সেবার আমার দ্বিতীয়বার কেদারনাথ যাওয়া।
প্রথমবার যখন গেছিলাম, আমার বয়স তখন চার। তাই স্মৃতি মলিন। কিছু কিছু ছেঁড়া আবছা
চিত্রপট ছাড়া সবই অন্ধকার।
এবার বাবা ঠিক করল একবারে গৌরীকুন্ড থেকে
কেদারে উঠব না। প্রায় চোদ্দ কিলোমিটার রাস্তা। তাই শ্রম হয়, নান্দনিকতার আস্বাদন
ঢাকা পড়ে যায়। আসলে আমরা বেড়াতে যাই, যাকে বিশুদ্ধ বাংলায় বলে ‘ভ্রমণ’। ভ্রমণ
শব্দটির উৎপত্তি ‘ভ্রম’ ধাতু থেকে, যার অর্থ হল জরায়ুর মধ্যে প্রাণের স্পন্দন,
জেগে ওঠা। নবনীতা দেবসেন বলেছেন, এই ভ্রম কিছুটা আর কিছুটা রমণ, দুইয়ে মিলে ভ্রমণ।
তাই বেড়ানোর মধ্যে যদি নান্দনিকতা না থাকে, ওই জেগে ওঠার অবসর টুকু না মেলে, তাহলে
পরিতৃপ্তি আসে নাকি! বিদেশীরা যেমন ‘ট্রাভেল’ করে। ‘ট্রাভেল’ শব্দের উৎস
‘ত্রাভায়ি’, যার অর্থ হল পরিশ্রম করা। আমি তাই ট্রাভেল কখনো করতে ভালোবাসি না, ভ্রমণ
করি।
যাক, নিজের জ্ঞান জাহির করতে গিয়ে ধান ভানতে
শিবের গীত গেয়ে ফেল্লুম। ফিরে আসি কেদারে। এইসব সাতপাঁচ চিন্তা করে বাবা বলল যে
মাঝে রামওয়াড়া চটিতে থাকা হবে রাত। পরদিন বাকি পথটুকু হেঁটে কেদার। গৌরীকুন্ড থেকে
ধর্মোৎসাহী মানুষের ভীড় ঠেলে এগিয়ে চলা। দুদিকের অপার সৌন্দর্যের দিকে কারো চোখ
নেই, পায়ে হেঁটে, দন্ডি কেটে, খচ্চরে চড়ে, পালকি চেপে এগিয়ে চলেছে দেব দর্শনের
জন্যে। বর্তমানে মরে থেকে পরকাল বাঁচতে চাওয়ার আকুতি। কখনো কখনো হাক্সলে সাহেবের
কথাটা খাঁটি সত্যি মনেহয়, ভারতের মানুষ ধর্মের নেশায় সব হারিয়েছে।
হিমালয়ের কোল কেটে যখন রামওয়াড়া পৌঁছালাম,
সুর্য অস্তায়মান। Twilight-এর অপরূপ মায়া ছড়িয়ে
পড়েছে বরফের গায়ে গায়ে। একটা ছোট হোটেল পাওয়া গেল রাতটুকুর জন্যে। বিকেলের রোদ্দুর
গায়ে মাখিয়ে বারান্দায় বসা, গরম চা-এর পেয়ালায় নিজেকে গরম করে নেওয়ার চুমুক দিই।
চোখে পড়ে বারান্দার এক কোণ ঘেঁসে বসে থাকা এক সাধু। সোয়েটার, জ্যাকেট চাপিয়েও আমরা
জমে যাচ্ছি, আর সাধুর উর্ধাঙ্গ অনাবৃত। মুখে একটা মিটিমিটি হাসি। দেখে খুব অবাক
হই। হিন্দিতে বাবা জিগ্যেস করে, আপনি কোথায় চলেছেন?
-কেদারনাথ। সাধুর জবাব।
-আসছেন কোথা থেকে? মা এবার প্রশ্ন করে।
-বদ্রীনাথ।
-কিভাবে এলেন?
-হেঁটে। সাধুর নির্লিপ্ত উত্তর।
-আপনি এই ভাবে শীতের জামা ছাড়া হেঁটে হেঁটে
বদ্রী থেকে এতদূর এসেছেন! আমাদের সকলের চোখে মুখে বিস্ময়।
-হ্যাঁ, আমার কষ্ট হয় না। আমি এভাবেই ঘুরি।
তার আগে ছিলাম রূদ্রনাথ। সেখান থেকে বদ্রী চলে গেলাম। ভালো লাগল না বেশীদিন। এখন
চলেছি বাবা কেদারকে দেখব। বারবার আসি। কিন্তু যা চাই, সেটা কোথাও খুঁজে পাইনা।
-কি চান আপনি?
-সেটাই তো বুঝিনা। কে যে আমায় তাড়িয়ে নিয়ে
বেড়ায়... পার্থিব দুঃখ, কষ্ট, কিছু গায়ে লাগেনা। খুঁজে চলেছি।
দুচার কথার পর আমরা উঠে আসি। সাধু বললেন,
বারান্দাতেই রাত কাটাব।
তারপর, টুপটাপ বরফ পরার শব্দ শুনতে শুনতে
মোটা লেপের তলায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। সারাদিন পথ হাঁটার ক্লান্তি।
ভোরবেলা ঘুম ভাঙে। বাইরে সারারাত বরফ পড়েছে।
বারান্দার কোণটা ফাঁকা। কেয়ার-টেকার বলে সাধু ভোরের আলো ফোটার আগেই বেড়িয়ে পড়েছেন।
একটা কৌপিন সম্বল করে অবিরাম তুষারের মধ্যে
রাত কাটিয়েছেন। তারপর বেড়িয়ে পরেছেন অজানার খোঁজে। আমরা তৈরি হয়ে হাঁটা শুরু করি
কেদার-এর উদ্দেশ্যে। ততক্ষণে উনি হয়তো আরো অনেকখানি এগিয়ে গেছেন ঈশ্বরের কাছে। মনে
মনে বললাম, ওহে হাক্সলে, মানুষের শুধু হারানোটাই দেখলে, পাওয়ার জন্যে এরকম
আকুলতাটা চোখে পড়ল না?
No comments:
Post a Comment