আমিই। অর্পণ চাকর, রামু। আর আমি বাবু। মনে আছে, বেশ হাততালি পেয়েছিলাম।
এরপর ‘বৃত্রাসুর বধ’। সেটাও বেশ মনে আছে। আমার একটা ছোট্ট নোটবুকে লিখেছিলাম
নাটকটা। আমি ইন্দ্র হয়েছিলাম। বৃত্রাসুর কে হয়েছিল মনে নেই, মনেহয় সৌরভ। ক্লাশ
টুতে রবীন্দ্রনাথের ‘গেছো বাবা’ করেছিলাম। আসলে সে বছর বইমেলা থেকে বাবা ‘সে’ কিনে
দিয়েছিল। তারমধ্যেই এই নাটকটা আছে। কিন্তু যে কারণেই হোক নাটকের শেষটা আমার পছন্দ
হয়নি। তাই দিলাম কলম চালিয়ে রবীন্দ্রনাথের উপর। নিজের মত করে সাজিয়ে নিলাম
স্ক্রিপ্ট। জোর কদমে প্রতিদিন টিফিনের সময় চলতে লাগল রিহার্সাল। দেখতে দেখতে চলে
এল সেই ছুটি পড়ার দিন। লো বেঞ্চ খাড়া করে বানানো হল গাছ। তার ওপর সবুজ রঙ করা পিস্বোর্ড
দিয়ে পাতা। তার পিছনে গেছো দাদা।
এরকম গেছোদাদারা আমার কাছ থেকে আজকাল অনেকটা দূরে সরে গেছে। সেইসব ক্ষুদে
ক্ষুদে ডাইরির পাতায় লেখা ‘বৃত্রাসুরের’ স্ক্রিপ্ট, নির্ভয়ে কলম চালানো
রবীন্দ্রনাথে, সব কেমন যেন দূরে সরে যায় বড় হওয়ার সাথে। জীবনের জটিলতা যতই বাড়তে
থাকে, বাড়তে থাকে তত নিজের বোধ, বুদ্ধি। আর ততই নানারকম দার্শনিকতা বেড়িয়ে আসে।
রবীন্দ্রনাথের লেখা থেকে একটা লাইন বাদ দেওয়ার আগে তার অর্থ বুঝতে হয়, গভীরতা
অনুভব করতে হয়। নিশ্চিন্তে জটায়ুকে দাঁড় করিয়ে রেখে, যাওয়া যায়না তাকেই মারার জন্য
তরোয়াল কুড়িয়ে আনতে।
No comments:
Post a Comment